📄 দ্বিতীয় শতাব্দী
দ্বিতীয় শতাব্দীর সূচনালগ্নে ১০৬ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট ট্রাজান (Trajan) রোমান সাম্রাজ্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তার সময়ে খ্রিষ্টানদের ওপর নানাবিধ শাস্তির খড়গ নেমে আসতে শুরু করে। প্রচুর সংখ্যক খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক, যোহনের শিষ্যবৃন্দ এবং খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীদের তিনি হত্যা করেন। নির্যাতনের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র ছিল যে, খ্রিষ্টানরা গোপনে তাদের ধর্মীয় বিধিবিধান পালন করতে বাধ্য হয়। সালাত, ওয়াজ-নসিহত, মসিহ আলাইহিস সালামের ওপর নাজিলকৃত ইনজিলের তেলাওয়াত সবই গোপনে করতে হতো। এ সম্পর্কে তারিখুল হাদারাহ গ্রন্থে বলা হয়েছে, “একজন এশিয়ান শাসক ব্লেইন (Blaine) সম্রাট ট্রাজানের কাছে একটি চিঠি লিখেন। চিঠিতে তিনি খ্রিষ্টানদের সাথে তার আচরণের বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন: খ্রিষ্টানদের অনুকারী হিসেবে অভিযুক্তদের সাথে আমি নিম্নোক্ত আচরণ করেছি। প্রথমেই আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করি তারা খ্রিষ্টান কি না? নিজেদেরকে খ্রিষ্টান দাবি করলে আমি দ্বিতীয় ও তৃতীয় বারের মতো জিজ্ঞেস করি এবং মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখাই। এরপরও যদি তারা অটল থাকে তখন আমি তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দিই। কেননা, আমি মনে করি তাদের এই জঘন্য অপরাধ ও কঠোর একগুঁয়েমির শাস্তি এটাই হওয়া উচিত। আমি আরও অনেকের ব্যাপারে খ্রিষ্টান হওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। কিন্তু তারা নিজেদের খ্রিষ্টান হওয়াটাকে অস্বীকার করেছে। আমি তাদের সামনে দেবতাদের নাম উল্লেখ করেছি। তারা তাদের পুজো দিয়েছে। তাদের সামনে আমি দেবতাদের প্রতিকৃতি উপস্থাপন করেছি। তারা সেগুলোর সামনে প্রসাদ ছড়িয়েছে এবং ধূপ জ্বালিয়েছে। এমনকি তারা মসিহকেও গালি দিয়েছে। বলা হয়ে থাকে প্রকৃত খ্রিষ্টানদের বাধ্য করা কঠিন। তাদের অনেকেই নিজেদেরকে খ্রিষ্টান হিসেবে স্বীকার করে। কিন্তু তারা এ কথার স্বীকৃতি দিয়েছে যে, তাদের অপরাধ হলো কোনো কোনো দিন তারা সূর্যোদয়ের পূর্বে প্রভু হিসেবে মসিহের ইবাদতের জন্য সমবেত হয়। তার সম্মানে তারা শ্লোক পাঠ করে। এরপর তারা শপথ নেয় যে; চুরি করবে না, মানুষ হত্যা করবে না, যিনা করবে না, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। বাস্তবতা উদঘাটনের জন্য আমি দুজন নারীকে শাস্তি দিলাম যাদের ব্যাপারে বলা হতো যে এরা গির্জাকে ভয় করে। কিন্তু আমি দেখলাম তাদের এগুলো সব কাল্পনিক ও অতিরঞ্জন ব্যতীত আর কিছুই নয়।" [৪০০]
এ যুগে খ্রিষ্টানদের অপবিত্রজ্ঞান করা হতো। গোসলখানা এবং জনসমাবেশস্থলে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। অনেক সময় তাদেরকে হিংস্র জন্তুর সামনে ছেড়ে দেওয়া হতো। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার জন্য মানুষ জড়ো হতো এবং এই হিংস্রতা উপভোগ করত।[৪০১]
খ্রিষ্টানদের পেছনে এসব ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ছিল ইহুদিরা। সদর হাদরু-রদস[৪০২] গ্রন্থে বলা হয়েছে, "রাব্বি যিহুদা রোমান সম্রাটের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন। তিনি নাসেরিদের[৪০৩] সম্পর্কে সম্রাটের কাছে প্রোপাগান্ডা চালান। তিনি সম্রাটকে বলেন, এরাই ছোঁয়াচে রোগের কারণ। এর ওপর ভিত্তি করে হিব্রু ৩৯১৫ সাল মোতাবেক ১৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সকল নাসেরিদেরকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই গ্রন্থে আরও বলা হয়েছে, "সম্রাট মার্ক অরেল (Mark Aurel) ইহুদিদের যোগসাজশে সকল নাসেরিদের হত্যা করেন।"
টিকাঃ
[৪০০] মুহাদারাত ফিন নাসরানিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৩৫-৩৬।
[৪০১] আল-ইদত্বিহাদুদ দীনি ফিল মসিহিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৩৫।
[৪০২] একটি গ্রন্থের নাম। তবে শব্দটির বানান ও উচ্চারণে সন্দেহ রয়ে গেল। নানা উৎস ঘাঁটাঘাঁটি করেও নিশ্চিত হওয়া গেল না।- সম্পাদক।
[৪০৩] ঈসা আলাইহিস সালাম গালিলের নাসরত এলাকাকে কেন্দ্র করে তার দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বিধায় তার অনুসারীদেরকে নাসেরি নামে অভিহিত করা হয়। -অনুবাদক
📄 তৃতীয় শতাব্দী
তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সম্রাট ডেসিয়াস (Decius) (২৪৯-২৫১খ্রি.) সিংহাসনে আরোহণ করেন। খ্রিষ্টানদের প্রতি নির্যাতন ও জুলুমের ক্ষেত্রে তিনি পূর্বের সকলকে ছাড়িয়ে যান। আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ যিনি ডেসিয়াসের নির্যাতন ও ধড়পাকড় প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি বর্ণনা দেন যে, "অতিমাত্রায় ভয়ের কারণে আমরা দীর্ঘশ্বাসও ফেলতে পারছিলাম না। আমাদের পূর্ববর্তী শাসকের চেয়ে পরবর্তী শাসক আরও বেশি নিষ্ঠুর ও দয়াহীন হতো। যাই হোক, শাসকের পরিবর্তন হলো। সিংহাসনে বসতে না বসতেই সে আমাদের দিকে নজর দিলো। শুরু করল নিপীড়ন। জারি করল অন্যায়মূলক কঠিন থেকে কঠিনতর নির্দেশ। ফলে আমাদের আশঙ্কাই সত্যি প্রমাণিত হলো। সকলের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ল। অনেকেই পালিয়ে গেল। এই শাসক যোগ্যতার বিবেচনা না করেই রাষ্ট্রীয় সমস্ত দায়িত্ব থেকে খ্রিষ্টানদেরকে অব্যাহতি দিলো। ত্বরিৎ একেকজনকে ধরে আনত। তাকে তাদের উপাসনাগৃহে প্রবেশ করাত। বাধ্য করত দেবতার উদ্দেশ্যে বলি ও নৈবেদ্য প্রদান করতে। বলি প্রদানে কেউ অস্বীকৃতি জানালে মূর্তির সামনে তাকেই বলি দেওয়া হতো। দুর্বল ঈমানদাররা ধর্ম ত্যাগ করল। অনেকেই ঈমান রক্ষায় পালিয়ে গেল। আবার অনেকেই বন্দি হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলো।”
ডেসিয়াসের পর শাসন ক্ষমতায় আসলেন ডায়োক্লেটিয়াস (Diocletius)। তিনি লোকমুখে দিকিয়ানুস নামে পরিচিত ছিলেন। প্রথম দিকে তিনি খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে অন্যদের মতো কঠোর ছিলেন না। খ্রিষ্টানরা তার কাছ থেকে ভালো কিছুই প্রত্যাশা করেছিল। কারণ, তার বিশেষ ব্যবস্থাপক ছিলেন একজন খ্রিষ্টান। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মিশরের খ্রিষ্টানরা রোমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা করতে লাগল। একজনকে তাদের নেতাও বানিয়ে নিল। এই স্বাধীনতা আন্দোলনের খবর জানতে পেরে দিকিয়ানুস ভীষণ রাগান্বিত হয়ে ক্ষিপ্রগতিতে মিশরে এসে পৌঁছান। শুরু করলেন খ্রিষ্টানদেরকে কঠোর শাস্তি প্রদান। তাদের গির্জাগুলো ধ্বংস করলেন। ধর্মীয় পুস্তকগুলো পুড়িয়ে ফেললেন। গির্জার যাজক ও নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়ে দিলেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে ২৮৪ খ্রিষ্টাব্দের এই ঘটনায় প্রায় তিন লক্ষ লোক নিহত হয়।
এই সময়টাতে তাওহিদবাদী মুমিনদের একটি দল পালিয়ে পর্বত-গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল এদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সূরা কাহাফে বলা হয়েছে-
أَمْ حَسِبْتَ أَنَّ أَصْحَبَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ ءَايَتِنَا عَجَبًا . إِذْ أَوَى الْفِتْيَةُ إِلَى الْكَهْفِ فَقَالُوا رَبَّنَا ءَاتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرিনَا رَشَدًا .
আপনি কি ধারণা করেন যে, গুহা ও গর্তের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলির মধ্যে বিস্ময়কর ছিল? যখন যুবকরা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয়গ্রহণ করে, তখন দুআ করে: হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে নিজের কাছ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্যে আমাদের কাজ সঠিকভাবে পূর্ণ করুন। [সুরা কাহাফ, আয়াত: ৯-১০]
পরবর্তীতে সম্রাট দ্বিতীয় থিউডোসিয়াস (2nd Theodosius)-এর সময়ে এদের ঘুম ভাঙে। উল্লেখ্য, সম্রাট থিউডোসিয়াস ৪০৮-৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তিনি খ্রিষ্টধর্মেও দীক্ষিত হন। তার সময়কালে ৪৪৫ কিংবা ৪৪৬ খ্রিষ্টাব্দে এই যুবকগণের ঘুম ভাঙে। [৪০৪]
এ বিষয়ে সবচেয়ে প্রাচীন সাক্ষ্যপত্র হলো সিরীয় খ্রিষ্টান পাদরি জেমস স্রোজি এর বর্ণনা। যিনি ৪৫২ খ্রিষ্টাব্দে গুহাবাসীদের জেগে ওঠার দু-বছর পর জন্মগ্রহণ করেন। [৪০৫] তিনি ছিলেন শাম অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট পাদরি। ৪৭২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তার নসিহতগুলোকে সুরিয়ানি ভাষায় সংকলন করেন। তার এই বর্ণনা আল্লামা তাবারিসহ আরও অনেক মুফাসসিরিনের হস্তগত হয়। তাফসিরের কিতাবে গুহাবাসীদের সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে তারা এই বর্ণনা থেকেও অনেক কিছুই উল্লেখ করেছেন। জেমস এর এই বর্ণনা ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষায় অনূদিত হয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপিয়ান ইতিহাসবিদদের জন্য গুহাবাসীদের ঘটনার একমাত্র রেফারেন্স বই হলো এটাই।
এ শতাব্দীতে অনেক খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক নিজেদের দ্বীন রক্ষার্থে খ্রিষ্টধর্মের দাওয়াত নিয়ে ইরানে হিজরত করেন। জরাথ্রুস্টীয় কাউকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত না করার শর্তে ইরানি শাসকবর্গ তাদেরকে ধর্মমত প্রচারের অনুমতি দেন।
খ্রিষ্টানদের এই গ্রুপটি নিরাপত্তার সাথে ইরানে অবস্থান করতে থাকে। রোমান সম্রাট কনস্টানটিন খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থা বিদ্যমান ছিল। কনস্টানটিন ছিলেন খ্রিষ্টানদের জন্য বিরাট অনুগ্রহ। তিনি সকল খ্রিষ্টান বন্দিকে মুক্তি দেন। এমনকি খ্রিষ্টধর্মকে রোমানদের রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। পৌত্তলিক রোমান সাম্রাজ্যকে খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যে পরিণত করার জন্য বহু খ্রিষ্টানকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত করেন।
এদিকে ইরানে অবস্থানরত খ্রিষ্টানরা যখন রোম সম্রাটের খ্রিষ্টানপ্রীতি প্রত্যক্ষ করল তখন তারা নিজেরাও সম্রাটের প্রতি আগ্রহী ও আন্তরিক হয়ে উঠল। কিন্তু রোমান ও ইরানিদের মাঝে ছিল তুমুল বৈরীভাব। সেই সূত্র ধরে ইরানি সরকার নিজেদের দেশে অবস্থানরত খ্রিষ্টানদের ওপর রোম সম্রাটের সাথে সম্পর্কের অপরাধে নির্যাতন শুরু করে। পরিশেষে ৩৭৬ খ্রিষ্টাব্দে উভয় সাম্রাজ্যের মাঝে শান্তিচুক্তি স্থাপিত হলে এই দুঃসময়ের ইতি ঘটে।
ইরানে যাপিত সময়টা খ্রিষ্টানদের আকিদা-বিশ্বাসে অত্যন্ত বিরূপ প্রভাব ফেলে। পরিবেশের প্রভাবে জরাথ্রুস্টীয় বিভিন্ন পৌত্তলিক আকিদা-বিশ্বাস তাদের মধ্যে প্রবেশ করে। খ্রিষ্টানদের ত্রিত্ববাদ-সম্পর্কিত আলোচনায় এ সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
[৪০৪] এ হিসেবে তাদের গুহায় অবস্থানকাল ছিল ১৬৬ বছর। কিন্তু সেক্ষেত্রে কুরআনের বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। কেননা কুরআনে তাদের অবস্থানকাল তিনশ আরও অতিরিক্ত নয় বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসিরগণের মতে এটাই উদ্দিষ্ট ও সঠিক সংখ্যা যা আল্লাহ তাআলা মানুষকে অবহিত করেছেন। পক্ষান্তরে অন্যান্য মুফাসসিরের মত হলো সংখ্যাটা আহলে কিতাবের বর্ণনা, যা আল্লাহ তাআলা কুরআনের মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়েছেন। এখানে আহলে কিতাবের বর্ণনা উল্লেখ করাই উদ্দেশ্য। প্রকৃত সময়কাল বিবৃত করা উদ্দিষ্ট নয়। তাই তো কুরআনে এর পরেই আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন قل الله أعلم بما لبثوا অর্থাৎ 'আপনি বলে দিন, আল্লাহই ভালো জানেন তারা কতদিন অবস্থান করেছিল।” যদি উল্লিখিত সংখ্যাটাই নির্ভুল সময়কাল হতো তাহলে পরে এই কথাটা বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না। ইবনে আব্বাস, কাতাদাহ, মুতাররিফ ইবনে আবদুল্লাহসহ আরও অনেকেই এই মত পোষণ করেছেন। বিস্তারিত দেখুন তাফসিরে ইবনে জারির তাবারি, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ১৫২
[৪০৫] একটু আগেই লেখক উল্লেখ করেছেন গুহাবাসীরা ৪৪৫/৪৪৬ খ্রিষ্টাব্দে জেগে উঠেছিল। আর জেমসের জন্ম বলা হচ্ছে ৪৫২ খ্রিষ্টাব্দে। সে হিসেবে গুহাবাসীদের জেগে উঠার কমপক্ষে ছয় বছর পর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু এখানে সময়ের পার্থক্য মাত্র দু-বছর উল্লেখ করা হয়েছে। এটা হয়তো টাইপিং মিসটেক নতুবা লেখকের অসতর্কতায় হয়ে গিয়েছে বলে আমরা মনে করি।-অনুবাদক
📄 চতুর্থ শতাব্দী
চতুর্থ শতাব্দীতে রোম সম্রাট কনস্টানটিন এর খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্থার সৃষ্টি হয়। তন্মধ্যে সবচেয়ে কঠোর প্রকৃতির ছিল হলিক্রস, যার উদ্দেশ্য ছিল মসিহকে অস্বীকারকারী সকল রোমানদের মূলোৎপাটন করা। দীর্ঘ তিন শতাব্দী যাবৎ জুলুমের শিকার হয়ে আসা খ্রিষ্টানরা পৌত্তলিক রোমানদের থেকে প্রতিশোধ নিতে শুরু করল। এ সময়ে তারা হিংস্রতার দিক থেকে বিগত সময়ের রোমানদের চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না। এমনকি এ সময়টাকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বীভৎস সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই জুলুম-নির্যাতন শুধু কাফির ও পৌত্তলিকদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বকে অস্বীকারকারী খ্রিষ্টানরাও এই নিপীড়নের শিকার হয়। কেননা, রোমান সম্রাট কনস্টানটিন পোল কর্তৃক প্রচারিত খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করেছিলেন। তাই বিরুদ্ধবাদীদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চলতে শুরু করে।
একারণেই দেখা যায়, এ শতাব্দীতে খ্রিষ্টানদের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। বিশেষ করে পোল ও অন্যান্য কিছু ইহুদির উদ্দেশ্যমূলকভাবে খ্রিষ্টধর্মে প্রবেশের পরই আকিদাগত এই পরিবর্তনের সূচনা ঘটে।
তাওহিদবাদী খ্রিষ্টান বিশ্বাসীগণ এবং মসিহ এর প্রভুত্বের দাবিদার পোলের অনুসারীদের মাঝে দ্বন্দ্ব চলমান ছিল। জুলুম-নির্যাতনের সময়ে রচিত কিতাবগুলো পোলের মতবাদ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। বিশেষ করে সুসমাচারসমূহ এবং পত্রাবলি। এজন্যই আমরা এগুলোতে অর্থ ও বাচনভঙ্গি প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বিরোধ দেখতে পাই। এমনকি এ সময়ে এই পুস্তকগুলোর সনদও হারিয়ে যায়।
শায়খ রহমতুল্লাহ কিরানবি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ইযহারে হকে বলেন, “আমরা বহুবার তাদের বিশেষজ্ঞ উলামাদের কাছে তাদের গ্রন্থগুলোর অবিচ্ছিন্ন সনদ উপস্থাপনের দাবি করেছিলাম। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। আমার এবং তাদের মাঝে সংঘটিত বিভিন্ন বিতর্ক সভায় তাদের অনেক পাদরি এ ব্যাপারে অপারগতা পেশ করেছেন। তারা বলেছেন দীর্ঘ তিনশ তেরো বছর যাবৎ খ্রিষ্টানদের ওপর আপতিত নানা ফিতনা ও মুসিবতের সময় আমাদের কাছ থেকে সনদ বা বর্ণনাসূত্র হারিয়ে গেছে।
তাদের কাছে রক্ষিত বর্ণনাসূত্রগুলোতেও আমরা নজর বুলিয়েছি। দেখতে পেলাম সেগুলো কিছু ধারণাপ্রসূত বর্ণনাসূত্র বৈ কিছু নয়। কিছু ইঙ্গিতসূচক বিষয় এবং ধারণার ওপর নির্ভর করেই তারা এগুলো বর্ণনা করে থাকে। আমি বলেছি এমন নাজুক বিষয়ে ধারণাপ্রসূত কিছু উপযুক্ত নয়। এখন পর্যন্ত তারা উপযুক্ত কোনো প্রমাণ, অবিচ্ছিন্ন বর্ণনাসূত্র নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হতে পারেনি। আমাদের জন্য যথেষ্ট যে তারা আসছে না। কেননা, দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা তাদের দায়িত্ব। আমাদের নয়।”
বাস্তবতা হলো নির্যাতনের সময়টাতে তারা পুস্তকগুলো রাতের অন্ধকারে সকলের অগোচরে লিপিবদ্ধ করতে বাধ্য হয়। ফলে তাদের ইচ্ছেমতো সেখানে সংযোজন-বিয়োজন করে ও হাওয়ারিদের নামে মিথ্যা ও বানোয়াট বক্তব্যের অবতারণা করে। এ ধরনের সংযোজন, বিয়োজন ও মিথ্যা থেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় ধারাবাহিক বর্ণনাসূত্র থাকা। অথচ এগুলোতে তা একেবারেই অনুপস্থিত।
একইভাবে প্রথম শতাব্দীতে রোমান ও মিশরীয়দের অনেকগুলো দল খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়। তাদের বিবেক-বুদ্ধির ওপর আগ থেকেই রোমান ও গ্রিক দর্শনের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। খ্রিষ্টানরা এসব ভিনদেশি দর্শন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয় এবং মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্ব ও ত্রিত্ববাদের মতো আকিদার অনুপ্রবেশ ঘটায়।
এজন্যই প্রাচ্যবিদ গোথিয়ার (Gauthier) তার গ্রন্থ 'আল-মাদখাল লি-দিরাসাতিল ফলসাফাতিল ইসলামিয়া' গ্রন্থে দাবি করেন যে, ত্রিত্ববাদ খ্রিষ্টানদের থেকে উদ্ভব হয়নি। এটি গ্রিক দর্শন থেকে এসেছে। এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা আমরা ত্রিত্ববাদ-সম্পর্কিত আলোচনায় উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ।