📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 পর্যালোচনা

📄 পর্যালোচনা


এক.
লুকের সুসমাচারে লুইস এর স্থলে যাকোবের ভ্রাতা যিহুদার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। [৩৮]

দুই.
যোহন গাদ্দার যিহুদা ব্যতীত অন্য এক যিহুদার নাম উল্লেখ করেছেন এবং স্পষ্ট করে বলেছেন, “ইনি যিহুদা ইস্করিয়োতি নন।” এ থেকে বোঝা যায়, ইনি হলেন প্রেরিতদের কার্যবিবরণীর লেখক লুক কর্তৃক বর্ণিত যাকোবের ভ্রাতা যিহুদা।

তিন.
প্রেরিতদের কার্যবিবরণীতে দ্বাদশ শিষ্যের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

চার.
মথি ও বরনাবা এর বর্ণনা অনুযায়ী করগ্রহীতার নাম ছিল মথি দশম। পক্ষান্তরে মার্কের বর্ণনা অনুযায়ী করগ্রহণের ডেস্কে যিনি বসতেন তার নাম লেবি বিন আলফেয়ের। [৩৯]

পাঁচ.
বরনাবার সুসমাচারের বর্ণনামতে বরনাবা ছিলেন বারোজন শিষ্যের একজন। বরনাবা নিজেই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এই সুসমাচারের লেখক যাকে অন্যান্য সুসমাচারের লেখকগণ শিষ্যদের তালিকায় স্থান দেননি, প্রকৃতপক্ষে তিনিও একজন শিষ্য ছিলেন। প্রেরিতদের কার্যবিবরণীর বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। [৪০] খ্রিষ্টান গবেষকদের অনেকেই সুসমাচারগুলোর এমন যথেচ্ছচারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। অনুসন্ধান ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই লেখকগণ শিষ্যদের নাম বসিয়ে দিয়েছেন বলে তাদের স্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

টিকাঃ
[৩৮] যোহন, অধ্যায়: ১৪, অনুচ্ছেদ: ২২।
[৩৯] মার্ক, অধ্যায়: ২, অনুচ্ছেদ: ১৪।
[৪০] প্রমাণস্বরূপ দেখুন: প্রেরিত, অধ্যায়: ৪, অনুচ্ছেদ: ৩৬; অধ্যায়: ৯, অনুচ্ছেদ: ২৭; অধ্যায়: ১১, অনুচ্ছেদ: ২২-২৫।

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 ইহুদিরা মসিহ আলাইহিস সালামের দাওয়াতের বিরোধিতা করার কারণ

📄 ইহুদিরা মসিহ আলাইহিস সালামের দাওয়াতের বিরোধিতা করার কারণ


ইহুদিরা আল্লাহর শরীয়তের অবাধ্য জাতি- এ কথা অকাট্য সত্য। তাদের ধর্মীয় পুস্তক তাওরাতেই তাদের এই অবাধ্যতার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। এবং বারবার আল্লাহর দীনকে আঁকড়ে ধরার দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের মন্দ স্বভাবে কোনো পরিবর্তনই আসেনি। মুসা আলাইহিস সালামের পর থেকে ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত হাজার বছর বহু নবি-রাসুল ও সংস্কারগণের আগমন ঘটেছে, কিন্তু তাদের স্বভাব বদলায়নি কিঞ্চিৎও। যখনই তারা সুযোগ পেয়েছে অবাধ্যতা, কুফরি ও পৌত্তলিকতায় লিপ্ত হয়েছে। বস্তুবাদের দিকে ধাবিত হয়েছে। পার্থিব স্বার্থে ডুবে গিয়েছে। বস্তুবাদ তাদের চিন্তা-চেতনা, মন-মানস ও অনুভূতিকে কাবু করে ফেলেছে। এমনকি এক পর্যায়ে তারা আম্বিয়ায়ে কেরাম ও নেককার ব্যক্তিবর্গকে হত্যা করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি।

অপরদিকে তাদের পণ্ডিত ও পুরোহিতগণ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ও জাতিকে পথহারা করার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে ধর্মীয় রীতি-নীতি ও বাহ্যিক কর্মকাণ্ডকে, যেখানে ছিল না দ্বীনের মৌলিকত্ব ও মূল লক্ষ্যের ছিটেফোঁটাও। এমন একটি বিশৃঙ্খল সমাজে অরাজক পরিস্থিতিতে যখন একজন নবি এসে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করলেন, বাহ্যিক লৌকিকতা বাদ দিয়ে দ্বীনের মূলকে আঁকড়ে ধরার আহ্বান জানালেন, তখনই তারা সেই নবিকে কুফরি ও ভ্রষ্টতার অপবাদ দিতে শুরু করল। এমনকি শাসকগোষ্ঠীর সামনে তাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করল। তারা রোমান প্রশাসনকে উস্কে দিয়ে তার মৃত্যু পরোয়ানাও জারি করাতে সক্ষম হলো।

ইহুদি জাতি কর্তৃক মসিহ আলাইহিস সালামের এই কঠোর বিরোধিতার কারণগুলো ছিল নিম্নরূপ:

এক.
ইহুদিরা এমন একজন নবির প্রতীক্ষা করত, যিনি তাদের বাদশাহ হবেন। এবং সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে তাদেরকে শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করবেন। কিন্তু মসিহ আলাইহিস সালামকে তারা এমন একজন নবি হিসেবে আবিষ্কার করল যিনি সশস্ত্র সংগ্রামের পরিবর্তে ধৈর্য, স্থিরতা, চিন্তা-ফিকির ও ঈমানের দাওয়াত দিচ্ছেন। ফলে তারা তার সঙ্গ ত্যাগ করল এবং বিভিন্ন গণজমায়েত ও উপাসনাগৃহে প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করতে শুরু করল। কারণ, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। [৩৪৬]

দুই.
ইহুদিরা সাবাত দিবস তথা শনিবারকে মর্যাদার চোখে দেখতো। কারণ, মুসা আলাইহিস সালামকে প্রদত্ত দশ আজ্ঞার চতুর্থ আজ্ঞায় এ দিবসকে মর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যেমন যাত্রাপুস্তকে বলা হয়েছে, "তুমি বিশ্রামদিন স্মরণ করিয়া পবিত্র করিও। ছয় দিন শ্রম করিও, আপনার সমস্ত কার্য করিও; কিন্তু সপ্তম দিন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশে বিশ্রামদিন। সেই দিন তুমি, কি তোমার পুত্র কি কন্যা, কি তোমার দাস কি দাসী, কি তোমার পশু, কি তোমার পুরদ্বারের মধ্যবর্তী বিদেশী, কেহ কোনো কার্য করিও না। কেননা, সদাপ্রভু আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী, সমুদ্র ও সেই সকলের মধ্যবর্তী সমস্ত বস্তু ছয় দিনে নির্মাণ করিয়া সপ্তম দিনে বিশ্রাম করিলেন। এই জন্য সদাপ্রভু বিশ্রামদিনকে আশীর্বাদ করিলেন, ও পবিত্র করিলেন। [৩৪৭]

এমনকি শনিবারে লাকড়ি সংগ্রহের অপরাধে এক ব্যক্তিকে রজম তথা প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করার কথাও পুরাতন নিয়মে বিবৃত হয়েছে। যেমন গণনাপুস্তকে বলা হয়েছে, "ইস্রায়েল-সন্তানগণ যখন প্রান্তরে ছিল, তখন বিশ্রামদিনে একজনকে কাষ্ঠ সংগ্রহ করিতে দেখিল। যাহারা তাহাকে কাষ্ঠ সংগ্রহ করিতে দেখিয়াছিল, তাহারা মোশি, হারোণ ও সমস্ত মণ্ডলীর নিকটে তাহাকে আনিল। আর তাহারা তাহাকে রুদ্ধ করিয়া রাখিল; কেননা, তাহার প্রতি কি কর্তব্য, তাহা ব্যক্ত হয় নাই। পরে সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, সেই ব্যক্তির প্রাণদণ্ড অবশ্য হইবে; সমস্ত মণ্ডলী তাহাকে শিবিরের বাহিরে প্রস্তরাঘাতে বধ করিবে। পরে মোশির প্রতি সদাপ্রভুর আজ্ঞা অনুসারে সমস্ত মণ্ডলী তাহাকে শিবিরের বাহিরে লইয়া গিয়া প্রস্তরাঘাত করিল; তাহাতে সে মরিয়া গেল। [৩৪৮]

কিন্তু মসিহ আলাইহিস সালাম শনিবারের বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করতেন না। এদিনে কাজ করাকেও তিনি নিষিদ্ধ মনে করতেন না। এর বিপরীতে তিনি ও তার অনুসারীরা অষ্টম দিবস তথা রবিবারকে পবিত্রজ্ঞান করতেন। যেমন বরনাবার সুসমাচারে বলা হয়েছে, “আমরা ইহুদিদের বিপরীত অষ্টম দিনকে পবিত্রজ্ঞান করি।” উল্লেখ্য ইহুদিরা শনিবারকে সপ্তম দিবস বলত। সে বিবেচনায় রবিবারকে অষ্টম দিবস বলা হয়েছে।

মার্কের সুসমাচারে বলা হয়েছে, আর তিনি বিশ্রামবারে শস্যক্ষেত্র দিয়া যাইতেছিলেন; এবং তাঁহার শিষ্যেরা চলিতে চলিতে শীষ ছিঁড়িতে লাগিলেন। ইহাতে ফরীশীরা তাঁহাকে কহিল, দেখ, যাহা বিধেয় নয়, উহারা তাহা বিশ্রামবারে কেন করিতেছে? তিনিাদিগকে কহিলেন, দায়ূদ ও তাঁহার সঙ্গীরা খাদ্যের অভাবে ক্ষুধিত হইলে তিনি যাহা করিয়াছিলেন, তাহা কি তোমরা কখনও পাঠ কর নাই? তিনি ত অবিয়াথর মহাযাজকের সময়ে ঈশ্বরের গৃহে প্রবেশ করিয়া, যে দর্শন-রুটি যাজকবর্গ ব্যতিরেকে আর কাহারও ভোজন করা বিধেয় নয়, তাহাই ভোজন করিয়াছিলেন, এবং সঙ্গীগণকেও দিয়াছিলেন। তিনিাদিগকে আরও কহিলেন, বিশ্রামবার মনুষ্যের নিমিত্তই হইয়াছে, মনুষ্য বিশ্রামবারের নিমিত্ত হয় নাই; সুতরাং মনুষ্যপুত্র বিশ্রামবারেরও কর্তা। [৩৪৯]

তিন.
মসিহ আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে ইহুদিদের আরেকটি অভিযোগ ছিল তার শিষ্যরা হাত না ধুয়েই আহার গ্রহণ করে। যেমন বর্ণিত হয়েছে, "আর ফরীশীরা ও কয়েকজন অধ্যাপক যিরূশালেম হইতে আসিয়া তাঁহার নিকটে একত্র হইল। তাহারা দেখিল যে, তাঁহার কয়েকজন শিষ্য অশুচি অর্থাৎ অধৌত হস্তে আহার করিতেছে। ফরীশীগণ ও যিহূদীরা সকলে প্রাচীনদের পরমপরাগত বিধি মান্য করায় ভাল করিয়া হাত না ধুইয়া আহার করে না। [৩৫০]

চার.
মসিহ আলাইহিস সালাম জেরুজালেমের ধ্বংস কামনা করে বদদুআ করেছিলেন। যেমন লুকের বর্ণনায় এসেছে, 'আর যখন তোমরা যিরূশালেমে সেনাসামন্ত দ্বারা বেষ্টিত দেখিবে, তখন জানিবে যে, তাহার ধ্বংস সন্নিকট'। [৩৫১]

মথির বর্ণায় বলা হয়েছে, “হা যিরূশালেম, যিরূশালেম, তুমি ভাববাদিগণকে বধ করিয়া থাক, ও তোমার নিকটে যাহারা প্রেরিত হয়, তাহাদিগকে পাথর মারিয়া থাক! কুক্কুটী যেমন আপন শাবকদিগকে পক্ষের নিচে একত্র করে, তদ্রূপ আমিও কত বার তোমার সন্তানদিগকে একত্র করিতে ইচ্ছা করিয়াছি, কিন্তু তোমরা সম্মত হইলে না। দেখ, তোমাদের গৃহ তোমাদের নিমিত্ত উৎসন্ন হইয়া পড়িয়া রহিল। কেননা, আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, তোমরা এখন অবধি আমাকে আর দেখিতে পাইবে না, যে পর্যন্ত না বলিবে, “ধন্য তিনি, যিনি প্রভুর নামে আসিতেছেন!” [৩৫২]

উপর্যুক্ত কারণগুলোসহ আরও বিভিন্ন কারণে ইহুদিরা মসিহ আলাইহিস সালামের দাওয়াতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তাই তারা রোমান শাসককে তার বিরুদ্ধে উস্কে দেয়। এবং মসিহ দাউদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান বলে অপবাদ আরোপ করে। শেষ পর্যন্ত তাকে বন্দি ও হত্যার রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়। এরপর রোমান সৈনিকরা মসিহ আলাইহিস সালামকে খুঁজতে খুঁজতে নাগালে পেয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার আকৃতি যিহুদা ইস্করিয়োতির ওপর ঢেলে দেন। এই যিহুদা ইস্করিয়োতিই হলেন সেই ব্যক্তি, যে মসিহ আলাইহিস সালামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।

এ সম্পর্কিত বরনাবার সুসমাচারের বর্ণনা আমরা নিচে তুলে ধরছি।

“যখন সৈনিকগণ যিহুদার সাথে যিশুর অবস্থানস্থলের নিকট পৌঁছল তখন যিশু বহু মানুষের আনাগোনা টের পেলেন। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন। এগারো শিষ্য তখন ঘুমোচ্ছিলেন। আল্লাহ তাআলা বান্দার বিপদ দেখে তার দূত জিবরাইল, মিকাইল, রুফাইল, উরাইলকে নির্দেশ দিলেন যিশুকে পৃথিবী থেকে নিয়ে আসার জন্য। অতঃপর পবিত্র ফিরিশতারা এসে তাকে দক্ষিণের জানালা দিয়ে বের করে নিলেন। তৃতীয় আসমানে সর্বদা তাসবিহ পাঠে রত ফিরিশতাদের সাথে তাকে রাখলেন। যিহুদা জোরপূর্বক কক্ষে প্রবেশ করল যে কক্ষ থেকে যিশুকে তুলে নেওয়া হয়েছে। শিষ্যরা সবাই ছিল ঘুমে আচ্ছন্ন। তখনই ঈশ্বর আশ্চর্য এক ঘটনা সম্পাদন করলেন। যিহুদার চেহারা ও গলার কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে যিশুর মতো হয়ে গেল। এমনকি আমরা তাকেই যিশু মনে করতে লাগলাম।

কিন্তু সে আমাদেরকে ডেকে তুলে মুআল্লিম (যিশু) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে লাগল। আমরা অবাক হয়ে তাকে বললাম, আপনিই তো আমাদের মুআল্লিম। আমাদেরকে এখনই ভুলে গেলেন! সে তখন হেসে বলল, তোমরা বোকা নাকি? যিহুদা ইস্করিয়োতিকে চিনতে পারছ না!

এই কথোপকথনের মাঝেই সৈনিকগণ প্রবেশ করল। তারা যিহুদা ইস্করিয়োতিকে পাকড়াও করল। কেননা, সে সবদিক থেকেই যিশুর সদৃশ ছিল। [৩৫৩]

কথিত সুসমাচারগুলোতেও যিশুর আকৃতি ও রূপ অন্য ব্যক্তিতে স্থানান্তরিত হওয়ার বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। [৩৫৪] তাদের প্রত্যেকে এ কথা উল্লেখ করেছেন যে, “তখন যীশু তাঁহাদিগকে কহিলেন, এই রাত্রিতে তোমরা সকলে আমাতে বিঘ্ন পাইবে; কেননা, লেখা আছে, "আমি পালরক্ষককে আঘাত করিব, তাহাতে পালের মেষেরা ছিন্নভিন্ন হইয়া যাইবে।” [৩৫৫]

এভাবেই আল্লাহ তাআলার কুদরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন। স্বীয় রাসুলের প্রতি তিনি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলেন। তাকে নিয়ে গেলেন দৃষ্টির আড়ালে। আর গাদ্দার যিহুদাকে অর্পণ করলেন সৈনিকদের হাতে। যিহুদা এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিল যে, সে আত্মপক্ষ সমর্থন করারও সুযোগ পেল না। ব্যাপক চেঁচোমেচি, হট্টগোল ও আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে তারা তাকে মৃত্যুর গর্তে নিপতিত করল। তারা ষড়যন্ত্র করেছিল। আর আল্লাহ তাআলা সুনিপুণভাবে তাদের ষড়যন্ত্রের জবাব দিলেন। শাসকগোষ্ঠী যিহুদাকে বেত্রাঘাতের পর শূলে চড়াল অথচ তাদের ধারণা ছিল তারা মসিহকে শুলিতে চড়িয়েছে।

وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِن شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ مَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينَا . بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللهُ عَزِيزًا حَكِيمًا .

আর তাদের একথা বলার কারণে যে, আমরা মারইয়াম পুত্র ঈসা মসিহকে হত্যা করেছি, যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল। অথচ তারা না তাকে হত্যা করেছে, আর না শূলে চড়িয়েছে, বরং তারা এরূপ ধাঁধায় পতিত হয়েছিল। বস্তুত যারা এ ব্যাপারে নানা রকম কথা বলে, তারা এক্ষেত্রে সন্দেহের মাঝে পড়ে আছে, শুধু অনুমান করা ছাড়া তারা এ বিষয়ে কোনো খবরই রাখে না। আর নিশ্চয়ই তাকে তারা হত্যা করেনি। বরং তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন আল্লাহ নিজের কাছে। আর আল্লাহ হচ্ছেন মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [সুরা নিসা, আয়াত: ১৫৭-১৫৮]

জুরজি যায়দান উপহাসের সুরে বলেন, “তারা বলে মসিহকে বাস্তবে শূলে চড়ানো হয়নি। তার স্থানে অন্য ব্যক্তিকে চড়ানো হয়েছে।” [৩৫৬]

সুস্থ মস্তিষ্ক খ্রিষ্টানদের এই আকিদাকে খণ্ডন করে। কারণ, যে প্রভু নিজেকে রক্ষা করতে পারেন না তিনি কীভাবে অন্যকে রক্ষা করবেন? আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওযিয়্যাহ বলেন, “বিষয়টি ওই জাতির কাছে কীভাবে গুরুতর মনে হবে যে জাতি নিজেদের প্রভুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়াকে মেনে নিয়েছে। অতঃপর সেই ক্রুশকেই তারা সম্মানের স্থানে বসিয়েছে। এমনকি পূজাও করতে শুরু করেছে। অথচ তাদের উচিত ছিল, সমস্ত ক্রুশ পুড়িয়ে ফেলা এবং অপদস্থ করা। কেননা, এই ক্রুশেই তাদের প্রভুকে বিদ্ধ করা হয়েছে। ক্রুশবিদ্ধ এই প্রভু সম্পর্কেও তাদের মন্তব্য নানাবিধ। কখনো তারা বলছে, তিনি স্বয়ং আল্লাহ। আবার কখনো বলছে, আল্লাহর পুত্র। কখনো দাবি করছে, প্রভুর তিন সত্তার এক সত্তা। তারা তাদের সৃষ্টিকর্তার হক নষ্ট করেছে। তার সাথে কুফরি করেছে। সুতরাং তাদের জন্য অসম্ভব নয় সেই প্রভুর বান্দা ও রাসুলকে প্রত্যাখ্যান করা এবং তাকে অস্বীকার করা। এগুলো তাদের কাছে মোটেও জঘন্য কিছু নয়।

বিষয়টি ঐ জাতির কাছে কীভাবে গুরুতর মনে হবে যে জাতি বলে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা মাখলুকের সাথে কথা বলার জন্য স্বশরীরে মর্তে নেমে এসেছেন। তাদের আপত্তি দূর করতে এবং নিজেকে প্রমাণ করতে তাদের সাথে কথা বলেছেন। আবার তিনি মারইয়ামের পেটে প্রবেশ করেছেন। তার সাথে আড়ালও নিয়েছেন। শারীরিক গঠনে তিনি মাখলুক। সত্তাগতভাবে তিনি খালিক। তিনি নিজেই নিজের আকৃতি তৈরি করেছেন। মা হলেন মানবপ্রকৃতির। সেই মা থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান হলেন ঐশ্বরিক। তিনি পরিপূর্ণ ঈশ্বর আবার পরিপূর্ণ মানব। তার অপার অনুগ্রহ এই যে, তিনি পাপমোচনের নিমিত্ত বান্দার পক্ষ থেকে ক্রুশদণ্ডে নিজের রক্ত প্রবাহিত করেছেন। ফলে তার শত্রু ইহুদিরা শান্ত হয়েছে। আর ইহুদিদের ওপর তার ক্রোধ পরিপূর্ণ হয়েছে। ইহুদিরা তাকে পাকড়াও করেছে। ক্রুশবিদ্ধ করেছে। চপেটাঘাত করেছে। এমনকি তার মুখে থুতুও নিক্ষেপ করেছে। তারা তাকে কাঁটাযুক্ত হেলমেট পরিধান করিয়েছে। তার রক্ত আঙুলে দেবে গেছে। কেননা, তার এক ফোঁটা রক্তও যদি মাটিতে পড়ত তাহলে জমিনের সবকিছুই শুকিয়ে যেত। তার ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার স্থানে ফুল ফুটেছে।

ইশ্বর তার পাপী বান্দা থেকে প্রতিশোধ নেওয়া প্রজ্ঞার পরিচায়ক নয়। যে শিরক করে কিংবা তার অমর্যাদা করে স্বীয় মহত্ত্বের কারণে তিনি তার থেকে প্রতিশোধ নেন না। তাই আল্লাহ তাআলা চাইলেন, এমন একজন মানুষকে দণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন, যিনি মানুষ হওয়ার পাশাপাশি তার মতো একজন প্রভুও। তাই আদিপাপের প্রায়শ্চিত্ত তিনি করলেন মসিহকে ক্রুশবিদ্ধ করে। কেননা, প্রভুত্বের দিক থেকে মসিহ তার সমকক্ষ। ঈশ্বরপুত্র ঈশ্বরকে ক্রুশবিদ্ধ করা হলো জুমার দিন নয়টায়।

এতক্ষণ সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে যা বলা হলো সবই তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের বিবৃতি। যারা নিজেদের প্রভু সম্পর্কে এমন কথা বলে তাদের জন্য নিজেদের প্রভুর বান্দা ও রাসুলকে জাদুকর বলা বা মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা কোনো ব্যাপারই নয়।

এজন্যই কোনো এক ভারতীয় রাজা বলেছেন-
“খ্রিষ্টানদের সাথে অন্যান্য জাতি অস্ত্রের মাধ্যমে লড়াই করলেও আমি মনে করি তাদের সাথে লড়াইটা হওয়া উচিত বুদ্ধিবৃত্তিক। আমরা কাউকে হত্যা করার কথা ভাবি না। কিন্তু এ জাতিটির কথা বিশ্বের সকলের চেয়ে ভিন্ন। এরা বিবেককে কাজে লাগায় না। বুদ্ধির সাথে যেন তাদের চির বৈরিতা। পুরো বিশ্ব একদিকে আর তারা অন্যদিকে। অসম্ভবকে তারা মনে করে সম্ভব। এমন এক শরিয়ত তারা বানিয়ে নিয়েছে যা বিশ্বের কোনো ধরনের কল্যাণই বয়ে আনতে পারে না। পরন্তু এই শরিয়তের অনুসরণ একজন বিবেকবানকে নির্বোধে পরিণত করে। বুদ্ধিমানকে সাব্যস্ত করে বোকা হিসেবে। আর ভালোকে গণ্য করে মন্দ। কেননা, তাদের আকিদার ভিত্তিই হলো সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশীলিত আচরণ। মহোত্তম গুণাবলির পরিবর্তে মর্যাদাহীন বিশেষণে তাকে আখ্যায়িত করা। এমন জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা না করলে তাদের অনিষ্ট ও ধ্বংসলীলা ব্যাপকাকার ধারণ করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তখন দুর্ভোগ পোহাতে হবে সমগ্র বিশ্বকে। হিংস্র জন্তুকে যেভাবে হত্যা করা হয় এদেরকেও সেভাবে হত্যা করা উচিত।”[৩৫৭]

এদের সম্পর্কে ইহুদি কিমুনি যথার্থ বলেছেন-
"আল্লাহর শানে কিছুতেই শোভা পায় না যে— তিনি রজঃস্রাবের রক্তের মাঝে, গর্ভের সংকীর্ণতা ও অন্ধকারে বসবাস করেছেন। কিংবা চর্মচক্ষু দ্বারা তাকে দর্শন করা যায়।

অনেক ক্ষেত্রেই তার অক্ষমতা প্রকাশিত হয়। তিনি ভয় পান। মানুষের সম্পদের প্রতি তিনি লোভী। তিনি জেলহাজতে গিয়েছেন। সেখান থেকে পালিয়েছেন। তিনি মাখলুকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। স্বীয় ক্ষমতার মধ্যেও তিনি অনেক কিছু করতে অক্ষম। যদ্দরুণ মানুষকে শয়তানের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি মর্তে নেমে এসেছেন। এসেছেন তাদেরকে ভ্রষ্টতা থেকে বাঁচাতে। পাপ থেকে পবিত্র করতে। এরপর ইহুদিরা সেই প্রভুর পিছু নিল। তাকে কষ্ট দিলো। অপমান করল। ক্রুশবিদ্ধ করল। এরপর তিনি তিন দিন কবরে থাকলেন।

প্রশ্ন হলো— মসিহের যুগে সংঘটিত এই অপরাধের চেয়ে বড় আর কোনো অপরাধ আছে যা এর পূর্বে কিংবা পরে সংঘটিত হয়েছে? আমরা দেখছি, মসিহের আগমনের পূর্বে শয়তান যেভাবে মানুষকে ধোকা দিত এখনো সেভাবে ধোকা দিচ্ছে। দিগভ্রান্ত করছে। তোমাদের (খ্রিষ্টান) ধর্মে ফাটল ধরিয়েছে। নানা দলে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছে। তোমরা একে অপরকে গোমরাহ বলে অভিহিত করেছ। বিভিন্ন দেশে হাওয়ারিদের ওপর নির্যাতন হয়েছে। তাদেরকে অপদস্থ করা হয়েছে। এমনকি অনেককে হত্যা করা হয়েছে। অদ্যাবধি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়সহ পুরো বিশ্বে জুলুম, সীমলঙ্ঘন, হত্যা, কুফুরি বিদ্যমান। তাহলে তোমাদের দাবিমতে ঈশ্বরের আগমন ও আত্মহুতির সুফলটা কোথায়?[৩৫৮]

এদিকে বিশ্বাসঘাতক যিহুদা ইস্করিয়োতির পরিণতির ব্যাপারে সুসমাচারগুলোর বক্তব্য বিরোধপূর্ণ। যেমন প্রেরিতদের কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, “সে অধর্মের বেতন দ্বারা একখানি ক্ষেত্র লাভ করিল; এবং অধোমুখে ভূমিতে পতিত হইলে তাহার উদর ফাটিয়া যাওয়াতে নাড়ী ভূঁড়ী সকল বাহির হইয়া পড়িল।”[৩৫৯]

অর্থাৎ, ইহুদিদের থেকে নেওয়া ঘুষের অর্থ দিয়ে সে একটি জমি ক্রয় করে। এরপর সেই জমিতে পড়েই সে মারা যায়।

মথির বক্তব্য হলো সে লজ্জায় স্বীয় শ্বাস রোধ করে আত্মহুতি দেয়।
"তখন যিহূদা, যে তাঁহাকে সমর্পণ করিয়াছিল, সে যখন বুঝিতে পারিল যে, তাঁহার দণ্ডাজ্ঞা হইয়াছে, তখন অনুশোচনা করিয়া সেই ত্রিশ রৌপ্যমুদ্রা প্রধান যাজক ও প্রাচীনবর্গের নিকটে ফিরাইয়া দিল, আর কহিল, নির্দোষ রক্ত সমর্পণ করিয়া আমি পাপ করিয়াছি। তাহারা বলিল, আমাদের কি? তুমি তাহা বুঝিবে। তখন সে ঐ মুদ্রা সকল মন্দিরের মধ্যে ফেলিয়া দিয়া চলিয়া গেল, এবং গিয়া গলায় দড়ি দিয়া মরিল।"[৩৬০]

উভয় বর্ণনার বিরোধ পাঠক নিজ দায়িত্বে বুঝে নেবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো ক্রুশবিদ্ধ ও দাফনকৃত ব্যক্তিটি যদি যিহুদা ইস্করিয়োতি হয়ে থাকে তাহলে কবরে তার দেহের পরিণতি কী হয়েছিল?

এই প্রশ্নের জবাব পেতে হলে আমাদেরকে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে।

এক. পাহারাদারগণ প্রধান যাজকদিগকে সবকিছু খুলে বলেছিল। এরপর তারা বয়স্ক নেতাদের সাথে মিলিত হয়ে পরামর্শ করে। তারা সৈন্যদেরকে প্রচুর পরিমাণে রুপো উৎকোচ দিয়ে বললো, "তোমরা বলবে মসিহ এর শিষ্যগণ রাতের অন্ধকারে তার দেহ চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। আমরা সে সময় ঘুমিয়ে ছিলাম।... মথি বলেন, “এ ঘটনাটি ইহুদিদের কাছে আজো প্রসিদ্ধ।” অর্থাৎ, মথি কর্তৃক সুসমাচার লিপিবদ্ধ হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটি প্রসিদ্ধ। উল্লেখ্য মথির সুসমাচারটি লিখিত হয়েছে ৬৫ খ্রিষ্টাব্দে কিংবা তারও পরে।

আমরা মথিকে প্রশ্ন করতে চাই মসিহ আলাইহিস সালামের ঊর্ধ্বারোহণের ত্রিশচল্লিশ বছর পর এই প্রচারণার মূল উৎস কী? কীসের ভিত্তিতে এই প্রচারণা চালানো হচ্ছে? মথি নিজে তো এই ঘটনা স্বচক্ষে দেখার প্রশ্নই আসে না। তাহলে কি সৈনিকদের সাথে মসিহ আলাইহিস সালামের শিষ্যদের কোনো যোগসাজশ ছিল? অথচ একথা প্রসিদ্ধ যে, এই শিষ্যদেরকে অন্যরা ধর্মত্যাগের অপবাদ আরোপের ভয়ে এড়িয়ে চলত। আমরা বলতে পারি, উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন কেউ না কেউ লাশটি চুরি করেছে।

দুই, শত্রু কর্তৃক লাশ চুরির বিষয়টি সর্বপ্রথম মারইয়াম মিগদলির মাথায় তখনই আসে যখন তৃতীয় দিনে কবরে লাশ পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি বিষয়টি পিতর এবং আরেকজন শিষ্যকে অবহিত করেন। সংবাদ শুনে তারা উভয়ে কবরের দিকে দৌড়ে যান।

এগুলো তাদেরই ধর্মীয় গ্রন্থের বর্ণনা। সুতরাং বলা যায় ক্রুশবিদ্ধ ব্যক্তির দেহ চুরির বিষয়টি নবোদ্ভাবিত কোনো কথা নয়। বরং এটি সে সময়েরই প্রসিদ্ধ ঘটনা যা মথি তার সুসমাচারে উল্লেখ করেছেন।

মসিহ আলাইহিস সালামের সবচেয়ে কাছের শিষ্য পিতরও মারইয়াম মিগদলির বক্তব্যের ওপর কোনো আপত্তি করেননি। উল্টো ঘটনার সত্যতা জানতে কবর অভিমুখে দৌড় দিয়েছিলেন। এই চিন্তাধারাটি প্রাথমিক যুগের খ্রিষ্টানদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। এমনকি এটাও প্রচারিত হয়েছিল যে, মসিহ আলাইহিস সালাম তার কোনো কোনো শিষ্যের নিকট আত্মপ্রকাশ করেছেন। কবরের মধ্যে দেহ না থাকার বিষয়টি প্রমাণের জন্য এটাই যথার্থ দলিল। বাস্তবতা হলো ক্রুশবিদ্ধ হওয়া ব্যক্তিটির দেহ কবর থেকে চুরি হয়েছিল। হয়তো ফিতনা দমনের জন্য ইহুদিরা চুরি করেছে। অথবা সত্যকে গোপন করার জন্য শিষ্যরাই করেছে। আর মসিহ আলাইহিস সালাম ক্রুশবিদ্ধ হননি। আল্লাহ তাআলা তাকে স্বশরীরে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন।

যিহুদা ইস্করিয়োতি নিহত হওয়ার পর শিষ্যগণ দ্বাদশ শিষ্য নির্বাচনের জন্য একত্রিত হন। পদটির জন্য দুই জনের নাম প্রস্তাব করা হয়। তাদের একজন ছিলেন যুস্ট অপরজন ছিলেন মত্তথিয়। শেষে লটারিতে মত্তথিয়ের নাম ওঠে। সেদিন থেকে তিনি দ্বাদশ শিষ্যের স্থানে আসীন হন। [৩৬১]

ক্রুশের ঘটনায় মুক্তির পর ঈসা আলাইহিস সালামের সাথে কী ঘটেছিল তা নিয়ে মুফাসসিরগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাকে স্বশরীরে উঠিয়ে নিয়েছেন নাকি শুধু রুহটাকেই নেওয়া হয়েছে? [৩৬২] একদল বলছেন ঈসা আলাইহিস সালাম লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন। পরে পৃথিবীর বুকেই তিনি বাকি জীবন অতিবাহিত করেন। অন্যান্য নবি-রাসুলের মতো তিনিও স্বাভাবিকভাবে ইন্তেকাল করবেন। তার পবিত্র রুহকে ঊর্ধ্বালোকে নিয়ে যাওয়া হয়। যেভাবে নবি, সিদ্দিক ও শহিদগণের রুহকে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা কুরআনের কয়েকটি আয়াত উপস্থাপন করেন এবং এর বাহ্যিক অর্থকে প্রমাণ হিসেবে খাড়া করার চেষ্টা করেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِذْ قَالَ اللهُ يُعِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيْكَ وَ رَافِعُكَ إِلَى وَ مُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِينَ اتَّبَعُوْكَ فَوْقَ الَّذِينَ كَفَرُوْা إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ .

আর স্মরণ করো, যখন আল্লাহ বলবেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে নিয়ে নেব এবং তোমাকে নিজের দিকে তুলে নেব কাফেরদের থেকে তোমাকে পবিত্র করে দেব। আর যারা তোমার অনুগত রয়েছে তাদেরকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যারা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে তাদের ওপর জয়ী করে রাখব। [সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৫৫]

অন্য আয়াতে তিনি বলেন-

فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ .

অতঃপর যখন আপনি আমাকে লোকান্তরিত করলেন, তখন থেকে আপনিই তাদের সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। আপনি সর্ববিষয়ে পূর্ণ পরিজ্ঞাত। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ১১৭]

বর্তমান যুগের কাদিয়ানিদের মত হলো, মসিহকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু পরে তাকে জীবিত অবস্থাতেই ক্রুশ থেকে নামানো হয়। জীবিতই দাফন করা হয়। এরপর তৃতীয় দিন তিনি কবর থেকে উঠে হিন্দুস্থানের দিকে রওনা হন। কাশ্মিরের শ্রীনগরে পৌঁছে সেখানেই থিতু হন। বাকি জীবন এখানে কাটিয়ে ১১০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

কাদিয়ানিদের এই মতকে মুসলিম-খ্রিষ্টান উভয় সম্প্রদায় কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে থাকে। গবেষক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ এ বিষয়ে কলম ধরেছেন। আবকারিয়াতুল মসিহ গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কাদিয়ানিরা যেটাকে ঈসা আলাইহিস সালামের কবর বলে দাবি করে থাকে এটা ইয়ুযাসিফ নামক এক ইহুদির কবর।

ক্রুশের ঘটনার পর মসিহ আলাইহিস সালামের পরবর্তী জীবন নিয়ে এই তিনটি মতই প্রসিদ্ধ। [৩৬৩] তন্মধ্যে প্রথম মতটিই বিশুদ্ধ। অধিকাংশ মুফাসসির এই মতটিকেই গ্রহণ করেছেন। কেননা, স্বশরীরে ঊর্ধ্বারোহণের মধ্যেই বিশেষত্ব রয়েছে। রুহের ঊর্ধ্বারোহণ কিংবা মর্যাদা উন্নীতকরণ তো অন্য নবিদের বেলায়ও হয়েছে। আয়াতে ঊর্ধ্বারোহণের বিষয়টি ওফাতের প্রসঙ্গ উল্লেখের পর এসেছে। এটি মূলত অলংকার শাস্ত্রের তাকদিম-তাখির (অগ্র-পশ্চাৎ) নীতি [৩৬৪] অনুযায়ী করা হয়েছে। সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো, আমি তোমাকে তুলে নেব এবং স্বাভাবিক নিয়মে মৃত্যু দেব। কারণ, প্রত্যেকেরই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। ঈসা আলাইহিস সালাম শেষ জামানায় দুনিয়াতে আসবেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন। যেমন বুখারি ও মুসলিম শরিফে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে যে, “যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ, অচিরেই তোমাদের মধ্যে ইবনে মারইয়াম ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে অবতরণ করবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন। শূকর হত্যা করবেন। যুদ্ধের ইতি টানবেন। সম্পদের প্রাচুর্য বইয়ে দেবেন। তখন সম্পদ গ্রহণ করার মতো কেউ থাকবে না।” [৩৬৫]

এদিকে খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করে মসিহকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। পরে কবরে দাফন করা হয়েছে। তিন দিন পর তিনি কবর থেকে বের হয়ে এসেছেন। অতঃপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন স্থানে তিনি শিষ্যবর্গ ও অন্যান্য মানুষদের সামনে এসেছেন। এরপর ঊর্ধ্বালোকে চলে গিয়েছেন।

সন্দেহ নেই যে, এটি একটি মাত্র ঘটনা। পুনঃ পুন সংঘটিত কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু এ ঘটনার বিভিন্ন অংশের বর্ণনায় সুসমাচারগুলোর বর্ণনা এতটাই বিরোধপূর্ণ যে, খোদ ক্রুশবিদ্ধকরণের ঘটনা নিয়েই সংশয় সৃষ্টি হয়ে যায়। আমরা সুসমাচারগুলোর বিরোধসহ ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরছি।

মথি বলেন: "তিনি যখন কথা কহিতেছেন, দেখ, যিহূদা, সেই বারোজনের একজন, আসিল, এবং তাহার সঙ্গে অনেক লোক খড়গ ও যষ্টি লইয়া প্রধান যাজকদের ও লোকদের প্রাচীনবর্গের নিকট হইতে আসিল। যে তাঁহাকে সমর্পণ করিতেছিল, সে তাহাদিগকে এই সঙ্কেত বলিয়াছিল, আমি যাহাকে চুম্বন করিব, সে ঐ ব্যক্তি, তোমরা তাহাকে ধরিবে। তখন শিষ্যেরা সকলে তাঁহাকে ছাড়িয়া পলাইয়া গেলেন।...

আর যাহারা যীশুকে ধরিয়াছিল, তাহারা তাঁহাকে মহাযাজক কায়াফার কাছে লইয়া গেল; সেই স্থানে অধ্যাপকেরা ও প্রাচীনবর্গ সমবেত হইয়াছিল। তখন প্রধান যাজকগণ এবং সমস্ত মহাসভা যীশুকে বধ করিবার জন্য তাঁহার বিরুদ্ধে মিথ্যাসাক্ষ্য অন্বেষণ করিল, কিন্তু অনেক মিথ্যাসাক্ষী আসিয়া যুটিলেও তাহা পাইল না। অবশেষে দুই জন আসিয়া বলিল, এই ব্যক্তি বলিয়াছিল, আমি ঈশ্বরের মন্দির ভাঙ্গিয়া ফেলিতে, আবার তিন দিনের মধ্যে গাঁথিয়া তুলিতে পারি। তাহারা উত্তর করিয়া কহিল ..., এ মরিবার যোগ্য। তখন তাহারা তাঁহার মুখে থুথু দিল ও তাঁহাকে ঘুসি মারিল; আর কেহ কেহ তাঁহাকে প্রহার করিয়া কহিল, রে খ্রীষ্ট, আমাদের নিকটে ভাববাণী বল, কে তোকে মারিল?

...প্রভাত হইলে প্রধান যাজকেরা ও লোকদের প্রাচীনবর্গ সকলে যীশুকে বধ করিবার নিমিত্ত তাঁহার বিপক্ষে মন্ত্রণা করিল; আর তাঁহাকে বাঁধিয়া লইয়া গিয়া দেশাধ্যক্ষ পীলাতের [৩৬৬] নিকটে সমর্পণ করিল।...

ইতিমধ্যে যীশুকে দেশাধ্যক্ষের সম্মুখে দাঁড় করান হইল। দেশাধ্যক্ষ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি যিহূদীদের রাজা? যীশু তাঁহাকে কহিলেন, তুমিই বলিলে? ...আর দেশাধ্যক্ষের এই রীতি ছিল, পর্বের সময়ে তিনি জনসমূহের জন্য এমন একজন বন্দিকে মুক্ত করিতেন, যাহাকে তাহারা চাহিত। সেই সময়ে তাহাদের একজন প্রসিদ্ধ বন্দি ছিল, তাহার নাম বারাব্বা। অতএব তাহারা একত্র হইলে পীলাত তাহাদিগকে কহিলেন, তোমাদের ইচ্ছা কি, আমি তোমাদের জন্য কাহাকে মুক্ত করিব? বারাব্বাকে, না যীশুকে, যাহাকে খ্রীষ্ট বলে? কারণ তিনি জানিতেন, তাহারা হিংসাবশতঃ তাঁহাকে সমর্পণ করিয়াছিল। ...আর প্রধান যাজকেরা ও প্রাচীনবর্গ লোকসমূহকে প্রবৃত্তি দিল, যেন তাহারা বারাব্বাকে চাহিয়া লয় ও যীশুকে সংহার করে। তখন দেশাধ্যক্ষ তাহাদিগকে কহিলেন, তোমাদের ইচ্ছা কি? সেই দুই জনের মধ্যে কাহাকে ছাড়িয়া দিব? তাহারা কহিল, বারাব্বাকে। পীলাত তাহাদিগকে বলিলেন, তবে যীশু, যাহাকে খ্রীষ্ট বলে, তাহাকে কি করিব? তাহারা সকলে কহিল, উহাকে ক্রুশে দেওয়া হউক। তিনি কহিলেন, কেন? সে কি অপরাধ করিয়াছে? কিন্তু তাহারা আরও চেঁচাইয়া বলিল, উহাকে ক্রুশে দেওয়া হউক। পীলাত যখন দেখিলেন, তাঁহার চেষ্টা বিফল, বরং আরও গোলযোগ হইতেছে, তখন জল লইয়া লোকদের সাক্ষাতে হাত ধুইয়া কহিলেন, এই ধার্মিক ব্যক্তির রক্তপাতের সম্বন্ধে আমি নির্দোষ, তোমরাই তাহা বুঝিবে। তাতে সমস্ত লোক উত্তর করিল, উহার রক্ত আমাদের উপরে ও আমাদের সন্তানদের উপরে বর্তক। তখন তিনি তাহাদের জন্য বারাব্বাকে ছাড়িয়া দিলেন, এবং যীশুকে কোড়া মারিয়া ক্রুশে দিবার জন্য সমর্পণ করিলেন।...

তখন দেশাধ্যক্ষের সেনাগণ যীশুকে রাজবাটীতে লইয়া গিয়া তাঁহার নিকটে সমুদয় সেনাদল একত্র করিল। আর তাহারা তাঁহার বস্ত্র খুলিয়া লইয়া তাঁহাকে একখানি লোহিত বস্ত্র পরিধান করাইল। আর কাঁটার মুকুট গাঁথিয়া তাঁহার মস্তকে দিল, ও তাঁহার দক্ষিণ হস্তে এক গাছি নল দিল; পরে তাঁহার সম্মুখে জানু পাতিয়া, তাঁহাকে বিদ্রূপ করিয়া বলিল, 'যিহূদী-রাজ, নমস্কার!' আর তাহারা তাঁহার গাত্রে থুথু দিল, ও সেই নল লইয়া তাঁহার মস্তকে আঘাত করিতে লাগিল। আর তাঁহাকে বিদ্রূপ করিবার পর বস্ত্রখানি খুলিয়া ফেলিয়া তাহারা আবার তাঁহার নিজের বস্ত্র পরাইয়া দিল, এবং তাঁহাকে ক্রুশে দিবার জন্য লইয়া চলিল।

আর বাহির হইয়া তাহারা শিমোন নামে একজন কুরীণীয় লোকের দেখা পাইল; তাহাকেই তাঁহার ক্রুশ বহন করিবার জন্য বেগার ধরিল। পরে গল্পথা নামক স্থানে, অর্থাৎ যাহাকে মাথার খুলির স্থান বলে, সেখানে উপস্থিত হইয়া তাহারা তাঁহাকে পিত্তমিশ্রিত দ্রাক্ষারস পান করিতে দিল; তিনি তাহা আস্বাদন করিয়া পান করিতে চাহিলেন না। পরে তাহারা তাঁহাকে ক্রুশে দিয়া তাঁহার বস্ত্র সকল গুলিবাঁটপূর্বক অংশ করিয়া লইল; এবং সেখানে বসিয়া তাঁহাকে চৌকি দিতে লাগিল। আর উহারা তাঁহার মস্তকের উপরে তাঁহার বিরুদ্ধে এই দোষের কথা লিখিয়া লাগাইয়া দিল, 'এই ব্যক্তি যীশু, যিহূদীদের রাজা'।...

পরে বেলা ছয় ঘটিকা হইতে নয় ঘটিকা পর্যন্ত সমুদয় দেশ অন্ধকারময় হইয়া রহিল। আর নয় ঘটিকার সময়ে যীশু উচ্চ রবে চিৎকার করিয়া ডাকিয়া কহিলেন, “এলী এলী লামা শবক্তানী,” অর্থাৎ “ঈশ্বর আমার, ঈশ্বর আমার, তুমি কেন আমায় পরিত্যাগ করিয়াছ?” ...

আর সেখানে অনেক স্ত্রীলোক ছিলেন, দূর হইতে দেখিতেছিলেন; তাঁহারা যীশুর পরিচর্যা করিতে করিতে গালীল হইতে তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে মন্দলীনী মারইয়াম, যাকোবের ও যোষির মাতা মারইয়াম, এবং সিবদিয়ের পুত্রদের মাতা ছিলেন।...

পরদিন, অর্থাৎ আয়োজন-দিনের পরদিবস, প্রধান যাজকেরা ও ফরীশীরা পীলাতের নিকটে একত্র হইয়া কহিল, মহাশয়, আমাদের মনে পড়িতেছে, সেই প্রবঞ্চক জীবিত থাকিতে বলিয়াছিল, তিন দিনের পরে আমি উঠিব। অতএব তৃতীয় দিবস পর্যন্ত তাহার কবর চৌকি দিতে আজ্ঞা করুন; পাছে তাহার শিষ্যেরা আসিয়া তাহাকে চুরি করিয়া লইয়া যায়, আর লোকদিগকে বলে, তিনি মৃতগণের মধ্য হইতে জীবিত হইয়া উঠিয়াছেন; তাহা হইলে প্রথম ভ্রান্তি অপেক্ষা শেষ ভ্রান্তি আরও মন্দ হইবে। পীলাত তাহাদিগকে বলিলেন, তোমাদের নিকটে প্রহরি-দল আছে; তোমরা গিয়া যথাসাধ্য রক্ষা কর। তাহাতে তাহারা গিয়া প্রহরি-দলের সহিত সেই পাথরে মুদ্রাঙ্ক দিয়া কবর রক্ষা করিতে লাগিল।

বিশ্রামদিন অবসান হইলে, সপ্তাহের প্রথম দিনের ঊষারম্ভে, মঙ্গলীনি মারইয়াম ও অন্য মারইয়াম কবর দেখিতে আসিলেন। আর দেখ, মহা-ভূমিকম্প হইল; কেননা, প্রভুর এক দূত স্বর্গ হইতে নামিয়া আসিয়া সেই পাথরখানি সরাইয়া দিলেন, এবং তাহার উপরে বসিলেন। তাঁহার দৃশ্য বিদ্যুতের ন্যায়, এবং তাঁহার বস্ত্র হিমের ন্যায় শুভ্রবর্ণ। তাঁহার ভয়ে প্রহরীগণ কাঁপিতে লাগিল, ও মৃতবৎ হইয়া পড়িল। সেই দূত স্ত্রীলোক কয়জনকে কহিলেন, তোমরা ভয় করিও না, কেননা, আমি জানি যে, তোমরা ক্রুশে হত যীশুর অন্বেষণ করিতেছ। তিনি এখানে নাই; কেননা, তিনি উঠিয়াছেন, যেমন বলিয়াছিলেন; আইস, প্রভু যেখানে শুইয়াছিলেন, সেই স্থান দেখ। আর শীঘ্র গিয়া তাঁহার শিষ্যদিগকে বল যে, তিনি মৃতদের মধ্য হইতে জীবিত হইয়া উঠিয়াছেন, এবং দেখ, তোমাদের অগ্রে গালীলে যাইতেছেন, সেখানে তাঁহাকে দেখিতে পাইবে; দেখ, আমি তোমাদিগকে বলিলাম। তখন তাঁহারা সভয়ে ও মহানন্দে শীঘ্র কবর হইতে প্রস্থান করিয়া তাঁহার শিষ্যদিগকে সংবাদ দিবার জন্য দৌড়াইয়া গেলেন।...

তাঁহারা যাইতেছেন, ইতিমধ্যে দেখ, প্রহরি-দলের কেহ কেহ নগরে গিয়া যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, সেই সমস্ত বিবরণ প্রধান যাজকদিগকে জানাইল। তখন তাহারা প্রাচীনবর্গের সহিত একত্র হইয়া ও মন্ত্রণা করিয়া ঐ সেনাগণকে অনেক টাকা দিল, কহিল, তোমরা বলিও যে, তাহার শিষ্যগণ রাত্রিকালে আসিয়া, যখন আমরা নিদ্রাগত ছিলাম, তখন তাহাকে চুরি করিয়া লইয়া গিয়াছে। আর যদি এই কথা দেশাধ্যক্ষের কর্ণগোচর হয়, তবে আমরাই তাঁহাকে বুঝাইয়া তোমাদের ভাবনা দূর করিব। তখন তাহারা সেই টাকা লইয়া, যেরূপ শিক্ষা পাইল, সেইরূপ কার্য করিল। আর যিহূদীদের মধ্যে সেই জনরব রটিয়া গেল, তাহা অদ্য পর্যন্ত রহিয়াছে। পরে একাদশ শিষ্য গালীলে যীশুর নিরূপিত পর্বতে গমন করিলেন।” [৩৬৭]

এই হলো ক্রুশবিদ্ধকরণ, কবর থেকে উত্থান, গালিলে গমন এবং শিষ্যদের দেখা দেওয়া সংক্রান্ত সুসমাচারের বর্ণনা। এ পর্যায়ে আমরা এই ঘটনার বিভিন্ন অংশের বিরোধ বিশ্লেষণ করব।

প্রথম
মথি, মার্ক ও লুকের বর্ণনা অনুযায়ী মসিহকে চেনার লক্ষণ ছিল যিহুদা কর্তৃক মসিহকে চুম্বন করা। মসিহ নিজ থেকে পরিচয় প্রকাশ করেননি।

অথচ যোহন বলছেন, "অতএব যিহূদা সেনাদলকে, এবং প্রধান যাজকদের ও ফরীশীদের নিকট হইতে পদাতিকদিগকে প্রাপ্ত হইয়া মশাল, দীপ ও অস্ত্রশস্ত্রের সহিত সেখানে আসিল। তখন যীশু, আপনার প্রতি যাহা যাহা ঘটিতেছে, সমস্তই জানিয়া বাহির হইয়া আসিলেন, আর তাহাদিগকে কহিলেন, কাহার অন্বেষণ করিতেছ? তাহারা তাঁহাকে উত্তর করিল, নাসরতীয় যীশুর। তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, আমিই তিনি। আর যিহূদা যে তাঁহাকে সমর্পণ করিতেছিল, সে তাহাদের সহিত দাঁড়াইয়াছিল। তিনি যখন তাহাদিগকে বলিলেন, আমিই তিনি, তাহারা পিছাইয়া গেল, ও ভূমিতে পড়িল। পরে তিনি তাহাদিগকে আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, কাহার অন্বেষণ করিতেছ? তাহারা বলিল, নাসরতীয় যীশুর। যীশু উত্তর করিলেন, আমি ত তোমাদিগকে বলিলাম যে, আমিই তিনি; অতএব তোমরা যদি আমার অন্বেষণ কর, তবে ইহাদিগকে যাইতে দাও- যেন তিনি এই যে কথা বলিয়াছিলেন, তাহা পূর্ণ হয়, 'তুমি আমাকে যে সকল লোক দিয়াছ, আমি তাহাদের কাহাকেও হারাই নাই।”[৩৬৮]

যোহনের বক্তব্যকে যদি সঠিক ধরা হয় তাহলে এটা হবে মসিহ আলাইহিস সালামের অন্যতম মুজিযা। সেক্ষেত্রে সুসমাচারের লেখকগণের এই মুজিয়ার বিবরণ দেওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত ছিল।

এ ছাড়াও এক্ষেত্রে যিহুদাকে কীভাবে দোষ দেওয়া যায়! সে তো সৈনিক ও প্রধান যাজকদের হাতে মসিহ আলাইহিস সালামকে ধরিয়ে দেয়নি বরং মসিহ আলাইহিস সালাম নিজেই নিজেকে সমর্পণ করেছেন।

দ্বিতীয়
মথির সুসমাচারে বলা হয়েছে, “তখন তাহার সকল শিষ্যগণ তাহাকে ছাড়িয়া পালাইয়া গেল।”

এদিকে মার্ক বলছেন, "তখন শিষ্যেরা সকলে তাঁহাকে ছাড়িয়া পলাইয়া গেলেন। আর, একজন যুবক উলঙ্গ শরীরে একখানি চাদর জড়াইয়া তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিতে লাগিল। তাহারা তাহাকে ধরিল, কিন্তু সে সেই চাদরখানি ফেলিয়া উলঙ্গই পলায়ন করিল।"

পক্ষান্তরে লুক এবং যোহন শিষ্যদের পালানোর বিষয়টি উল্লেখই করেননি। যদি তারা না পালিয়ে থাকেন তাহলে মসিহকে গ্রেফতারের সময় তাদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

তৃতীয়
মথির বর্ণনা অনুযায়ী মসিহকে গ্রেফতার করে লোকেরা প্রধান যাজক কায়াফার কাছে নিয়ে গিয়েছিল।

মার্ক এবং লুক কায়াফার নাম উল্লেখ করেননি।

অপরদিকে যোহনের ভাষ্যমতে, “তখন সেনাদল, এবং সহস্রপতি ও যিহূদিগণের পদাতিকেরা যীশুকে ধরিল, ও তাঁহাকে বন্ধন করিল, এবং প্রথমে হাননের কাছে লইয়া গেল; কারণ যে কায়াফা সেই বৎসর মহাযাজক ছিলেন, ঐ হানন তাঁহার শ্বশুর। এ সেই কায়াফা, যিনি যিহূদিগণকে এই পরামর্শ দিয়াছিলেন, প্রজালোকদের জন্য একজনের মরণ ভাল।”[৩৬৯]

কায়াফা আরামী শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে পাথর। কায়াফা ছিলেন ২৭-৩৬ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে ইহুদিদের প্রধান যাজক। শুরুতে প্রধান যাজকগণ আমৃত্যু স্বপদে বহাল থাকতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে রোমান শাসকগণ পদটিতে নিজেদের ইচ্ছেমতো লোক বসাত কিংবা বরখাস্ত করত।

হানন হিব্রু শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে যিহোবা তাকে অনুগ্রহ করেছেন। হানন জেরুজালেমের প্রধান যাজক ছিলেন। কিন্তু মসিহের গ্রেফতারের সময় তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন না।

যাই হোক, এখানে প্রশ্ন হলো গ্রেফতারের পর কার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? যোহনের ভাষ্যমতে হাননের কাছে? নাকি মথির ভাষ্যমতে কায়াফার কাছে?

চতুর্থ
মথি ও লুকের বর্ণনা অনুযায়ী প্রধান যাজকগণ, নেতৃবৃন্দ এবং উপস্থিত সকলে যিশুকে হত্যার জন্য মিথ্যা সাক্ষ্য তালাশ করছিল।

অপরদিকে লুক এবং যোহন মিথ্যা সাক্ষীর বিষয়টি উল্লেখই করেননি। বরং প্রধান যাজকের সামনে তার মসিহ হওয়ার দাবি করাটাই তারা যথেষ্ট বিবেচনা করেছেন। এজন্যই তারা বলেছেন, "এরপর আর কোনো সাক্ষীর প্রয়োজন নেই। কেননা, আমরা তার মুখ থেকেই শুনতে পেয়েছি।”

মসিহের অপরাধ কী ছিল? নিজেকে মসিহ হিসেবে দাবি করা? নাকি উপাসনাগৃহের ধ্বংস কামনা করা? এটা কোন পর্যায়ের অপরাধ যদ্দরুন তিনি হত্যার উপযুক্ত হলেন?

পঞ্চম
মথি ও মার্কের বক্তব্য অনুযায়ী লোকেরা মসিহকে নিয়ে পিলাতের কাছে অর্পণ করল। পিলাত তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমিই কি যিহুদিদের বাদশা?...

এদিকে লুক বলছেন, “আর তাহারা তাঁহার উপরে দোষারোপ করিয়া বলিতে লাগিল, আমরা দেখিতে পাইলাম যে, এই ব্যক্তি আমাদের জাতিকে বিগড়াইয়া দেয়, কৈসরকে রাজস্ব দিতে বারণ করে, আর বলে যে, আমিই খ্রীষ্ট রাজা।” [৩৭০]

পক্ষান্তরে যোহনের বর্ণনা একেবারে ভিন্ন। তিনি বলছেন, "পরে লোকেরা যীশুকে কায়াফার নিকট হইতে রাজবাটীতে লইয়া গেল; তখন প্রত্যুষকাল; আর তাহারা যেন অশুচি না হয়, কিন্তু নিস্তারপর্বের ভোজ ভোজন করিতে পারে, এই জন্য আপনারা রাজবাটীতে প্রবেশ করিল না। অতএব পীলাত বাহিরে তাহাদের কাছে গেলেন ও বলিলেন, তোমরা এই ব্যক্তির উপরে কি দোষারোপ করিতেছ? তাহারা উত্তর করিয়া তাঁহাকে কহিল, এ যদি দুষ্কর্মকারী না হইত, আমরা আপনার হস্তে ইহাকে সমর্পণ করিতাম না। তখন পীলাতাদিগকে কহিলেন, তোমরাই উহাকে লইয়া যাও, এবং আপনাদের ব্যবস্থামতে উহার বিচার কর। যিহূদিগণ তাঁহাকে কহিল, কোনো ব্যক্তিকে বধ করিতে আমাদের অধিকার নাই।” [৩৭১]

পিলাত মসিহ এর সাথে কথা বললেন প্রকৃতই তিনি দোষী কি না তা নির্ণয় করতে। শেষে তিনি ইহুদিদের বললেন, আমি তো তার কোনো দোষ দেখি না।

ষষ্ঠ
মথির ভাষ্যমতে পিলাত যখন মসিহের নির্দোষ হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারলেন তখন তিনি সকলের সামনে নিজের হাত ধুয়ে বললেন, "আমি এই নিরাপরাধ ব্যক্তির হত্যার দায় থেকে মুক্ত।”

এই বক্তব্য অন্য কোনো সুসমাচারে স্থান পায়নি।

সপ্তম
এককভাবে লুকের বর্ণনায় উল্লিখিত হয়েছে, পিলাত যখন জানতে পারলেন যে, যিশু গালিলের লোক। আর গালিল হলো হেরোড এর শাসনাধীন এলাকা। তখন তিনি যিশুকে দণ্ডিত করার পূর্বে হেরোডের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে বলা হয়েছে, “যিশুকে দেখিয়া হেরোদ অতিশয় আনন্দিত হইলেন, কেননা, তিনি তাঁহার বিষয় শুনিয়াছিলেন, এই জন্য অনেক দিন হইতে তাঁহাকে দেখিতে বাঞ্ছা করিতেছিলেন, এবং তাঁহার কৃত কোনো চিহ্ন দেখিবার আশা করিতে লাগিলেন। তিনি তাঁহাকে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিলেন, কিন্তু যিশু তাঁহাকে কোনো উত্তর দিলেন না। আর প্রধান যাজকগণ ও অধ্যাপকেরা দাঁড়াইয়া উগ্রভাবে তাঁহার উপর দোষারোপ করিতেছিল। আর হেরোদ ও তাঁহার সেনারা তাঁহাকে তুচ্ছ করিলেন, ও বিদ্রূপ করিলেন, এবং জমকাল পোষাক পরাইয়া তাঁহাকে পীলাতের নিকটে ফিরিয়া পাঠাইলেন। সেই দিন হেরোদ ও পীলাত পরস্পর বন্ধু হইয়া উঠিলেন, কেননা, পূর্বে তাঁহাদের মধ্যে শত্রুভাব ছিল।”[৩৭২]

অষ্টম
যোহনের বর্ণনায় এসেছে, "তখন তাহারা যীশুকে লইল; এবং তিনি নিজে ক্রুশ বহন করিতে করিতে বাহির হইয়া 'মাথার খুলির স্থান' নামক স্থানে গেলেন। ইব্রীয় ভাষায় সেই স্থানকে গল্পথা বলে।”[৩৭৩]

পক্ষান্তরে মথি, মার্ক ও লুকের বর্ণনা অনুযায়ী তারা সিকান্দারের পিতা শিমোন নামক একজন কুরনিয় ব্যক্তিকে যিশুর পিছু পিছু ক্রুশ বহনের জন্য নিয়ে গিয়েছিল।

লন্ডন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ডেনিস এরিক নিনেহাম (Dennis Eric Nineham) তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য গসপেল অব সেইন্ট মার্ক (The Gospel of Saint Mark) এ বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন, "সাডু মার্ক তার সুসমাচারটি যে গির্জার জন্য রচনা করেছিলেন তারা এই দু'ব্যক্তিকে তথা সিকান্দার ও রুযকে ভালোভাবেই চিনত। তাই এদের সম্পর্কে আর বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন পড়েনি। সুসমাচারের এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য হলো শিমোন কর্তৃক ক্রুশ বহনের বিষয়টির বিশুদ্ধতা যাচাই করা।”

যোহনের সুসমাচারে এই অনুচ্ছেদ তথা শিমোন কুরনিয় কর্তৃক ক্রুশ বহনের বিষয়টি বিলুপ্ত করার কারণ হলো, এই চতুর্থ সুসমাচারটি[৩৭৪] যখন রচিত হয় তখন খ্রিষ্টানদের মাঝে এই দাবিটি ব্যাপকতা লাভ করে যে, শিমোন যিশুর স্থলাভিস্থিক্ত হয়েছে এবং যিশুর পরিবর্তে তাকেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে প্রসিদ্ধি পাওয়া খ্রিষ্টান জ্ঞানবাদীদের নিকট ধারণাটি আজও প্রচলিত। [৩৭৫]

নবম
শুধু যোহনের বর্ণনায় এসেছে যে, ক্রুশের নিকট অবস্থানরত গালিল থেকে আসা মহিলাদের সাথে যিশুর মাতাও ছিলেন। মহিলাদের মধ্যে যিশুর খালা, ক্লোপার স্ত্রী এবং মারইয়াম মিগদলি ছিলেন। তারা সবাই ঘটনাস্থলে দণ্ডায়মান ছিলেন। মসিহ যখন স্বীয় মাতা এবং প্রিয় শিষ্যকে দেখলেন তখন মাতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে নারী, ঐ দেখ তোমার পুত্র।” আবার শিষ্যকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে বৎস, ঐ দেখ তোমার মাতা।"

প্রশ্ন হলো, এই শিষ্য কোত্থেকে এল? ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যিশুকে গ্রেফতারের পর শিষ্যগণ সবাই মৃত্যুভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

দশম
মথি, মার্ক ও লুকের বর্ণনায় বলা হয়েছে, রাত নয়টায় যিশু চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ঈশ্বর আমার! ঈশ্বর আমার! আপনি কেন আমায় ত্যাগ করলেন? এই বলে তিনি নিজেকে সমর্পণ করে দিলেন।

চিৎকারের বিষয়টি যোহন উল্লেখ করেননি। বরং এমন কিছু বিষয়ের অবতারণা করেছেন, যা অন্য কোনো সুসমাচারে দেখা যায় না।

একাদশ
মথি এবং যোহনের বর্ণনামতে, মারইয়াম মিগদলি এবং অন্য এক মারইয়াম বিশ্রামদিনের পরদিন সকালে কবর দেখার জন্য এসেছিলেন। পক্ষান্তরে লুক ও মার্কের বর্ণনা অনুযায়ী মারইয়াম মিগদলি এবং যাকোবের মাতা মারইয়াম সুগন্ধিদ্রব্য কিনেছিলেন যিশুর গায়ে মাখানোর জন্য।

দ্বাদশ
কবরে প্রবেশ করার পর মারইয়াম সেখানে একজন যুবককে দেখতে পেলেন। এটা হলো মথি ও মার্কের বর্ণনা। পক্ষান্তরে লুক ও যোহনের বর্ণনামতে কবরের ভেতর যুবকের সংখ্যা ছিল দুইজন।

ত্রয়োদশ
মথি বলেছেন, যিশু তাদেরকে বললেন! তোমরা ভয় কর না। তোমরা যাও এবং আমার ভাইদেরকে গালিলে যেতে বল। সেখানেই তারা আমাকে দেখতে পাবে।

পক্ষান্তরে মার্ক এবং লুকের বর্ণনামতে কথা বলা ব্যক্তিটি যিশু ছিলেন না। অন্য কেউ তাদেরকে সম্বোধন করে বলেছিল, "মসিহ উঠে গেছেন। তিনি এখানে নেই।"

চতুর্দশ
যোহন বলেন, “সপ্তাহের প্রথম দিন প্রত্যুষে অন্ধকার থাকিতে থাকিতে মদলীনী মারইয়াম কবরের নিকটে যান, আর দেখেন, কবর হইতে পাথরখানি সরান হইয়াছে। তখন তিনি দৌড়াইয়া শিমোন পিতরের নিকটে, এবং যীশু যাহাকে ভালবাসিতেন, সেই অন্য শিষ্যের নিকটে আসিলেন, আর তাঁাদিগকে বলিলেন, লোকে প্রভুকে কবর হইতে তুলিয়া লইয়া গিয়াছে; তাঁহাকে কোথায় রাখিয়াছে, আমরা জানি না।” [৩৭৬]

পঞ্চদশ
মথি বলেন, “বিশ্রামদিন অবসান হইলে, সপ্তাহের প্রথম দিনের ঊষারম্ভে, মন্দলীনী মারইয়াম ও অন্য মারইয়াম কবর দেখিতে আসিলেন। আর দেখ, মহা-ভূমিকম্প হইল; কেননা, প্রভুর এক দূত স্বর্গ হইতে নামিয়া আসিয়া সেই পাথরখানি সরাইয়া দিলেন, এবং তাহার উপরে বসিলেন।” [৩৭৭]

পক্ষান্তরে মার্কের বর্ণনা হলো, "তাঁহারা পরস্পর বলাবলি করিতেছিলেন, কবরের দ্বার হইতে কে আমাদের জন্য পাথরখানি সরাইয়া দিবে? এমন সময় তাঁহারা দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন, পাথরখানি সরান গিয়াছে; কেননা, তাহা অতি বৃহৎ ছিল।”[৩৭৮]

উভয়ের বর্ণনা কাছাকাছি। ফিরিশতারা নারীদের উপস্থিতিতেই কবরের মুখ থেকে পাথর সরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু লুক এবং যোহনের বর্ণনা ভিন্ন। তাদের ভাষ্যমতে মহিলারা দেখল পাথর পূর্বেই সরানো হয়েছে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, এই দুই বর্ণনার কোনো একটি ভুল।

ষোড়শ
যিশুর কবর থেকে উত্থানসংক্রান্ত বর্ণনায় মথি বলেন, “তখন কয়েকজন অধ্যাপক ও ফরীশী তাঁহাকে বলিল, হে গুরু, আমরা আপনার কাছে কোন চিহ্ন-কার্য দেখিতে ইচ্ছা করি। তিনি উত্তর করিয়া তাহাদিগকে কহিলেন, এই কালের দুষ্ট ও ব্যব্যভিচারী লোকে চিহ্নের অন্বেষণ করে, কিন্তু যোনা ভাববাদীর[৩৭৯] চিহ্ন ছাড়া আর কোন চিহ্ন ইহাদিগকে দেওয়া যাইবে না। কারণ যোনা যেমন তিন দিবারাত্র বৃহৎ মৎস্যের উদরে ছিলেন, তেমনি মনুষ্যপুত্রও তিন দিবারাত্র পৃথিবীর গর্ভে থাকিবেন।”[৩৮০]

কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী এই চিহ্ন দুটি সংঘটিত হয়নি। কেননা, সুসমাচারগুলোর বর্ণনামতে মসিহকে দাফন করা হয়েছিল জুমাবার সন্ধ্যায়। এরপর শনিবার সারা দিন এবং পরবর্তী রাত তিনি কবরে ছিলেন। পরদিন ভোরে তিনি কবর থেকে উঠে আসেন। সে হিসেবে তার কবরে অবস্থানকালীনের ছিল এক দিন দুই রাত।

একইভাবে বলা হয়েছিল, কবর থেকে উত্থানের বিষয়টি দুষ্ট জাতির নিদর্শন হবে। কিন্তু এটাও হয়নি। দুষ্ট জাতির জন্য নিদর্শন হওয়া তো দূরের কথা, এটি স্বয়ং শিষ্যদের জন্যও নিদর্শন হতে পারেনি। কেননা, তাদের অধিকাংশেই সন্দেহের মধ্যে ছিল বাস্তবেই যিশু কবর থেকে উঠেছে কি না?

মথি বলেন, “পরে একাদশ শিষ্য গালীলে যীশুর নিরূপিত পর্বতে গমন করিলেন, আর তাঁহাকে দেখিয়া প্রণাম করিলেন; কিন্তু কেহ কেহ সন্দেহ করিলেন।”[৩৮১]

মার্ক বলেন, “তৎপরে সেই এগার জন ভোজনে বসিলে তিনি তাঁহাদের কাছে প্রকাশিত হইলেন, এবং তাঁহাদের অবিশ্বাস ও মনের কঠিনতা প্রযুক্ত তাঁহাদিগকে তিরস্কার করিলেন; কেননা, তিনি উঠিলে পর যাঁহারা তাঁহাকে দেখিয়াছিলেন, তাঁহাদের কথায় তাঁহারা বিশ্বাস করেন নাই।”[৩৮২]

এই হলো শিষ্যদের অবস্থা। অপরদিকে ইহুদিরা লোকদের মাঝে এ কথা প্রচার করল যে, শিষ্যগণ মসিহের লাশ চুরি করেছে। এই সুস্পষ্ট নিদর্শন তাদের কেউই বিশ্বাস করেনি।

মথি বলেন, "তাঁহারা যাইতেছেন, ইতিমধ্যে দেখ, প্রহরি-দলের কেহ কেহ নগরে গিয়া যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, সেই সমস্ত বিবরণ প্রধান যাজকদিগকে জানাইল। তখন তাহারা প্রাচীনবর্গের সহিত একত্র হইয়া ও মন্ত্রণা করিয়া ঐ সেনাগণকে অনেক টাকা দিল, কহিল, তোমরা বলিও যে, তাহার শিষ্যগণ রাত্রিকালে আসিয়া, যখন আমরা নিদ্রাগত ছিলাম, তখন তাহাকে চুরি করিয়া লইয়া গিয়াছে। আর যদি এই কথা দেশাধ্যক্ষের কর্ণগোচর হয়, তবে আমরাই তাঁহাকে বুঝাইয়া তোমাদের ভাবনা দূর করিব। তখন তাহারা সেই টাকা লইয়া, যেরূপ শিক্ষা পাইল, সেইরূপ কার্য করিল। আর যিহূদীদের মধ্যে সেই জনরব রটিয়া গেল, তাহা অদ্য পর্যন্ত রহিয়াছে।”[৩৮৩]

এভাবেই মসিহের মৃত্যু থেকে উত্থান পর্যন্ত বর্ণনার সূচনা হয় এবং খ্রিষ্টানদের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মজার বিষয় হলো, মসিহের উত্থান এর ঘোষণাটিও ছিল বিলম্বিত। পিতর ও অন্যান্যদের অস্বীকৃতির কারণে ঘোষণা দিতে ছয় সপ্তাহ বিলম্ব করা হয়। ঘটনার প্রায় পঞ্চাশ দিন পর সাধারণ খ্রিষ্টানদের মাঝে এটি প্রচারিত হয়। যিশুর ঊর্ধ্বারোহণের ষাট বছর পর লিখিত প্রেরিতদের কার্যবিবরণীতে লুক বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

সপ্তদশ
উক্ত ঘটনায় শুধু মথির বর্ণনায় উল্লেখ হয়েছে যে, প্রধান যাজকগণ ও ফরিশিরা পিলাতের কাছে গিয়ে তিন দিন কবর পাহারা দেওয়ার জন্য একজন লোক চেয়েছিল। কিন্তু পিলাত অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, “তোমাদের নিকটে প্রহরী-দল আছে; তোমরা গিয়া যথাসাধ্য রক্ষা করো।”[৩৮৪]

এটি একটি বিরোধপূর্ণ বানোয়াট ঘটনা। কেননা, ইহুদিরা নিজেরাই ছিল কবরের পাহারাদার। অথচ অধ্যায়ের শেষে বলা হয়েছে, “তখন তাহারা প্রাচীনবর্গের সহিত একত্র হইয়া ও মন্ত্রণা করিয়া ঐ সেনাগণকে অনেক টাকা দিল, কহিল, তোমরা বলিও যে, তাহার শিষ্যগণ রাত্রিকালে আসিয়া, যখন আমরা নিদ্রাগত ছিলাম, তখন তাহাকে চুরি করিয়া লইয়া গিয়াছে।”[৩৮৫]

প্রশ্ন হলো, ইহুদিরা নিজেরাই যদি পাহারাদার হয়ে থাকে তাহলে এই ঘুষের কী প্রয়োজন ছিল? কাকেই বা এই ঘুষ দেওয়া হলো? সৈনিকগণই বা কোত্থেকে এল? পিলাত তো ইহুদিগণ কর্তৃক কবর পাহারা দেওয়ার আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

আমি অবাক হই সুসমাচারের লেখকের ওপর। রচনার সময় সাধারণ বিষয়গুলো পর্যন্ত তিনি খেয়াল রাখেননি।

অষ্টাদশ
মার্ক তার সুসমাচারের শেষে বলেন, “আর তিনি তাঁাদিগকে কহিলেন, তোমরা সমুদয় জগতে যাও, সমস্ত সৃষ্টির নিকটে সুসমাচার প্রচার কর। যে বিশ্বাস করে ও বাপ্তাইজিত হয়, সে পরিত্রাণ পাইবে; কিন্তু যে অবিশ্বাস করে, তাহার দণ্ডাজ্ঞা করা যাইবে। আর যাহারা বিশ্বাস করে, এই চিহ্নগুলি তাহাদের অনুবর্তী হইবে; তাহারা আমার নামে ভূত ছাড়াইবে, তাহারা নূতন নূতন ভাষায় কথা কহিবে, তাহারা সর্প তুলিবে, এবং প্রাণনাশক কিছু পান করিলেও তাহাতে কোন মতে তাহাদের হানি হইবে না; তাহারা পীড়িতদের উপরে হস্তার্পণ করিবে, আর তাহারা সুস্থ হইবে।”[৩৮৬]

এই ঘটনায় সত্য-মিথ্যার মিশেল রয়েছে।

সত্য অংশ হলো, আল্লাহ তাআলা ঈসা আলাইহিস সালামের ওপর ইনজিল নামক একটি কিতাব নাজিল করেছেন। তিনি তার অনুসারীদের এই ইনজিলের সুসংবাদ দিতে বলেছিলেন। কিন্তু ঈসা আলাইহিস সালামের সেই ইনজিল তাদের কাছে এখন আর নেই। তাদের কাছে রয়েছে বিরোধপূর্ণ চারটি সুসমাচার। এই চারটি সুসমাচার চারজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি রচনা করেছেন। এই চারটির একটিও প্রকৃত ইনজিল নয়। এগুলোর প্রত্যেকটি ঈসা আলাইহিস সালামের ঊর্ধ্বারোহণের বহু পরে রচিত হয়েছে।

মিথ্যা অংশ হলো, বিশ্বাসীদের যে নিদর্শনের কথা মার্ক বলেছেন সেগুলো।

ইবনে হাজম বলেন, "স্পষ্টতই এটি একটি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। কেননা, তাদের কেউই এমন ভাষায় কথা বলেনি, যে ভাষা সে শিখেনি। কাউকেই অপবিত্র অবস্থায় দেশান্তরিত করা হয়নি। বিষপান করে আক্রান্ত না হওয়ার কোন ঘটনাও ঘটেনি। বরং তারা স্বীকার করে থাকে যে, সুসমাচারের লেখক যোহন নিজে বিষক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন। সৃষ্টিকর্তা তো নয়ই কোনো নবিও কোনোদিন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন না। তারা প্রতিশ্রুতি দিলে সেটা ব্যর্থও হয় না। এ থেকে বোঝা যায়, সুসমাচারের লেখকদের জন্য মসিহ আলাইহিস সালামের ওপর মিথ্যা আরোপ করা একেবারে নস্যি।”[৩৮৭]

এভাবেই ক্রুশের ঘটনা, মসিহের কবর এবং সেখান থেকে উত্থানের ঘটনায় সুসমাচারগুলো বিভ্রান্তিমূলক ও বিরোধপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছে। বিরোধগুলো একেবারে সুস্পষ্ট। কেননা, এটি একাধিকবার সংঘটিত কোনো ঘটনা নয়। একটিমাত্র ঘটনার বর্ণনায় এত বৈপরীত্য কীভাবে সম্ভব? এই বড় বড় বৈপরীত্যগুলো ক্রুশের ঘটনায় খ্রিষ্টানদের বর্ণনার প্রতি আস্থা রাখার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ নড়বড়ে করে দেয়। অথচ এই বর্ণনাগুলোই আজকের খ্রিষ্টধর্মের ভিত্তি।

প্রাচীনকাল থেকেই খ্রিষ্টানরা সুসমাচারগুলোর এই বিরোধ ও বৈপরীত্যেকে স্বীকার করে আসছে। যেমন তাদের একজন প্রসিদ্ধ লেখক হাবিব সাইদ বলেন-

“কোনো চলচাতুরির আশ্রয় না নিয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করে নিতে হবে যে, এই বর্ণনাগুলোতে অবশ্যই বিরোধ, অসংগতি ও বৈপরীত্য বিদ্যমান। দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই বিষয়গুলো নজরে এসেছে। বিদ্বেষীরা এটাকেও ছিদ্রান্বেষণ ও সমালোচনার বিষয়ে পরিণত করেছে। সে সময়ের সমালোচনা শুধু মথি ও লুক কর্তৃক বর্ণিত যিশুর বংশপরম্পরা এবং যোহন কর্তৃক বর্ণিত ঐতিহাসিক ঘটনার ধারাবাহিকতার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। অথচ সুসমাচারগুলোর লেখকগণ কখনোই ইনজিলের বর্ণনাগুলো অক্ষরে অক্ষরে সঠিক দাবি করেননি। যুগে যুগে লেখকদের ক্ষেত্রে যা হয় ঠিক তেমনি তারাও নিজেদের বুদ্ধি ও মানসিকতা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। সুতরাং এ সুসংবাদগুলোর মাঝে সামান্যতম নয়, বরং বড় রকমের অসংগতি আছে বললে অত্যুক্তি হবে না। আর সেসব বৈপরীত্যের কার্যকারণ বের করাও কঠিন কোনো কাজ নয়। পরবর্তী যুগের পণ্ডিতগণ এ সসম্যাগুলোর সমাধানে দারুণ সব কাজ করে গেছেন।”[৩৮৮]

এই কয়েকটি লাইনই সেই ঐতিহাসিক ঘটনা এবং বংশনামা বর্ণনার ক্ষেত্রে খ্রিষ্টবাদের যৌক্তিকতার মুখোশ উন্মোচন করে দেয়। অথচ তারা সেসব কিতাব ও লেখকদেরকে পুতঃপবিত্র এবং সাধুজ্ঞান করে থাকে।

আমি মনে করি, যারা সুসমাচারগুলোর বর্ণনার বৈপরীত্য ও অসংগতিগুলোকে হালকা করে দেখাতে চান তাদের দাবিকে খণ্ডন করার জন্য এই একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্ণিত অনুচ্ছেদগুলোর ব্যবচ্ছেদ করাই যথেষ্ট।

চার্লস গিজেনবার্ট (Charles Guiguenbert) বিষয়টিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, “সুসমাচারগুলো লিপিবদ্ধ হওয়ার আগে ক্রশের ঘটনার অনেক কিছুই বিশ্বাসীদের স্মরণ থেকে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। ফলে এর লেখকগণ প্রাচ্যের বিভিন্ন রূপকথা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন।”[৩৮৯]

এরপর তিনি বলেন, "এভাবেই আমরা ঈসার ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক সুস্পষ্টভাবে নিরূপণ করতে সক্ষম নই। একইভাবে তার জীবনের ঘটনাপ্রবাহের রেফারেন্সসমৃদ্ধ সুনিপুণ বর্ণনা দেওয়াও সম্ভব নয়।”[৩৯০]

নব খ্রিষ্টবাদের জনক পোল এর দাবি এসবকিছুকে ধুলিস্যাৎ করে দেয়। তিনি বলেন, "তাহার পরে তিনি একেবারে পাঁচ শতের অধিক ভ্রাতাকে দেখা দিলেন, তাহাদের অধিকাংশ লোক অদ্যাপি বর্তমান রহিয়াছে, কিন্তু কেহ কেহ নিদ্রাগত হইয়াছে। তাহার পরে তিনি যাকোবকে, পরে সকল প্রেরিতকে দেখা দিলেন।”[৩৯১]

এখান থেকে বোঝা যায়, মসিহের কবর থেকে উত্থানবিষয়ক আকিদায় প্রথম যুগ থেকেই অনুসারীদের মাঝে মতবিরোধ বিদ্যমান ছিল। পোল ছিলেন এই আকিদার অন্যতম আহ্বায়ক। সুসমাচারের লেখকগণ এই আকিদাটি তার কাছ থেকেই গ্রহণ করেছেন। কেননা, পোলের চিঠিগুলো[৩৯২] সুসমাচারগুলোর কয়েক দশক আগে লিখিত হয়েছে। তন্মধ্যে প্রথম চিঠিটি ছিল করিস্থিয়বাসীদের প্রতি লেখা। সেখানে পোল কবর থেকে উত্থানের আকিদা অস্বীকারকারীদের তুমুল সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, "মৃতগণের পুনরুত্থান যদি না হয়, তবে খ্রীষ্টও ত উত্থাপিত হন নাই। আর খ্রীষ্ট যদি উত্থাপিত না হইয়া থাকেন, তাহা হইলে ত আমাদের প্রচারও বৃথা, তোমাদের বিশ্বাসও বৃথা। আবার আমরা যে ঈশ্বরের সম্বন্ধে মিথ্যা সাক্ষী, ইহাই প্রকাশ পাইতেছে; কারণ, আমরা ঈশ্বরের বিষয়ে এই সাক্ষ্য দিয়াছি যে, তিনি খ্রীষ্টকে উত্থাপন করিয়াছেন; কিন্তু যদি মৃতগণের উত্থাপন না হয়, তাহা হইলে তিনি তাঁহাকে উত্থাপন করেন নাই।” [৩৯৩]

এই বক্তব্যে তিনি মূলত মসিহের প্রিয় শিষ্য শিমোন পিতরকে উদ্দেশ্য করেছেন। কেননা, পিতর মসিহের কবর থেকে উত্থানের বিষয়কে অস্বীকার করতেন। ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে নিকিয়ার মহাসভার আগ পর্যন্ত এই আকিদাটি গ্রহণ করা নিয়ে খ্রিষ্টানদের মধ্যে বড় দ্বন্দ্ব ছিল। উক্ত মহাসভায় তারা অধিকাংশের রায়ের ভিত্তিতে কবর থেকে উত্থানের আকিদাসহ আরও অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। এই মহাসভা-সংক্রান্ত আলোচনা সামনে করা হবে ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
[৩৪৬] ইয়াসসু মসিহ, পৃষ্ঠা: ৩৭১।
[৩৪৭] যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ২০, অনুচ্ছেদ: ৮-১১।
[৩৪৮] গণনাপুস্তক, অধ্যায়: ১৫, অনুচ্ছেদ: ৩২-৩৬।
[৩৪৯] মার্ক, অধ্যায়: ২, অনুচ্ছেদ: ২৩-২৮।
[৩৫০] মার্ক, অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ১-১।
[৩৫১] লুক, অধ্যায়: ২১, অনুচ্ছেদ: ২০।
[৩৫২] মথি, অধ্যায়: ২৩, অনুচ্ছেদ: ৩৭-৩৯।
[৩৫৩] বরনাবা, অধ্যায়: ২১৫-২১৬।
[৩৫৪] এতদসত্ত্বেও খ্রিষ্টানগণ বিশ্বাস করে মসিহ আলাইহিস সালামকেই শূলে চড়ানো হয়েছে। সমগ্র খ্রিষ্টজগতের পাপ মার্জনার জন্য তিনি আত্মহুতি দিয়েছেন। এই আত্মহুতির স্মৃতি হিসেবে তারা নিজেদের ইবাদাতগৃহে এবং নিজেদের শরীরে ক্রশ ধারণ করে থাকে।
[৩৫৫] মথি, অধ্যায়: ২৬, অনুচ্ছেদ: ৩১; মার্ক, অধ্যায়: ১৪, অনুচ্ছেদ: ২৭।
[৩৫৬] তারিখুত তামাদ্দুনিল ইসলামি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৪, দারুল হিলাল।
[৩৫৭] হিদায়াতুল হিয়ারা, পৃষ্ঠা: ২০-২১।
[৩৫৮] তানকিহুল আবহাস লিল মিলালিস সালাস, পৃষ্ঠা: ৫৭।
[৩৫৯] প্রেরিত, অধ্যায়: ১০, অনুচ্ছেদ: ১৮।
[৩৬০] মথি, অধ্যায়: ২৭, অনুচ্ছেদ: ৩-৫।
[৩৬১] প্রেরিত, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ২০-২৬।
[৩৬২] ফতহুল বারি, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা: ২৬৭। বিশিষ্ট মুফাসসির আবু হাইয়ান তার তাফসির গ্রন্থ আল-বাহরুল মুহিত-এ ইবনে আতিয়ার বর্ণনা নকল করে বলেন, "সমস্ত উম্মত এ কথার ওপর একমত যে হাদিসে মুতাওয়াতির দ্বারা ঈসা আলাইহিস সালামের আসমানে জীবিত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত। এবং আখেরি জমানায় তিনি অবতরণ করবেন। শুকর হত্যা করবেন। ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন। দাজ্জালকে বধ করবেন। আদল-ইনসাফ ছড়িয়ে দেবেন। তার মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদি বিজয় লাভ করবে। তিনি হজ করবেন। উমরা করবেন। মুসলিম শরিফের হাদিসে এসেছে, "ঐ সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, ইবনে মারইয়াম রাওহা উপত্যকায় হজ অথবা উমরা অথবা দুটোরই ইহরাম বাঁধবেন।" রাওহা উপত্যকাটি মদিনা থেকে বদর যাওয়ার পথে একটি স্থান।
[৩৬৩] মত তিনটি হলো: এক, তাকে স্বশরীরে আসমানে তুলে নেওয়া হয়েছে। দুই, তিনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন অতঃপর তার রুহকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিন, তিনি হিজরত করে কাশ্মিরের শ্রীনগরে আসেন। এখানেই তার মৃত্যু হয়।
[৩৬৪] তাকদিম-তাখির অলংকার শাস্ত্রের একটি নিয়ম। যেখানে নানাবিধ উদ্দেশ্যে পরের বিষয়কে আগে এবং আগের বিষয়কে পরে উল্লেখ করা হয়।
[৩৬৫] বুখারি। ক্রুশ ভাঙার দ্বারা বোঝা যায়, তিনি খ্রিষ্টধর্মকে অকার্যকর করবেন এবং খ্রিষ্টানগণ কর্তৃক ক্রুশকে সম্মানের বিষয়টিও তিনি অপনোদন করবেন। মসিহ আলাইহিস সালামের অবতরণ সম্পর্কিত হাদিস প্রচুর এবং মুতাওয়াতির পর্যায়ের। এ সম্পর্কে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ. রচিত ও শায়খ আবু গুদ্দাহ কর্তৃক পুনঃনিরীক্ষণ কিতাব আত-তাসরিহ বিমা তাওয়াতারা ফি নুযুলিল মসিহ দেখা যেতে পারে।
[৩৬৬] পিলাত ২৯ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে ইহুদিদের ওপর শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। মসিহ আলাইহিস সালামের কয়েক বছর পর পর্যন্ত তার শাসন বিদ্যমান ছিল। তার মৃত্যু সম্পর্কে মতবিরোধ রয়েছে। বলা হয়ে থাকে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কারও কারও মতে তাকে স্বীয় পদ থেকে বরখাস্ত করে ফ্রান্সে নির্বাসন দেওয়া হয়। সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
[৩৬৭] মথি, অধ্যায়: ২৬,২৭,২৮; মার্ক, অধ্যায়: ১৪,১৫,১৬; লুক, অধ্যায়: ২২,২৩,২৪; যোহন, অধ্যায় : ১৮,১৯,২০,২১।
[৩৬৮] যোহন, অধ্যায়: ১৮, অনুচ্ছেদ: ৩-৯।
[৩৬৯] যোহন, অধ্যায়: ১৮, অনুচ্ছেদ: ১৩-১৪।
[৩৭০] লুক, অধ্যায়: ২৩, অনুচ্ছেদ: ২।
[৩৭১] যোহন, অধ্যায়: ১৮, অনুচ্ছেদ: ২৮-৩১।
[৩৭২] লুক, অধ্যায়: ২৩, অনুচ্ছেদ: ৮-১২।
[৩৭৩] যোহন, অধ্যায়: ১৯, অনুচ্ছেদ: ১৭।
[৩৭৪] রচনার সময়কাল বিবেচনায় যোহনের সুসমাচারকে চতুর্থ সুসমাচার বলা হয়। এটি ১০০-১২৫ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে রচিত হয়েছে।
[৩৭৫] আল-মাসিহ ফিল মাসাদিরিল আকাইদিল মসিহিয়্যাহ, ২৭২
[৩৭৬] যোহন, অধ্যায়: ১৯, অনুচ্ছেদ: ১-২।
[৩৭৭] মথি, অধ্যায়: ২৮, অনুচ্ছেদ: ১-২।
[৩৭৮] মার্ক, অধ্যায়: ১৬, অনুচ্ছেদ: ৩-৪।
[৩৭৯] এখানে ইউনুস আলাইহিস সালামের কথা বলা হচ্ছে। খ্রিষ্টানদের গ্রন্থগুলোর বাংলা অনুবাদে নবী শব্দের অনুবাদে ভাববাদী লেখা হয়েছে।
[৩৮০] মথি, অধ্যায়: ১২, অনুচ্ছেদ: ৩৮-৪০।
[৩৮১] মথি, অধ্যায়: ২৮, অনুচ্ছেদ: ১৬-১৭।
[৩৮২] মার্ক, অধ্যায়: ১৬, অনুচ্ছেদ: ১৪।
[৩৮৩] মথি, অধ্যায়: ২৮, অনুচ্ছেদ: ১১-১৫। অর্থাৎ, মথি কর্তৃক সুসমাচারটি লিপিবদ্ধ হওয়া পর্যন্ত চুরির বিষয়টি ইহুদিদের মাঝে প্রচলিত ছিল। উল্লেখ্য, মথির সুসমাচারটি লিখিত হয় খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতাব্দীর শেষের দিকে। সূতরাং, দুষ্ট জাতির জন্য এটি নিদর্শন হয়নি। খ্রিষ্টানদের উচিত এর যথার্থ কোন ব্যাখ্যা দেওয়া।
[৩৮৪] বাইবেলের আরবি অনুবাদে এভাবেই বর্ণনা এসেছে। পক্ষান্তরে কোনো কোনো বাংলা অনুবাদে এসেছে, "তখন পীলাত তাঁদের বললেন, পাহারাদারদের নিয়ে গিয়ে আপনারা যেভাবে পারেন সেইভাবে পাহারা দেবার ব্যবস্থা করুন।"
[৩৮৫] মথি, অধ্যায়: ২৮, অনুচ্ছেদ: ১২-১৩।
[৩৮৬] মার্ক, অধ্যায়: ১৬, অনুচ্ছেদ: ১৫-১৮।
[৩৮৭] আল-ফসলু ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়াই ওয়ান নিহাল, খণ্ড: ২ পৃষ্ঠা: ৫৬।
[৩৮৮] আদইয়ানুল আলাম, পৃষ্ঠা: ২৭৭।
[৩৮৯] আল-মসিহিয়‍্যাহ ওয়া নাশআতুহা ওয়া তাতাওয়ারুহা, পৃষ্ঠা: ২৯।
[৩৯০] প্রাগুক্ত।
[৩৯১] করিন্থিয় ১ম, অধ্যায়: ১৫, অনুচ্ছেদ: ৬-৮, বিষয়টি হলো, খ্রিষ্টানদের বর্ণনাগুলোর মতে মসিহ চল্লিশ দিন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিলেন। অথচ পোল খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন পঁয়ত্রিশ খ্রিষ্টাব্দে। অর্থাৎ মসিহের ঊর্ধ্বারোহণের সাত বছর পর।
[৩৯২] কোনো কোনো খ্রিষ্টান লিখকের মতে এই চিঠিগুলো ৫০-৬০ খ্রিষ্টাব্দে লিখিত হয়েছে। পক্ষান্তরে প্রথম সুসমাচারটি লিখিত হয় ৭০ খ্রিষ্টাব্দে। আদইয়ানুল আলাম, পৃষ্ঠা: ২৭২।
[৩৯৩] করিন্থিয় ১ম, অধ্যায়: ১৫, অনুচ্ছেদ: ১৩-১৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px