📄 তালমুদ ও মসিহ আলাইহিস সালাম
মসিহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তালমুদের বক্তব্য হলো যিশু জাহান্নামের আগুন বরফের শান্তি ভোগ করছে। তার মা মরিয়ম তাকে অবৈধভাবে জন্ম দিয়েছেন। খ্রিষ্টান গির্জাগুলো সব আবর্জনার ভাগাড়। সেখানকার উপদেশদাতাগণ ঘেউ ঘেউ করতে থাকা কুকুরের মতো। খ্রিষ্টানকে হত্যা করাই হলো নির্দেশনা। কোনো খ্রিষ্টানের সাথে চুক্তি করলে তা শুদ্ধ হয় না। খ্রিষ্টানকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে ইহুদির জন্য সেটা পূরণ করা জরুরি নয়। ইহুদিদের কর্তব্য হলো খ্রিষ্টান নেতাদের তিনবার অভিশাপ করা। একইভাবে যারা বনি ইসরাইলের সাথে শত্রুতা করে থাকে তাদেরকেও তিনবার অভিশাপ করা।
টিকাঃ
[২৮৬] আল-কানযুল মারসুদ ফি কাওয়াইদিত তালমুদ এর আরবি অনুবাদকের ভূমিকা থেকে সংগৃহীত। অনুবাদক মনে করেন ফরাসি সম্রাটের দরবারে যেসব ইহুদি রাব্বি তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছিল তারা মসিহ এবং খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে তাদের এসব বক্তব্যকে স্বীকার করে নিয়েছিল। এমনকি তাদের এসব অনুচ্ছেদের অনুবাদ তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ব্যাখ্যা দিয়েছিল।
📄 শপথ সম্পর্কে
ইহুদিরা অন্য জাতির সাথে শপথ করলে সেটা শপথ হিসেবে বিবেচিত হয় না। এটা চতুষ্পদ জন্তুর সাথে শপথ করার মতো। চতুষ্পদ জন্তুর সাথে শপথ করলে সেটা শপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কেননা, শপথ করা হয় মানুষের মাঝে বিবাদ মীমাংসা করার জন্য। মানুষ ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন নেই। ইহুদি যদি কোনো খ্রিষ্টান এর সাথে শপথ করতে বাধ্য হয় তাহলে সেটাকে শপথ বিবেচনা করার দরকার নেই। ইহুদির কর্তব্য প্রয়োজনে বিশবার মিথ্যা শপথ করা। এ ক্ষেত্রে ইহুদি কোনো ভাইয়ের জন্য তাকে বাধা দেওয়া উচিত নয়।
টিকাঃ
[২৮৭] আল-কানযুল মারসুদ ফি কাওয়াইদিত তালমুদ, পৃষ্ঠা: ৯৩-৯৪।
📄 অ-ইহুদি নারী সম্পর্কে
তালমুদ অ-ইহুদি নারীর সাথে অশ্লীল কর্মে লিপ্ত হওয়ার বৈধতা দেয়। অ-ইহুদির স্ত্রীর সাথে সহবাস করা বৈধ। কেননা, অ-ইহুদিদের বিবাহগুলো তালমুদের বিধান অনুযায়ী বাতিল ও অবৈধ। অ-ইহুদি নারী চতুষ্পদ জন্তুর মতো। চতুষ্পদ জন্তুদের মাঝে বিবাহ হয় না। তাই ইহুদি কর্তৃক কোনো খ্রিষ্টান নারীর সাথে সহবাস করা হারাম নয়। বরং অ-ইহুদি নারীকে ধর্ষণ করা ইহুদির অধিকার। রাব্বি টম এর ভাষায়, ইহুদি নারী-পুরুষের সাথে জিনা করলে কোনো শাস্তি প্রযোজ্য হবে না। কেননা, ইহুদিরা পশুর বংশধর।
এ পর্যায়ে আমরা পাঠকদের সামনে তালমুদ এর কিছু বক্তব্যের অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো। এগুলো ইহুদিধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করা মোহাম্মদ আফিন্দি (মুসা আবুল আফিয়া) এর অনুবাদ।
টিকাঃ
[২৮৮] আল-কানযুল মারসুদ ফি কাওয়াইদিত তালমুদ, পৃষ্ঠা: ৮৯।
[২৮৯] আবুল আফিয়া ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে দামেশকের যাজক টমাসের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর ইসলামে দীক্ষিত হন। পরবর্তীতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি গোপনে তালমুদের বাক্যগুলোর অনুবাদ শুরু করেন এবং সেগুলো ফরাসি কনস্যুলেট এর উপদেষ্টা ও গভর্নর শরিফ পাশাকে হস্তান্তর করেন। শরিফ পাশা এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ইহুদিরা তাকে অর্ধ মিলিয়ন স্বর্ণমুদ্রা ঘুষ দিয়ে তালমুদের ব্যাপারে তদন্ত থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে। পাশাপাশি আবুল আফিয়াহ কর্তৃক কৃত অনুবাদকে নিশ্চিহ্ন করার প্রস্তাব দেয়।
📄 ইহুদিদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ইহুদিদের ধর্মীয় কিতাব বিশেষ করে বুখতেনসর কর্তৃক বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংসের পর রচিত কিতাবগুলো অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, সেসময় তাদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যক্তিত্ব হারিয়ে যায়। এমনকি পৃথিবী থেকে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়। তখন ইহুদি নেতাগণ তাদের অন্তর থেকে ব্যাবিলনের দুঃসময় ও বন্দি জীবনের স্মৃতি কাটিয়ে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে চিন্তা করতে থাকেন। তখন তাদের আলেম ও পণ্ডিতগণ মিলে 'শরিয়ত ও প্রতিশ্রুতি' তত্ত্ব আবিষ্কার করেন এবং তাদেরকে অন্যদের সাথে মেশার অনুপযুক্ত ঘোষণা করেন। এ ক্ষেত্রে ফরিশিগণ ছিল শীর্ষে।
এনসাইক্লোপেডিয়া অব জুডাহ বলছে, 'তখন থেকে ইহুদিদের জীবনে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। অসহায় অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। পরিস্থিতিও পাল্টে যায়। পূর্ববর্তী শরিয়ত নতুন ধাঁচে পরিচালিত হয়। প্রাচীন রীতিনীতিতে নতুন ধারাবাহিকতা আসে। হিংস্রতা ইহুদিদের স্বভাব কাঠামো তৈরি করে দিয়েছিল। একইভাবে তাদের জীবন, চিন্তা-ধারা সর্বোপরি তাদের ভবিষ্যৎকে পাল্টে দিয়েছিল।'
এখান থেকে ইহুদি ও অ-ইহুদির মেলামেশার ওপর নিষেধাজ্ঞার সূচনা হয়। শুরু হয় অন্যদের সংস্কৃতি ও রীতিনীতিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং অ-ইহুদিদের সাথে অনাদর ও নির্দয় আচরণের। ব্যাবিলনীয় লেখকগণ ইহুদি জাতির ওপর ভয়ংকর কিছু শিক্ষাদীক্ষা চাপিয়ে দিয়েছিল। ইহুদিদের এগুলো আবশ্যিকভাবে পালন করতে হতো। এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে কার্যত সামরিককভাবে একতাবদ্ধ করা। যাতে করে তারা বিশ্বের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারে।
এজন্যই আমরা দেখি তাদের দাবিকৃত তাওরাত অ-ইহুদিদেরকে সমূলে হত্যার নির্দেশ দেয়। তাওরাতের এই বাণীসমূহ তাদের সিনাগগগুলোতে প্রকাশ্যে পঠিত হয়।
ইহুদিরা যুদ্ধের জন্য এক কাল্পনিক প্রভু আবিষ্কার করেছিল। তারা সেই প্রভুর নাম দিয়েছে যিহোবা। ইনি ইহুদিদের গোত্রীয় প্রভু। তার দায়িত্ব হচ্ছে ইহুদিদের শত্রু বিনাশ করা।
কথিত তাওরাতের দ্বিতীয় বিবরণ পুস্তকে ইহুদিদেরকে সমস্ত জীব এমনকি প্রাণীকুলকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো পৃথিবী থেকে অ-ইহুদিদের মূলোৎপাটন করা।
'আর তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার সম্মুখ হইতে ওই জাতিগণকে অল্প অল্প করিয়া দূর করিবেন; তুমি তাহাদিগকে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করিতে পারিবে না, পাছে তোমার প্রতিকূলে বন্যপশুগণ বর্ধিত হয়। কিন্তু তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার সম্মুখে তাহাদিগকে সমর্পণ করিবেন; এবং যে পর্যন্ত তাহারা বিনষ্ট না হয়, তাবৎ মহাব্যাকুলতায় তাহাদিগকে ব্যাকুল করিবেন।'
গণনাপুস্তকে বলা হয়েছে—
'কিন্তু যদি তোমরা আপনাদের সম্মুখ হইতে সেই দেশনিবাসীদিগকে অধিকারচ্যুত না করো, তবে যাহাদিগকে অবশিষ্ট রাখিবে তাহারা তোমাদের চক্ষে কণ্টক ও তোমাদের কক্ষে অঙ্কুশস্বরূপ হইবে এবং তোমাদের সেই নিবাসদেশে তোমাদিগকে ক্লেশ দেবে।'
যুদ্ধের এই নতুন সেনাপতি ইহুদিদেরকে শত্রু বিনাশের নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। বরং তাদেরকে এই বলে ভয় দেখিয়েছে যে, তারা যদি শত্রু হত্যা না করে তাহলে যিহোবা তাদের বিরুদ্ধে চলে যাবেন। গণনা পুস্তক বলা হয়েছে—
'আর আমি তাহাদের প্রতি যাহা করিতে মনস্থ করিয়াছিলাম, তাহা তোমাদের প্রতি করিব।'
দ্বিতীয় বিবরণে বলা হয়েছে—
'তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভুর ফরমানে কর্ণপাত না করিলে, তোমাদের সম্মুখে সদাপ্রভু যে জাতিগণকে বিনষ্ট করিতেছেন, তাহাদেরই ন্যায় তোমরা বিনষ্ট হইবে।'
একই পুস্তকে আরও বলা হয়েছে—
'আর যদি তুমি কোনো প্রকারে আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুকে ভুলিয়া যাও, অন্য দেবগণের পশ্চাদগামী হও, তাহাদের সেবা করো, ও তাহাদের নিকটে প্রণিপাত করো, তবে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে অদ্য এই সাক্ষ্য দিতেছি, তোমরা নিশ্চয় বিনষ্ট হইবে।'
তাদের পবিত্র গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী এই প্রভুর মধ্যে শুধু শয়তানি গুণাবলি বিদ্যমান। তিনি অত্যন্ত হিংস্র, দুষ্ট প্রকৃতির, ধ্বংস ও রক্তপাতে আসক্ত। অ-ইহুদির জন্য তার মাঝে দয়ার ছিটেফোঁটাও নেই। অ-ইহুদি তার শত্রু।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, খ্রিষ্টান সম্প্রদায় কীভাবে এই পুরাতন নিয়মকে গ্রহণ করে যেখানে যিহোবার মতো একজন প্রভুর উল্লেখ আছে। যে পুস্তক অ-ইহুদিদেরকে সমূলে হত্যা করতে নির্দেশ দেয় কীভাবে তারা সে পুস্তকের ওপর ঈমান রাখে। খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন উপদল সম্পর্কে অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, তাদের অনেকেই পুরাতন নিয়মকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এটাকে তারা শরিয়তসিদ্ধ মানতে নারাজ। এমন একটি উপদল হলো ম্যানুবি সম্প্রদায়। তাদের নেতা ম্যানির দিকে সম্বন্ধ করে এই নামকরণ করা হয়। খ্রিষ্টাব্দ তৃতীয় শতাব্দীতে পারস্যে এদের উদ্ভব হয়।
টিকাঃ
[২৯১] দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ২২-২৩।
[২৯২] গণনা পুস্তক, অধ্যায়: ৩৩, অনুচ্ছেদ: ৫৫।
[২৯৩] গণনা পুস্তক, অধ্যায়: ৩৩, অনুচ্ছেদ: ৫৬।
[২৯৪] দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায়: ৮, অনুচ্ছেদ: ২০।
[২৯৫] দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায় : ৮, অনুচ্ছেদ : ১৯।