📄 অলিখিত বা মৌখিক ওহি
তাওরাতের বাণীর পাশাপাশি ইহুদিদের জীবনঘনিষ্ঠ বিভিন্ন রীতি নীতির সমষ্টিই হলো মৌখিক বা অলিখিত ওহি। ইহুদিরা মনে করে এসব প্রথা ও শিক্ষা মুসা আলাইহিস সালাম পর্বতের ওপর থেকে তার জাতির জন্য প্রদান করেছিলেন। এরপর পালাক্রমে হারুন, ইলিয়াসার, যিহোশুয় এগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেন এবং পরবর্তী নবিদের কাছে অর্পণ করেন।²⁶⁸ এরপর এই বর্ণনাগুলো পুরোহিত ইষ্রার কাছে পৌঁছায়। তিনি ১২০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত সর্বোচ্চ পরিষদের সদস্যদের এগুলো শিক্ষা দেন। এরপর ওহির এই অংশটি ২৫০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত এই সদস্যদের পুত্র এবং পৌত্রদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে। এদের সর্বশেষ ব্যক্তি ছিলেন শিমসন (৩০০ খ্রিষ্টপূর্ব)। এরপর এই ওহি লেখকদের কাছে হস্তান্তরিত হয়। তাদের কাছ থেকে উলামাদের কাছে। উলামাদের থেকে যাজক ও রাব্বিগণের কাছে হস্তান্তরিত হয়। এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলে ৭০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২২০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে।
ইহুদিদের এসব ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণে এই বর্ণনাগুলো মধ্য দিয়ে অনেক মিথ্যা, বানোয়াট ও কল্পকথা তাদের ধর্মীয় পুস্তকে প্রবেশ করে। যে কেউ ইচ্ছে মতো কিছু একটা লিখত আর বলত এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি। এদিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে বলা হয়েছে-
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ .
অতএব, তাদের জন্যে আফসোস! যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ-যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে। [সুরা বাকারা, আয়াত: ৭৯]
লোকমুখে প্রসিদ্ধ এই বর্ণনাগুলো দ্বিতীয় খ্রিষ্টাব্দের রাব্বি যিহুদা সংকলন করেন এবং এর নাম দেন মিশনা। মিশনা শব্দের অর্থ হলো পুনরাবৃত্তি। এটাকে তিনি তাওরাতের তাফসির হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এরপর আলেমগণ এর ব্যাখ্যা লিখেন যার নাম দেওয়া হয় গিমারা। এই মিশনা ও গিমারা এর সমষ্টিকে বলা হয় তালমুদ। জোসেফ বলেন, 'পুরাতন নিয়মে মুসা আলাইহিস সালামের সমস্ত অসিয়ত সন্নিবেশিত হয়েছে। সেখানে আমরা দেখি যে লিখিত শরিয়তে কোনো ধরনের সংযোজন বিয়োজন এর ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।²⁶⁹ কিন্তু যখন হিব্রু ভাষায় বাইবেলকে সংকলন করা হচ্ছিল ততদিনে ইহুদিদের জীবনাচারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসে যায়। তাই শরিয়তের অনেকগুলো বাক্যের মৌখিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দেয়। পরে এই মৌখিক ব্যাখ্যার পঠন-পাঠন ব্যাপক আকার লাভ করে। তেষট্টি অধ্যায় সম্বলিত ছয় খণ্ডের একটি সংকলনের রূপ ধারণ করে যার নামকরণ করা হয় মিশনা।
পরবর্তীতে তাদের সেই ব্যাখ্যাগুলো আরামীয় ভাষায় সংকলিত হয় যার নাম রাখা হয় গিমারা। এরপর মিশনা ও গিমারার বর্ণনাগুলো চল্লিশ খণ্ডের একটি কিতাবে সংকলিত হয় যা তালমুদ নামে পরিচিতি লাভ করে।²⁷¹
অধিকাংশ ইহুদি তালমুদকে আসমানি গ্রন্থ মনে করে এবং এটিকে তাওরাতের সমকক্ষ বিবেচনা করে। তারা মনে করে আল্লাহ তাআলা তুর পর্বতে মুসা আলাইহিস সালামকে লিখিত আকারে তাওরাত দান করেছেন এবং তালমুদ প্রেরণ করেছেন মৌখিকভাবে। অনেক ইহুদি এই মৌখিক বর্ণনাগুলোকে তাওরাত এর চেয়েও উঁচু মর্যাদায় স্থান দিয়েছে। তারা সুস্পষ্টভাবে বলে থাকে যে, ওই ব্যক্তির কোনো প্রভু নেই যে মিশনা ও গিমারা ছাড়া তাওরাত অধ্যয়ন করে। তারা মনে করে তাদের রাব্বিগণের কথা হলো প্রভুর জীবন্তবাণী। যখনই কোনো জটিল সমস্যা সামনে আসে, এমনকি আসমানে তার সমাধান সম্ভব হয় না তখন আল্লাহ তাআলা তাদের রাব্বিগণের সাথে পরামর্শ করেন।²⁷⁴
টিকাঃ
২৬৮. কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাস, পৃষ্ঠা: ২২২।
২৬৯. দ্বিতীয় বিবরণের চতুর্থ অধ্যায়ের ২য় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'আমি তোমাদিগকে যাহা আজ্ঞা করি, সেই বাক্যে তোমরা আর কিছু যোগ করিবে না, এবং তাহার কিছু হ্রাস করিবে না।'
২৭১. হিকমাতুল আদইয়ানিল হাইয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৫৪-১৫৫।
২৭৪. আল-কানযুল মারসুদ ফি কাওয়াইদিত তালমুদ, পৃষ্ঠা: ৪৪-৪৬।
📄 তালমুদের প্রকার
ইহুদিদের মধ্যে দুই ধরনের তালমুদ বিদ্যমান :
এক. জেরুজালেমের তালমুদ। এটি সংক্ষিপ্ত এবং সমন্বিত। খ্রিষ্টাব্দ চতুর্থ শতাব্দীতে এর সংকলন সমাপ্ত হয়। এতে মিশনা এবং ইহুদি রাব্বি ও আলেমগণের সংযোজন ও ব্যাখ্যাগুলো সংযোজিত হয়েছে। এটি লিপিবদ্ধ করেছেন তাবারিয়া এর রাব্বিগণ।
দুই. ব্যাবিলনের তালমুদ। এটি প্রথমোক্ত তালমুদ এর চেয়ে তিনগুণ বড়। জেরুজালেমের তালমুদ এর সহায়তা নিয়ে এটি রচনা করা হয়। খ্রিষ্টাব্দ ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যাবিলনের রাব্বিগণ কর্তৃক পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে। এই দ্বিতীয় তালমুদই বর্তমান বিশ্বে ইহুদিদের কাছে প্রচলিত। সাধারণভাবে তালমুদ বলতে এটাকেই বোঝানো হয়।
তালমুদ পরবর্তী ইহুদি আলেমগণ কর্তৃক সঙ্কলিত মাসআলাগুলোকে টোসেফটা (Tosefta) এবং মিদরাশ (Midrash) বলা হয়। তবে পরবর্তী এই সংকলনগুলো ইহুদি উলামা ও রাব্বিদের কাছে তালমুদ এর মতো সমাদৃত হয়নি।
📄 তালমুদের গোপনীয়তা
ইহুদিরা তালমুদের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে। এই গোপনীয়তার কারণ হলো এতে বিদ্যমান এমন কিছু আলোচনা যা মানবতার জন্য অমর্যাদাকর। পাশাপাশি এটি ইহুদিজাতিকে সমগ্র বিশ্বের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনে প্ররোচিত করে। এজন্য ইহুদি রাব্বিগণ সাধারণ ইহুদিদের থেকেও তালমুদকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন যাতে করে এর গোপনীয়তা লঙ্ঘন না হয়। ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি প্রশাসন প্রকাশ্যে এটি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়।
নিকোলাস ডনিন নামক এক ইহুদি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে পোপ নবম গ্রেগরির কাছে তালমুদ এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বসে এবং বলে যে, এই তালমুদে মসিহ এবং কুমারী মাতা মরিয়ম সম্পর্কে লাঞ্ছনাকর অশালীন মন্তব্য রয়েছে। সে আরও অভিযোগ করে, তালমুদ ইহুদিদেরকে উৎসাহ দেয় খ্রিষ্টানদের সাথে ধোঁকা ও প্রতারণামূলক আচরণ করতে। ১২৪২ খ্রিষ্টাব্দে তালমুদের কপিগুলো একত্র করা হয় এবং আগুনে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। ১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দে প্যারিসের ত্রিসীমানায় তালমুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পোপের পক্ষ থেকে ফরমান জারি করা হয়।²⁷⁶
মিশনার সবচেয়ে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় ইতালির পারমা (Parma) নগরীতে। এটি খ্রিষ্টাব্দ ত্রয়োদশ শতাব্দীর রচনা। ব্যাখ্যাসহ মিশনার প্রথম ছাপানো কপি প্রকাশিত হয় ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ইতালিতে।²⁷⁷ এরপর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভাষায় এটি অনূদিত হয়। ব্যাবিলনীয় তালমুদের মূল আরবি নুসখাটি ইসরাইল থেকে পুনর্মুদ্রণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গের মাঝে নামমাত্র মূল্যে বণ্টন করা হয়। এই কপিটি সাধারণ ইহুদিদের কাছেও পৌঁছতে দেওয়া হয়নি। অথচ তারা প্রতি বছর কিতাবুল মুকাদ্দাস তথা বাইবেলের লক্ষ লক্ষ কপি ছাপায় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ফ্রি বিতরণ করে।
টিকাঃ
২৭৫. ১২১২ মতান্তরে ১২১৫ খ্রিষ্টাব্দে সেন্ট ডমিনিক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পাদরিগণ।
২৭৬. কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১০৬-১০৭।
২৭৭. আল-আরব ওয়াল ইয়াহুদ ফিত তারিখ, পৃষ্ঠা: ১৭৫।