📄 ১। চাসিদিম (Chasidim)
এর শাব্দিক অর্থ হলো আনুগত্য। এরা ইহুদি জীবনাদর্শকে কঠোরভাবে মেনে চলে। নির্যাতনের সময়ও তাদের আত্মমর্যাদাবোধের কারণে তারা নামুস তথা মুসা আলাইহিস সালামের পুস্তকগুলিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। এদের মধ্য থেকেই ফরিশি (Pharisee) নামক আরেকটি দলের উদ্ভব ঘটে। ফরিশি আরামীয় ভাষার শব্দ। এর অর্থ হলো বিচ্ছিন্ন। এ উপদলটি নামুস এর বিধিবিধান অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলে।
ইহুদিদের এই দলটির সাথে অন্যান্য দলের চরম বিরোধ বিদ্যমান। বিশেষ করে সাদ্দুকিদের (Sadducees) সাথে। এরা দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ায় মানুষকে তাদের ধর্মে দীক্ষিত করার জন্য। যেমনটা মথির সুসমাচারে ত্রয়োবিংশ অধ্যায়ের পঞ্চদশ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে। খ্রিষ্টান লেখকগণ এদেরকে মুসলিমদের বিভ্রান্ত সম্প্রদায় মুতাজিলাদের সাথে তুলনা করে থাকেন।²⁵³ এদেরকে কে, কখন, কেন এই উপাধি দিয়েছিল তা জানা যায় না।
কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাসের লেখক মনে করেন এরা সম্রাট হিরকানাস (Hyrcanus) (১৩৫-১০৫ খ্রিষ্টপূর্ব) এর যুগ থেকে ফরিশি নামে পরিচিত হয়। হিরকানাস প্রথমদিকে এদের অনুসারী হলেও পরবর্তী সময়ে সাদ্দুকিদের সাথে যোগ দেন। সম্রাট হিরকানাসের পর তার ছেলে আলেকজান্ডার জান্নাইস (Alexander Jannaes) এদেরকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করে। তার মৃত্যুর পর ৭৮ খ্রিষ্টপূর্বে তার স্ত্রী আলেকজান্দ্রা সালোম (Alexandra Salome) সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ফরিশিদের পৃষ্ঠপোষকরূপে আবির্ভূত হন। ফলে ইহুদিদের ধর্মীয় জীবনে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এমনকি ধর্মীয় বিষয়ে তারা ইহুদিজাতির নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়।²⁵⁴
ফরিশিরা নিজেদের সম্প্রদায়ের সদস্যদেরকে ভাই, বন্ধু প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করে থাকে। এ ছাড়াও তারা যাজকবর্গ কর্তৃক রচিত তালমুদের অনুসারী হওয়ায় নিজেদেরকে যাজক উপাধিতে পরিচয় দিয়ে থাকে। এই ফরিশিগণ ৭৮ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত নিপীড়নের শিকার হয়। এরপর আলেকজান্ডার জান্নাইস এর স্ত্রী আলেকজান্দ্রা সালোম সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং তারা ধর্মীয় বিষয়ে নেতৃত্বের আসনে চলে আসে। এই উপদলটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিম্নে তুলে ধরা হলো।
এক. ধর্মীয় উৎস তথা ধর্মগ্রন্থ
এই সম্প্রদায়টি বিশ্বাস করে তাওরাত তার পঞ্চপুস্তকসহ অনাদী থেকে মাখলুক। এটি পবিত্র ফলকে লিপিবদ্ধ ছিল। অতঃপর ওহির মাধ্যমে এটি মুসা আলাইহিস সালামকে প্রদান করা হয়। সুতরাং পরবর্তীকালে এটিকে পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে, নতুন করে কিছু সৃষ্টি করা হয়নি। এরা মুখে মুখে প্রচলিত তাওরাতের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, নীতিসূত্র ও বিভিন্ন উপদেশ বাণীর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে। তাদের রাব্বিগণ মৌখিকভাবে প্রজন্মান্তরে এটি শিক্ষা দিয়ে থাকেন। তারা মনে করে এই অলিখিত বাণীগুলো লিখিত শরিয়তের সমমর্যাদা সম্পন্ন। বরং ক্ষেত্রবিশেষে অলিখিত শরিয়তই অধিক গুরুত্ব বহন করে। পূর্বপুরুষের অতিরঞ্জিত অন্ধ অনুসরণ এবং ঘৃণার কারণে এদের সম্পর্কে মথির সুসমাচারে বলা হয়েছে- তখন জেরুসালেম হইতে ফরীশীরা ও অধ্যাপকেরা যীশুর নিকটে আসিয়া কহিল, আপনার শিষ্যগণ কি জন্য প্রাচীনদের পরমপরাগত বিধি লঙ্ঘন করে? কেননা, আহার করিবার সময়ে তাহারা হাত ধোয় না। তিনি উত্তর করিয়া তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরাও তোমাদের পরমপরাগত বিধির জন্য ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন কর কেন? কারণ ঈশ্বর বলিয়াছেন, 'তুমি আপন পিতাকে ও আপন মাতাকে সমাদর করিও;' আর 'যে কেহ পিতার কি মাতার নিন্দা করে, তাহার প্রাণদণ্ড অবশ্য হইবে।' কিন্তু তোমরা বলিয়া থাক, যে ব্যক্তি পিতাকে কি মাতাকে বলে, 'আমা হইতে যাহা দিয়া তোমার উপকার হইতে পারিত, তাহা ঈশ্বরকে দত্তক দেওয়া হইয়াছে,' সে আপন পিতাকে বা আপন মাতাকে আর সমাদর করিবে না; এইরূপে তোমরা আপনাদের পরমপরাগত বিধির জন্য ঈশ্বরের বাক্য নিষ্ফল করিয়াছ।²⁵⁵ এই পরম্পরাগত অলিখিত বক্তব্যগুলো পরবর্তীতে তালমুদ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে বোঝা গেল যে ইহুদিদের এই দলটি মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়তকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে থাকে। তারা পরম্পরাগত বিধান মেনে চলে এবং তাদের যাজকগণের কাছ থেকে কিতাবুল মুকাদ্দাসের ব্যাখ্যা গ্রহণ করে থাকে।
দুই. মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস
১। এই সম্প্রদায়টি আখেরাত, ফেরেশতা, পুনরুত্থান প্রভৃতিতে বিশ্বাস করে। এদের অধিকাংশি অনাড়ম্বর ও সন্ন্যাস জীবনযাপন করে। বিয়ে করে না। তবে তাদের অস্তিত্ব ও বংশধারা টিকিয়ে রাখার জন্য পালক পুত্র গ্রহণ করে থাকে।
২। এরা আত্মার চিরন্তন হওয়ায় বিশ্বাসী।
৩। এরা রাব্বিগণকে নিষ্পাপ মনে করে। তাদেরকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্পণ করে থাকে। রাব্বিদের কথাকে ঐশীবাণী বিবেচনা করে। এমনকি তাদেরকে সৃষ্টিকর্তার ন্যায় ভয় করে। এ প্রসঙ্গে তালমুদে বলা হয়েছে— 'বিশ্বাসীদের কর্তব্য হলো রাব্বিদের কথাকে শরিয়তের সমান বিবেচনা করা। কেননা, তাদের বক্তব্য হলো আল্লাহ তাআলার জীবন্ত বাণী। যদি কোনো রাব্বি তার ডান হাতকে বাম হাত বলে কিংবা বাম হাতকে ডান হাত বলে তাহলে সেটাই বিশ্বাস করবে। তার সাথে তর্ক করবে না।' এদিকে ইঙ্গিত করেই কুরআনে বলা হয়েছে— ٱتَّخَذُوا أَحْبারَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ ٱللَّهِ (তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে। [সুরা তাওবাহ, আয়াত: ৩১]) এজন্যই তারা ইজতিহাদের কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না। কেননা, প্রত্যেক প্রশ্নের জবাব নিষ্পাপ ও পবিত্র রাব্বিদের কাছেই রয়েছে।
এই দলটি মসিহ আলাইহিস সালামের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল। তার দণ্ডাদেশের ব্যাপারে রাজকীয় ফরমান জারি করার জন্য এরাই চেষ্টা চালিয়েছিল। তাকে হত্যার জন্য হীন ষড়যন্ত্র পাকিয়েছিল এরাই। এমনকি গুপ্তহত্যার চেষ্টাও তারা বাকি রাখেনি। এই দলটির গোড়াপত্তন কখন হয়েছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মতটি ইহুদি ঐতিহাসিক জোসেফাইন (মৃ. ৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'এ সম্প্রদায়টি জোনাথন এর যুগে সংগঠিত হয়। জোনাথন ছিলেন দাউদ আলাইহিস সালামের অন্তরঙ্গ বন্ধু।'
টিকাঃ
২৫৩. আদইয়ানুল আলম, পৃষ্ঠা: ২০৫।
২৫৪. আল-কামুস, পৃষ্ঠা: ৬৭৪
২৫৫. মথি, অধ্যায়: ১৫, অনুচ্ছেদ: ১-৬।
📄 ৪। সামেরাহ
এরা বনি ইসরাইল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটি ইহুদি উপদল। এদের নিজস্ব ইবাদত গৃহ রয়েছে। যোসেফাস বলেন, 'প্রধান যাজক ইয়াদু এর ভাই মনঃশি এক ভিনদেশি রমণীকে বিয়ে করে। তখন জেরুযালেমের প্রবীণ শায়খগণ তাকে দুটো সুযোগ দেন। হয়তো স্ত্রীকে তালাক দেবে নতুবা সে বলিদান এর জন্য নির্ধারিত পবিত্র স্থানে আসতে পারবে না। তখন মনঃশি অত্যন্ত প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীকে তালাক দিতে মনস্থ করে। এ সময় তার শ্বশুর এগিয়ে আসেন। তিনি মনঃশিকে প্রস্তাব দেন যাতে স্ত্রীকে তালাক না দেয়। তিনি জেরুজালেমের বিপরীতে আরেকটি ইবাদতগৃহ নির্মাণ করে দেবেন। মনঃশি রাজি হয়ে যায়। অতঃপর তার জন্য গেরিজিম পর্বতে একটি হাইকল নির্মাণ করা হয়। এই হলো সামেরাহ সম্প্রদায়ের আলাদা ইবাদতগৃহের রহস্য।²⁶⁴
এভাবেই ইহুদিদের এই সম্প্রদায়টি জেরুজালেম থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে যায়। তারা বলে থাকে, আল্লাহ তাআলা দাউদ আলাইহিস সালামকে নাবলুস পর্বতে বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেটা ছিল মূলত তুর পর্বত যেখানে আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলেছেন। কিন্তু দাউদ সেটাকে পরিবর্তন করে ইলিয়াতে নির্মাণ করেন। এতে করে তিনি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছেন।²⁶⁵
এরা আরও বলে থাকে, তাওরাতে শুধু একজন নবির আগমনের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। যিনি মুসা আলাইহিস সালামের পরে আগমন করবেন। তাওরাতকে সত্যায়ন করবেন। তাওরাত অনুযায়ী ফয়সালা করবেন। সামেরাহতে উলফান নামক এক ব্যক্তির আবির্ভাব হয়। সে নবুওয়াত দাবি করে বসে। তার দাবি ছিল সে-ই হলো মুসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক প্রতিশ্রুত নবি। এরপর সামেরাহ সম্প্রদায় দুটি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি হলো দোস্তানিয়া অপরটি হলো কোস্তানিয়া। দোস্তানিয়া শব্দের অর্থ হলো বিচ্ছিন্ন মিথ্যুকদের দল। আর কোস্তানিয়া শব্দের অর্থ হলো সত্যবাদীদের দল। এরা আখিরাত প্রতিদান, সওয়াব ও শাস্তিকে বিশ্বাস করে। তবে দোস্তানিয়ারা মনে করে প্রতিদান ও শাস্তি শুধু এই দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ।
আল-বেরুনি (মৃ. ৪৪০ হিজরি মেতাবেক ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) মনে করেন, এই সামেরাহ সম্প্রদায়ের লোকেরাই বুখতেনসরকে ইহুদিদের গোপনীয়তা সম্পর্কে অবহিত করেছিল। যার ফলে বুখতেনসর তাদেরকে সহজেই হত্যা ও বন্দী করতে সক্ষম হয়। কিন্তু সে সামেরাহ সম্প্রদায়ের কাউকে স্পর্শও করেনি।²⁶⁶ ইহুদিদের অন্যান্য সম্প্রদায়ের তুলনায় এদের সংখ্যা খুবই নগণ্য।²⁶⁷
টিকাঃ
২৬৪. কামুসুল কিতাবুল মুকাদ্দাস, পৃষ্ঠা: ২৫৮, এই হাইকলটি নির্মিত হয়েছিল ৪৩২ খ্রিষ্টপূর্বে ফিলিসতিনে।
২৬৫. আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৫৮
২৬৬. আল-আছারুল বাকিয়াহ ফিল কুরুনিল খালিয়াহ, পৃষ্ঠা: ২১।
২৬৭. বিস্তারিত দেখুন: তারিখুল ইয়াহুদ, মাকরিজি (৭৬৬-৮৪৫ হিজরি)।