📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 আলোচনার সারনির্যাস

📄 আলোচনার সারনির্যাস


তাওরাত সম্পর্কে এই আলোচনার পর আমরা নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তসমূহে উপনীত হতে পারি।
১। তাওরাত এর প্রথম সংকলন সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো তথ্য জানা যায় না।
২। প্রতিবার ধ্বংস ও হারিয়ে যাওয়ার পর তাওরাতকে নতুনভাবে সংকলন করা হয়। কিন্তু এই সংকলনকর্ম সাধন করতে গিয়ে সংকলকদের সামনে কোনো সুনির্ধারিত নীতিমালা ছিল না।
৩। প্রথমদিকে তাওরাতের অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ থাকলেও কাল পরিক্রমায় বারবার এটি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় এর ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ণ হয়।
৪। ইহুদিদের প্রত্যেকটি গ্রুপ তাওরাতের মধ্যে নিজেদের মত ও চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
৫। তাওরাত প্রথমে হিব্রু ভাষায় লিখিত ছিল। এরপর এটিকে আরামীয় ও গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করা হয় এবং এই অনুবাদগুলোতে যথেষ্ট বিকৃতি সাধন করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরামীয় অনুবাদকে সামনে রেখেই অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়।
৬। বনি ইসরাইল ইসমাইলের বংশধরদের হিংসার চোখে দেখত। তাই তারা তাওরাতে ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশধরদের ব্যাপারে অযাচিত মন্তব্য জুড়ে দিয়েছে। তারা এদের সম্পর্কে ‘গাবিম’ (الغويم) শব্দ ব্যবহার করে। হিব্রু ভাষার এই শব্দটি থেকে তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে চতুষ্পদ জন্তু। তাদের দৃষ্টিতে ইহুদি ছাড়া পৃথিবীর আর সব জাতি হলো চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়।

তাওরাত সম্পর্কিত আলোচনা আমরা সুহাইল মিখাইল ডেভ এর বক্তব্য দিয়ে শেষ করছি। তিনি বলেন, 'তাওরাতের লেখকগণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইহুদিদেরকে ভয়ংকর সব শিক্ষাদীক্ষার অনুগামী করা। পাশাপাশি ইহুদিজাতিকে সামরিক ধাঁচে গড়ে তোলা যাতে করে তারা শত্রুদের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনে সক্ষম হয়। একইভাবে তাওরাত তার অনুসারীদের অন্তরে শত্রুদের প্রতি চিরস্থায়ীভাবে হিংসা জাগিয়ে তোলার কাজ করে। কেননা, এই শত্রুদের কারণেই তারা জুলুমের শিকার হয়েছে, গৃহহীন হয়েছে এমনকি পবিত্র ভূমিতেও তারা স্থায়ী হতে পারেনি। তাদের প্রধান শত্রু হলো ভূমধ্যসাগরের পশ্চিমে বসবাস করা কানানি, ফিনিশীয়, ইদোমি প্রভৃতি অ-ইহুদি জাতিসত্তাগুলো।'

দ্বিতীয় বিবরণে বলা হয়েছে—
আর তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার হস্তে যে সমস্ত জাতিকে সমর্পণ করিবেন, তুমি তাহাদিগকে কবলিত করিবে; তোমার চক্ষু তাহাদের প্রতি দয়া না করুক, এবং তুমি তাহাদের দেবগণের সেবা করিও না, কেননা, তাহা তোমার ফাঁদস্বরূপ।[২৫০]

একই পুস্তকে বলা হয়েছে—
তুমি যে দেশ অধিকার করিতে যাইতেছ, সেই দেশে যখন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমাকে লইয়া যাইবেন ও তোমার সম্মুখ হইতে অনেক জাতিকে, হিত্তীয়, গির্গাশীয়, ইমোরীয়, কনানীয়, পরিষীয়, হিব্বীয় ও যিবৃষীয়, তোমা হইতে বৃহৎ ও বলবান এই সাত জাতিকে দূর করিবেন।[২৫১]

আরও বলা হয়েছে—
কেননা, তুমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর পবিত্র প্রজা; ভূতলে যত জাতি আছে, সেই সকলের মধ্যে আপনার নিজস্ব প্রজা করিবার জন্য তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমাকেই মনোনীত করিয়াছেন।[২৫২]

এই হলো তাওরাতের কিছু অনুচ্ছেদ যেগুলো মানবজাতিকে সমষ্টিগতভাবে হত্যার নির্দেশ দেয় এবং পুনঃপুন পৃথিবীর বুকে ইহুদিদের কর্তৃত্ব স্থাপনের আদেশ প্রদান করতে থাকে। ইহুদিদের সিনাগগগুলোতে এই নির্দেশনাবলি প্রতিদিন পাঠ করা হয়।

বাস্তবতা এটাই যে, বর্তমানে তাদের কাছে বিদ্যমান এই তাওরাত মুসা আলাইহিস সালামের তাওরাত নয়। এখানে তারা তাদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। নতুবা কীভাবে সম্ভব তাওরাতে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদেরকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হবে! অথচ দশ আজ্ঞার সারমর্ম এই হত্যা আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।

টিকাঃ
[২৫০] দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ১৬।
[২৫১] দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ১।
[২৫২] দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ৬।

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 খ্রিস্টধর্মে ইহুদি পোলের প্রভাব এবং তাওহিদ (একত্ববাদ) থেকে পৌত্তলিকতার দিকে যাত্রা

📄 খ্রিস্টধর্মে ইহুদি পোলের প্রভাব এবং তাওহিদ (একত্ববাদ) থেকে পৌত্তলিকতার দিকে যাত্রা


অন্যান্য নবিদের মতো মসিহ আলাইহিস সালামও নির্ভেজাল তাওহিদের দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া হাওয়ারি ও শিষ্যগণও এই তাওহিদের ওপরেই অটল ছিলেন। এরপর পোল খ্রিষ্টধর্মে প্রবেশ করেন। খ্রিষ্টধর্মে প্রবেশের পূর্বে তিনি ছিলেন খ্রিষ্টানদের কট্টর বিরোধী ফরিশি ইহুদিদের একজন। তিনি তারসুস (TARSUS)-এ জন্মগ্রহণ করেন এবং জেরুযালেমে বেড়ে ওঠেন। তার প্রকৃত নাম ছিল সৌল।[৪০৬]

এই কট্টর ইহুদি মসিহ আলাইহিস সালামের শিষ্য কিংবা সহচর ছিলেন না। এমনকি জীবনে তিনি মসিহ আলাইহিস সালামকে কখনো দেখেনওনি। মসিহ আলাইহিস সালামের কোনো নসিহত শোনারও সুযোগ তার হয়নি। প্রেরিতদের কার্যবিবরণীতে তিনি নিজেই এ কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী জেরুজালেম থেকে তিনি দামেশকে সফর করছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, খ্রিষ্টানদেরকে ধরে এনে জেলে দেওয়া। তার নিজস্ব কিছু স্বীকারোক্তি নিম্নে তুলে ধরা হলো।

১। “সেই দিন যিরূশালেমস্থ মণ্ডলীর প্রতি বড়ই তাড়না উপস্থিত হইল, তাহাতে প্রেরিতবর্গ ছাড়া অন্য সকলে যিহূদীয়ার ও শমরিয়ার জনপদে ছিন্নভিন্ন হইয়া পড়িল। আর কয়েক জন ভক্ত লোক স্তিফানের কবর দিলেন, ও তাঁহার নিমিত্ত মহাবিলাপ করিলেন। কিন্তু শৌল মণ্ডলীর উচ্ছেদ সাধন করিতে লাগিলেন, ঘরে ঘরে প্রবেশ করিয়া পুরুষ ও স্ত্রীলোকদিগকে টানিয়া আনিয়া কারাগারে সমর্পণ করিতে লাগিলেন।”[৪০৭]
২। "তোমরা ত যিহূদী-ধর্মে আমার পূর্বকার আচার ব্যবহারের কথা শুনিয়াছ; আমি ঈশ্বরের মণ্ডলীকে অতিমাত্র তাড়না করিতাম ও তাহা উৎপাটন করিতাম; আর পরম্পরাগত পৈতৃক রীতিনীতি পালনে অতিশয় উদ্যোগী হওয়াতে আমার স্বজাতীয় সমবয়স্ক অনেক লোক অপেক্ষা যিহূদী-ধর্মে উত্তর উত্তর অগ্রসর হইতেছিলাম।”[৪০৮]
৩। "শৌল তখনও প্রভুর শিষ্যদের বিরুদ্ধে ভয় প্রদর্শন ও হত্যার নিশ্বাস টানিতেছিলেন; তিনি মহাযাজকের নিকটে গিয়া, দম্মেশকস্থ সমাজ সকলের প্রতি পত্র যাজ্ঞা করিলেন, যেন সেই পথাবলম্বী পুরুষ ও স্ত্রী যে সমস্ত লোককে পান, তাঁহাদিগকে বাঁধিয়া যিরূশালেমে আনিতে পারেন।”[৪০৯]
৪। “ভ্রাতারা ও পিতারা, আমি এক্ষণে আপনাদের কাছে আত্মপক্ষ সমর্থন করিতেছি, শ্রবণ করুন। তখন তিনি ইব্রীয় ভাষায় তাহাদের কাছে কথা কহিতেছেন শুনিয়া তাহারা আরও শান্ত হইল। পরে তিনি কহিলেন, আমি যিহূদী, কিলিকিয়ার তার্ষ নগরে আমার জন্ম; কিন্তু এই নগরে গমলীয়েলের চরণে মানুষ হইয়াছি, পৈতৃক ব্যবস্থার সূক্ষ্ম নিয়মানুসারে শিক্ষিত হইয়াছি; আর আপনারা সকলে অদ্যাপি যেমন আছেন, তেমনি আমিও ঈশ্বরের পক্ষে উদ্যোগী ছিলাম। আমি প্রাণনাশ পর্যন্ত এই পথের প্রতি উপদ্রব করতাম, পুরুষ ও স্ত্রীলোকদিগকে বাঁধিয়া কারাগারে সমর্পণ করতাম। এই বিষয়ে মহাযাজক ও সমস্ত প্রাচীনবর্গও আমার সাক্ষী; তাঁহাদের নিকট হইতে আমি ভ্রাতৃগণের সমীপে পত্র লইয়া, দম্মেশকে যাত্রা করিয়াছিলাম; যাহারা তথায় ছিল, তাঁহাদিগকেও বাঁধিয়া যিরূশালেমে আনিার জন্য গিয়াছিলাম, যেন তাঁহাদের দণ্ড হয়।”[৪১০]

খ্রিষ্টানদের ওপর জুলুম, হত্যা ও ধাওয়া করাটাই ছিল এই ইহুদির চরিত্র। এতসত্ত্বেও যখন খ্রিষ্টান বিশ্বাসীদের অন্তর থেকে তিনি ধর্মের মূলোৎপাটন করতে পারলেন না তখন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করলেন। তার এই নতুন কৌশলে খ্রিষ্টানদের ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে গেল।

তিনি কোনো ধরনের পূর্ব আলোচনা ছাড়াই আকস্মিক খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ঘোষণা দিয়ে বসেন। নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন, “আর যাইতে যাইতে দম্মেশকের নিকটে উপস্থিত হইলে বেলা দুই প্রহরের সময়ে হঠাৎ আকাশ হইতে মহা আলো আমার চারিদিকে চমকিয়া উঠিল। তাহাতে আমি ভূমিতে পড়িয়া গেলাম, ও শুনিলাম, এক বাণী আমাকে বলিতেছে, শৌল, শৌল, কেন আমাকে তাড়না করিতেছ? আমি উত্তর করিলাম, প্রভু, আপনি কে? তিনি আমাকে কহিলেন, আমি নাসরতীয় যীশু, যাঁহাকে তুমি তাড়না করিতেছ। আর যাহারা আমার সঙ্গে ছিল, তাহারা সেই আলো দেখিতে পাইল বটে, কিন্তু যিনি আমার সহিত কথা কহিতেছিলেন, তাঁহার বাণী শুনিতে পাইল না। পরে আমি বলিলাম, প্রভু, আমি কি করিব? প্রভু আমাকে কহিলেন, উঠিয়া দম্মেশকে যাও, তোমাকে যাহা যাহা করিতে হইবে বলিয়া নিরূপিত আছে, সে সমস্ত সেখানেই তোমাকে বলা যাইবে। পরে আমি সেই আলোর তেজে দৃষ্টিহীন হওয়াতে আমার সঙ্গীরা হাত ধরিয়া আমাকে লইয়া চলিল, আর আমি দম্মেশকে উপস্থিত হইলাম।”[৪১১]

পোলের খ্রিষ্টধর্মে প্রবেশ সম্পর্কে লুক বলেন, “পরে তিনি যাইতে যাইতে দম্মেশকের নিকট উপস্থিত হইলেন, তখন হঠাৎ আকাশ হইতে আলোক তাঁহার চারিদিকে চমকিয়া উঠিল। তাহাতে তিনি ভূমিতে পড়িয়া শুনিলেন, তাঁহার প্রতি এই বাণী হইতেছে, শৌল, শৌল, কেন আমাকে তাড়না করিতেছ? তিনি কহিলেন, প্রভু, আপনি কে? প্রভু কহিলেন, আমি যীশু, যাঁহাকে তুমি তাড়না করিতেছ; কিন্তু উঠ, নগরে প্রবেশ কর, তোমাকে কি করিতে হইবে, তাহা বলা যাইবে। আর তাঁহার সহপথিকেরা অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, তাহারা ঐ বাণী শুনিল বটে, কিন্তু কাহাকেও দেখিতে পাইল না। পরে শৌল ভূমি হইতে উঠিলেন, কিন্তু চক্ষু মেলিলে পর কিছুই দেখিতে পাইলেন না; আর তাহারা তাঁহার হস্ত ধরিয়া তাঁহাকে দম্মেশকে লইয়া গেল। আর তিনি তিন দিন পর্যন্ত দৃষ্টিহীন থাকিলেন, এবং কিছুই ভোজন কি পান করিলেন না।”[৪১২]

এই ঘটনা বর্ণনার শেষে লুক এমন একটি বাক্য জুড়ে দিয়েছেন যা খ্রিষ্টধর্মের ইতিহাসের গতিপথকে পুরোই পাল্টে দিয়েছে। সেই বাক্যটি হলো, "এবং অমনি সমাজ-গৃহে যীশুকে এই বলিয়া প্রচার করিতে লাগিলেন যে, তিনিই ঈশ্বরের পুত্র। আর যাহারা তাঁহার কথা শুনিল, তাহারা সকলে চমৎকৃত হইল, বলিতে লাগিল, এ কি সেই ব্যক্তি নয়, যে, এই নামে যাহারা ডাকে, তাহাদিগকে যিরূশালেমে উৎপাটন করিত, এবং এখানে এই জন্যই আসিয়াছিল, যেন তাহাদিগকে বন্ধন করিয়া প্রধান যাজকদের নিকটে লইয়া যায়?”[৪১৩]

পোলের দাওয়াত মসিহ আলাইহিস সালামের শিষ্য এবং হাওয়ারিদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। পোলের বক্তব্য এবং তার দাওয়াতি কার্যক্রমকে তারা সন্দেহের চোখে দেখতেন। ফরাসি বিজ্ঞানী ড. মরিস বুকাইলি বলেন, “পোলকে খ্রিষ্টবাদের বিশ্বাসঘাতক বিবেচনা করা হয়। জ্যাক (Jacques)[৪১৪] এর সাথে আল-কুদসে অবস্থানরত মসিহের পরিবার ও সহচরবৃন্দ তাকে এই বিশেষণে অভিযুক্ত করেছে। কেননা, পোল খ্রিষ্টবাদকে গঠন করতে গিয়ে ওই সমস্ত ব্যক্তিবর্গকে খরচের খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন, যাদেরকে মসিহ স্বীয় শিক্ষার প্রচার-প্রসারে নিজের পাশে জড়ো করেছিলেন। যেহেতু পোল জীবদ্দশায় মসিহকে দেখেননি তাই নিজের প্রেরিত হওয়ার দাবিকে আইনসিদ্ধ করতে গিয়ে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, কবর থেকে উত্থানের পর দামেস্কের পথে মসিহ তার সামনে প্রকাশিত হয়েছিলেন।[৪১৫]

জার্মান গবেষক আর্নেস্ট ডি যোনা তার আল-ইসলাম (দি ইসলাম) নামক গ্রন্থে বলেন, “ক্রুশ এবং যীশুর আত্মোৎসর্গকরণের ঘটনা পোল এবং তার মতো কপট ব্যক্তিদের বানানো বর্ণনা।”

মুhammad যকিউদ্দিন আন-নাজ্জার (যিনি খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। পরবর্তী সময় ইসলামে দীক্ষিত হন।) তার বিরচিত গ্রন্থ আল-ইসলামু নাওয়ারাল আকওয়ান (ইসলাম বিশ্বকে আলোকিত করেছে)-এ বলেন-
“ইহুদিদের একটি আশ্চর্যজনক কাজ এই যে, সৌল নামক তাদের এক পাপিষ্ট ব্যক্তি খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। বিশ্বাসীদের হত্যা করে। হাওয়ারিদের কষ্ট দেয়। এত জুলুম নির্যাতনের পরও যখন খ্রিষ্টানদের বিনাশ সম্ভব হচ্ছিল না, বিশ্বাসীদের তাদের বিশ্বাস থেকে ফিরিয়ে আনা যাচ্ছিল না তখন তিনি এমন একটি কৌশলের আশ্রয় নিলেন যা তাদের ধর্মের ভিত্তিটাই ধ্বসিয়ে দিয়েছিল। তিনি নিজেকে মসিহের অনুসারী দাবি করেন। সবার কাছে পোল নামে পরিচিত হন। এরপর আকিদাগত বিভ্রান্তি ছড়িয়ে মানুষকে পথহারা করেন। এটি প্রেরিতদের কার্যবিবরণী পুস্তকের বর্ণনা।[৪১৬] অথচ একই সময়ে তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মসিহ সম্পর্কে নসিহত করতে গিয়ে বলতেন, তিনি আল্লাহর পুত্র।[৪১৭]

পোলের খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ব্যাপারে শিষ্যগণ সন্দেহ করতেন। কারণ, তার কাছ থেকে দ্বিমুখী কর্মকাণ্ড প্রকাশ পেত। এ ছাড়াও ইতিপূর্বে তিনি খ্রিষ্টানদের নির্যাতন করেছিলেন। তাদেরকে ধরে ধরে রোমান প্রশাসনের হাতে ন্যস্ত করেছিলেন। এরপর আকস্মিক খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। তথাপি বরনাবা তাদেরকে পোলের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছিলেন এবং তিনি কীভাবে পথিমধ্যে প্রভুর দর্শন লাভ করেছেন তার বর্ণনাও দিয়েছিলেন। তখন থেকে বরনাবার পৃষ্ঠপোষকতায় পোল খ্রিষ্টবাদের দাওয়াতের জন্য একটি কার্যকরী শক্তি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে পোলের বিদআত ও কুসংস্কারের বিরক্ত হয়ে বরনাবাও তার সঙ্গ ত্যাগ করেন।

বরনাবা তার সুসমাচারে উল্লেখ করেন যে, "যারা মসিহের শিক্ষার প্রচারের নামে মারাত্মক পর্যায়ে কুফুরি শিক্ষার প্রচারণা চালায় তারা তাকওয়া ও ঈমানহীন। এরা মসিহকে আল্লাহর পুত্র বলে। আল্লাহর বিধান খৎনাকে অস্বীকার করে। সব ধরনের মাংস হালাল মনে করে। এসব পথভ্রষ্টদের মধ্যে একজন হলেন পোল।”[৪১৮]

একইভাবে প্রধান হাওয়ারি পিতরও তার দ্বিতীয় পত্রে পোলের দাওয়াতের বিরোধিতা করেন। সেখানে তিনি বলেন, “অতএব, প্রিয়তমেরা, তোমরা যখন এই সকলের অপেক্ষা করিতেছ, তখন যত্ন কর, যেন তাঁহার কাছে তোমাদিগকে নিষ্কলঙ্ক ও নির্দোষ অবস্থায় শান্তিতে দেখিতে পাওয়া যায়! আর আমাদের প্রভুর দীর্ঘসহিষ্ণুতাকে পরিত্রাণ জ্ঞান কর; যেমন আমাদের প্রিয় ভ্রাতা পৌলও তাঁহাকে দত্ত জ্ঞান অনুসারে তোমাদিগকে লিখিয়াছেন, আর যেমন তাঁহার সকল পত্রেও এই বিষয়ের প্রসঙ্গ করিয়া তিনি এই প্রকার কথা কহেন; তাহার মধ্যে কোনো কোনো কথা বুঝা কষ্টকর; অজ্ঞান ও চঞ্চল লোকেরা যেমন অন্য সমস্ত শাস্ত্রলিপি, তেমনি সেই কথাগুলিরও বিরূপ অর্থ করে, আপনাদেই বিনাশার্থে করে।”

টিকাঃ
[৪০৬] পোলের জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না; শুধু বিভিন্ন চিঠিপত্রে তিনি নিজে যা বলেছেন তা-ই একমাত্র সম্বল।
[৪০৭] প্রেরিত, অধ্যায় ৮, অনুচ্ছেদ: ১-৩।
[৪০৮] গালাতিয়, অধ্যায় ৮, অনুচ্ছেদ: ১৩-১৪।
[৪০৯] প্রেরিত, অধ্যায়: ৯, অনুচ্ছেদ: ১-৩।
[৪১০] প্রেরিত, অধ্যায়: ২২, অনুচ্ছেদ: ১-৬।
[৪১১] প্রেরিত, অধ্যায়: ২২, অনুচ্ছেদ: ৭-১১।
[৪১২] প্রেরিত, অধ্যায়: ৯, অনুচ্ছেদ: ৪-৯।
[৪১৩] প্রেরিত, অধ্যায়: ৯, অনুচ্ছেদ: ২০-২১।
[৪১৪] জ্যাক ছিলেন মসিহরে আত্মীয়। ৭০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি খ্রিষ্টানদের নেতা হয়েছিলেন।
[৪১৫] দিরাসাতুল কুতুবিল মুকাদ্দাসাহ, পৃষ্ঠা: ৭৩।
[৪১৬] প্রেরিত, অধ্যায়: ৯, অনুচ্ছেদ: ২০।
[৪১৭] আন-নাসরানিয়্যাহ ওয়াল-ইসলাম, পৃষ্ঠা: ২৭৩।
[৪১৮] বরনাবার সুসমাচারের ভূমিকা, পৃষ্ঠা: ৩-৭।

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 ঈসা আলাইহিস সালামের ইনজিল

📄 ঈসা আলাইহিস সালামের ইনজিল


আমরা মুসলিমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আল্লাহ তাআলা নবি ঈসা আলাইহিস সালামের ওপর একটি গ্রন্থ নাজিল করেছেন। নাম ইনজিল।[৫০৩] অর্থাৎ সুসমাচার বা ভবিষ্যদ্বাণী। ঈসা আলাইহিস সালাম শহর-গ্রামে ঘুরে ঘুরে মানুষকে এই সুসংবাদ জানাতেন। বিদ্যমান সুসমাচারগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ঈসা আলাইহিস সালামের নিকট একটি ইনজিল বা সুসমাচার ছিল। যেমন মথির সুসমাচারে বলা হয়েছে, 'পরে যীশু সমুদয় গালীলে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন; তিনি লোকদের সমাজ-গৃহে উপদেশ দিলেন, রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করিলেন, এবং লোকদের সর্বপ্রকার রোগ ও সর্বপ্রকার পীড়া ভাল করিলেন।[৫০৪] এখানে রাজ্যের সুসমাচার শব্দটি ইনজিল শব্দের ভাবানুবাদ।

মার্কের সুসমাচারে বলা হয়েছে, 'আর যোহন কারাগারে সমর্পিত হইলে পর যীশু গালীলে আসিয়া ঈশ্বরের সুসমাচার প্রচার করিয়া বলিতে লাগিলেন, 'কাল সম্পূর্ণ হইল, ঈশ্বরের রাজ্য সন্নিকট হইল; তোমরা মন ফিরাও, ও সুসমাচারে বিশ্বাস কর।'[৫০৫] সন্দেহ নেই যে, মথি ও মার্ক কর্তৃক ওপরে বর্ণিত সুসমাচারটি প্রচলিত সুসমাচারগুলোর চেয়ে ভিন্ন। এটি বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ তথা মার্ক, যোহন, মথি, লুক প্রমুখের দিকে সম্বন্ধিত সুসমাচারগুলো নয়। এটি এমন এক ইনজিল বা সুসমাচার যা ঈসা আলাইহিস সালামের কাছেই বিদ্যমান ছিল। তিনি গ্রামে-গঞ্জে মানুষকে ইনজিলের দাওয়াত দিতেন। সুসমাচারগুলোর লেখকগণ মসিহ আলাইহিস সালামের ইনজিল থেকে কিছু অংশ নিজেদের সুসমাচারে অন্তর্ভুক্ত করেছেন এমনটিও অসম্ভব নয়। এর মাধ্যমে মূলত তারা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়েছেন।

ঈসা আলাইহিস সালামের ইনজিলের অস্তিত্বের ব্যাপারে কুরআনের পর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো পোলের চিঠির নিম্নোক্ত বাক্যটি, যেখানে বলা হয়েছে, 'প্রথমতঃ আমি যীশু খ্রীষ্ট দ্বারা তোমাদের সকলের জন্য আমার ঈশ্বরের ধন্যবাদ করিতেছি যে, তোমাদের বিশ্বাস সমস্ত জগতে ঘোষিত হইতেছে। কারণ ঈশ্বর, যাঁহার আরাধনা আমি আপন আত্মাতে তাঁহার পুত্রের সুসমাচারে করিয়া থাকি, তিনি আমার সাক্ষী যে, আমি নিরন্তর তোমাদের নাম উল্লেখ করিয়া থাকি।'[৫০৬]

একইভাবে করিন্থিয়বাসীদের প্রতি লিখিত প্রথম পত্রে তিনি বলেন, 'যদি তোমাদের উপরে কর্তৃত্ব করিবার অন্য লোকদের অধিকার থাকে, তবে আমাদের কি আরও অধিকার নাই? তথাপি আমরা এই কর্তৃত্ব ব্যবহার করি নাই, বরং সকলই সহ্য করিতেছি, যেন খ্রীষ্টের সুসমাচারের কোনো বাধা না জন্মাই।'[৫০৭]

তিনি আরও বলেন, 'সেইরূপে প্রভু সুসমাচার প্রচারকদের জন্য এই বিধান করিয়াছেন যে, তাহাদের উপজীবিকা সুসমাচার হইতে হইবে।'[৫০৮]

তিনি অন্যত্র বলেন, 'আমি সকলই সুসমাচারের জন্য করি, যেন তাঁহার সহভাগী হই।'[৫০৯]

এই বাক্যগুলো আমরা খ্রিষ্টানদের কাছে বিদ্যমান সুসমাচারগুলো থেকে উদ্ধৃত করেছি। এই নামটি (ইনজিল বা সুসমাচার) সেগুলোতে বারবার উল্লিখিত হয়েছে।[৫১০] এই সুসমাচারটি নিশ্চিতভাবে বিদ্যমান সুসমাচারগুলোর কোনোটিই নয়। এগুলোর প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট লেখকের দিকে সম্বন্ধিত সুসমাচার। বর্তমানে ঈসা আলাইহিস সালামের ইনজিল বা সুসমাচারের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ একটি সংক্ষিপ্ত চিঠির কথা স্বীকার করেছেন, যেটাতে মসিহ আলাইহিস সালামের অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছিল। এটিই ছিল প্রকৃত ইনজিল বা সুসমাচার। তবে এটি ছিল ওই সমস্ত ব্যক্তিবর্গের জন্য যারা মসিহ আলাইহিস সালামের বাণী নিজ কর্ণে শোনেননি। তার অবস্থা নিজ চোখে দেখেননি। বলা যায়, এই চিঠিটিই ছিল মূল, যেখানে খ্রিষ্টানদের অবস্থা ধারাবাহিকভাবে লিখিত ছিল।[৫১১] কিন্তু এই চিঠিটি হারিয়ে গেছে কিংবা ইচ্ছাকৃত নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, যাতে করে চিঠিটি মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্ব এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তকে অস্বীকার করার ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণস্বরূপ খাড়া করা না যায়।

সুসমাচারসমূহ, সেগুলোর লেখক আর বিষয়বস্তু নিয়ে পর্যালোচনার পর আমরা স্পষ্টভাবে বলতে পারি, এই শিক্ষা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেনি। কেননা, তিনি কখনোই শিরকের আদেশ দিতে পারেন না। আল্লাহর মনোনীত দ্বীন হচ্ছে তাওহিদের দ্বীন। সমস্ত নবি-রাসুলকে তিনি তাওহিদ-প্রচারের জন্য প্রেরণ করেছেন। তারপরও খ্রিষ্টানরা দাবি করে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে! আমরা মুসলিমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মসিহ আলাইহিস সালাম বনি ইসরাইলের একজন রাসুল ছিলেন। তার ওপর ইনজিল অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁকে হত্যা করা হয়নি। শূলেও চড়ানো হয়নি। বরং তাদের কাছে ঈসা আলাইহিস সালামের সাদৃশ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন,

مَا الْمَسِيحُ ابْنُ মَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ انظُرْ كَيْفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ الْآيَاتِ ثُمَّ انظُرْ أَنَّى يُؤْفَكُونَ

মারইয়াম-তনয় মসিহ রাসুল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে অনেক রাসুল অতিক্রান্ত হয়েছেন। আর তার জননী একজন সত্যবাদী নারী। তাঁরা উভয়েই খাদ্য ভক্ষণ করতেন। দেখুন, আমি তাদের জন্যে কীরূপ যুক্তি- প্রমাণ বর্ণনা করি, আবার দেখুন, তারা কী ভুলে ঘুরপাক খাচ্ছে। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ৭৫]

অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন,

وَقَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِم بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَآتَيْنَاهُ الإِنجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِينَ.

আমি তাদের পেছনে মারইয়াম-তনয় ঈসাকে প্রেরণ করেছি। তিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তাওরাতের সত্যায়নকারী ছিলেন। আমি তাঁকে ইনজিল প্রদান করেছি। এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ৪৬]

টিকাঃ
[৫০৩] ইনজিল শব্দটি গ্রিক উনজেলিন থেকে গৃহীত। এর অর্থ হচ্ছে ভালো খবর, সুসংবাদ, সুসমাচার, আনন্দদায়ক সংবাদ প্রভৃতি।
[৫০৪] মাথি, অধ্যায়: ৪, অনুচ্ছেদ: ২৩।
[৫০৫] মার্ক, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ১৪-১৫।
[৫০৬] রোমিয়, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ৮-৭
[৫০৭] করিন্থিয় ১ম, অধ্যায়: ৯, অনুচ্ছেদ: ১২
[৫০৮] করিন্থিয় ১ম, অধ্যায়: ৯, অনুচ্ছেদ: ১৪
[৫০৯] করিন্থিয় ১ম, অধ্যায়: ৯, অনুচ্ছেদ: ২৩
[৫১০] পাঠক উদাহরণস্বরূপ দেখুন: রোমিয়, ১/১; থিষলনিকিয় ১ম, ২/২; মার্ক, ১/১; প্রকাশিত কালাম, ১/১৫-১৬,১৯; কলিসিয় ১ম, ৯/১২,১৮; গালাতিয়, ১/৭ প্রভৃতি।
[৫১১] মুহাদারাতুন ফিন নাসরানিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৬৬।

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 খ্রিস্টবাদ ও ইসলামের মাঝে তুলনামূলক পর্যালোচনা

📄 খ্রিস্টবাদ ও ইসলামের মাঝে তুলনামূলক পর্যালোচনা


ইসলাম
১- ইসলাম আল্লাহ তাআলার সত্তা ও গুণাবলির ক্ষেত্রে তাওহিদের দাওয়াত দেয়। ইসলাম বলে : একমাত্র তিনিই ইবাদতের উপযুক্ত।
قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ .
বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। [সুরা ইখলাস, আয়াত: ১-৪]
২- মসিহ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।
৩- মসিহ মানুষকে ভ্রষ্টতা থেকে সঠিক পথের দিশা দেওয়ার জন্য আগমন করেছেন।
৪- ইসলাম ঈমান ও আমলের দাওয়াত দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে তার সওয়াব তাদের পালনকর্তার কাছে। [সুরা বাকারা, আয়াত: ৬২]
৫- মসিহ ছিলেন মায়ের প্রতি সদাচারী। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَبَرًّا بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا এবং জননীর অনুগত করেছেন এবং আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। [সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৩২]
৬- আল্লাহ তাআলা মসিহকে রুহুল কুদস তথা জিবরাইল ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ অর্থ্যাৎ, “আমি তাকে রুহুল কুদসের মাধ্যমে শক্তিদান করেছি।” [সুরা বাকারা, আয়াত: ৮৭]
৭- মসিহ আলাইহিস সালাম দুনিয়া ও আখেরাতে মহাসম্মানের অধিকারী। পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছে,
اسْمُهُ الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ وَجِيهًا فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ
তার নাম হলো মসিহ-মারইয়াম তনয় ঈসা-, দুনিয়া ও আখেরাতে তিনি মহাসম্মানের অধিকারী...। [আলে ইমরান, আয়াত: ৪৫]
৮- মসিহ অন্যান্য নবিগণের মতো নিষ্পাপ ছিলেন।
৯- মসিহ পূর্ববর্তী নবিগণকে সত্যায়নকারী ছিলেন।
১০- আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন। তারা তাকে হত্যা করতে পারেনি।
১১- সর্বাবস্থায় মসিহের উপর সালাম বা শান্তি। পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছে, وَالسَّلامُ عَلَيَّ يَوْমَ وُلِدتُّ وَيَوْমَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا .
আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হব। [সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৩৩]
১২- হাওয়ারিগণ মসিহের দাওয়াতে সাড়া দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়- قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنصَارُ اللَّهِ
শিষ্যবর্গ বলেছিল, আমরা আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। [সুরা সফ, আয়াত: ১৪]
১৩- আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল, দয়ালু। তিনি বান্দার তাওবা কবুল করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ তিনি অনুকম্পা প্রদর্শনকে নিজ দায়িত্বে লিপিবদ্ধ করে নিয়েছেন। [সুরা আনআম, আয়াত: ১২]
অন্যত্র তিনি বলেন, وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ আমার রহমত সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে নিয়েছে। [সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৬]
১৪- ইবাদত কবুলের জন্য আল্লাহ তাআলা কোনো মাধ্যমের মুখাপেক্ষী নন।
১৫- ইসলামি শরিয়ত হেদায়াত ও সৌভাগ্যের উৎস।
১৬- ইসলামের দৃষ্টিতে নবি-রাসুলগণ আল্লাহর নেককার বান্দা।
১৭- নবিগণ নিষ্পাপ।
১৮- আল্লাহ এবং তার রাসুল ব্যতীত আর কারও অধিকার নেই ইসলামের কোনো বিধান রহিত করার।
১৯- কুরআন আল্লাহ তাআলার অলৌকিক কিতাব।
২০- কুরআন মসিহের বক্তব্য তুলে ধরেছে,
إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার দাস এবং যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞ। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ১১৮]

খ্রিষ্টবাদ
১- খ্রিষ্টবাদ ত্রিত্ববাদের দাওয়াত দেয়। পিতা ঈশ্বর, পুত্র ঈশ্বর ও পবিত্র আত্মা ঈশ্বর। খ্রিষ্টবাদ বলে : তিন জনের প্রত্যেকেই ইবাদাতের উপযুক্ত।
২- মসিহ আল্লাহর পুত্র।
৩- মসিহ মানুষকে পাপ থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার জন্য এসেছেন।
৪- খ্রিষ্টবাদ ইশ্বরপুত্র মসিহ এবং প্রায়শ্চিত্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপনের দাওয়াত দেয়।
৫- মসিহ মায়ের প্রতি সদাচারী ছিলেন না। তিনি মায়ের মর্যাদাকে অস্বীকার করতেন। [যোহন, ২/১-৪, মথি, ১২/৪৭-৪৮]
৬- পবিত্র আত্মা মসিহকে ক্রুশ থেকে বাঁচানোর জন্য কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি।
৭- সৈনিকরা মসিহকে প্রহার করেছে। মুখে থুতু দিয়েছে। তারপর তাকে শূলে চড়িয়েছে।
৮- মসিহ সৎ ছিলেন না।
৯- সুসমাচারের ভাষ্যমতে মসিহ অন্যান্য নবি-রাসুলগণকে ডাকাত বিবেচনা করতেন।
১০- ইহুদিরা তাকে বেত্রাঘাত করে শূলে চড়িয়েছে।
১১- বনি আদমের পাপের কারণে তাকে শূলে চড়ানো হয়েছে। সুসমাচারের ভাষ্যমতে তার মৃত্যু ছিল অভিশপ্ত ব্যক্তির মৃত্যুর ন্যায়।
১২- বিপদ ও পরীক্ষার সময় হাওয়ারিরা মসিহকে রেখে পালিয়ে গিয়েছিল।
১৩- আল্লাহ পরাক্রমশালী। তিনি আদমের তাওবা কবুল করেননি। এমনকি তার সন্তানকে শূলে চড়িয়ে প্রতিশোধ নিয়েছেন।
১৪- আল্লাহ তাআলা পোপের মাধ্যমে তাওবা ও যাবতীয় ইবাদাত কবুল করে থাকেন।
১৫- শরিয়ত খ্রিষ্টানদের কাঁধে অভিশাপস্বরূপ।
১৬- পুরাতন ও নতুন উভয় নিয়মের ভাষ্যমতে নবি-রাসুলগণ সীমালঙ্ঘনকারীদের চেয়ে নিকৃষ্ট। তাদের অনেকে স্বীয় কন্যার সাথে ব্যভিচার করেছেন। আবার অনেকে মদ পান করতেন। কেউ কেউ মানুষের সামনে উলঙ্গও হয়েছেন।
১৭- পোপগণ নিষ্পাপ
১৮- পোপ শরিয়ত রহিত করার অধিকার রাখেন।
১৯- খ্রিষ্টানদের কাছে রক্ষিত সুসমাচারগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির রচনা।
২০- মসিহ ফরিশি ও সাদ্দুকিদের ধ্বংস ও বরবাদির বদদুআ করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px