📄 ১। গ্রিক অনুবাদ
গ্রিক সাম্রাজ্যের মূল ভূখণ্ড এবং এশিয়া ও আফ্রিকায় তাদের উপনিবেশগুলোতে পরিচিত একটি ভাষা হলো গ্রিক বা ইউনানী ভাষা। খ্রিষ্টপূর্ব ২৮২ সাল। সম্রাট ক্লডিয়াস টলেমির (Claudias Ptolemy) নির্দেশে মিশরে বাহাত্তর জন ইহুদি পণ্ডিত সমবেত হন। এই পণ্ডিতগণ পুরোনো নিয়মকে গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করেন। এটাকেই গ্রিক অনুবাদ বলা হয়। এর অপর নাম সেপটুয়েজিন্ট। ল্যাটিন ভাষায় বলা হয় (Septuagent)। আর ফরাসি ভাষায় এর নাম Version Be Septant। রোমান সংখ্যায় এটাকে LXX দ্বারা নির্দেশ করা হয়।²⁴³
অনুবাদকগণ সামেরিয়ান পাণ্ডুলিপির ওপর নির্ভর করে এটি অনুবাদ করেন। যদ্দরুণ সামেরিয়ান কপি এবং সেপ্টয়াজিন্টের মাঝে এক হাজার নয়শটি অনুচ্ছেদের মিল পাওয়া যায়। অপরদিকে হিব্রু তাওরাত ও সামেরিয়ান তাওরাতের অমিলের সংখ্যা ছয় হাজারেরও বেশি।
খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণের মাঝে এই অনুবাদের বিন্যাসের ব্যাপারে যেমন মতদ্বৈততা রয়েছে, একইভাবে মতানৈক্য রয়েছে সংযোজন ও বিয়োজন নিয়েও। পাশাপাশি এই অনুবাদে এমন কিছু পুস্তক রয়েছে যা হিব্রু তাওরাতে নেই।
হিব্রু তাওরাত ও এই অনুবাদের বেশকিছু বাক্যেও অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। যেমন:
১। হিব্রু তাওরাতের ভাষ্য অনুযায়ী আদম আলাইহিস সালাম এবং নুহ আলাইহিস সালামের প্লাবনের মধ্যবর্তী সময়কাল হলো ১৬৫৬ বছর। অথচ এই অনুবাদে সেটা উল্লেখ করা হয়েছে ২২৬২ বছর।
২। সন্দেহপূর্ণ ও রহস্যাবৃত পুস্তক অ্যাপোক্রিফা থেকে এই অনুবাদে স্থান দেওয়া হয়েছে। এ সম্পর্কিত আলোচনা আমরা ইতিপূর্বে করেছি।
৩। হিব্রু তাওরাতের যবুর পুস্তকটি গ্রিক অনুবাদে পাওয়া যায় না।
৪। অনুবাদকগণ আল্লাহ তাআলার গুণবাচক নামগুলোকে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এগুলো মানুষের গুণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। তাদের ধারণা ছিল এভাবে না বললে যিহোবার যথাযথ মর্যাদা রক্ষা হয় না।
এসব স্পষ্ট বৈপরীত্য সত্ত্বেও গ্রিক বাইবেলটি দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত ইহুদি ও খ্রিষ্টান উভয়ের মাঝে সমাদৃত ছিল। এরপর তৃতীয় শতাব্দীর শেষের দিকে সম্রাট কনস্টানটিন খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর খ্রিষ্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদা লাভ করে। এরপর তিনি (সম্রাট কনস্টানটিন) পোপ জেরোমিকে ৩৮৩ খ্রিষ্টাব্দে পুরোনো নিয়ম ও নতুন নিয়মে রোমান ভাষায় অনুবাদ করার দায়িত্ব প্রদান করেন। তখন জেরোমি শামে (বৃহত্তর সিরিয়া) চলে যান এবং বেথেলহেমে চৌদ্দ বছর অবস্থান করেন। এসময় তিনি তার পাশে হিব্রু ভাষার নুসখাগুলো (সংস্করণগুলো) জড়ো করেন। অবশেষে ইহুদি পণ্ডিতদের সহায়তায় তিনি ৩৯৪ খ্রিষ্টাব্দে সরাসরি হিব্রু থেকে রোমান ভাষায় রূপান্তরে সক্ষম হন। শুরুতে গির্জাগুলো এই অনুবাদটি গ্রহণ না করলেও শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়। খ্রিষ্টাব্দ পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমস্ত গির্জায় এটি সমাদৃত ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ব্যাপারে টমাস মন্তব্য করেন, কয়েকবারই জেরোমির এই অনুবাদটি সংশোধন করা হয়েছিল। তারপরও এটি বিভিন্ন দিক থেকে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তবে জেরোমি প্রাচীন পুস্তকগুলি সন্নিবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।²⁴⁴
যাই হোক, ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও সিনাগগ এবং গির্জা এটিকে মৌলিক হিসেবে বিবেচনা করেছিল। উভয়ে এটিকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করত। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন খ্রিষ্টানরা এর বিভিন্ন পঙক্তি দিয়ে ইহুদিদের প্রচলিত আচার ও শিক্ষার সমালোচনা করতে শুরু করে তখন ইহুদিরা হিব্রু তাওরাতে ফিরে যায় যা তাদের অনেকের কাছেই অপরিচিত ছিল। বহুল প্রচলিত এই অনুবাদকে তারা অপাঙক্তেয় ঘোষণা করে। কেননা এটি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছিল।²⁴⁵
টিকাঃ
২৪৩. তারিখুস সুহুফিস সামাওয়িয়্যাহ
২৪৪. তারিখুস সুহুফিস সামাওয়িয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৫৩
২৪৫. কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাস, পৃষ্ঠা: ৭৬৮
📄 ২। ক্যালডিয়ান অনুবাদ
ব্যাবিলনের দীর্ঘকাল দাসত্বের জীবনযাপনের কারণে ইহুদিদের ভাষা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। তাদের মুখের ভাষা ছিল তখন আরামীয় ভাষা। এটিকে রূপকার্থে ক্যালডিয়ান ভাষাও বলা হয়ে থাকে। ইহুদিদের পূর্বপুরুষদের হিব্রু ভাষার সাথে এই ভাষার বিস্তর ফারাক রয়েছে। ভাষাগত এই জটিলতার কারণে তাদের ধর্মীয় পুস্তকগুলোকে আরামীয় ভাষায় অনুবাদের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই অনুবাদকেই তারা নাম দিয়েছিল ‘তরজুমাত’। নহমিয়ের পুস্তকে এদিকেই ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে—
‘এইরূপে তাহারা স্পষ্ট উচ্চারণপূর্বক সেই পুস্তক, ঈশ্বরের ব্যবস্থা পাঠ করিল, এবং তাহার অর্থ করিয়া লোকদিগকে পাঠ বুঝাইয়া দিলো। আর শাসনকর্তা নহিমিয়, অধ্যাপক ইষ্রা যাজক ও লোকদের শিক্ষক লেবীয়েরা সমস্ত লোককে কহিলেন, অদ্যকার দিন তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশে পবিত্র, তোমরা শোক করিও না, রোদন করিও না। কেননা ব্যবস্থা-পুস্তকের বাক্য শ্রবণে সমস্ত লোক রোদন করিতেছিল।’²⁴⁶
অর্থাৎ তারা পুস্তকগুলোকে ক্যালডিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছিল যে ভাষায় ইহুদিরা তখন কথা বলত।
টিকাঃ
২৪৬. নহমিয়, অধ্যায়: ৮, অনুচ্ছেদ: ৮-৯।
📄 ৩। ল্যাটিন অনুবাদ
ঈসা আলাইহিস সালাম পরবর্তী যুগে প্রথম শতাব্দীতেই গ্রিক অনুবাদ থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ হয়। কেননা ল্যাটিন ভাষা সেসময় উত্তর আফ্রিকার বহুল প্রচলিত ভাষা ছিল। এখানকার ইহুদি-খ্রিষ্টান অধিবাসীরা এই অনুবাদ দিয়ে দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করত।
📄 ৪। ইথিওপিয়ান অনুবাদ
৩২০ খ্রিষ্টাব্দে গ্রিক অনুবাদ থেকে পুরাতন নিয়মকে ইথিউপিয়ান (হাবশি) ভাষায় অনুবাদ করা হয়। বলা হয়ে থাকে সম্রাট কনস্টানাটিন (৩২৪-৩৩৭ খ্রি.) এর সময়ে যখন হাবশায় খ্রিষ্টধর্ম প্রবেশ করে তখন এই অনুবাদের কাজ শুরু হয়। এরপর চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে এই অনুবাদের কাজ সমাপ্ত হয়।