📄 তাওরাত সংকলনের বিভিন্ন স্তর
ইহুদি ও খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ একমত যে, প্রাথমিকভাবে তাওরাত পুরোটা একখণ্ড ছিল। অতঃপর ২৮৪ খ্রিষ্টপূর্বে ইহুদিরা যখন এটাকে গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করে তখন তারা এটিকে পাঁচ খণ্ডে ভাগ করে নেয়। ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দে কার্ডিনাল এতে অধ্যায় ও অনুচ্ছেদ যুক্ত করেন। পণ্ডিতগণ এতে নুকতা, হরকত প্রভৃতি জুড়ে দেন। কেননা, হিব্রু বাইবেলে নুকতা-হরকত ছিল না। এত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও তাহকিকের পরও তাওরাত শব্দ ও অর্থগত দিক থেকে তালগোল পাকানোই রয়ে গেছে।
প্রথম তাওরাতের বিনাশ ঘটে ৯৪৫ খ্রিষ্টপূর্বে রহবিয়াম বিন সুলাইমান এর রাজত্বকালে, যখন মিশর সম্রাট শশাঙ্ক আক্রমণ করেছিলেন।²²⁸ রাজাবলি ১ম পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে, আর রহবিয়াম রাজার পঞ্চম বৎসরে মিসর-রাজ শীশক যিরূশালেমের বিরুদ্ধে আসিলেন; তিনি সদাপ্রভুর গৃহের ধন ও রাজবাটীর ধন লইয়া গেলেন; তিনি সমস্তই লইয়া গেলেন, আর শলোমনের নির্মিত স্বর্ণময় ঢাল সকলও লইয়া গেলেন।²²⁹
খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর সূচনা পর্যন্ত তাওরাত গায়েব ছিল। এরপর যাজক হিল্কিয় ঘোষণা দিলেন যে তিনি হাইকলের ভেতর শরিয়তসম্বলিত একটি পুস্তক পেয়েছেন। রাজাবলি দ্বিতীয় পুস্তকে এই ঘটনা বিবৃত হয়েছে। বলা হয়েছে, তখন হিষ্কিয় মহাযাজক শাফন লেখককে কহিলেন, আমি সদাপ্রভুর গৃহে ব্যবস্থাপুস্তকখানি পাইয়াছি। পরে হিল্কিয় শাফনকে সেই পুস্তক দিলে তিনি তাহা পাঠ করিলেন। আর শাফন লেখক রাজার নিকটে গিয়া তাঁহাকে এই সমাচার দিলেন, আপনার দাসগণ সেই গৃহে প্রাপ্ত সমস্ত টাকা একত্র করিয়া সদাপ্রভুর গৃহের তত্ত্বাবধায়ক কার্যকারীদের হস্তে দিয়াছে। পরে শাফন লেখক রাজাকে কহিলেন, হিল্কিয় যাজক আমাকে একখানি পুস্তক দিয়াছেন। আর শাফন রাজার সাক্ষাতে তাহা পাঠ করিতে লাগিলেন। তখন রাজা সেই ব্যবস্থাপুস্তকের বাক্য সকল শুনিয়া আপনার বস্ত্র ছিঁড়িলেন।²³⁰
৬২৩ খ্রিষ্টপূর্বে যিহুদা রাজ্যে ঘটনাটি ঘটেছিল। এখান থেকে বোঝা যায়, সে সময়টাতে তাওরাতের কপি খুব বেশি ছিল না। শুধু একটি কপি পাওয়া গিয়েছিল হাইকলের ভিতর। প্রায় তিনশ বছর গায়েব থাকার পর হিল্কিও একমাত্র কপিটি খুঁজে পান। প্রশ্ন আসে, এটাই যে মুসা আলাইহিস সালামের তাওরাত তার প্রমাণ কি? প্রকৃত তাওরাতের সাথে মিলিয়ে দেখার কি কোনো সুযোগ ছিল? এত বছর পরে তো এমন কেউই বেঁচে ছিলেন না যিনি সরাসরি মুসা আলাইহিস সালাম কিংবা তার সন্তানদের কাছ থেকে তাওরাত শুনেছেন। খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ লক্ষ লক্ষ ঘণ্টা গবেষণা করেও এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যাবিলন সম্রাট বুখতে নসর জেরুজালেমে হামলা চালান এবং বায়তুল মুকাদ্দাস গুঁড়িয়ে দেন (৫৯৭ খ্রিষ্টপূর্ব)। সেখানকার সমস্ত আলামত তিনি মুছে দেন এবং চল্লিশ হাজারেরও বেশি ইহুদিদেরকে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যান। প্রায় চল্লিশ মতান্তরে সত্তর বছর এরা ব্যাবিলনে দাসবৃত্তি করতে বাধ্য হয়। একপর্যায়ে তারা নিজেদের জাতিগত ভাষা হিব্রু ভাষাও ভুলে যায়। বংশাবলি দ্বিতীয় পুস্তকের ছত্রিশতম অধ্যায়ে বুখতে নসর এর জেরুজালেম অভিযানের ঘটনা সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আর তাঁহার লোকেরা ঈশ্বরের গৃহ পোড়াইয়া দিল, যিরূশালেমের প্রাচীর ভগ্ন করিল, এবং তথাকার সকল অট্টালিকা অগ্নি দ্বারা পোড়াইয়া দিল, তথাকার সমস্ত মনোরম পাত্র বিনষ্ট করিল। আর তিনি খড়া হইতে রক্ষাপ্রাপ্ত অবশিষ্ট লোকদিগকে বাবিলে লইয়া গেলেন; তাহাতে পারস্য-রাজ্য স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত লোকেরা তাঁহার ও তাঁহার সন্তানদের দাস থাকিল।²³¹
ইহুদিরা পারস্য সম্রাটের সহযোগিতায় ব্যাবিলন শাসকের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে নিজেদের দেশে ফিরে আসে। এরপর তাদের পণ্ডিতগণ নতুনভাবে তাওরাত সংকলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে যাজক ইষ্রার যথেষ্ট অবদান ছিল। ইষ্রার পুস্তকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে, তিনি ইহুদি ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। একইভাবে হারিয়ে যাওয়া তাওরাতকে তিনি ফিরিয়ে এনেছেন। এ ছাড়াও তিনি তাওরাতে অ্যাসিরিয়ান শব্দ প্রবেশ ঘটিয়েছেন। কিন্তু ইষ্রা কীভাবে নতুনভাবে তাওরাত সংকলন করেছিলেন এ ব্যাপারে খ্রিষ্টান আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। অনেকেই বলে থাকেন, তিনি ইতিপূর্বে এগুলো আদ্যোপান্ত পাঠ করেছিলেন। পরে নবি নহমিয় এর সহযোগিতায় তিনি এটিকে সংকলন করেন। উল্লেখ্য, নহমিয় হাইকল নির্মাণেও ইষ্রার সহযোগী ছিলেন। খ্রিষ্টান লেখক কিটোসহ অনেকেরই মত হলো, ইষ্রা পুরো তাওরাত মুখস্থ জানতেন। নিজ স্মৃতিশক্তি থেকেই তিনি এটাকে পুনর্বার সংকলন করেন।
তৃতীয় মত হলো, ইষ্রা একশ বিশ জন পণ্ডিতকে নিয়ে একটি পরিষদ গঠন করে দিয়েছিলেন। এটাই পরবর্তীতে মহান গির্জা (The great church) নামে পরিচিতি লাভ করে। এদের সবার দায়িত্ব ছিল তাওরাত সংকলন করা, কপি করা, পড়া এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। হাফেজ ইবনে হাজম বলেন, ইষ্রা কর্তৃক তাওরাত লিপিবদ্ধ করার ঘটনাটি বায়তুল মুকাদ্দাস বিরান হওয়ার সত্তর বছরেরও অধিক পরে সংগঠিত হয়েছিল। তাদের কিতাবগুলো সাক্ষ্য দেয় যে বন্দিদশা থেকে ফিরে আসার প্রায় চল্লিশ বছর পর ইষ্রা এটি লিখেন। এ সময় তাদের মধ্যে কোনো নবি ছিল না। ছিল না কোনো কুব্বা কিংবা তাবুত।... তখন থেকেই মূলত তাওরাতের প্রচার প্রসার ঘটতে থাকে। তবে এই প্রচার-প্রসার ছিল খুবই দুর্বল পন্থায়।²³²
এ কথা স্পষ্ট যে ব্যাবিলনের বন্দিদশা থেকে ফিলিস্তিনে ফিরে এসে তারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পুনরায় ইহুদি জাতিসত্তার সংরক্ষণে মনোনিবেশ করে। ভিন্ন জাতি কর্তৃক জুলুম-অত্যাচারের অভিজ্ঞতা তাদেরকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর ১৭০ খ্রিষ্টপূর্বে তৃতীয়বারের মতো তাওরাত হারিয়ে যায়। মেসিডোনিয়া সম্রাট এন্টিওকাস এপিফানেস এসময় জেরুজালেমে অভিযান চালায়। হাইকলকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় এবং সেখানে রক্ষিত সমস্ত পুস্তক ও চিহ্ন নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। অতঃপর সত্তর খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট টাইটাসের জেরুজালেম অভিযানে চতুর্থবারের মতো তাওরাত বিলুপ্ত হয়। টাইটাস বাইতুল মুকাদ্দাস পোড়াতে চায়নি। তিনি লোকদেরকে আগুন নেভাতে নির্দেশ দেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয় না। বাইতুল মুকাদ্দাসের অভ্যন্তরে রক্ষিত তরবারি, স্বর্ণালঙ্কার ও যাবতীয় পুস্তকসহ পুড়ে যায়।²³³
টাইটাসের অভিযানের পর অবশিষ্ট ইহুদিরা একত্রিত হয়। সত্তর খ্রিষ্টাব্দে তারা রোমান সাম্রাজ্য আক্রমণ করে। কিন্তু যুদ্ধে তাদেরকে পরাস্ত হতে হয়। এতে করে রোমান হুকুমত প্রচণ্ড রেগে যায় এবং জেরুজালেমের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করে। এই বাহিনীটি ইহুদিদের সমস্ত চিহ্ন মুছে দেয়। ৪০০ খ্রিষ্টাব্দে রোমের উত্তর দিক থেকে পৌত্তলিকদের আগমন ঘটে। তারা রোমানদের সমস্ত উপনিবেশগুলোতে হামলা চালায়। ৬১৩ খ্রিষ্টাব্দে ইরান-শাহ পারভেজ জেরুজালেম আক্রমণ করেন। নব্বই হাজারেরও বেশি ইহুদিকে তিনি হত্যা করেন। পবিত্র স্থানগুলোকে গুঁড়িয়ে দেন এবং ধর্মীয় পুস্তকগুলো পুড়িয়ে ফেলেন। এই হলো ইহুদিদের তাওরাতের গল্প। ইতিহাসবিদগণ দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, ষোড়শ শতাব্দীর সূচনালগ্নে যখন ইহুদিরা স্পেন থেকে বিতাড়িত হয় তখন মুসলিমরাই তাদের সাথে সদাচারের পরিচয় দেয় এদেরকে সাবাতিয়ান ইহুদি বা দোনমেহ (Donmeh) বলা হয়।²³⁴
টিকাঃ
২২৮. রহবিয়াম বিন সুলাইমান যখন শাসনক্ষমতা অধিষ্ঠিত হন তখন তার বয়স ছিল ষোলো বছর। নবি সুলাইমান আলাইহিস সালামের ওফাতের পর সে সতেরো বছর রাজত্ব করেছিল। পুরো রাজত্বকালে সে শুধু কুফরি করে গিয়েছে। এমনকি তার অনুসারীসহ মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়েছে। অধীনদের মধ্যে বিরোধিতা করার মতো কেউ ছিল না। রহবিয়াম কুফরির ওপরেই মৃত্যুবরণ করে। এরপর বনি ইসরাইলের যত রাজা আসে তাদের অধিকাংশি প্রকাশ্যে কুফরি করত। মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়তের প্রতিপালন তারা করত না। ধর্মীয় কিতাবগুলোকেও তারা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতো না।
২২৯. রাজাবলি ১ম, অধ্যায়: ১৪, অনুচ্ছেদ: ২৫-২৬।
২৩০. রাজাবলি ২য়, অধ্যায়: ২২, অনুচ্ছেদ: ৮-১১।
২৩১. বংশাবলি ২য়, অধ্যায়: ৩৬, অনুচ্ছেদ: ১৯-২০।
২৩২. আল-ফসলু ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়াই ওয়ান নিহাল, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৯৭
২৩৩. দিরাসাতুন মুকারিনাতুন লি আদইয়ানিল আলম, পৃষ্ঠা: ৩৭৬
২৩৪. দোনমেহ একটি তুর্কি শব্দ। এর অর্থ হলো ফিরে যাওয়া। ইতিহাস বলছে ১৬২৬ খ্রিষ্টাব্দে তুরস্কে সাবাত জেফি নামক এক ইহুদি জন্মগ্রহণ করে। তার পরিবারের মূল নিবাস ছিল স্পেন। এই ব্যক্তি এবং তার কিছু অনুসারী প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেয়। কিন্তু তারা আন্তরিকভাবে ইসলামের অনুসারী ছিল না। এ ধরনের কপট আচরণের মাধ্যমে তারা মুসলমানদের ক্ষতি সাধনে সমর্থ হয়। ইতিহাসে এরা দোনমেহ এবং সাবাতিয়ান ইহুদি নামে পরিচিত।
📄 মূলনীতিগুলো হলো
এ কথা স্পষ্ট যে ব্যাবিলনের বন্দিদশা থেকে ফিলিস্তিনে ফিরে এসে তারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পুনরায় ইহুদি জাতিসত্তার সংরক্ষণে মনোনিবেশ করে। ভিন্ন জাতি কর্তৃক জুলুম-অত্যাচারের অভিজ্ঞতা তাদেরকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে। এজন্য তারা কিছু মূলনীতি প্রণয়ন করে। তাওরাত থেকে এই মূলনীতিগুলো সহজেই অনুমান করা যায়। মূলনীতিগুলো হলো-
১। আল্লাহ তাআলা একক সত্তা। তার কোনো শরিক নেই। তারা তার নাম রাখে যিহোভা। এবং ইনি হলেন বনি ইসরাইলের প্রভু। তার দায়িত্ব হচ্ছে বনি ইসরাইলকে শত্রুদের থেকে রক্ষা করা।
২। মুসা আলাইহিস সালামের আনীত শরিয়ত বনি ইসরাইলের জন্য খাস।
৩। মুসা আলাইহিস সালাম একজন নবির সুসংবাদ দিয়েছেন। এই প্রতিশ্রুত নবি বনি ইসরাইলের ত্রাণকর্তা হবেন এবং তিনি হবেন ইসহাক এর বংশধর।
৪। অন্যান্য জাতিগুলো বনি ইসরাইলের সেবক।
৫। ইসরাইলিরা অন্য জাতির সাথে মিশে যাওয়া কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। অন্য জাতি থেকে নিজেদের বংশকে পবিত্র রাখা প্রত্যেক ইসরাইলির কর্তব্য।
এইসব বিচ্ছিন্নতাকামি ও সাম্প্রদায়িক মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে নতুন তাওরাত লিপিবদ্ধ হয়। এরপর তাদের প্রবীণদের সামনে উপস্থাপন করা হলে তাঁরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। কেননা এভাবেই ইহুদি জাতীয়তাবাদের সংরক্ষণ করা সম্ভবপর হবে।