📄 ৭. যোয়েল
যোয়েল অর্থ যিহোভাই প্রভু। তিনি পথুয়েল এর পুত্র এবং যোয়েল পুস্তকের রচয়িতা। কিন্তু কখন এই পুস্তক তিনি রচনা করেছেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। যোয়েল তার জাতিকে পাপাচারের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। আহ্বান করেছেন তাওবা করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের জন্য। তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন—
কিন্তু, সদাপ্রভু বলেন, এখনও তোমরা সমস্ত অন্তঃকরণের সহিত এবং উপবাস, রোদন ও বিলাপসহকারে আমার কাছে ফিরিয়া আইস।¹⁸⁵
টিকাঃ
১৮৫. যোয়েল, অধ্যায়: ২, অনুচ্ছেদ: ১২।
📄 ৮. আমোষ
আমোষ অর্থ হলো সমৃদ্ধি। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর মানুষ। ইহুদিদেরকে তিনি তাওবার দাওয়াত দিয়েছেন। তাদের চারিত্রিক অধঃপতনের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছেন। ইবাদতের ক্ষেত্রে অবক্ষয় এবং তাদের পৌত্তলিক চিন্তা-চেতনার তিনি সমালোচনা করেছেন। ইসরায়েলিদের শেষ পরিণতি নিয়ে তিনি ছিলেন অসম্ভব শঙ্কিত।
📄 ৯. ওবদিয়
ওবদিয় অর্থ হলো যিহোবার দাস। ইনি দাউদ আলাইহিস সালামের বংশধর। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে জেরুজালেমের ধ্বংসের পূর্বে অথবা পঞ্চম শতাব্দীতে ব্যাবিলন থেকে বন্দি ইহুদিদের প্রত্যাবর্তনের পরবর্তী সময়কালে তিনি দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তার সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত তেমন পাওয়া যায় না।
📄 ১০. যোনা
যোনা শব্দের অর্থ হলো কবুতর। যোনা হলেন অমিত্তয়ের সন্তান এবং যবলুন এর বংশধর। কথিত তাওরাতের ভাষ্যমতে প্রভু তাকে নিনবি¹⁸৬ শহরে গিয়ে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে আদেশ দেন। কিন্তু তিনি সেখান থেকে পালিয়ে তারশিশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে জাফাতে পৌঁছেন। সেখানে তিনি তারশিশে যাওয়ার জন্য একটি জাহাজও পেয়ে যান।¹⁸৭ তিনি ভাড়া পরিশোধ করে জাহাজে চেপে বসেন। তখন প্রভু প্রচন্ড বায়ু প্রেরণ করলেন। এতে সমুদ্রে প্রচণ্ড ঝড় উঠল। এমনকি জাহাজ ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। মাঝি-মাল্লারা ভয় পেয়ে নিজেদের দেবতাদের ডাকতে শুরু করল। আসবাবপত্র সব নদীতে ফেলে দিলো। এদিকে যোনা নিচে জাহাজের পাটাতনে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। এমতাবস্থায় প্রধান মাঝি এসে তাকে ডেকে বললেন, এমন পরিস্থিতিতে তুমি ঘুমাচ্ছ! উঠে এসো তোমার প্রভুকে ডাকো। হয়তো তিনি আমাদের দিকে মুখ তুলবেন আর আমরা ধ্বংস থেকে বেঁচে যাব। এরপর তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, এসো আমরা লটারি দিই-কার কারণে এই বিপদ লটারির মাধ্যমে চিহ্নিত করা হোক। কথামত লটারি দেওয়া হলো এবং যোনার নাম উঠে এলো। তারা বলতে লাগল, বলো দেখি, আমাদের উপর এই বিপদ কেন? তোমার কাজ কি? কোত্থেকে এসেছ? কোথায় তোমার নিবাস? কোন জাতির তুমি?" তখন যোনা বললেন, আমি ইবরানি। আমি ভয় করি আসমানের প্রভুকে, যিনি জল-স্থল সৃষ্টি করেছেন।"
লোকেরা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল এবং বলল, তুমি এটা কী করলে? লোকেরা জানত, তিনি প্রভুর কাছ থেকে পালিয়ে এসেছেন। ইতিপূর্বে তিনিই তাদেরকে সেটা বলেছিলেন। লোকেরা আবার বলল, সমুদ্র শান্ত হওয়ার জন্য এখন আমরা কি করতে পারি? সমুদ্র তো ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠতে লাগল। তিনি বললেন, আমাকে ধরে সমুদ্রে ফেলে দাও। সমুদ্র ঠান্ডা হয়ে যাবে। আমি জানি, আমার কারণেই এই ঘূর্ণিঝড় আপতিত হয়েছে।
লোকেরা জাহাজকে তীরে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য দাঁড় টানতে লাগল। কিন্তু তারা পারল না। সমুদ্র ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠতে লাগল। তখন তারা চিৎকার করে বলতে লাগল, হে প্রভু, এই লোকের প্রাণের নিমিত্তে আমাদের বিনাশ করবেন না। আমাদের ওপর নির্দোষের রক্তও অর্পণ করবেন না। আপনি যা ইচ্ছা তাই করেন। এরপর তারা যোনাকে ধরে সমুদ্রে ফেলে দিলো। সমুদ্র ঠান্ডা হয়ে গেল। লোকেরা প্রভুকে ভীষণ ভয় করল। তারা বলিদান করল এবং নানা ধরনের মানত করল। আর প্রভু যোনাকে গ্রাস করার জন্য একটি বিরাট মাছ প্রস্তুত করে দিলেন। সেই মাছের পেটে তিনি তিনদিন তিন রাত ছিলেন।
যোনা মাছের পেটে আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং স্বীয় অপরাধের দরুন তওবা করতেন। আল্লাহ তাআলা তাকে রিসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্য নিনবি যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি নিনবিতে গিয়ে সেখানকার লোকদেরকে বললেন, ৪০ দিনের মধ্যে এই গ্রাম উল্টে যাবে। তখন শহরের লোকেরা তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করে।¹⁸⁸ যোনার ঘটনা কুরআনে বর্ণিত ইউনুস আলাইহিস সালামের ঘটনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কুরআনে সরাসরি চারবার তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। [সুরা নিসা ১৬৩, সুরা আনআম ৮৬, সুরা ইউনুস ৯৮, সুরা সাফফাত ১৩৯] আর সুরা আম্বিয়াতে গুণবাচক নাম উল্লেখ করা হয়েছে যেমন বলা হচ্ছে
وَذَا النُّونِ إِذ ذَّهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَن لَّن نَّقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ .
এবং মাছওয়ালার কথা স্মরণ করুন, তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন, অতঃপর মনে করেছিলেন যে, আমি তাঁকে ধৃত করতে পারব না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান করলেন-তুমি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; তুমি নির্দোষ আমি গুনাহগার। [সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭]
একইভাবে সুরা কলমে বলা হয়েছে-
فَاصْبِرْ لِحُকْمِ رَبِّكَ وَلَا تَكُن كَصَاحِبِ الْহূতি إِذْ নাদী وَهُوَ মক্জূম .
আপনি আপনার পালনকর্তার আদেশের অপেক্ষায় সবর করুন এবং মাছওয়ালার মতো হবেন না, যখন সে দুঃখাকুল মনে প্রার্থনা করেছিল। [সুরা কালাম ৬৮:৪৮]
সকল মুফাসসির ও মুহাদ্দিসিনে কেরাম একমত যে, এখানে মাছওয়ালা বলতে ইউনুস ইবনে মাত্তাই উদ্দেশ্য।
তার ঘটনা কুরআনে বিবৃত হয়েছে-
وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ ) إِذْ أَبَقَ إِلَى الْفُلْكِ الْمَشْحُونِ فَسَاهَمَ فَكَانَ مِنَ الْمُদ্হাদ্বীন ফালতাকামাহুল হূত ওয়া হুয়া মুলীম ফালাওলা আন্নাহু কানা মিনাল মুসাব্বিহীন লালাবিসা ফী বাতনিহী ইলা ইয়াওমি ইউবআসূন ফানাবাযনাহু বিল আরা-ই ওয়া হুয়া সাকীম ওয়া আমবাতনা আলাইহি শাজারাতাম মি ইয়াকতীন ওয়া আরসালনাহু ইলা মিয়াতি আলফিন আও ইয়াযীদূন ফাআমানূ ফামাত্তাইনাহুম ইলা হীন।
আর ইউনুসও ছিলেন পয়গম্বরগণের একজন। যখন পালিয়ে তিনি বোঝাই নৌকায় গিয়ে পৌঁছেছিলেন। অতঃপর লটারি (সুরতি) করালে তিনি দোষী সাব্যস্ত হলেন। অতঃপর একটি মাছ তাঁকে গিলে ফেলল, তখন তিনি অপরাধী গণ্য হয়েছিলেন। যদি তিনি আল্লাহর তাসবিহ পাঠ না করতেন, তবে তাঁকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হতো। অতঃপর আমি তাঁকে এক বিস্তীর্ণ-বিজন প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম, তখন তিনি ছিলেন রুগ্ন। আমি তাঁর ওপর এক লতাবিশিষ্ট বৃক্ষ উদগত করলাম এবং তাঁকে লক্ষ বা ততধিক লোকের প্রতি প্রেরণ করলাম। তারা বিশ্বাস স্থাপন করল। অতঃপর আমি তাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জীবনোপভোগ করতে দিলাম। [সুরা সাফফাত, আয়াত: ১৩৯-১৪৮]
আধুনিক গবেষকদের মতে পুরাতন নিয়মের যোনার পুস্তকটি রচিত হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শতাব্দীতে।
টিকাঃ
১৮৬. নিনবি হলো দজলা ও যাব নদীর মোহনা থেকে পাঁচশ কিলোমিটার দূরে দজলার পূর্ব তীরে অ্যাসেরিয়ান সাম্রাজ্যের রাজধানী। ইবনে কাসিরের মত হলো এটি মসুল নগরীর একটি গ্রাম।
১৮৭. ঘটনা থেকে বুঝা যায় যোনা জাফা থেকে সমুদ্রপথে তারশিশে রওনা হয়েছিলেন। গবেষকরা মনে করেন সমুদ্রটি ছিল ভূমধ্যসাগর। তারশিশ নগরীটি স্পেনের দক্ষিণে জিব্রাল্টার প্রণালির নিকটে অবস্থিত তারভিসুস (Tartessus) নগরী। অনেকে মনে করেন এটি আফ্রিকার উত্তরে বর্তমান কার্টেজীনা নগরী।
১৮৮. যোনা এর পুস্তকের প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়। কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাস: ১১২৬।