📄 এক. ইয়োব
ইয়োব হলেন কুরআনে বর্ণিত নবিদের একজন। কুরআনে যাকে আইয়ুব নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং তাঁকে ধৈর্য, স্থিরতা ও তুষ্টির উপমা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কুরআনে তার সম্পর্কে যা আলোচনা করা হয়েছে বাইবেলের পুরাতন নিয়ম তা পাওয়া যায় না। পুরাতন নিয়মে ইয়োবকে একজন নেককার মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে যিনি কখনো সন্তুষ্ট আবার কখনো বিদ্রোহী। কখনো আপতিত বিপদকে অম্লান চিত্তে মেনে নিচ্ছেন আবার কখনো বিদ্রোহী হয়ে প্রশ্ন করছেন, আমার সাথেই কেন এমন হলো?
পুরাতন নিয়মে তার সাথে শয়তানের কথোপকথনের একটি ঘটনাও বিবৃত হয়েছে এবং সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শয়তান ইয়োবের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। পশ্চিমা লেখকগণ ইয়োবের পুস্তকটিকে দর্শন ও সাহিত্যের এক অনবদ্য পুস্তক হিসেবে অভিহিত করেছেন। ফরাসি বিজ্ঞানী মরিস বুকাইলি বলেন, প্রকৃত অর্থে এটি সততা ও প্রজ্ঞার পুস্তক।¹⁶⁶
কুরআন এবং পুরাতন নিয়মের কোথাও তার সময়কাল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়নি। কিন্তু তার অবস্থানস্থল সম্পর্কে পুরাতন নিয়মে বলা হয়েছে যে, তিনি উস নগরীতে বসবাস করতেন।¹⁶⁷ এটি দামেশক ও ইরম এর মধ্যবর্তী একটি শহর। অনেকের মতে এটি হলো হোরান নগরী। তার সময়কাল সম্পর্কে কুরআনে সামান্য ইঙ্গিত পাওয়া যায় যেখানে বলা হচ্ছে-
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا آتَيْنَاهَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ نَرْفَعُ دَرَجَاتٍ مَنْ نَشَاءُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ ، وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ كُلًّا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَارُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ، وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ كُلٌّ مِنَ الصَّالِحِينَ، وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطًا وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ .
এটি ছিল আমার যুক্তি, যা আমি ইবরাহিমকে তাঁর সম্প্রদায়ের বিপক্ষে প্রদান করেছিলাম। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় সমুন্নত করি। নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞানী। আমি তাঁকে দান করেছি ইসহাক এবং ইয়াকুব। প্রত্যেককেই আমি পথ প্রদর্শন করেছি এবং পূর্বে আমি নুহকে পথ প্রদর্শন করেছি-তাঁর সন্তানদের মধ্যে দাউদ, সোলায়মান, আইউব, ইউসুফ, মুসা ও হারুনকে। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। আর যাকারিয়া, ইয়াহিয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকে। তারা সবাই পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং ইসরাইল, ইয়াসা, ইউনুস, লুতকে প্রত্যেককেই আমি সারা বিশ্বের ওপর গৌরবান্বিত করেছি। [সুরা আনআম, আয়াত: ৮৩-৮৬]
আলোচ্য আয়াতে (ذريته) এর সর্বনামটি থেকে যদি ইবরাহিম আলাইহিস সালাম উদ্দেশ্য হয় তাহলে বলা যায়, তিনি অর্থাৎ আইয়ুব তাঁর বংশধর। তবে এটি সুনিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কেননা, এ ক্ষেত্রে লুত আলাইহিস সালামকেও ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বংশধর বলে সাব্যস্ত করা হয়। অথচ তিনি ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ভাতুষ্পুত্র। বংশধর নন। আর যদি সর্বনামটি থেকে নুহ আলাইহিস সালাম উদ্দেশ্য হয় তখন বলা যায় তিনি নুহ আলাইহিস সালামের বংশধর। সে ক্ষেত্রে সময়কাল নির্ধারণ করা অনেক কঠিন। সময়কাল যাই হোক না কেন, আমরা বিশ্বাস করি, তিনি একজন নবি ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে পরীক্ষা করেছেন। তিনিও আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন। পুরাতন নিয়মেও তার এই গুণের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে-
উস দেশে ইয়োব নামে এক ব্যক্তি ছিলেন; তিনি সিদ্ধ ও সরল, ঈশ্বরভয়শীল ও কুক্রিয়াত্যাগী ছিলেন।¹⁶⁸
একই অধ্যায়ে একটু পর বলা হয়েছে-
তাহাতে সদাপ্রভু শয়তানকে কহিলেন, আমার দাস ইয়োবের ওপরে কি তোমার মন পড়িয়াছে? কেননা তাহার তুল্য সিদ্ধ ও সরল, ঈশ্বরভয়শীল ও কুক্রিয়াত্যাগী লোক পৃথিবীতে কেহই নাই।¹⁶⁹
পুরাতন নিয়মের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি সাত পুত্র ও তিন কন্যার পিতা ছিলেন। তার সম্পদের মধ্যে ছিল সাত হাজার মেষ, তিন হাজার উট, পাঁচশ জোড়া বলদ, পাঁচশ গাধী এবং প্রচুর পরিমাণ দাস-দাসী। পূর্বাঞ্চলের লোকদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে মহান ও বিত্তশালী।¹⁷⁰ এরপর তাঁর সমস্ত সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যায়। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেন। আল্লাহ তাআলা খুশি হয়ে তাকে আগের চেয়েও বেশি বিত্তশালী বানিয়ে দেন। এই পুস্তকটিকে আমরা পাঁচটি অংশে ভাগ করতে পারি।
প্রথম: এ অংশে আইয়ুব এর আল্লাহভীতি, সম্পত্তির বিবরণ, আত্মীয়স্বজনের বর্ণনা এবং তার গুণাবলির আলোচনা স্থান পেয়েছে।
দ্বিতীয়: এ অংশে আইয়ুব ও তার তিন বন্ধুর মধ্যকার কথোপকথন আলোচিত হয়েছে। যন্ত্রণাদগ্ধ আইয়ুব প্রশ্ন করেছিলেন, কেন তার উপরেই মুসিবত এলো? তার বন্ধুরা ইসরাইলি ধর্মমত অনুযায়ী বিশ্বাস করত যে, ঈশ্বর সব সময় ধার্মিককে পুরস্কৃত করেন আর অধার্মিককে দণ্ড দেন। কাজেই কোনো পাপের ফলস্বরূপ এই নিদারুণ যন্ত্রণা তাকে দেওয়া হচ্ছে।
তৃতীয়: আইয়ুবের সর্বকনিষ্ঠ সাথি ইলিহুর প্রজ্ঞাপূর্ণ বচন এ অংশে স্থান পেয়েছে।
চতুর্থ : ঘূর্ণিবায়ুর মধ্য থেকে সৃষ্টিকর্তার আইয়ুবের সাথে কথোপকথন বিবৃত হয়েছে এ অংশে।
পঞ্চম: আইয়ুবের বিনয়, সুস্থতা এবং তার ধৈর্যের প্রতিদান সম্পর্কিত আলোচনা এ অংশে স্থান পেয়েছে।
টিকাঃ
১৬৬. দিরাসাতুল কিতাবিল মুকাদ্দাস, পৃষ্ঠা: ৩৬।
১৬৭. ইয়্যব, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ১।
১৬৮. ইয়োব, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ১।
১৬৯. ইয়োব, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ৯।
১৭০. ইয়োব, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ২-৩।
📄 ২. দাউদ গীত
এই পুস্তকে মোট গীতের সংখ্যা একশ পঞ্চাশ। এতে সন্নিবেশিত হয়েছে কতগুলো ধর্মীয় সংগীত/শ্লোক। ইসরাইলিরা তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষ্যে এগুলো আবৃত্তি করে থাকে। একশ পঞ্চাশটি গীতের মধ্যে তিয়াত্তরটি দাউদ আলাইহিস সালামের রচনা বিধায় পুস্তকটিকে তার দিকে সম্বন্ধ করা হয়। বাকি গীতগুলোর রচয়িতা হলেন-
নাম | সংখ্যা | গীত নং
মুসা | ১টি | ৯০
আসফ | ১২টি | ৫০, ৭৩-৮৩
কোরহ | ১১টি | ৪২, ৪৪-৪৯, ৮৪, ৮৫, ৮৭, ৮৮
সুলাইমান | ২টি | ৭২, ১২৭
এগুলো ছাড়াও আরও কিছু গীত আছে যেগুলোর রচয়িতা সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা যায় না। এ পুস্তকের প্রত্যেকটি গীত অন্যান্য পুস্তকের এক একটি অধ্যায়ের মতো। কুরআনুল কারিমে অবশ্য দাউদ আলাইহিস সালামকে যাবুর দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। যেমন বলা হচ্ছে-
وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا
আর আমি দাউদকে যাবুর প্রদান করলাম। [সুরা নিসা, আয়াত: ১৬৩]
অন্য আয়াতে এসেছে-
وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَى بَعْضٍ وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا.
আমি নবিদের কতেককে কতেকের ওপর মর্যাদা দিয়েছি আর দাউদকে যাবুর দিয়েছি। [সুরা ইসরা, আয়াত: ৫৫]
কুরআন বর্ণিত যাবুর এবং পুরাতন নিয়মের এই গীত এক নয়। কেননা, এই গীতগুলো দাউদ আলাইহিস সালামের চার শত বছর পর লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। পুরাতন নিয়মের নিম্নোক্ত বক্তব্য থেকেও বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যেখানে বলা হয়েছে—
আঃ! ইস্রায়েলের পরিত্রাণ সিয়োন হইতে উপস্থিত হউক। সদাপ্রভু যখন আপন প্রজাদের বন্দিত্ব ফিরাইবেন, তখন যাকোব উল্লসিত হইবে, ইস্রায়েল আনন্দ করিবে।¹⁷¹
অন্যস্থানে বলা হয়েছে— হে ঈশ্বর, জাতিগণ তোমার অধিকারে প্রবেশ করিয়াছে তাহারা তোমার পবিত্র মন্দির অশুচি করিয়াছে, যিরূশালেমকে স্তূপের ঢিবী করিয়াছে। তাহারা তোমার দাসদের শব আকাশের পক্ষিগণকে ভক্ষণার্থে দিয়াছে, তোমার সাধুদের মাংস পৃথিবীর পশুগণকে দিয়াছে। তাহারা যিরূশালেমের চারিদিকে জলের ন্যায় উহাদের রক্ত ঢালিয়াছে; উহাদের কবর দিবার কেহ ছিল না। আমরা প্রতিবাসিগণের নিকটে তিরস্কারের বিষয় হইয়াছি, চারিদিকে লোকদের কাছে হাস্য ও বিদ্রূপের পাত্র হইয়াছি। হে সদাপ্রভু, আর কতকাল তুমি নিরন্তর ক্রুদ্ধ থাকিবে? তোমার অন্তর্জালা কি অগ্নির ন্যায় জ্বলিবে? ঢালিয়া দেও তোমার কোপ সেই জাতিগণের উপরে, যাহারা তোমাকে জানে না— সেই রাজ্য সকলের উপরে, যাহারা তোমার নামে ডাকে না। কেননা তাহারা যাকোবকে গ্রাস করিয়াছে— তাহার বাসস্থান শূন্য করিয়াছে।¹⁷²
এই গীতটিকে আসফের দিকে সম্বন্ধ করা হয়। আসফ ছিলেন দাউদ আলাইহিস সালামের যুগের গায়ক ও বাদক দলের প্রধান যারা বীনা, নেবল ও করতালসহকারে গান করত।¹⁷³ সংগত কারণে বোঝা যাচ্ছে, এই পুস্তকটি বুখতে নসর এর আক্রমণের পর লেখা হয়েছে। কেননা ইসরাইলিরা এসমস্ত গীত পাঠ করে প্রভুর কাছে শত্রুর হাত থেকে নিস্তার কামনা করত। যেমন বলা হয়েছে—
সদাপ্রভু! আমাদের বন্দিদিগকে ফিরাইয়া আনো, দক্ষিণ দেশের প্রণালির ন্যায় ফিরাইয়া আনো।¹⁷⁴
সদাপ্রভু যিরূশালেম গাঁথেন, তিনি ইস্রায়েলের দূরীকৃতদিগকে সংগ্রহ করেন। তিনি ভগ্নচিত্তদিগকে সুস্থ করেন, তাহাদের ক্ষত সকল বাঁধিয়া দেন।¹⁷⁵
এই পুস্তক দাউদের গীত এর অন্তর্ভুক্ত। অথচ দাউদ আলাইহিস সালামের যুগের বহু পরের ব্যাবিলনীয় বন্দিদশা এবং পরবর্তীতে বনি ইসরাইলের ফিলিস্তিনে ফিরে আসার ঘটনা এখানে বিবৃত হয়েছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি কুরআনুল কারিমে বর্ণিত যাবুর এবং এই গীত এক নয়। এগুলো ঘটনা ও ইসরাইলি উপকথামাত্র, যা দাউদ আলাইহিস সালামের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, খ্রিষ্টানদের গির্জাগুলো এসব গীতকে ঐশীবাণী মনে করে, এমনকি এগুলো দিয়ে তাদের ইবাদত পরিচালনা করে।
টিকাঃ
১৭১. গীত, অধ্যায়: ১৪, অনুচ্ছেদ: ৭।
১৭২. গীত, অধ্যায়: ৭৯, অনুচ্ছেদ: ১-৭।
১৭৩. বংশাবলি, অধ্যায়: ২৫, অনুচ্ছেদ: ১০১
১৭৪. গীত, অধ্যায়: ৪, অনুচ্ছেদ: ১২৬।
১৭৫. গীত, অধ্যায়: ১৪৭, অনুচ্ছেদ: ২-৩।
📄 ৩. ৪. ৫. সুলেমান কাহিনি
এই তিনটি পুস্তকের নাম যথাক্রমে: হিতোপদেশ, উপদেশক ও পরম গীত। এই তিনটি পুস্কককে সুলাইমান আলাইহিস সালামের দিকে সম্বন্ধ করা হয়। কিন্তু গবেষকরা সহজেই ধরতে পারবেন যে, এটি তাঁর রচনা নয়। এ পুস্তকগুলোতে প্রজন্মান্তরে চলে-আসা বিভিন্ন শিষ্টাচারসম্বলিত আলোচনা স্থান পেয়েছে। নানা সময় নানাভাবে এখানে সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে, হয়েছে বিকৃতিসাধনও। এখানকার কতগুলো শ্লোক ইহুদিরা তাদের পাসওভার উৎসবে আবৃত্তি করে থাকে।
উপদেশক : ( الجامعة) উপদেশক বনি ইসরাইলের একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির নাম। বলা হয়ে থাকে, তিনি দাউদ আলাইহিস সালামের পুত্র। অনেকের মতে তিনি বনি- ইসরাইলের একজন রাজা ছিলেন। যেমন এই পুস্তকের শুরুতে বলা হয়েছে-
আমি উপদেশক, যিরূশালেমে ইস্রায়েলের উপরে রাজা ছিলাম। আর আমি প্রজ্ঞা দ্বারা আকাশের নিচে কৃত সমস্ত বিষয়ের অনুশীলন ও অনুসন্ধান করিতে মনোযোগ করিতাম।¹⁷⁶
টিকাঃ
১৭৬. উপদেশক, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ১২-১৩।