📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 ইহুদিদের অন্যান্য উৎসব

📄 ইহুদিদের অন্যান্য উৎসব


ঈদুল ফেসাখ বা পাসওভার (Passover) উৎসব: দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে মিশর ত্যাগ করা বনি ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ফেরাউনের নির্যাতন ও মিশরীয়দের গোলামির জিঞ্জির থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। কুরআন তাদেরকে বারংবার এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যাতে তারা আল্লাহর দ্বীনের দিকে ফিরে আসে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরিয়তের অনুগামী হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে সুপথে ফিরে আসার বদলে তারা তাদের মুক্তির দিনটিকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করে। এই দিনটিকে তারা ঈদুল ফেসাখ বা পাসওভার (Passover) উৎসব নাম দিয়ে আড়ম্ভরতার সাথে পালন করে থাকে। এই উৎসবের আরেক নাম ঈদুল ফিতর। বনি ইসরাইলকে খুব দ্রুত মিশর থেকে বের হতে বলা হয়েছিল। ফলে তারা রুটির খামিরকে ভালোভাবে গাজাতে পারেনি। সেদিকে লক্ষ্য করেই এই নামকরণ করা হয়েছে। যাত্রাপুস্তক এর দ্বাদশ অধ্যায়ে এই উৎসব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এপ্রিলের ১৪ তারিখ সন্ধ্যায় শুরু হয়ে ২১ তারিখ সন্ধ্যা পর্যন্ত এই উৎসব পালিত হয়। এরপর তারা ভেড়া জবাই করে। প্রবাহিত রক্ত তাদের প্রায়শ্চিত্তের প্রতীক বহন করে। আর মিশরের বন্দিদশার কথা স্মরণ করে এই দিনগুলোতে তেতো লতা-পাতা খাওয়া হয়। পরিবারের প্রধান কিংবা উপস্থিতিদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এসময় তাদেরকে মিশর ত্যাগের কাহিনি পড়ে শোনান। ইহুদি ধর্মমতে কেউ যদি এই নিয়মের ব্যতিক্রম করে তাহলে সে ইসরাইলি দলভুক্ত থাকে না।

অন্যান্য উৎসবঃ
* ঈদুল আসাবি (Shavuot): ঈদুল ফেসাখ তথা পাসওভারের সাত সপ্তাহ পর জুনের ছয় তারিখে এই উৎসব পালন করা হয়। কথিত আছে, এই দিনে আল্লাহ তাআলা তুর পর্বতে মুসা আলাইহিস সালামের সাথে আলাপ করেছিলেন।
* রোশ হাশানা (Rosh Hashana): তাদের ধারণা এই দিনে ইসহাক আলাইহিস সালামকে জবাই থেকে মুক্তি দিয়ে তদস্থলে দুম্বা জবাই দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে তিনি ইসহাক ছিলেন না। ছিলেন ইসমাইল। ইতিপূর্বে আমরা বিষয়টি স্পষ্ট করে এসেছি।
* ঈদুল সোমারিয়া: অর্থ্যাৎ বড় উপবাস। এই দিনে ইহুদিরা রোজা রাখে। তারা বিশ্বাস করে এটি মুসা আলাহিস সালাম কর্তৃক উপবাস যাপনের তৃতীয় চল্লিশ দিনের শেষ দিন এটি।
* ঈদুস মিজাল্লা: তারা সাত দিন কুঁড়েঘরে বসবাস করে।¹⁴⁷ হাইকল যখন আবাদ ছিল তখন তাদের উপর বছরে তিনবার তীর্থ যাত্রা করা আবশ্যক ছিল।¹⁴⁸

টিকাঃ
১৪৭. সিনাইতে তাদের চল্লিশ বছরের যাযাবর জীবনের স্মৃতিরোমন্থনস্বরূপ তারা এটি করে থাকে।
১৪৮. বিস্তারিত: তারিখুল ইয়াহুদ, মাকরিজি, পৃষ্ঠা: ১৪০-১৪১

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 তৃতীয় পুস্তক : লেবীয় পুস্তক

📄 তৃতীয় পুস্তক : লেবীয় পুস্তক


মুসা আলাইহিস সালামের দাদা লেবি বিন ইয়াকুবের দিকে সম্বন্ধ করে এই পুস্তকটিকে লেবীয় পুস্তক বলা হয়। লেবির বংশধর ছিল ইহুদি সম্প্রদায়ের পৌরোহিত্য পালনকারী তথা যাজক শ্রেণি। দীর্ঘদিন পর্যন্ত সমাগম তাঁবু বহন ও স্থাপনের দায়িত্ব তাদের হাতেই অর্পিত ছিল। এই পুস্তকে তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তাই পুস্তকটি এই নামে নামকরণ করা হয়। পাশাপাশি এই পুস্তকে আনুষ্ঠানিক রীতিনীতি, বিধিব্যবস্থা সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। এই পুস্তক এর বিষয়বস্তু নিম্নরূপ।

এক. যাজক ও পূজারি কর্তৃক নৈবেদ্য ও বলিদানের নিয়মাবলি。

দুই. হারুন ও তার পুত্রদের যাজকীয় পদে অভিষেক。

তিন. পবিত্রতা ও অপবিত্রতা সম্পর্কিত বর্ণনা。

চার. মানত ও প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতির বিধান。

ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করে এই পুস্তকটি মুসা আলাইহিস সালাম লিপিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু গবেষকগণ বলছেন এটি খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে লেখা হয়েছে। এই পুস্তকের সূচিপত্র থেকে সেটাই পরিস্ফুট হয়।

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 চতুর্থ পুস্তক : গণনা পুস্তক

📄 চতুর্থ পুস্তক : গণনা পুস্তক


এটি পূর্ববর্তী তিনটি পুস্তকের পরিশিষ্ট এর মতো। এখানে ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সময় থেকে নিয়ে বনি ইসরাইলের মিশর ত্যাগের ঘটনা, অতঃপর সিনাই মরুভূমিতে তাদের জীবনযাপনের ঘটনা এবং সর্বশেষে মোয়াব অঞ্চলে পৌঁছার কাহিনি বিবৃত হয়েছে।

বনি ইসরাইলের বিভিন্ন গোত্রের সৈন্যসংখ্যা, সম্পদ ও চতুষ্পদ জন্তুর গণনা স্থান পেয়েছে বিধায় এটিকে গণনা পুস্তক বলা হয়। সিনাই পৌঁছে মুসা আলাইহিস সালাম প্রথম যে কাজটি করেছিলেন তা ছিল লেবির বংশধর ব্যতীত অন্যদের আদমশুমারি করা এবং প্রত্যেক গোত্রের অবস্থান নির্ধারণ করা। এরপর লেবীয়দেরকে গণনা করে তাদের অবস্থানস্থল নির্ধারণ করা এবং তাদের পৌরোহিত্যকার্য সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়া। ইসরাইলিদের সিনাইতে দুবার আদমশুমারি হয়েছিল। তন্মধ্যে প্রথমবার হয়েছিল মিশর থেকে বেরিয়ে আসার দ্বিতীয় বছরের দ্বিতীয় মাসে। লেবীয়দেরকে বাদ দিয়ে অস্ত্র বহন করতে পারে এমন বিশোর্ধ বয়সী পুরুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয় লক্ষ তিন হাজার পাঁচশ পঞ্চাশ জনে।¹⁴⁹ প্রত্যেক গোত্রের সংখ্যা ছিল নিম্নরূপ।

ক্র. - বংশের নাম - সংখ্যা
১. রুবেন এর বংশ : ৪৬৫০০
২. শিমিয়ন এর বংশ : ৫৯৩০০
৩. গাদ এর বংশ : ৪৫৬৫০
৪. যিহুদা এর বংশ : ৭৪৬০০
৫. ইষাখার এর বংশ : ৫৪৪০০
৬. ইফ্রয়িম এর বংশ : ৪০৫০০
৭. যবুলুন এর বংশ : ৫৭৪০০
৮. মনঃশি এর বংশ : ৩২২০০
৯. বিন্যামিন এর বংশ : ৩৫৪০০
১০. দান এর বংশ : ৬২৭০০
১১. আশের এর বংশ : ৪১৫০০
১২. নফতালি এর বংশ : ৫৩৪০০
মোট : ৬০৩৫৫০

এই গণনায় লেবীয়দেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে তাদের এক মাস বা তদূর্ধ্ব বয়সী পুরুষের সংখ্যা ছিল বাইশ হাজার।¹⁵⁰ বনি ইসরাইলের এই সংখ্যাতে নিশ্চিত অতিরঞ্জন করা হয়েছে। ইতিপূর্বে আমরা তা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সাথে যারা কানান থেকে এসেছিলেন তাদের সংখ্যা ছিল সত্তর। এরপর মিশরে মাত্র দুটি প্রজন্ম জন্মগ্রহণ করে। মুসা আলাইহিস সালামের পিতা ইমরানের প্রজন্ম এবং মুসা আলাইহিস সালামের প্রজন্ম। সত্তরজনের একটি গোষ্ঠী মাত্র দুই প্রজন্মের ব্যবধানে ছয় লক্ষে পৌঁছে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব ও অযৌক্তিক। তাও এই ছয় লক্ষ সংখ্যাটি বৃদ্ধ, শিশু ও নারীদেরকে বাদ দিয়ে। এদিকে লেবীয়দের সংখ্যাটা আরও বেশি আশ্চর্যজনক। লেবি হলেন ইমরানের দাদা। তার তিন পুত্র। গোর্শন, কহাৎ ও মরারি। এদের মধ্যে কহাত হলেন মুসা আলাইহিস সালামের দাদা। সংগত কারণে লেবির এই তিন পুত্র থেকে এত অল্প সময়ে বংশবিস্তার হয়ে বাইশ হাজারে পৌঁছা একেবারেই অসম্ভব।

বনি ইসরাইলের দ্বিতীয় আদমশুমারি হয়েছিল প্রথম শুমারির আটত্রিশ বছর পর তাদের কানানে প্রবেশের পূর্বে।¹⁵¹ এই শুমারিতে লেবীয়দের সংখ্যা ছিল তেইশ হাজার আর অন্যদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ এক হাজার সাতশ ত্রিশ।¹⁵² নিরপেক্ষ খ্রিষ্টানদের অনেকেই স্বীকার করেন যে, এ সংখ্যাতত্ত্বে অতিরঞ্জন রয়েছে।¹⁵³

টিকাঃ
১৪৯. গণনা পুস্তক, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ৪৫-৪৬।
১৫০. গণনা পুস্তক, অধ্যায়: ৩, অনুচ্ছেদ: ৩৯।
১৫১. গণনা পুস্তক, অধ্যায় ২৬, অনুচ্ছেদ: ৫১।
১৫২. গণনা পুস্তক, অধ্যায় ২৬, অনুচ্ছেদ: ৫১।
১৫৩. মনিনি, উর্দু সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ২০৫

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 পঞ্চম পুস্তক : দ্বিতীয় বিবরণ

📄 পঞ্চম পুস্তক : দ্বিতীয় বিবরণ


মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়তের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে বলেই পুস্তকটির এ নামকরণ করা হয়েছে। এ পুস্তকে মূলত বনি-ইসরাইলের জন্য শরিয়তের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইহুদিদের দাবি হলো, ইউশা ইবনে নুন নেতৃত্বে আসার পূর্বে মুসা আলাইহিস সালাম এই পুস্তকটি লিপিবদ্ধ করেছেন। তবে গবেষকদের মত হলো এটি সম্রাট যিহুদা (৬৯৩-৬৩৯ খ্রিষ্টপূর্ব) এর সময়ে লিপিবদ্ধ করা হয় এবং যিশাইয় (৬৩৮-৬০৮ খ্রিষ্টপূর্ব) এর সময়ে এটি প্রকাশিত হয়।¹⁵⁴ কেননা এই পুস্তকে মুসা আলাইহিস সালামের মৃত্যু এবং তৎপরবর্তী উপর্যুক্ত সময়কাল পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ স্থান পেয়েছে।

এই পুস্তকে রাজনীতি, যুদ্ধ, অর্থনীতি, সামাজিক রীতিনীতি ও লেনদেনসম্পর্কিত বিধিবিধান আলোচিত হয়েছে। এ ছাড়াও মুসা আলাইহিস সালামের তিনটি ঐতিহাসিক খুতবা এই পুস্তকে স্থান পেয়েছে। যেগুলো তিনি মোয়াবে মিশর থেকে বের হওয়ার চল্লিশ বছর পূর্তিতে বনি ইসরাইলের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। খুতবাগুলোর বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ।

প্রথম খুতবা : আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি উৎসাহ প্রদান。

দ্বিতীয় খুতবা: দশ আদেশের পুনরাবৃত্তি, শরিয়ত পালনের বরকত এবং শরিয়ত না মানার পরিণতি。

তৃতীয় খুতবা : বনি-ইসরাইলকে উদ্দেশ্য করে মুসা আলাইহিস সালামের বিদায়-সম্ভাষণ。

টিকাঃ
১৫৪. মনিনি, উর্দু সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ২০৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px