📄 দ্বিতীয় পুস্তক : যাত্রাপুস্তক
বনি ইসরাইলের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা আলোচিত হয়েছে এ পুস্তকে। দীর্ঘদিন ফেরাউনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর বনি ইসরাইল মুসা আ. এর সাথে মিশর ত্যাগ করে সিনাই মরুতে পৌঁছায় এবং সেখানে চল্লিশ বছর উদভ্রান্তের মতো ঘুরতে থাকে। উক্ত ঘটনাই সবিস্তারে বিবৃত হয়েছে এ পুস্তকে। পাশাপাশি ইবাদত, লেনদেন এবং শাস্তি সম্পর্কিত কিছু বিধিবিধানও এ পুস্তকে স্থান পেয়েছে। পুস্তকটিকে আমরা মোটামুটি তিনটি অংশে ভাগ করতে পারি।
এক. মিশরে অবস্থানকালীন সময়ের আলোচনা। এই অংশে পুস্তকটি ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সপরিবারে মিশরে আগমন সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করেছে। অতঃপর ইউসুফ আলাইহিস সালামের ওফাতের পর বনি ইসরাইলের ওপর নেমে আসা দুর্যোগ, মুসা আলাইহিস সালামের জন্ম, তার প্রাথমিক জীবন, দাওয়াতের পদ্ধতি, ফেরাউনের সাথে বিরোধ, অতঃপর ফিরাউন ও মিশরীয়দের ওপর দশটি আঘাতের বর্ণনা করা হয়েছে।
দুই. মিশর থেকে সিনাই-। এই অংশে বনি ইসরাইলের মিশর ত্যাগ, অতঃপর সমুদ্রে রাস্তা হয়ে যাওয়া এবং মরুভূমিতে তাদের জন্য আসমানি খাবার মান্না-সালওয়ার ব্যবস্থাপনা প্রভৃতির আলোচনা স্থান পেয়েছে।
তিন. সিনাইতে বনি ইসরাইলের জীবনযাপন। এ অংশে সিনাইতে বনি ইসরাইলের জীবনযাপন, মুসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক আনীত শরীয়তের বিরুদ্ধাচরণ, গোবৎস উপাসনা, মুসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক বনি ইসরাইলের নিন্দা, মুসা আলাইহিস সালামের তুর পর্বতে গমন প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। শেষোক্ত বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে বলা হয়েছে-
وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
আর যখন আমি মুসার সাথে ওয়াদা করেছি চল্লিশ রাত্রির ... [সুরা বাকারা, আয়াত: ৫১]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَوَاعَدْنَا مُوسَى ثَلَاثِينَ لَيْلَةً وَأَتْمَمْنَاهَا بِعَশْرٍ فَتَمَّ مِيقَاتُ رَبِّهِ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً .
আর আমি মুসাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি ত্রিশ রাত্রির এবং সেগুলোকে পূর্ণ করেছি আরও দশ দ্বারা। বস্তুত এভাবে চল্লিশ রাতের মেয়াদ পূর্ণ হয়ে গেছে। [সুরা আরাফ, আয়াত: ১৪২]
📄 দশ আদেশ বা আজ্ঞা
মুসা আলাইহিস সালাম কীভাবে দশ আদেশ প্রাপ্ত হয়েছেন এ নিয়ে তাওরাতের আলোচনা বিরোধপূর্ণ। তাওরাত কখনো বলছে, আল্লাহ তাআলা নিজেই এই কালিমাগুলো বলেছেন।¹⁴² আর মুসা আলাইহিস সালাম স্বহস্তে তা লিপিবদ্ধ করেছেন। আবার অন্য সময় বলছে, এই দশটি আদেশ আল্লাহর আঙুল দ্বারা পাথরে লিখিত আকারে মুসা আলাইহিস সালামকে দেওয়া হয়েছে।¹⁴³
মুসা আলাইহিস সালাম চল্লিশ দিন পর পাহাড় থেকে নেমে এসে দেখলেন বনি ইসরাইল বাছুর পুজায় লিপ্ত হয়েছে। তিনি ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। এমনকি রাগের মাথায় দুটি ফলক ভেঙে ফেললেন। এরপর অবাধ্য জাতিকে পবিত্র করার পর পুনরায় তিনি আল্লাহর নির্দেশে পাহাড়ে গেলেন। এবারে তিনি নতুন দুটি ফলক নিয়ে এলেন। এগুলোতে প্রভুর আদেশ লিপিবদ্ধ ছিল।¹⁴⁴ তবে এ দুটি ফলক মুসা আলাইহিস সালামের নিজ হাতে খোদাই-করা ছিল।¹⁴⁵ বর্ণনার এই বিরোধ কথিত তাওরাতের ওপর স্বাভাবিকভাবেই মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি করে।
দশটি আদেশের মধ্যে প্রথম তিনটি হলো আল্লাহর প্রতি মানুষের কর্তব্য তথা হক্কুল্লাহ সম্পর্কে। এই তিনটি আদেশ প্রথম ফলকে লিপিবদ্ধ ছিল। আর বাকি সাতটি আদেশ হলো মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব তথা হক্কুল ইবাদ সম্পর্কে। এগুলো দ্বিতীয় ফলকে লিপিবদ্ধ ছিল। এই বিভাজনটি অগাস্টিন কর্তৃক বর্ণিত। রোমান ক্যাথলিকগণ এটিকে গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য অনেক ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মত হলো, প্রথম ফলকে চারটি আদেশ এবং দ্বিতীয় ফলকে ছয়টি আদেশ লিপিবদ্ধ ছিল। তাওরাতে বর্ণিত সেই দশটি আদেশ আমরা ধারাবাহিকভাবে নিম্নে বর্ণনা করলাম।
প্রথম আদেশ: আমি তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু, যিনি মিসর দেশ হইতে, দাস-গৃহ হইতে, তোমাকে বাহির করিয়া আনিলেন। আমার সাক্ষাতে তোমার অন্য দেবতা না থাকুক।
দ্বিতীয় আদেশ: "তুমি আপনার নিমিত্ত খোদিত প্রতিমা নির্মাণ করিও না; উপরিস্থ স্বর্গে, নিচস্থ পৃথিবীতে ও পৃথিবীর নিচস্থ জলমধ্যে যাহা যাহা আছে, তাহাদের কোনো মূর্তি নির্মাণ করিও না; তুমি তাহাদের কাছে প্রণিপাত করিও না, এবং তাহাদের সেবা করিও না; কেননা তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু আমি স্বগৌরব রক্ষণে উদ্যোগী ঈশ্বর; আমি পিতৃগণের অপরাধের প্রতিফল সন্তানদের ওপরে বর্তাই, যাহারা আমাকে দ্বেষ করে, তাহাদের তৃতীয় চতুর্থ পুরুষ পর্যন্ত বর্তাই; কিন্তু যাহারা আমাকে প্রেম করে ও আমার আজ্ঞা সকল পালন করে, আমি তাহাদের সহস্র (পুরুষ) পর্যন্ত দয়া করি। তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর নাম অনর্থক লইও না, কেননা যে কেহ তাঁহার নাম অনর্থক লয়, সদাপ্রভু তাহাকে নির্দোষ করিবেন না।"
তৃতীয় আদেশ: তুমি বিশ্রামদিন (শনিবার) স্মরণ করিয়া পবিত্র করিও। ছয় দিন শ্রম করিও, আপনার সমস্ত কার্য করিও; কিন্তু সপ্তম দিন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশে বিশ্রামদিন। সেই দিন তুমি, কি তোমার পুত্র কি কন্যা, কি তোমার দাস কি দাসী, কি তোমার পশু, কি তোমার পুরদ্বারের মধ্যবর্তী বিদেশী, কেহ কোনো কার্য করিও না। কেননা সদাপ্রভু আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী, সমুদ্র ও সেই সকলের মধ্যবর্তী সমস্ত বস্তু ছয় দিনে নির্মাণ করিয়া সপ্তম দিনে বিশ্রাম করিলেন। এই জন্য সদাপ্রভু বিশ্রামদিনকে আশীর্বাদ করিলেন, ও পবিত্র করিলেন।
চতুর্থ আদেশ: তোমার পিতাকে ও তোমার মাতাকে সমাদর করিও, যেন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমাকে যে দেশ দিবেন, সেই দেশে তোমার দীর্ঘ পরমায়ু হয়।
পঞ্চম আদেশ: নরহত্যা করিও না।
ষষ্ঠ আদেশ: ব্যভিচার করিও না।
সপ্তম আদেশ: চুরি করিও না।
অষ্টম আদেশ: তোমরা প্রতিবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ো না।
নবম আদেশ: তোমরা লোভ করিও না প্রতিবাসীর স্ত্রীতে।
দশম আদেশ: কিংবা প্রতিবাসীর গৃহে বা তাহার দাসে কি দাসীতে, কিংবা তাহার গরুতে কি গর্দভে, প্রতিবাসীর কোনো বস্তুতেই লোভ করিও না।¹⁴⁶
টিকাঃ
১৪২. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ২০, অনুচ্ছেদ: ১।
১৪৩. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ৩১, অনুচ্ছেদ: ১৮; অধ্যায়: ৩২, অনুচ্ছেদ: ১৫-১৬।
১৪৪. কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাস, পৃষ্ঠা: ৯-১০
১৪৫. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ২৪, অনুচ্ছেদ: ১-৪।
১৪৬. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ২০, অনুচ্ছেদ: ১-১৭; দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায়: ৫, অনুচ্ছেদ: ৬-২১।
📄 ইহুদিদের অন্যান্য উৎসব
ঈদুল ফেসাখ বা পাসওভার (Passover) উৎসব: দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে মিশর ত্যাগ করা বনি ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ফেরাউনের নির্যাতন ও মিশরীয়দের গোলামির জিঞ্জির থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। কুরআন তাদেরকে বারংবার এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যাতে তারা আল্লাহর দ্বীনের দিকে ফিরে আসে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরিয়তের অনুগামী হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে সুপথে ফিরে আসার বদলে তারা তাদের মুক্তির দিনটিকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করে। এই দিনটিকে তারা ঈদুল ফেসাখ বা পাসওভার (Passover) উৎসব নাম দিয়ে আড়ম্ভরতার সাথে পালন করে থাকে। এই উৎসবের আরেক নাম ঈদুল ফিতর। বনি ইসরাইলকে খুব দ্রুত মিশর থেকে বের হতে বলা হয়েছিল। ফলে তারা রুটির খামিরকে ভালোভাবে গাজাতে পারেনি। সেদিকে লক্ষ্য করেই এই নামকরণ করা হয়েছে। যাত্রাপুস্তক এর দ্বাদশ অধ্যায়ে এই উৎসব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এপ্রিলের ১৪ তারিখ সন্ধ্যায় শুরু হয়ে ২১ তারিখ সন্ধ্যা পর্যন্ত এই উৎসব পালিত হয়। এরপর তারা ভেড়া জবাই করে। প্রবাহিত রক্ত তাদের প্রায়শ্চিত্তের প্রতীক বহন করে। আর মিশরের বন্দিদশার কথা স্মরণ করে এই দিনগুলোতে তেতো লতা-পাতা খাওয়া হয়। পরিবারের প্রধান কিংবা উপস্থিতিদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এসময় তাদেরকে মিশর ত্যাগের কাহিনি পড়ে শোনান। ইহুদি ধর্মমতে কেউ যদি এই নিয়মের ব্যতিক্রম করে তাহলে সে ইসরাইলি দলভুক্ত থাকে না।
অন্যান্য উৎসবঃ
* ঈদুল আসাবি (Shavuot): ঈদুল ফেসাখ তথা পাসওভারের সাত সপ্তাহ পর জুনের ছয় তারিখে এই উৎসব পালন করা হয়। কথিত আছে, এই দিনে আল্লাহ তাআলা তুর পর্বতে মুসা আলাইহিস সালামের সাথে আলাপ করেছিলেন।
* রোশ হাশানা (Rosh Hashana): তাদের ধারণা এই দিনে ইসহাক আলাইহিস সালামকে জবাই থেকে মুক্তি দিয়ে তদস্থলে দুম্বা জবাই দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে তিনি ইসহাক ছিলেন না। ছিলেন ইসমাইল। ইতিপূর্বে আমরা বিষয়টি স্পষ্ট করে এসেছি।
* ঈদুল সোমারিয়া: অর্থ্যাৎ বড় উপবাস। এই দিনে ইহুদিরা রোজা রাখে। তারা বিশ্বাস করে এটি মুসা আলাহিস সালাম কর্তৃক উপবাস যাপনের তৃতীয় চল্লিশ দিনের শেষ দিন এটি।
* ঈদুস মিজাল্লা: তারা সাত দিন কুঁড়েঘরে বসবাস করে।¹⁴⁷ হাইকল যখন আবাদ ছিল তখন তাদের উপর বছরে তিনবার তীর্থ যাত্রা করা আবশ্যক ছিল।¹⁴⁸
টিকাঃ
১৪৭. সিনাইতে তাদের চল্লিশ বছরের যাযাবর জীবনের স্মৃতিরোমন্থনস্বরূপ তারা এটি করে থাকে।
১৪৮. বিস্তারিত: তারিখুল ইয়াহুদ, মাকরিজি, পৃষ্ঠা: ১৪০-১৪১
📄 তৃতীয় পুস্তক : লেবীয় পুস্তক
মুসা আলাইহিস সালামের দাদা লেবি বিন ইয়াকুবের দিকে সম্বন্ধ করে এই পুস্তকটিকে লেবীয় পুস্তক বলা হয়। লেবির বংশধর ছিল ইহুদি সম্প্রদায়ের পৌরোহিত্য পালনকারী তথা যাজক শ্রেণি। দীর্ঘদিন পর্যন্ত সমাগম তাঁবু বহন ও স্থাপনের দায়িত্ব তাদের হাতেই অর্পিত ছিল। এই পুস্তকে তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তাই পুস্তকটি এই নামে নামকরণ করা হয়। পাশাপাশি এই পুস্তকে আনুষ্ঠানিক রীতিনীতি, বিধিব্যবস্থা সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। এই পুস্তক এর বিষয়বস্তু নিম্নরূপ।
এক. যাজক ও পূজারি কর্তৃক নৈবেদ্য ও বলিদানের নিয়মাবলি。
দুই. হারুন ও তার পুত্রদের যাজকীয় পদে অভিষেক。
তিন. পবিত্রতা ও অপবিত্রতা সম্পর্কিত বর্ণনা。
চার. মানত ও প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতির বিধান。
ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করে এই পুস্তকটি মুসা আলাইহিস সালাম লিপিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু গবেষকগণ বলছেন এটি খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে লেখা হয়েছে। এই পুস্তকের সূচিপত্র থেকে সেটাই পরিস্ফুট হয়।