📄 ১ম পুস্তক : আদিপুস্তক
বিষয় বিবেচনায় এই পুস্তকটিকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি।
এক. সৃষ্টির সূচনা ও তার পর্যায়সমূহ।
দুই. পৃথিবীতে মানব জাতির পদার্পণ, আদম-হাওয়া, নুহ আলাইহিস সালামের প্লাবন, প্লাবন পরবর্তী নতুন পৃথিবীর বিকাশ।
তিন. ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্ম, তার অবস্থা, সফর, দাওয়াত, সন্তানসন্ততি, বনি ইসরাইলের মিশর গমন, ইউসুফ ও তার ভাইদের ঘটনা, সর্বশেষ ইয়াকুব আলাইহিস সালাম ও ইউসুফ আলাইহিস সালামের মৃত্যু।
আদিপুস্তক এর প্রথম অংশে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখব, বিশ্বজগতের সৃষ্টির আলোচনা করতে গিয়ে সেখানে যথেষ্ট বৈপরীত্যপূর্ণ বক্তব্য স্থান পেয়েছে। এ ছাড়াও কতগুলো বক্তব্য বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সুস্পষ্ট ভুল হিসেবে প্রমাণিত। যেমন আদিপুস্তকে বলা হয়েছে, পরে ঈশ্বর কহিলেন, দীপ্তি হউক; তাহাতে দীপ্তি হইল। তখন ঈশ্বর দীপ্তি উত্তম দেখিলেন, এবং ঈশ্বর অন্ধকার হইতে দীপ্তি পৃথক করিলেন।¹³⁶ এটি ছিল সৃষ্টির প্রথম দিনের ঘটনা। এর একটু পরেই চতুর্থ দিনের বিবরণিতে বলা হয়েছে- পরে ঈশ্বর কহিলেন, রাত্রি হইতে দিবসকে ভিন্ন করণার্থে আকাশমণ্ডলের বিতানে জ্যোতির্গণ হউক; সেই সমস্ত চিহ্নের জন্য, ঋতুর জন্য এবং দিবসের ও বৎসরের জন্য হউক; এবং পৃথিবীতে দীপ্তি দিবার জন্য দীপ বলিয়া তাহা আকাশমণ্ডলের বিতানে থাকুক; তাহাতে সেইরূপ হইল।¹³⁷
এখান থেকে বোঝা যায়, নক্ষত্র থেকে বিচ্ছুরিত আলোকে প্রথম দিনে সৃষ্টি করা হয়েছে। পক্ষান্তরে নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করা হয়েছে চতুর্থ দিন। মাধ্যমের আগে ফলাফল বা গাছের আগে ফলের আত্মপ্রকাশের মতো একটি অযৌক্তিক বিষয়ের অবতারণা এখান থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে। আল্লাহপ্রদত্ত ওহিতে এমন অবাস্তব বিষয়ের অবতারণা অকল্পনীয়।
একই পুস্তকের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে— পরে ঈশ্বর সপ্তম দিবসে আপনার কৃতকার্য হইতে নিবৃত্ত হইলেন, সেই সপ্তম দিবসে আপনার কৃত সমস্ত কার্য হইতে বিশ্রাম করিলেন।¹³⁸
এখানে আল্লাহ তাআলা বিশ্রাম নিয়েছেন বলা হচ্ছে। তার মানে জগৎ সৃষ্টি করতে গিয়ে তার পরিশ্রম হয়েছে। তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। অতঃপর বিশ্রাম নিয়েছেন। এমন চিন্তা-বিশ্বাস আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। প্রকারান্তরে তার সত্তার ত্রুটির পরিচায়ক। অথচ তিনি সমস্ত ত্রুটির ঊর্ধ্বে। তা ছাড়া যেখানে সবকিছু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় তার বাণী কুন (হও) বললেই হয়ে যায়, সেখানে পরিশ্রান্ত হওয়া অতঃপর বিশ্রাম নেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। আর যদি বিশ্রাম থেকে উদ্দেশ্য হয় সপ্তম দিনে তিনি কর্মহীন থেকেছেন তাহলে সেটা তার চিরঞ্জীবিতা ও স্থায়িত্বকে বাতিল করে দেয়। আল্লাহ তাআলার সত্তায় কর্মহীন শব্দটি প্রয়োগ করা যায় না। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনুল কারিমই একমাত্র ন্যায়সংগত বক্তব্য দিয়েছে সেখানে বলা হচ্ছে-
وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِنْ لُغُوبٍ
আমি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি এবং আমাকে কোনোরুপ ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। [সুরা ক্বাফ, আয়াত : ৩৮]
তাওরাতের এই বিষয়টি নিয়ে আপত্তি আসার পর তাদের পণ্ডিতগণ বিভিন্ন সংস্করণ ও অনুবাদে বিশ্রামের অর্থকে বিরত থাকা অর্থে পাল্টে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ছয় দিনে আসমান জমিন সৃষ্টি করে সপ্তম দিনে কাজ থেকে বিরত থেকেছেন। কেননা কাজ সমাপ্ত হয়ে গিয়েছে। যেমন ইংরেজি অনুবাদে বলা হয়েছে, And also the whole universe was completed by the seventh day God finished what He had been doing and stopped working.
উর্দু হিন্দিসহ আরও বিভিন্ন ভাষার অনুবাদেও তারা এমন পরিবর্তন করেছে।
আদিপুস্তক এর চতুর্থ, পঞ্চম, একাদশ, একবিংশ ও পঞ্চবিংশ অধ্যায়ে আদম আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত আদি পুরুষগণের আয়ুষ্কাল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আদম আলাইহিস সালামকে সূচনা ধরে প্রত্যেকের জন্ম ও মৃত্যু সাল উল্লেখ করা হয়েছে। ফরাসি বিজ্ঞানী মরিস বুকাইলি এ সংক্রান্ত একটি চার্ট তৈরি করেছেন চার্টটি তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে কিতাবুল মুকাদ্দাস অধ্যয়ন এ উল্লেখ করেছেন। আমরা এখানে চার্টটি হুবহু তুলে ধরছি।
ক্র: নাম - জন্মসন (আদম আ.-কে সৃষ্টি সূচনা ধরে) - বয়স - মৃত্যুসন
১. আদম : ... - ৯৩০ - ৯৩০
২. শেথ (শীষ) : ১৩০ - ৯১২ - ১০৪২
৩. ইনোশ : ২৩৫ - ৯০৫ - ১১৪০
৪. কৈনন : ৩২৫ - ৯১০ - ১২৩৫
৫. মহললেল : ৩৯৫ - ৮৯৫ - ১২৯০
৬. যেরদ : ৪৬০ - ৯৬২ - ১৪২২
৭. হনোক : ৬২২ - ৩৬৫ - ৯৮৭
৮. মথুশেলহ : ৬৮৭ - ৯৬৯ - ১৬৫৬
৯. লেমক : ৮৭৪ - ৭৭৭ - ১৬৫১
১০. নুহ : ১০৫৬ - ৯৫০ - ২০০৬
১১. শেম : ১৫৫৬ - ৬০০ - ২১৫৬
১২. অর্ফকশদ : ১৬৫৮ - ৪৩৮ - ২০৯৬
১৩. শেলহ : ১৬৯৩ - ৪৩৩ - ২১২২
১৪. এবর : ১৭২৩ - ৪৬৪ - ২১৮৭
১৫. পেলগ : ১৭৫৭ - ২৩৯ - ১৯৯৬
১৬. রিয়ু : ১৭৮৭ - ২৩৯ - ২০২৬
১৭. সরুগ : ১৮১৯ - ২৩০ - ২০৪৯
১৮. নাহোর : ১৮৪৯ - ১৪৮ - ১৯৯৭
১৯. তেরহ : ১৮৭৮ - ২০৫ - ২০৮৩
২০. ইবরাহিম : ১৯৪৮ - ১৭৫ - ২১২৩
এই চার্টটির দিকে তাকালে আমরা দেখব যে, নুহ আলাইহিস সালামের জীবদ্দশাতেই ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্ম হয়। অথচ প্রাচীন ইতিহাসে তারা সমকালীন হওয়া কিংবা তাদের পরস্পরের সাক্ষাতের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। চার্ট থেকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়— নুহ আলাইহিস সালামের প্লাবন এবং ইবরাহিম আলাইহিস সালামের মাঝে সর্বোচ্চ ব্যবধান হলো ৮৯২ বছর। তাও যদি আমরা মনে করি যে নুহ আলাইহিস সালামের জন্মের পর পরই প্লাবন হয়েছিল। অথচ এটা অসম্ভব। প্লাবনের সম্ভাব্য সময় ছিল আদম আলাইহিস সালামের আগমনের ১৫৩১ বছর পর এবং ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্মের ৪১৭ বছর পূর্বে। খ্রিষ্টপূর্ব হিসেবে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন সর্বোচ্চ ১৮ শতকের মানুষ। সে হিসেবে সর্বগ্রাসী সেই প্লাবনটি সংঘটিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাবিংশ শতাব্দীতে। অবশ্য মরিস বুকাইলি যাজকদের বর্ণনার ভিত্তিতে প্লাবনের সময় নুহ আলাইহিস সালামের বয়স ৬০০ ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। এটি কুরআনের বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা, কুরআনে বলা হচ্ছে—
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمْسِينَ عَامًا فَأَخَذَهُمُ الطُّوفَانُ وَهُمْ ظَالِمُونَ
আমি নুহ আলাইহিস সালামকে তার সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছিলাম। তিনি তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিলেন। অতঃপর তাদেরকে মহাপ্লাবন গ্রাস করেছিল। তারা ছিল জালিম। [সুরা আনকাবুত, আয়াত: ১৪]
এই খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাবিংশ শতাব্দী এবং তারও পূর্বে পৃথিবীর বুকে অনেক প্রাচীন সভ্যতার আবির্ভাব হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ মিশরের কথাই ধরা যাক। দ্বাবিংশ শতাব্দী ছিল মিশরীয় সভ্যতার মধ্যকাল। এ সময়ে মিশরে একাদশ রাজবংশ এবং ব্যাবিলনে প্রথম কিংবা তৃতীয় রাজবংশ শাসন করছিল। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে, মিশরীয় সভ্যতার শুরুটা হয়েছিল আরও শত শত বছর পূর্বে আর এই প্রাচীন সভ্যতাগুলোর কোনোকালেই পরিপূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সুতরাং প্লাবনের সময় সমগ্র মানবজাতি বিলীন হওয়ার যে দাবি তাওরাতে করা হয়েছে সেরকম কোনো ঘটনাও ঘটেনি। উপরন্তু এ দাবিও অবান্তর যে, তাওরাতের তিন পুস্তকের বর্ণনাগুলো মানবজাতির ব্যাপারে যে সকল তথ্য দিয়েছে সেগুলো বাস্তবতার সাথে সাযুজ্য রাখে।¹³⁹
এখানে আরেকটি বিষয় এই যে, তাওরাতের এই বর্ণনা অনুযায়ী পৃথিবীতে মানব সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছিল আনুমানিক সপ্তত্রিংশ শতাব্দীতে। অথচ আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, লক্ষ্য বছর পূর্বে পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব ছিল। খ্রিষ্টানদেরই লিখিত একটি বিশ্বকোষের তথ্য মতে, ফিলিস্তিনে দুই লক্ষ বছর পূর্বের মানবজাতির বসতির চিহ্ন পাওয়া গেছে।¹⁴⁰ বিশিষ্ট খ্রিষ্টান নৃবিজ্ঞানী ডোনাল্ড জনসন ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি ঘোষণা করেন যে, চার মিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ তিনি পেয়েছেন। তার এই গবেষণা ডারউইনের বিবর্তনবাদের থিওরিকেও ভুল প্রমাণিত করে।¹⁴¹
টিকাঃ
১৩৬. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ৩-৪।
১৩৭. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ১৪-১৫।
১৩৮. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ২, অনুচ্ছেদ: ২।
১৩৯. দিরাসাতুল কুতুবিল মুকাদ্দাসাহ আলা দওইল মাআরিফিল হাদিসাহ, পৃষ্ঠা: ৫৩-৫৪।
১৪০. ওয়ার্ল্ড বুক এনসাইক্লোপিডিয়া, পৃষ্ঠা: ১৫
১৪১. আল-ইয়াহুদিয়্যাহ ওয়াল মাসিহিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৭৪
📄 দ্বিতীয় পুস্তক : যাত্রাপুস্তক
বনি ইসরাইলের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা আলোচিত হয়েছে এ পুস্তকে। দীর্ঘদিন ফেরাউনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর বনি ইসরাইল মুসা আ. এর সাথে মিশর ত্যাগ করে সিনাই মরুতে পৌঁছায় এবং সেখানে চল্লিশ বছর উদভ্রান্তের মতো ঘুরতে থাকে। উক্ত ঘটনাই সবিস্তারে বিবৃত হয়েছে এ পুস্তকে। পাশাপাশি ইবাদত, লেনদেন এবং শাস্তি সম্পর্কিত কিছু বিধিবিধানও এ পুস্তকে স্থান পেয়েছে। পুস্তকটিকে আমরা মোটামুটি তিনটি অংশে ভাগ করতে পারি।
এক. মিশরে অবস্থানকালীন সময়ের আলোচনা। এই অংশে পুস্তকটি ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সপরিবারে মিশরে আগমন সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করেছে। অতঃপর ইউসুফ আলাইহিস সালামের ওফাতের পর বনি ইসরাইলের ওপর নেমে আসা দুর্যোগ, মুসা আলাইহিস সালামের জন্ম, তার প্রাথমিক জীবন, দাওয়াতের পদ্ধতি, ফেরাউনের সাথে বিরোধ, অতঃপর ফিরাউন ও মিশরীয়দের ওপর দশটি আঘাতের বর্ণনা করা হয়েছে।
দুই. মিশর থেকে সিনাই-। এই অংশে বনি ইসরাইলের মিশর ত্যাগ, অতঃপর সমুদ্রে রাস্তা হয়ে যাওয়া এবং মরুভূমিতে তাদের জন্য আসমানি খাবার মান্না-সালওয়ার ব্যবস্থাপনা প্রভৃতির আলোচনা স্থান পেয়েছে।
তিন. সিনাইতে বনি ইসরাইলের জীবনযাপন। এ অংশে সিনাইতে বনি ইসরাইলের জীবনযাপন, মুসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক আনীত শরীয়তের বিরুদ্ধাচরণ, গোবৎস উপাসনা, মুসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক বনি ইসরাইলের নিন্দা, মুসা আলাইহিস সালামের তুর পর্বতে গমন প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। শেষোক্ত বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে বলা হয়েছে-
وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
আর যখন আমি মুসার সাথে ওয়াদা করেছি চল্লিশ রাত্রির ... [সুরা বাকারা, আয়াত: ৫১]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَوَاعَدْنَا مُوسَى ثَلَاثِينَ لَيْلَةً وَأَتْمَمْنَاهَا بِعَশْرٍ فَتَمَّ مِيقَاتُ رَبِّهِ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً .
আর আমি মুসাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি ত্রিশ রাত্রির এবং সেগুলোকে পূর্ণ করেছি আরও দশ দ্বারা। বস্তুত এভাবে চল্লিশ রাতের মেয়াদ পূর্ণ হয়ে গেছে। [সুরা আরাফ, আয়াত: ১৪২]
📄 দশ আদেশ বা আজ্ঞা
মুসা আলাইহিস সালাম কীভাবে দশ আদেশ প্রাপ্ত হয়েছেন এ নিয়ে তাওরাতের আলোচনা বিরোধপূর্ণ। তাওরাত কখনো বলছে, আল্লাহ তাআলা নিজেই এই কালিমাগুলো বলেছেন।¹⁴² আর মুসা আলাইহিস সালাম স্বহস্তে তা লিপিবদ্ধ করেছেন। আবার অন্য সময় বলছে, এই দশটি আদেশ আল্লাহর আঙুল দ্বারা পাথরে লিখিত আকারে মুসা আলাইহিস সালামকে দেওয়া হয়েছে।¹⁴³
মুসা আলাইহিস সালাম চল্লিশ দিন পর পাহাড় থেকে নেমে এসে দেখলেন বনি ইসরাইল বাছুর পুজায় লিপ্ত হয়েছে। তিনি ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। এমনকি রাগের মাথায় দুটি ফলক ভেঙে ফেললেন। এরপর অবাধ্য জাতিকে পবিত্র করার পর পুনরায় তিনি আল্লাহর নির্দেশে পাহাড়ে গেলেন। এবারে তিনি নতুন দুটি ফলক নিয়ে এলেন। এগুলোতে প্রভুর আদেশ লিপিবদ্ধ ছিল।¹⁴⁴ তবে এ দুটি ফলক মুসা আলাইহিস সালামের নিজ হাতে খোদাই-করা ছিল।¹⁴⁵ বর্ণনার এই বিরোধ কথিত তাওরাতের ওপর স্বাভাবিকভাবেই মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি করে।
দশটি আদেশের মধ্যে প্রথম তিনটি হলো আল্লাহর প্রতি মানুষের কর্তব্য তথা হক্কুল্লাহ সম্পর্কে। এই তিনটি আদেশ প্রথম ফলকে লিপিবদ্ধ ছিল। আর বাকি সাতটি আদেশ হলো মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব তথা হক্কুল ইবাদ সম্পর্কে। এগুলো দ্বিতীয় ফলকে লিপিবদ্ধ ছিল। এই বিভাজনটি অগাস্টিন কর্তৃক বর্ণিত। রোমান ক্যাথলিকগণ এটিকে গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য অনেক ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মত হলো, প্রথম ফলকে চারটি আদেশ এবং দ্বিতীয় ফলকে ছয়টি আদেশ লিপিবদ্ধ ছিল। তাওরাতে বর্ণিত সেই দশটি আদেশ আমরা ধারাবাহিকভাবে নিম্নে বর্ণনা করলাম।
প্রথম আদেশ: আমি তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু, যিনি মিসর দেশ হইতে, দাস-গৃহ হইতে, তোমাকে বাহির করিয়া আনিলেন। আমার সাক্ষাতে তোমার অন্য দেবতা না থাকুক।
দ্বিতীয় আদেশ: "তুমি আপনার নিমিত্ত খোদিত প্রতিমা নির্মাণ করিও না; উপরিস্থ স্বর্গে, নিচস্থ পৃথিবীতে ও পৃথিবীর নিচস্থ জলমধ্যে যাহা যাহা আছে, তাহাদের কোনো মূর্তি নির্মাণ করিও না; তুমি তাহাদের কাছে প্রণিপাত করিও না, এবং তাহাদের সেবা করিও না; কেননা তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু আমি স্বগৌরব রক্ষণে উদ্যোগী ঈশ্বর; আমি পিতৃগণের অপরাধের প্রতিফল সন্তানদের ওপরে বর্তাই, যাহারা আমাকে দ্বেষ করে, তাহাদের তৃতীয় চতুর্থ পুরুষ পর্যন্ত বর্তাই; কিন্তু যাহারা আমাকে প্রেম করে ও আমার আজ্ঞা সকল পালন করে, আমি তাহাদের সহস্র (পুরুষ) পর্যন্ত দয়া করি। তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর নাম অনর্থক লইও না, কেননা যে কেহ তাঁহার নাম অনর্থক লয়, সদাপ্রভু তাহাকে নির্দোষ করিবেন না।"
তৃতীয় আদেশ: তুমি বিশ্রামদিন (শনিবার) স্মরণ করিয়া পবিত্র করিও। ছয় দিন শ্রম করিও, আপনার সমস্ত কার্য করিও; কিন্তু সপ্তম দিন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশে বিশ্রামদিন। সেই দিন তুমি, কি তোমার পুত্র কি কন্যা, কি তোমার দাস কি দাসী, কি তোমার পশু, কি তোমার পুরদ্বারের মধ্যবর্তী বিদেশী, কেহ কোনো কার্য করিও না। কেননা সদাপ্রভু আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী, সমুদ্র ও সেই সকলের মধ্যবর্তী সমস্ত বস্তু ছয় দিনে নির্মাণ করিয়া সপ্তম দিনে বিশ্রাম করিলেন। এই জন্য সদাপ্রভু বিশ্রামদিনকে আশীর্বাদ করিলেন, ও পবিত্র করিলেন।
চতুর্থ আদেশ: তোমার পিতাকে ও তোমার মাতাকে সমাদর করিও, যেন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমাকে যে দেশ দিবেন, সেই দেশে তোমার দীর্ঘ পরমায়ু হয়।
পঞ্চম আদেশ: নরহত্যা করিও না।
ষষ্ঠ আদেশ: ব্যভিচার করিও না।
সপ্তম আদেশ: চুরি করিও না।
অষ্টম আদেশ: তোমরা প্রতিবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ো না।
নবম আদেশ: তোমরা লোভ করিও না প্রতিবাসীর স্ত্রীতে।
দশম আদেশ: কিংবা প্রতিবাসীর গৃহে বা তাহার দাসে কি দাসীতে, কিংবা তাহার গরুতে কি গর্দভে, প্রতিবাসীর কোনো বস্তুতেই লোভ করিও না।¹⁴⁶
টিকাঃ
১৪২. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ২০, অনুচ্ছেদ: ১।
১৪৩. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ৩১, অনুচ্ছেদ: ১৮; অধ্যায়: ৩২, অনুচ্ছেদ: ১৫-১৬।
১৪৪. কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাস, পৃষ্ঠা: ৯-১০
১৪৫. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ২৪, অনুচ্ছেদ: ১-৪।
১৪৬. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ২০, অনুচ্ছেদ: ১-১৭; দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায়: ৫, অনুচ্ছেদ: ৬-২১।
📄 ইহুদিদের অন্যান্য উৎসব
ঈদুল ফেসাখ বা পাসওভার (Passover) উৎসব: দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে মিশর ত্যাগ করা বনি ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ফেরাউনের নির্যাতন ও মিশরীয়দের গোলামির জিঞ্জির থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। কুরআন তাদেরকে বারংবার এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যাতে তারা আল্লাহর দ্বীনের দিকে ফিরে আসে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরিয়তের অনুগামী হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে সুপথে ফিরে আসার বদলে তারা তাদের মুক্তির দিনটিকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করে। এই দিনটিকে তারা ঈদুল ফেসাখ বা পাসওভার (Passover) উৎসব নাম দিয়ে আড়ম্ভরতার সাথে পালন করে থাকে। এই উৎসবের আরেক নাম ঈদুল ফিতর। বনি ইসরাইলকে খুব দ্রুত মিশর থেকে বের হতে বলা হয়েছিল। ফলে তারা রুটির খামিরকে ভালোভাবে গাজাতে পারেনি। সেদিকে লক্ষ্য করেই এই নামকরণ করা হয়েছে। যাত্রাপুস্তক এর দ্বাদশ অধ্যায়ে এই উৎসব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এপ্রিলের ১৪ তারিখ সন্ধ্যায় শুরু হয়ে ২১ তারিখ সন্ধ্যা পর্যন্ত এই উৎসব পালিত হয়। এরপর তারা ভেড়া জবাই করে। প্রবাহিত রক্ত তাদের প্রায়শ্চিত্তের প্রতীক বহন করে। আর মিশরের বন্দিদশার কথা স্মরণ করে এই দিনগুলোতে তেতো লতা-পাতা খাওয়া হয়। পরিবারের প্রধান কিংবা উপস্থিতিদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এসময় তাদেরকে মিশর ত্যাগের কাহিনি পড়ে শোনান। ইহুদি ধর্মমতে কেউ যদি এই নিয়মের ব্যতিক্রম করে তাহলে সে ইসরাইলি দলভুক্ত থাকে না।
অন্যান্য উৎসবঃ
* ঈদুল আসাবি (Shavuot): ঈদুল ফেসাখ তথা পাসওভারের সাত সপ্তাহ পর জুনের ছয় তারিখে এই উৎসব পালন করা হয়। কথিত আছে, এই দিনে আল্লাহ তাআলা তুর পর্বতে মুসা আলাইহিস সালামের সাথে আলাপ করেছিলেন।
* রোশ হাশানা (Rosh Hashana): তাদের ধারণা এই দিনে ইসহাক আলাইহিস সালামকে জবাই থেকে মুক্তি দিয়ে তদস্থলে দুম্বা জবাই দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে তিনি ইসহাক ছিলেন না। ছিলেন ইসমাইল। ইতিপূর্বে আমরা বিষয়টি স্পষ্ট করে এসেছি।
* ঈদুল সোমারিয়া: অর্থ্যাৎ বড় উপবাস। এই দিনে ইহুদিরা রোজা রাখে। তারা বিশ্বাস করে এটি মুসা আলাহিস সালাম কর্তৃক উপবাস যাপনের তৃতীয় চল্লিশ দিনের শেষ দিন এটি।
* ঈদুস মিজাল্লা: তারা সাত দিন কুঁড়েঘরে বসবাস করে।¹⁴⁷ হাইকল যখন আবাদ ছিল তখন তাদের উপর বছরে তিনবার তীর্থ যাত্রা করা আবশ্যক ছিল।¹⁴⁸
টিকাঃ
১৪৭. সিনাইতে তাদের চল্লিশ বছরের যাযাবর জীবনের স্মৃতিরোমন্থনস্বরূপ তারা এটি করে থাকে।
১৪৮. বিস্তারিত: তারিখুল ইয়াহুদ, মাকরিজি, পৃষ্ঠা: ১৪০-১৪১