📄 রাজাদের যুগ
তাওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী ইসরাইলিরা তাদের সর্বশেষ বিচারক শমুয়েল এর কাছে পার্শ্ববর্তী কানানি ও ফিলিস্তিনিদের মতো নিজেদের জন্যও একজন রাজা নির্বাচনের দাবি করেছিল। তাদের সেই দাবির প্রেক্ষিতে শৌলকে রাজা হিসেবে মনোনীত করা হয়। [১১০] শৌলের পর আল্লাহর নবি দাউদ আলাইহিস সালাম রাজত্ব লাভ করেন। তিনি অধিকাংশ ফিলিস্তিনি শহর পদানত করতে সক্ষম হন। বিশেষত পিতলের খনিসমৃদ্ধ আরামীয়দের সোবা নগরী তার করতলগত হয়। তিনি সেখান থেকে অনেক পিতল আহরণ করে সেগুলো দিয়ে বর্ম ও যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ করেন। [১১১]
জেরুসালেম জয়ের পর তিনি সেটাকে নিজের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপর যিহোভা প্রভুর জন্য ইবাদতগৃহ নির্মাণকাজ শুরু করেন। দাউদ আলাইহিস সালামের রাজত্ব প্রায় চল্লিশ বছর স্থায়ী হয়। এরপর তার পুত্র আল্লাহর নবি সুলাইমান আলাইহিস সালাম ক্ষমতায় অধিষ্টিত হন। তার মাধ্যমেই পিতার নির্মিতব্য হাইকলের নির্মাণকাজ শেষ হয়। সুলাইমান আলাইহিস সালামের রাজত্বকে ইহুদিদের ইতিহাসে সবচেয়ে বিশাল ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে আমাদের মনে হয় বিশালতার এই বিষয়টি আপেক্ষিক।[১১২]
এইচ জি ওয়েলস বলেন, যেকোনো বিষয়ের যথাযথ মূল্যায়নের বিষয়টি আমাদের ভুলে না যাওয়া উচিত। সুলাইমান শুধু একজন ছোটোখাট রাজা ছিলেন। তার রাষ্ট্রটাও ছিল শীর্ণকায় ও ভঙ্গুর। যার কারণে তার মৃত্যুর পর কয়েক বছর যেতে না যেতেই দ্বাবিংশ রাজবংশের প্রথম ফারাও সম্রাট শশাঙ্ক জেরুসালেম দখল করে নেয়। এবং সেখানকার সমস্ত সম্পদও লুটে নেয়। বাইবেলে বর্ণিত শলোমনের রাজত্বের বিশালতার ব্যাপারে অনেক সমালোচক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের দৃষ্টিতে প্রচণ্ড অহমিকাবোধই পরবর্তীকালের লেখকগণকে এ ধরনের অতিরঞ্জিত গাল-গল্প জুড়ে দিতে প্রেরণা জুগিয়েছে।[১১৩]
এইচ জি ওয়েলস তার মাআলিমু তারিখিল ইনসানিয়্যাহ (দি আউটলাইন অব হিস্টোরি) গ্রন্থে এ কথা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, সুলাইমান ও তার রাজত্ব সম্পর্কে ইহুদিদের পবিত্র গ্রন্থের বর্ণনায় অধিকমাত্রায় অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি রয়েছে। পরবর্তী কোনো লেখক ধর্মীয় গ্রন্থে এগুলো সংযোজন করেছে। আর এই বর্ণনা খ্রিষ্টান বিশ্ব তো বটেই মুসলিম বিশ্বকেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে, বিশালতা ও জৌলুসের দিক থেকে সুলাইমান ছিলেন সবচেয়ে শক্তিশালী সম্রাট। বাইবেলের রাজাবলি পুস্তকে সুলাইমানের রাজত্বের জাঁকজমক ও বিশালতার বর্ণনা স্থান পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তৃতীয় থোতমোস কিংবা দ্বিতীয় রামসিস অথবা বুখতে নসর কর্তৃক নির্মিত স্থাপনাগুলোর তুলনায় সুলাইমানের স্থাপনাগুলো অতি তুচ্ছ।[১১৪]
আমরা মুসলিমরা তাওরাতের মতো সুলাইমান আলাইহিস সালামের রাজত্বের বর্ণনায় অতিরঞ্জন করি না। আবার ওয়েলস এর মতো খাটো করেও দেখি না। কেননা আল্লাহ তাআলা সুলাইমান আলাইহিস সালামকে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। আমরা সেগুলো বিশ্বাস করি।
এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে কুরআনের ভাষায়- কতকা জিন তার সামনে কাজ করত তার পালনকর্তার আদেশে। তাদের যে কেউ আমার আদেশ অমান্য করবে, আমি জ্বলন্ত অগ্নির-শাস্তি আস্বাদন করাব। [সুরা সাবা, আয়াত: ১২] বাতাসকেও তার আজ্ঞাবহ করে দেওয়া হয়েছিল। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন- এবং সুলাইমানের অধীন করে দিয়েছিলাম প্রবল বায়ুকে; তা তাঁর আদেশে প্রবাহিত হতো ওই দেশের দিকে, যেখানে আমি কল্যাণ দান করেছি। আমি সব বিষয়েই সম্যক অবগত রয়েছি। [সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮০] অন্য আয়াতে বলা হচ্ছে- আর আমি সুলাইমানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে, যা সকালে এক মাসের পথ এবং বিকেলে এক মাসের পথ অতিক্রম করত। [সুরা সাবা, আয়াত: ১২] আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- তখন আমি বাতাসকে তার অনুগত করে দিলাম, যা তার হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হতো যেখানে সে পৌঁছাতে চাইত। আর সকল শয়তানকে তার অধীন করে দিলাম অর্থাৎ, যারা ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরি এবং অন্য আরও অনেককে অধীন করে দিলাম, যারা আবদ্ধ থাকত শৃঙ্খলে। এগুলো আমার অনুগ্রহ, অতএব, এগুলো কাউকে দাও অথবা নিজে রেখে দাও-এর কোনো হিসেব দিতে হবে না। নিশ্চয় তার জন্যে আমার কাছে রয়েছে মর্যাদা ও শুভ পরিণতি। [সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৩৬-৪০]
এ ছাড়া আল্লাহ তাআলা তাকে তুলনাহীন এক রাজত্ব দিয়েছিলেন যা আর কাউকে দেওয়া হয়নি। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে— সুলায়মান বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন যা আমার পরে আর কেউ পেতে পারবে না। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা। [সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৩৫]
সহিহুল বুখারি গ্রন্থের একটি হাদিসে এসেছে, আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, "নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, একটি অবাধ্য জিন রাতে আমার সালাতে বাধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আমার নিকট আসে। আল্লাহ আমাকে তার ওপর ক্ষমতা প্রদান করেন। আমি তাকে ধরলাম এবং মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখার ইচ্ছে করলাম, যাতে তোমরা সবাই স্বচক্ষে তাকে দেখতে পাও। তখনই আমার ভাই সুলাইমানের এ দুআটি আমার মনে পড়ল। “হে আমার পালনকর্তা, আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন যা আমার পরে আর কেউ যেতে পারবে না। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা” অতঃপর আমি জিনটিকে ব্যর্থ এবং লাঞ্ছিত করে ছেড়ে দিলাম।' [১১৫]
কুরআনের এসব আয়াত এবং হাদিস থেকে বুঝা যায় সুলাইমান আলাইহিস সালামের রাজত্বের আলাদা কিছু বিশেষত্ব ছিল। অন্য কাউকে তার মতো রাজত্ব না দেওয়ার যে দুআ তিনি করেছিলেন সেখান থেকে উদ্দেশ্য হলো মানব, জিন, বাতাস ও অন্যান্য মাখলুকাত তার অধীনস্ত হওয়ার বিষয়টি। রাজত্বের বিশালতা সেখানে উদ্দেশ্য নয়।
সুলাইমান আলাইহিস সালামের ইন্তেকালের পর তার পুত্র রহবিয়াম সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়। এ সময় ইসরাইলিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ইতিপূর্বে সুলাইমান আলাইহিস সালামের সাথে বিদ্রোহ করে পালিয়ে যাওয়া যারবিয়াম এই সুযোগটিকে কাজে লাগায়। সুলাইমান আলাইহিস সালামের মৃত্যুর সংবাদ শুনে সে ফিলিস্তিনে ফিরে আসে এবং রহবিয়ামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। ঘটনাক্রমে সে অধিকাংশ ইসরাইলিদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ফলে বারোটি গোত্রের মধ্যে যিহুদা ও বিনইয়ামিন এর বংশধররা ব্যতীত বাকি দশটি গোত্র যারবিয়ামের সাথে যোগ দেয়। রহবিয়াম জেরুসালেমকে কেন্দ্র করে নিজের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং যিহুদার নামে এই রাজ্যের নামকরণ করে। অপরদিকে যারবিয়াম উত্তরাঞ্চলে রাজত্ব স্থাপনে সক্ষম হয়। সে তার রাজ্যের নাম রাখে ইসরাইল এবং শিকমকে (বর্তমান নাবলুস) এ রাজ্যের রাজধানী ঘোষণা করে।
যারবিয়াম ভয় করত যে, তার অধীনস্ত গোত্রগুলো বলিপ্রদান ও তীর্থযাত্রার জন্য জেরুসালেম গমন করতে পারে। এতে করে তার ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে রহবিয়াম শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তাই সে স্বর্ণ দিয়ে বাছুর আকৃতির দুটি মূর্তি নির্মাণ করে। একটিকে সে রাজ্যের উত্তর প্রান্তের শহর স্থাপন করে। আর অপরটিকে স্থাপন করে দক্ষিণের শহর বেথেলহেমে। এরপর তার নির্দেশে অনুসারীরা এগুলোর পূজা করতে আরম্ভ করে। যারবিয়াম আরও অনেক পৌত্তলিক উপাসনাগৃহ নির্মাণ করে। আর এগুলোর পৌরোহিত্যের দায়িত্ব লেবিয়দেরকে বাদ দিয়ে অন্য গোত্রের নির্বাচিত লোকদের অর্পণ করে। আর নিজেকে প্রধান পুরোহিতও ঘোষণা দেয়।
এটাই হলো ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার স্বভাব-চরিত্র। এসব সুস্পষ্ট কুফরি। মুসা আলাইহিস সালামের রেখে যাওয়া ধর্ম কখনোই এগুলো সমর্থন করে না। এর মধ্য দিয়ে তারা মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়ত থেকে বের হয়ে গিয়েছে।
নিজেদের এই বিচ্ছিন্নতা বনি ইসরাইলের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুটো রাজ্যই দীর্ঘমেয়াদি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি কোনো কোনো সময় নিজেদের ভাইদেরকে দমন করার জন্য তারা বহিঃশক্তির সহযোগিতাও নিতে শুরু করে। রহবিয়ামের শাসনের পঞ্চম বছর মিশর সম্রাট প্রথম শশাঙ্ক জেরুসালেম হামলা করে। বাইতুল মুকাদ্দাসকে গুঁড়িয়ে দিয়ে শশাঙ্ক সেখানকার যাবতীয় সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। বাইবেলে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে— 'আর রহবিয়াম রাজার পঞ্চম বৎসরে মিশর-রাজ শীশক যিরূশালেমের বিরুদ্ধে আসিলেন; তিনি সদাপ্রভুর গৃহের ধন ও রাজবাটীর ধন লইয়া গেলেন; তিনি সমস্তই লইয়া গেলেন, আর শলোমনের নির্মিত স্বর্ণময় ঢাল সকলও লইয়া গেলেন।'[১১৬]
এরপর বনি ইসরাইল তিন শতাব্দী যাবৎ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যাবিলনিয় সম্রাট বুখতেনসর জেরুসালেমে অভিযান চালিয়ে দশ হাজারেরও অধিক ইহুদিকে ধরে নিয়ে যায়। এসব ইহুদিকে সে নিজের দাস-দাসীতে পরিণত করে। বুখতে নসর বাইতুল মুকাদ্দাসকে বিরান করে দেয় এবং তার সমস্ত চিহ্ন ধুলিসাৎ করে দেয়। তার অভিযানের ব্যাপকতায় ইহুদিদের উভয় রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
বুখতে নসরের অভিযানের আগ পর্যন্ত তিন শতাব্দীব্যাপি বিশজন রাজা বনি ইসরাইলকে শাসন করেন। এরপর আরামীয়রা যিহুদা রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে হেবরন থেকে নিয়ে বের-শেবা পর্যন্ত দখলে নিয়ে নেয়। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর মধ্যভাগেও এরা ফিলিস্তিন শাসন করে। এসব আরামীয় শাসকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সম্রাট হেরোডাস (Herod)। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭ সাল থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৪ সাল পর্যন্ত শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর তার পুত্রদের মধ্যে আর্কেলাস (Archelaus), অ্যান্টিপাস (Antipas) ও ফিলিপ (Philip) শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।
সম্রাট সাইরাস ব্যাবিলন জয় করলে ইসরাইলিরা ব্যাবিলনীয় বন্দিদশা থেকে মুক্তি পায়। ৩৫৬ খ্রিষ্টপূর্বে তারা ফিলিস্তিনে ফিরে আসে। মুক্তির আনন্দে তারা পৌত্তলিক সম্রাট সাইরাসকে অভিনন্দন জানায়।
এরপর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট জেরুসালেম অভিযানে মূলত ইহুদিদের প্রধান রাব্বি বড় একটি দল নিয়ে শহরের বাইরে এসে তাকে সংবর্ধনা দিয়ে শহরে প্রবেশ করায়। পাশাপাশি তাকে এ সংবাদ দেয় যে, নবি দানিয়েল আলেকজান্ডার শীঘ্রই পারস্য জয় করবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন।
এভাবেই ইহুদিরা আলেকজান্ডারকে ধোঁকা দেয়। তিনিও তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করেন। সাত বছরের জন্য তাদের ট্যাক্স মওকুফ করে দেন। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার এক সেনাপতি শাসনক্ষমতায় অধিষ্টিত হয়। সে ইহুদিদের একটি অংশকে ৩২০ খ্রিষ্টপূর্বে মিশরে বসতি স্থাপন করে দেয়। ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বে সিরিয়ান সম্রাট সেলুকাস নিকাটোর (Seleucus I Nicator) যিহুদা রাজ্য দখল করেন। এরপর ২০৩ খ্রিষ্টপূর্বে অপর এক সিরিয়ান সম্রাট কর্তৃক দ্বিতীয়বারের মতো যিহুদা রাজ্য দখল হয়। ভিন্নধর্মাবলম্বী হওয়ায় তারা ইহুদিদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেন।
১৬৫ খ্রিষ্টপূর্বে যিহুদা মুকাবি জেরুসালেম ফিরে আসতে সক্ষম হন। ঈসা আলাইহিস সালাম যখন আগমন করেন তখন জেরুসালেম রোমান শাসকের অধীনে ছিল। ইহুদিরাও তাদেরকে মেনে চলত। তাদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখত। এমনকি একসময় তারা রোমান শাসককে ফুসলিয়ে ঈসা আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশও জারি করিয়েছিল।
এরপর রোমানদের সাথে ইহুদিদের সম্পর্কে চিড় ধরে। ইহুদিদের গোমর ফাঁস হয়ে যায়। ফলে রোমানদের পক্ষ থেকে তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। ১৫০ খ্রিষ্টাব্দে পঞ্চাশ হাজারেরও অধিক ইহুদিকে হত্যা করা হয়। তাদের সিনাগগগুলো ধ্বংস করা হয়। তখন থেকে ইহুদিরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। তাদের অনেকে আফগানিস্তান, হিন্দুস্তান, চীন প্রভৃতি এশীয় অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। আর অনেক পাড়ি জমায় ইউরোপে।
বিশিষ্ট গবেষক ফরিদ ওয়াজদি লিখেন, “মুসলিমরা রোম জয় করার পর ইহুদিদের অবস্থার উন্নতি হয়। বাগদাদ, কায়রো, কর্ডোভা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ শহরে তারা অবাধে ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ পায়। আরবদের সংশ্রবের ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞানেও উন্নতি লাভ করতে থাকে। নবম শতাব্দীর শুরুতে কায়রো, পারস্য ও মারাকেশে তাদের নিজস্ব কেন্দ্র স্থাপিত হয়। এ সময়ে ব্যাবিলনে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে এবং ফিলিস্তিনে বাড়তে থাকে। মোঘল মুসলিমদের দরবারেও তারা যথেষ্ট সমাদৃত হয়।” [১১৭]
এই হলো ইহুদিদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এই ইতিহাস প্রমাণ করে ইহুদিরা ফিলিস্তিনের প্রকৃত অধিবাসী নয়। বরং তারা বাইরে থেকে এখানে এসেছে এবং একসময় ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ে।
পুরাতন নিয়মে বর্ণিত ঘটনাবলির সময়কাল নির্ধারণ করা নিয়ে গবেষকদের মাঝে যথেষ্ট মতবিরোধ দেখা যায়। আমরা এখানে প্রফেসর বি ইসরাইল ড্যান কর্তৃক রচিত তারিখু বাইবেল তথা বাইবেলের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে ঘটনাগুলোর ধারাবাহিক সময়কাল তুলে ধরছি।
১। আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টি থেকে নুহ আলাইহিস সালামের প্লাবন -২৩৪৮ খ্রিষ্টপূর্ব।
২। নুহ আলাইহিস সালামের প্লাবন থেকে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্ম - ২৩৪৮-১৯২১ খ্রিষ্টপূর্ব।
৩। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্ম থেকে ইয়াকুব আলাইহিস সালামের মিশর গমন - ১৯২১-১৭০৬ খ্রিষ্টপূর্ব।
৪। ইয়াকুব আলাইহিস সালামের মিশর গমন থেকে বনি ইসরাইলের মিশর ত্যাগ- ১৭০৬-১৪৯১ খ্রিষ্টপূর্ব।
৫। বনি ইসরাইলের মিশর ত্যাগ থেকে সিনাই উপত্যকায় অবস্থান - ১৪৯১-১৪৫১ খ্রিষ্টপূর্ব।
৬। বনি ইসরাইলের কেনানে প্রবেশ থেকে ইউশা ইবনে নুনের ওফাত - ১৪৫১-১৪০০ খ্রিষ্টপূর্ব।
৭। ইউশা ইবনে নুনের ওফাত থেকে বিচারকগণের যুগ - ১৪০০-১০৯৫ খ্রিষ্টপূর্ব।
৮। বনি ইসরাইলের একক রাজত্ব - ১০৯৫-৯৭৫ খ্রিষ্টপূর্ব।
৯। রাহবিয়াম এর যুগ থেকে সামেরাহ এর পতন - ৯৭৫-৭২২ খ্রিষ্টপূর্ব।
১০। রাহবিয়াম এর যুগ থেকে জেরুজালেমের পতন - ৯৭৫-৫৮৬ খ্রিষ্টপূর্ব।
১১। জেরুজালেমের পতন থেকে বনি ইসরাইলের ব্যাবিলনীয় বন্দিদশা থেকে মুক্তি - ৫৮৬-৫৩৬ খ্রিষ্টপূর্ব।
১২। বনি ইসরাইলের প্রত্যাবর্তন থেকে পৌত্তলিক পুস্তক রচনা - ৫৩৬-৪০০ খ্রিষ্টপূর্ব।
এতক্ষণ বনি ইসরাইলের যে ইতিহাস আমরা আলোচনা করেছি সেখান থেকে যা প্রমাণিত হয় তার সারসংক্ষেপ হলো -
১। বনি ইসরাইল ফিলিস্তিনের অধিবাসী নয়। তারা যোদ্ধা হিসেবে দেশ জয়ের লক্ষ্যে এখানে আগমন করেছে।
২। ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই তারা সমগ্র ফিলিস্তিনের দখল নিতে পারেনি।
৩। ফিলিস্তিনের অধিবাসীরা বনি ইসরাইলের শাসন মেনে নেয়নি। উল্টো তাদের সাথে সংঘর্ষ হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে তারা বনি ইসরাইলকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
৪। ইহুদিরা ওয়াদিল কুরা [১১৮]-তে একজন নবির আগমনের প্রত্যাশায় থাকত যিনি ইয়াসরিবে হিজরত করবেন। যিশাইয়ের পুস্তকে এ ব্যাপারে বিশদ বর্ণনা এসেছে। তাদের ধারণা ছিল এ নবি ইসহাকের বংশ থেকে জন্ম নেবেন এবং তাদেরকে শত্রু তথা পারসিক, রোমান, অ্যাসেরিয়ান ও ফিলিস্তিনের অধিবাসী ফিনিশীয়দের বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন। ইহুদিরা শেষ নবির হিজরতস্থলের কাছে অবস্থান করার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিল। তাই তারা ইয়াসরিবের আশেপাশে খাইবার ও ফাদাকে বসতি স্থাপন করে। যখন তারা দেখল যে প্রতিশ্রুত নবি ইসমাইলের বংশে আগমন করেছেন তখন আর মেনে নিতে পারল না। অস্বীকার করে বসল।
৫। মুসা আলাইহিস সালামের ওপর তাদের জন্য যে শরিয়ত নাজিল করা হয়েছিল তারা তা কখনোই মনেপ্রাণে গ্রহণ করেনি। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শত্রুদের দ্বারা অপদস্থ করেছেন। চাপিয়ে দিয়েছেন লাঞ্ছনা ও যাযাবর জীবন। কুরআনে বলা হচ্ছে, "তাদের ওপর লাঞ্ছনা এবং বঞ্চনা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ওরা উপার্জন করেছে আল্লাহর গজব। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অনবরত অস্বীকার করেছে এবং নবিগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। তার কারণ, তারা নাফরমানি করেছে এবং সীমালঙ্ঘন করেছে।" [সুরা বাকারা, আয়াত: ৬১]
খ্রিষ্টপূর্ব ৭০ সালে টাইটাসের আক্রমণের পর থেকে অদ্যাবধি তাদের ওপর এই লাঞ্চনা ও যাযাবর জীবন বেঁকে বসে আছে। সে সময়ে টাইটাস জেরুজালেমসহ তাদের নগরগুলো পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করেছিল। তাদের অধিকাংশকে হত্যা করেছে। অন্যদেরকে দাস বানিয়ে নিয়েছে। তখন থেকেই মূলত ফিলিস্তিনের সাথে ইসরাইলিদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলোর ষড়যন্ত্রে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। জেরুজালেমের বাসিন্দারা তাদের শহর ছেড়ে চলে গেছে এমন কোনো তথ্য কোথাও পাওয়া যায় না। উল্টো ইতিহাস বলছে, ইসরাইলিরা বিভিন্ন সময়ে এই শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সুতরাং ইসরাইলিরা এই শহরকে নিজেদের বলে দাবি করা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ। ইনশাআল্লাহ, আজ হোক বা কাল একদিন তাদেরকে আবারও অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই শহর ত্যাগ করতে হবে। আল্লাহ তাআলার কাছে কোনো কিছুই কঠিন নয়।
টিকাঃ
১১০. শমুয়েল ১ম, অধ্যায়: ১০৫, অনুচ্ছেদ: ১৯-২০।
১১১. শমুয়েল ২য়, অধ্যায় ৮, অনুচ্ছেদ: ৮।
১১২. হারবার্ট জর্জ ওয়েলস (২১ সেপ্টেম্বর, ১৮৬৬ – ১৩ অগাস্ট, ১৯৪৬) ছিলেন একজন ইংরেজ লেখক। তিনি মূলত তার কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস ও ছোটোগল্পগুলির জন্য সমধিক পরিচিত। তবে ওয়েলস ছিলেন একজন বহুমুখী লেখক। তিনি সমসাময়িক উপন্যাস, ইতিহাস, রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়গুলি নিয়েও বহু গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। উইকিপিডিয়া-নিরীক্ষক।
১১৩. মুকারানাতুল আদইয়ান আল- ইয়াহুদিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৭৯
১১৪. মুকারানাতুল আদইয়ান আল-ইয়াহুদিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৮০
১১৫. সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৪৬১।
১১৬. রাজাবলি ১ম, অধ্যায়: ১৪, অনুচ্ছেদ: ২৫-২৬।
১১৭. দায়েরাতু মাআরিফিল করনিল ইশরিন, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৮৪-২৮৫
১১৮. আরব উপদ্বীপে খাইবার এবং তাইমা এর মধ্যবর্তী অবস্থানে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক উপত্যকা। বর্তমান সময়ে এর অবস্থান নিয়ে দ্বিমত আছে। তবে অধিকাংশের মত হচ্ছে এ উপত্যকা বর্তমানে ওয়াদি আল-জিজিল নামে পরিচিত।-উইকিপিডিয়া ইয়াকুত হামাতি লিখেছেন, ওয়াদিল কুরা হচ্ছে মদিনা এবং সিরিয়ার মধ্যবর্তী খাইবার ও তাইমা এর মাঝে অবস্থিত উপত্যকা। এখানে অনেক গ্রাম এবং জনপদের বসবাস থাকায় এর নাম ওয়াদিল কুরা অর্থাৎ গ্রামসমূহের উপত্যকা। মুজামুল বুলদান, খণ্ড:৫, পৃষ্ঠা: ৩৪৫-নীরিক্ষক।