📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 ফিরআউনের নির্যাতন থেকে বনি ইসরাইলকে চিরমুক্তির লক্ষ্যে মুসা আলাইহিস সালাম-এর প্রেরণ

📄 ফিরআউনের নির্যাতন থেকে বনি ইসরাইলকে চিরমুক্তির লক্ষ্যে মুসা আলাইহিস সালাম-এর প্রেরণ


মুসা একটি মিশরীয় নাম। এর অর্থ হচ্ছে সন্তান। ইবরানি ভাষায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে শেষ মুহূর্তে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিকে বুঝাতে এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। মুসা আলাইহিস সালামের সমগ্র জীবনকে আমরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি।

প্রথম পর্যায়: মুসা আলাইহিস সালাম ঠিক সে সময়টাতে জন্মগ্রহণ করেন যখন ফিরাউন কর্তৃক ইবরানিদের নবজাতক পুত্রসন্তানদের হত্যা করা হচ্ছিল। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বোন মারইয়াম ছিলেন সবার বড়। আর হারুন ছিলেন দ্বিতীয়। জন্মের পর মুসা আলাইহিস সালামের মা ফিরআউনের ভয়ে সন্তানকে নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে ফিরআউনের স্ত্রী নদীতে গোসল করতে এলে নবজাতকটিকে দেখতে পান। বাচ্চাটিকে দেখে তার মন বিগলিত হয়। তিনি তাকে উঠিয়ে নেন। উল্লেখ্য, ফিরআউনের স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা। তাকে বলা হলো এটা ইবরানি শিশু। ইত্যবসরে সেখানে মুসা আলাইহিস সালামের বোন মারইয়াম উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন, আমি কি আপনার এই বাচ্চাটিকে দুধ পান করানোর জন্য একজন ইবরানি ধাত্রীকে ডেকে আনব? ফিরআউনের স্ত্রী অনুমতি দিলে সে মুসা আলাইহিস সালামের মাকেই ডেকে নিয়ে আসে। এরই মাধ্যমে মা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিজ পুত্রকে দুধ পান করানোর দায়িত্ব লাভ করেন।[৬১]

এভাবেই মুসা আলাইহিস সালাম ফিরাউন পরিবারের তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হন এবং পরিণত বয়সে পৌঁছান। এ সময় তিনি নানা জ্ঞান ও কৌশলে পারঙ্গম হয়ে উঠেন। চল্লিশ বছর পর্যন্ত তিনি মিশরেই ছিলেন। তার জীবনের এ পর্যায়টি সম্পর্কে এর চেয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয় পর্যায়: চল্লিশ বছরের পর তিনি একজন ইবরানি ও একজন মিশরি ব্যক্তির গোলযোগকে কেন্দ্র করে অনিচ্ছাকৃত মিশরি ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেন। ভয় পেয়ে তিনি মাদায়েন পালিয়ে যান। এ ঘটনা কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে—

"তিনি অধিবাসীদের অজান্তেই শহরে প্রবেশ করলেন। তথায় তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখলেন। এদের একজন ছিল তার নিজ দলের আর অন্যজন শত্রুপক্ষের। অতঃপর তার নিজ দলের লোকটি শত্রু দলের লোকটির বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন মুসা তাকে ঘুষি মারলেন এবং এতেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। মুসা বললেন, এটা শয়তানের কাজ। নিশ্চয় সে প্রকাশ্য শত্রু, বিভ্রান্তকারী। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের ওপর জুলুম করে ফেলেছি। অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, এরপর আমি কখনও অপরাধীদের সাহায্যকারী হবো না।

অতঃপর তিনি প্রভাতে উঠলেন সে শহরে ভীত-শঙ্কিত অবস্থায়। হঠাৎ তিনি দেখলেন, গতকাল যে ব্যক্তি তার সাহায্য চেয়েছিল, সে চিৎকার করে তার সাহায্য প্রার্থনা করছে। মুসা তাকে বললেন, তুমি তো একজন প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট ব্যক্তি। অতঃপর মুসা যখন উভয়ের শত্রুকে শায়েস্তা করতে চাইলেন, তখন সে বলল, গতকাল তুমি যেমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে, সে রকম আমাকেও কি হত্যা করতে চাও? তুমি তো পৃথিবীতে স্বৈরাচারী হতে চাও। সংস্কারক হতে চাও না। এসময় শহরের প্রান্ত থেকে একব্যক্তি ছুটে এসে বলল, হে মুসা, রাজ্যের পরিষদবর্গ তোমাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন। অতএব, তুমি বের হয়ে যাও। আমি তোমার হিতাকাঙ্ক্ষী।

অতঃপর তিনি সেখান থেকে ভীত অবস্থায় বের হয়ে পড়লেন পথ দেখতে দেখতে। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে জালিম সম্প্রদায়ের কবল থেকে রক্ষা করো। যখন তিনি মাদইয়ান অভিমুখে রওয়ানা হলেন তখন বললেন, আশা করা যায় আমার পালনকর্তা আমাকে সরল পথ দেখাবেন। যখন তিনি মাদইয়ানের কূপের ধারে পৌঁছালেন, তখন কূপের কাছে একদল লোককে পেলেন তারা জন্তুদেরকে পানি পান করানোর কাজে ব্যস্ত এবং তাদের পশ্চাতে দুজন স্ত্রীলোককে দেখলেন তারা তাদের জন্তুদেরকে আগলিয়ে রাখছে। তিনি বললেন, তোমাদের কি ব্যাপার? তারা বলল, আমরা আমাদের জন্তুদেরকে পানি পান করাতে পারি না, যে পর্যন্ত রাখালরা তাদের জন্তুদেরকে নিয়ে সরে না যায়। আমাদের পিতা খুবই বৃদ্ধ।" [সুরা কাসাস, ১৫-২৩]

যাত্রাপুস্তকেও এ ঘটনা বিবৃত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে-
"তখন মোশি ভীত হইয়া কহিলেন, কথাটা অবশ্যই প্রকাশ হইয়া পড়িয়াছে। পরে ফরৌণ ঐ কথা শুনিয়া মোশিকে বধ করিতে চেষ্টা করিলেন। কিন্তু মোশি ফরৌণের সম্মুখ হইতে পলায়ন করিলেন, এবং মিদিয়ন দেশে বাস করিতে গিয়া এক কূপের নিকট বসিলেন। মিদিয়নীয় যাজকের সাতটি কন্যা ছিল; তাহারা সেই স্থানে আসিয়া পিতার মেষপালকে জল পান করাইবার জন্য জল তুলিয়া নিপানগুলি পরিপূর্ণ করিল। ...পরে মোশি ঐ ব্যক্তির সঙ্গে বাস করিতে সম্মত হইলেন, আর তিনি মোশির সাথে আপন কন্যা সিপ্লোরার বিবাহ দিলেন। ...আর ঝোপের মধ্য হইতে অগ্নিশিখাতে সদাপ্রভুর দূত তাকে দর্শন দিলেন; তখন তিনি দৃষ্টিপাত করিলেন, আর দেখো ঝোপ অগ্নিতে জ্বলিতেছে তথাপি ঝোপ বিনষ্ট হইতেছে না। তাই মোশি কহিলেন, আমি এক পার্শ্বে গিয়া এই মহাশ্চর্য দৃশ্য দেখি, ঝোপ দগ্ধ হয় না ইহার কারণ কি? কিন্তু সদাপ্রভু যখন দেখিলেন যে, তিনি দেখিবার জন্য এক পার্শ্বে যাইতেছেন, তখন ঝোপের মধ্য হইতে ঈশ্বর তাঁহাকে ডাকিয়া কহিলেন, মোশি, মোশি।... অতএব এখন আইস, আমি তোমাকে ফরৌণের নিকট প্রেরণ করি, তুমি মিসর হইতে আমার প্রজা ইস্রায়েল সন্তানদিগকে বাহির করিও।"[৬২]

তৃতীয় পর্যায়: মাদায়েনের অভিবাস জীবন শেষ করে মুসা আলাইহিস সালাম জাসান অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তিনি এবং হারুন আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার নির্দেশ বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে দিলেন। কুরআনের বর্ণনামতে তিনি মাদায়েনে দশ বছর অবস্থান করেন।

"তিনি মুসাকে বললেন, আমি আমার এই কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সাথে বিবাহ দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার চাকরি করবে, যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ করো, তা তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ চাহেন তো তুমি আমাকে সৎকর্মপরায়ণ পাবে।" [সুরা কাসাস, ২৭]

কিন্তু মুসা আলাইহিস সালাম দাওয়াতি কর্মে তেমন একটা সফলতা দেখতে পাননি। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারিমে বলা হচ্ছে-

"আর মুসার প্রতি তাঁর জাতির কতিপয় লোক ছাড়া আর কেউই ঈমান আনল না-ফিরাউন ও তার সভাসদের ভয়ে যে, এরা না আবার কোনো বিপদে ফেলে দেয়। ফিরাউন দেশময় কর্তৃত্বের শিখরে আরোহণ করেছিল। আর সে ছিল সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্যতম।" [সুরা ইউনুস, আয়াত: ৮৩]

তাওরাতের একটি অনুচ্ছেদেও এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তখন মোশি সদাপ্রভুর সাক্ষাতে কহিলেন, দেখো, ইস্রায়েল-সন্তানেরা আমার বাক্যে মনোযোগ করিল না; তবে ফরৌণ কি প্রকারে শুনিবেন? আমি তো বাকপটু নহি। [৬৩]

এরপর আল্লাহ তাআলা মিশরীয়দের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে দশটি আঘাত করলেন। দশম আঘাতের পর মিশরীয়রা মুসা এবং তার দলবলকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফিরআউনের কাছে আবেদন করল।

মিশর থেকে বের হয়ে মুসা-হারুন আ. বনি-ইসরাইলকে নিয়ে সিনাইতে পৌঁছালেন। সেখানে চল্লিশ বছর ইসরাইলিরা উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরতে থাকে। একশ বিশ বছর বয়সে মুসা আলাইহিস সালাম ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের পূর্ব মুহূর্তে তিনি স্বীয় জাতির সামনে নামুসের বিধানাবলি পুনরাবৃত্তি করেন। মিশর থেকে সিনাই পর্যন্ত তাদের দীর্ঘ সফরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেন এবং সেখানে তাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। আবশ্যকীয় কর্তব্য সম্পর্কেও নসিহত করেন। এগুলোর বিস্তারিত বিবরণ পুরাতন নিয়মের দ্বিতীয় বিবরণ পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে।

তার নসিহতের অন্যতম অংশ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত দশ আজ্ঞা।
১। আমিই আল্লাহ। তোমাদের একক প্রভু।
২। আমার সামনে তোমাদের অন্য কোনো উপাস্য না থাকুক।
৩। প্রভুর নামে মিথ্যা শপথ করবে না।
৪। শনিবারকে স্মরণে রাখবে এবং তার হেফাজত করবে।
৫। পিতামাতার প্রতি সদাচরণ করবে।
৬। নরহত্যা করবে না।
৭। জিনা করবে না।
৮। চুরি করবে না।
৯। মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে না।
১০। তোমার ভাইয়ের সম্পদে হিংসা করবে না।

বলা হয়ে থাকে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুসা আলাইহিস সালামকে প্রদত্ত ফলকে এই দশটি বাক্য লিপিবদ্ধ ছিল। ফলক সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন—
"আর আমি তোমাকে ফলকে লিখে দিয়েছি সর্বপ্রকার উপদেশ ও বিস্তারিত সব বিষয়। অতএব, এগুলোকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো।" [সুরা আরাফ, আয়াত: ১৪৫]

এরপর মুসা আলাইহিস সালাম ইন্তেকাল করেন। তাকে মোয়াবে [৬৪] দাফন করা হয়। তাওরাত এর ভাষ্য অনুযায়ী তার কবর সম্পর্কে কেউ অবগত নয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেই কবর দেখিয়েছিলেন। মুসা আলাইহিস সালামের মৃত্যু সম্পর্কে হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু এর বর্ণিত হাদিসে এসেছে— ...অতঃপর তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন যাতে তাকে পবিত্র ভূমি থেকে পাথর নিক্ষেপ পরিমাণ দূরত্বে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি সেখানে থাকলে লাল টিলার নিচে রাস্তার পাশে তার কবরটি তোমাদেরকে দেখিয়ে দিতাম। [৬৫]

হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসরার রাতে লাল টিলার পাশে মুসার কবরের পাশ দিয়ে আমি যাচ্ছিলাম। তখন তিনি নিজ কবরে নামাজ পড়ছিলেন।[৬৬]

আল্লাহ তাআলা ফিরাউন ও মিশরীয়দের বিরুদ্ধে প্রমাণ দাঁড় করানোর জন্য মুসা আলাইহিস সালামের হাতে কিছু মুজেজা প্রকাশ করেছিলেন। তাওরাতে এগুলোকে 'আঘাত' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ফিরাউন ও মিশরীয়দের বিরুদ্ধে এমন আঘাতের সংখ্যা ছিল দশটি। সেগুলো হলো: ১। নীলনদের পানি রক্তে পরিণত হওয়া। ২। ব্যাঙের উৎপাত। ৩। মশার আক্রমণ। ৪। মাছি/দংশকের উৎপাত। ৫। গবাদি পশুতে মহামারি ছড়িয়ে পড়া। ৬। মানুষ ও চতুষ্পদ জন্তুতে উঁকুনের আক্রমণ। ৭। ঠান্ডা। ৮। পঙ্গপালের আক্রমণ। ৯। তিমির অন্ধকারে ছেয়ে যাওয়া। ১০। প্রথমজাত সন্তানের মৃত্যু।

এটা হলো তাওরাতের বর্ণনা। পক্ষান্তরে কুরআন সংক্ষিপ্তাকারে নয়টি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেছে। বলা হচ্ছে-
"আর আমি মুসাকে সুস্পষ্ট নয়টি নিদর্শন দিয়েছি...।" [সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১০১]

এই আয়াতের বিস্তারিত বর্ণনা স্থান পেয়েছে সুরা আরাফে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
"তারপর আমি পাকড়াও করেছি-ফেরাউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে এবং ফল ফসলের ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। অতঃপর যখন শুভদিন ফিরে আসে, তখন তারা বলতে আরম্ভ করে যে, এটাই আমাদের জন্য উপযোগী। আর যদি অকল্যাণ এসে উপস্থিত হয় তবে তাতে মুসা এবং তাঁর সঙ্গীদের অলক্ষণ বলে অভিহিত করে। শুনে রাখো তাদের অলক্ষণ আল্লাহরই এলেমে রয়েছে, অথচ এরা জানে না। তারা আরও বলতে লাগল, আমাদের ওপর জাদু করার জন্য তুমি যে নিদর্শনই নিয়ে আসো না কেন আমরা কিন্তু তোমার ওপর ঈমান আনছি না। সুতরাং আমি তাদের ওপর পাঠিয়ে দিলাম তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত প্রভৃতি বহুবিধ নিদর্শন একের পর এক। তারপরেও তারা অহংকার করল। বস্তুত তারা ছিল অপরাধপ্রবণ। আর তাদের ওপর যখন কোনো আজাব পতিত হয় তখন বলে, হে মুসা! আমাদের জন্য তোমার প্রভুর নিকট সে বিষয়ে দোয়া করো যা তিনি তোমার সাথে ওয়াদা করে রেখেছেন। যদি তুমি আমাদের ওপর থেকে এ আজাব সরিয়ে দাও, তবে অবশ্যই আমরা তোমার ওপর ঈমান আনব এবং তোমার সাথে বনি- ইসরাইলকে যেতে দেবে। অতঃপর যখন আমি তাদের ওপর থেকে আজাব তুলে নিতাম নির্ধারিত একটি সময় পর্যন্ত-যেখান পর্যন্ত তাদেরকে পৌঁছানোর উদ্দেশ্য ছিল, তখন তড়িঘড়ি তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করত।" [সুরা আরাফ, আয়াত: ১৩০-১৩৫]

কুরআনে নয়টি নিদর্শন বলতে কোন নয়টিকে বুঝানো হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করতে গিয়ে তাফসিরকারদের মাঝে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নয়টি নিদর্শন হলো লাঠি, শুভ্র হাত, দুর্ভিক্ষ, সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া, তুফান, পঙ্গপাল, উঁকুন, ব্যাঙ ও রক্ত।
সমুদ্রের মাঝে রাস্তা হওয়া এবং ফিরআউনের স্বদলবলে তাতে ডুবে মরা নয়টি নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত না হওয়াটাই অধিক যুক্তিসংগত। কেননা এটি মিশরীয়দের ওপর শাস্তির নিদর্শন পূর্ণ হওয়ার পরই সংঘটিত হয়েছিল।
মুহাম্মদ বিন কাব বলেন, নিদর্শন নয়টি হলো, শুভ্র হাত, লাঠি, সুরা আরাফে বর্ণিত পাঁচটি, সম্পদ বিনষ্টিকরণ ও পাথর।
সম্পদ বিনষ্টের বিষয়টি সুরা ইউনুসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে- "...হে আমার পরওয়ারদেগার, তাদের ধনসম্পদ ধ্বংস করে দাও..." [সুরা ইউনুস, আয়াত: ৮৮]
এটি মুসা আলাইহিস সালামের বদদুআ ছিল।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরেকটি তাফসির বর্ণিত হয়েছে। মুজাহিদ, ইকরিমা, শাবি ও কাতাদা রহিমাহুমুল্লাহও এই ধরনের তাফসির করেছেন। তারা বলেন, 'নিদর্শনগুলো হলো শুভ্র হাত, লাঠি, দুর্ভিক্ষ, ফসলের ঘাটতি, তুফান, পঙ্গপাল, উঁকুন, ব্যাঙ ও রক্ত।'

আল্লামা ইবনে কাসির রহিমাহুল্লাহ এই তাফসিরটিকে উৎকৃষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এরপর হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এর বরাতে বর্ণনা করেন যে, তিনি দুর্ভিক্ষ ও ফসলের ঘাটতিকে একটি নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করেছেন। নবম নিদর্শন হিসেবে লাঠি কর্তৃক জাদুকরদের জাদুর সাপ খেয়ে ফেলার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এরপর ইবনে কাসির বলেন, আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামকে এগুলো ছাড়াও প্রচুর নিদর্শন দিয়েছেন। যেমন লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাতের ফলে পানির ঝরনা প্রবাহিত হওয়া, মেঘে ছেয়ে যাওয়া, আকাশ থেকে মান্না-সালওয়া খাদ্য বর্ষণ প্রভৃতি। বনি ইসরাইল মিশর ছেড়ে যাওয়ার পর এগুলো দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আয়াতে বর্ণিত নয়টি নিদর্শনগুলো এমন যে, এগুলো ফিরাউন ও মিশরবাসীও প্রত্যক্ষ করেছিল এবং এই নিদর্শনগুলো দেখার পরও অস্বীকার করায় এগুলো তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে যায়।[৬৭]

টিকাঃ
৬১. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ২, অনুচ্ছেদ: ৫-১০। তবে যাত্রাপুস্তকে ফিরআউনের স্ত্রীর স্থলে কন্যার কথা বলা হয়েছে। কুরআনের সুরা কাসাসে এই ঘটনা বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে।
৬২. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায় ২, অনুচ্ছেদ: ১৪-২১; অধ্যায় ৩, অনুচ্ছেদ: ২-১০।
৬৩. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায় ৬, অনুচ্ছেদ: ১২।
৬৪. মোয়াব: জর্ডানের কেরাক শহর থেকে উত্তরে সুবাক শহরে যাওয়ার পথে মৃত সাগরের পূর্ব উপকূলজুড়ে বিস্তৃত পর্বতমালার ঐতিহাসিক নাম। উইকিপিডিয়া-নিরীক্ষক।
৬৫. সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৩৪০৭, মুসলিম, হাদিস নং: ২৩৭২।
৬৬. সহিহু মুসলিম, ২৩৭৫। কবরের মধ্যে নামাজ পড়ছিলেন বলার দ্বারা বুঝা যায়, এটি মুসা আ. এর কবরের জীবন ছিল। বাস্তব দুনিয়াবি জীবন নয়। কেননা মুসা আ. অন্যান্য মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
৬৭. ইবনে কাসির, খন্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১২৩।

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 বনি ইসরাইলকে নিয়ে মুসা আলাইহিস সালামের মিশর ত্যাগ

📄 বনি ইসরাইলকে নিয়ে মুসা আলাইহিস সালামের মিশর ত্যাগ


ইতিহাসবিদ ড. আহমদ সওসাহ বলেন, বাইবেলের পুরাতন নিয়মের যাত্রাপুস্তকে বিশদভাবে বর্ণিত বনি ইসরাইলকে নিয়ে মুসা আলাইহিস সালামের মিশর ত্যাগের ঘটনাটি কোনো রূপকথা নয়। এটি বিশাল এক জনগোষ্ঠীর মিশর ত্যাগের বাস্তবসত্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এরপর তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত বর্ণনার সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ যেটা আমাদের সামনে আছে তা হলো তাওরাত। এটি সংকলন করা হয়েছে ঘটনার আটশ বছর পর। কিন্তু বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সংকলন করার ফলে ঘটনাটি অনেকটা বিকৃত হয়েই সেখানে উপস্থাপিত হয়েছে। যদ্দরুণ অনেকের দৃষ্টিতে এটি ঐতিহাসিক সত্যের বদলে রূপকথায় পরিণত হয়েছে।[৬৮]

ইহুদিদের ঐতিহাসিক বর্ণনামতে আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামকে ফিরআউনের কাছে গিয়ে বনি ইসরাইলের মিশর ত্যাগের অনুমতি চাইতে নির্দেশ দেন। কিন্তু ফিরাউন দম্ভভরে অস্বীকৃতি জানায়। তখন আল্লাহ তাআলা দশম আঘাতটি প্রেরণ করেন। দশম আঘাতটি ছিল প্রথমজাত সন্তান ও শাবকের মৃত্যু। যাত্রাপুস্তকে বলা হয়েছে-
"পরে মধ্যরাত্রে এই ঘটনা হইল, সদাপ্রভু সিংহাসনে উপবিষ্ট ফরৌণের প্রথমজাত সন্তান অবধি কারাকূপস্থ বন্দির প্রথমজাত সন্তান পর্যন্ত মিশর দেশস্থ সমস্ত প্রথমজাত সন্তানকে ও পশুদের প্রথমজাত শাবকগণকে নিহনন করিলেন। তাহাতে ফরৌণ ও তাঁহার দাসগণ এবং সমস্ত মিশরীয় লোক রাত্রিতে উঠিল, এবং মিশরে মহাক্রন্দন হইল; কেননা যে ঘরে কেহ মরে নাই, এমন ঘরই ছিল না। তখন রাত্রিকালেই ফরৌণ মোশি ও হারোণকে ডাকাইয়া কহিলেন, তোমরা উঠ, ইস্রায়েল-সন্তানদিগকে লইয়া আমার প্রজাদের মধ্য হইতে বাহির হও, তোমরা যাও, তোমরা গিয়া তোমাদের কথানুসারে সদাপ্রভুর সেবা করো।"[৬৯]

এখানে যাত্রাপুস্তকের রচয়িতা একটি ভুল করে বসলেন। চতুষ্পদ জন্তুর মৃত্যুর বিষয়টি পঞ্চম আঘাতে উল্লেখ করার পর এখানে দশম আঘাতে পুনরায় উল্লেখ করলেন। অথচ পঞ্চম আঘাতটি ছিল মহামারির প্রকোপ যেখানে মিশরীয়দের সমস্ত পশু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। পঞ্চম আঘাতে নিঃশেষ হওয়া জন্তুর দশম আঘাতে আবার প্রথমজাত শাবক মারা যাওয়া নিতান্তই হাস্যকর বিষয়। যাত্রাপুস্তকে বলা হয়েছে—

"পরে সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, তুমি ফরৌণের নিকটে গিয়া তাহাকে বলো, সদাপ্রভু, ইব্রীয়দের ঈশ্বর, এই কথা কহেন, আমার সেবা করণার্থে আমার প্রজাদিগকে ছাড়িয়া দেও। যদি তাহাদিগকে ছাড়িয়া দিতে অসম্মত হও, অথবা এখনও বাধা দেও, তবে দেখো, ক্ষেত্রস্থ তোমার পশুধনের ওপর, অশ্বদের, গর্দভদের, উষ্ট্রদের, গোপালের ও মেষপালের ওপর সদাপ্রভুর হস্ত রহিয়াছে; কঠিন মহামারি হইবে। কিন্তু সদাপ্রভু ইস্রায়েলের পশুতে ও মিশরের পশুতে প্রভেদ করিবেন; তাহাতে ইস্রায়েল-সন্তানদের কোন পশু মরিবে না। আর সদাপ্রভু সময় নিরূপণ করিয়া কহিলেন, কল্য সদাপ্রভু দেশে এই কর্ম করিবেন। পরদিন সদাপ্রভু তাহাই করিলেন, তাহাতে মিশরের সকল পশু মরিল, কিন্তু ইস্রায়েল-সন্তানদের পশুদের মধ্যে একটিও মরিল না। তখন ফরৌণ লোক পাঠাইলেন, আর দেখো, ইস্রায়েলের একটি পশুও মরে নাই; তথাপি ফরৌণের হৃদয় ভারী হইল এবং তিনি লোকদিগকে ছাড়িয়া দিলেন না। [৭০]

সুতরাং চতুষ্পদ জন্তুর দুইবার উল্লেখ করাটা সুস্পষ্ট বিরোধ।

এই ঘটনায় তাওরাতের স্ববিরোধী আরেকটি বক্তব্য হলো—এক জায়গায় বলা হয়েছে ফিরাউন ইসরাইলিদের বাধা দিয়েছে। যেতে দেয়নি। পক্ষান্তরে আরেক জায়গায় বলা হয়েছে মিশরীয়রা ইসরাইলিদের মিশর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। অবশ্য তাদের পণ্ডিতগণ উভয় বর্ণনার মাঝে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছেন। তারা বলেছেন, দশম আঘাতের পর ফিরাউন মুসা আলাইহিস সালামকে মিশর ত্যাগের অনুমতি দেয়। কিন্তু পরে তার মতিভ্রম ঘটে। তাই অনুমতি দিয়েও আবার বনি ইসরাইলের পিছু ধাওয়া করে।

অনেকে আবার বিষয়টি এভাবেও ব্যাখ্যা করেছেন যে, ইসরাইলিরা তাদের মিশরীয় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে স্বর্ণ-রূপার বিভিন্ন জিনিসপত্র ধার নিয়েছিল। যেমন যাত্রাপুস্তকে বলা হয়েছে—

"আর ইস্রায়েল-সন্তানেরা মোশির কথা অনুসারে কার্য করিল; ফলে তাহারা মিশরীয়দের কাছে রৌপ্যালংকার, স্বর্ণালংকার ও বস্ত্র চাহিল। আর সদাপ্রভু মিশরীয়দের দৃষ্টিতে তাহাদিগকে অনুগ্রহের পাত্র করিলেন, তাই তাহারা যাহা চাহিল, মিশরীয়েরা তাহাদিগকে তাহাই দিল। এইরূপে তাহারা মিশরীয়দের ধন হরণ করিল। [৭১]

যাত্রাপুস্তকের উক্ত ভাষ্য অনুযায়ী প্রতিবেশীরা ইসরাইলিদের শত্রু ছিল না। যাই হোক, ফিরাউন বনি ইসরাইলকে তাড়া করার পেছনে অন্যতম একটি কারণ ছিল এসব মূল্যবান সামগ্রী ফিরিয়ে আনা।

কিন্তু কুরআন ফিরাউন কর্তৃক বনি ইসরাইলের পিছু নেওয়ার কারণ বর্ণনা করেনি। এতটুকু ইঙ্গিত করেছে যে, মুসা আলাইহিস সালাম বনি ইসরাইলকে নিয়ে গোপনে মিশর থেকে বেরিয়ে যান। এরপর ফিরাউন ও তার বাহিনী পিছু নেয়। কুরআনে বলা হচ্ছে-

"আমি মুসার প্রতি এই মর্মে ওহি পাঠালাম যে, আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাত্রিযোগে বের হয়ে যাও এবং তাদের জন্যে সমুদ্রে শুষ্কপথ নির্মাণ করো। পেছন থেকে এসে তোমাদের ধরে ফেলার আশঙ্কা করো না এবং পানিতে ডুবে যাওয়ার ভয় করো না। অতঃপর ফিরাউন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল এবং সমুদ্র তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করল।" [সুরা ত্বাহা, আয়াত: ৭৭-৭৮]

এর পূর্বেই মুসা আলাইহিস সালাম ফেরাউনের কাছে বনি ইসরাইলকে ছেড়ে দেওয়ার আবেদন করেছিলেন।
"...অতএব আমাদের সাথে বনি ইসরাইলকে যেতে দাও..." [সুরা ত্বাহা, ৪৭]

যাত্রাপুস্তকে বলা হয়েছে-
"তখন ইস্রায়েল-সন্তানেরা বালক ছাড়া কমবেশ ছয় লক্ষ পদাতিক পুরুষ রামিষেষ হইতে সুক্কোতে যাত্রা করিল। [৭২] পরে সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, তুমি আমার কাছে কেন ক্রন্দন করিতেছ? ইস্রায়েল-সন্তানদিগকে অগ্রসর হইতে বলো। আর তুমি আপন যষ্টি তুলিয়া সমুদ্রের উপরে হস্ত বিস্তার করো, সমুদ্রকে দুই ভাগ করো; তাহাতে ইস্রায়েল-সন্তানেরা শুষ্ক পথে সমুদ্রমধ্যে প্রবেশ করিবে। আর দেখ, আমিই মিশরীয়দের হৃদয় কঠিন করিব, তাহাতে তাহারা ইহাদের পশ্চাৎ প্রবেশ করিবে এবং আমি ফরৌণের, তাহার সকল সৈন্যের, তাহার রথ সকলের ও তাহার অশ্বারোহীগণের দ্বারা গৌরবান্বিত হইব।”[৭৩]

ফিরাউন ও তার বাহিনী বনি ইসরাইলের পিছু পিছু সমুদ্র অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। আর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ডুবিয়ে মারলেন।

বনি ইসরাইলের মিশর ত্যাগের ঘটনা কুরআনের বহু সুরাতেই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোন পথে তারা মিশর ত্যাগ করেছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন।

গবেষকগণ তাওরাতের বর্ণনাকে সামনে রেখে যে পথটিকে অধিক সম্ভাবনাপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সেটা হলো সিনাইমুখী প্রাচীন খনিশ্রমিকদের পথটি। বনি ইসরাইল রামেসিস এর জাসান থেকে সুক্কোতে সফর করে। এরপর সুক্কোত থেকে মরুভূমির নিকটবর্তী এথমে শিবির স্থাপন করে। সেখান থেকে যাত্রা করে মিগদোল এবং সূফ সাগরের মধ্যবর্তী বালসফোনের সামনে তারা রাত্রি যাপন করে। এখানে অবস্থানকালেই মিশরীয়রা তাদের পিছু ধাওয়া করার উদ্দেশ্যে বের হয়। এরপর ইসরাইলিরা শুর মরুভূমির দিকে যাত্রা শুরু করে। এ যাত্রায় তারা প্রথমে মারা, মারা থেকে এলিম, এলিম থেকে সিনাই-এর মধ্যবর্তী সিন মরুভূমিতে পৌঁছায়। এরপর তারা দুফকাতে শিবির স্থাপন করে। সেখান থেকে উশ এবং উশ থেকে রফিদিম-এ গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। এই রফিদিমেই আমালেকা সম্প্রদায়ের সাথে তাদের প্রথম সংঘর্ষ হয়। রফিদিম থেকে ইসরাইলিরা সিনাই উপত্যকায় সিনাই পর্বতের সম্মুখে শিবির স্থাপন করে। এই পর্বতটিই পরবর্তীতে মুসার পর্বত এবং তুর পর্বত নামে পরিচিত হয়। এখানেই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের জন্য শরিয়তের বিধিবিধান নাজিল করা হয়। মাদায়েন থেকে মুসা আলাইহিস সালামের স্ত্রী সাধুরা, দুই সন্তান এবং শ্বশুর যিথ্রো এসে এখানেই মিলিত হন।

বনি ইসরাইল সিনাই উপত্যকায় এক বছর অবস্থান করে। এরপর আল্লাহর নির্দেশে সিনাই থেকে ১৫০ মাইল উত্তরে কাদেশ বরনিয় অভিমুখে রওয়ানা হয়। আকাবা উপসাগরের তীরবর্তী হাদারামাউতের পাশ দিয়ে তারা ফারান প্রান্তরে পৌঁছায়। সেখান থেকে অনেকগুলো গ্রাম পেরিয়ে তারা আকাবা উপসাগরের শেষ বিন্দু এজিয়ন হয়ে জিন উপত্যকায় পৌঁছায়। এই জিন উপত্যকাই হলো তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত কাদেশ বরনিয়। সেখানে তারা ইদম এর নিকটবর্তী হুর পর্বত অবস্থান করতে থাকে।[৭৪] আর এখানেই মুসা আলাইহিস সালামের মৃত্যু হয়।

ইসরাইলিদের জন্য সরাসরি জাসান থেকে কেনানে চলে আসা সম্ভব ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায় ছিল ফিরাউন ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করা। তাই মুসা আলাইহিস সালাম সহজ পথটি না ধরে আল্লাহর ইচ্ছায় বাঁকা ও ঘুরপথ নির্বাচন করেন। এ সম্পর্কে তাওরাতে বলা হয়েছে-
"আর ফরৌণ লোকদিগকে ছাড়িয়া দিলে, পলেষ্টীয়দের দেশ দিয়া সোজা পথ থাকিলেও ঈশ্বর সেই পথে তাহাদিগকে চালাইলেন না, কেননা ঈশ্বর কহিলেন, যুদ্ধ দেখিলে পাছে লোকেরা অনুতাপ করিয়া মিশরে ফিরিয়া যায়। অতএব ঈশ্বর লোকদিগকে সূফসাগরের প্রান্তরময় পথ দিয়া গমন করাইলেন।"[৭৫]

সিনাই মরুভূমিতে বনি ইসরাইল চল্লিশ বছর উদভ্রান্তের ন্যায় ঘোরাঘুরি করে। এ সময় না তারা মুসার আনুগত্য করেছে, না তারা শরিয়তের পাবন্দ হয়েছে। মুসা আলাইহিস সালাম ও হারুন আলাইহিস সালাম তাদেরকে কেনান অভিমুখে রওয়ানা হতে বলেছিলেন। কিন্তু তারা যুদ্ধের ব্যাপারে শুধু গা-ছাড়া ভাব আর কাপুরুষতাই প্রদর্শন করেছে।

"তারা বলল: হে মুসা, সেখানে একটি প্রবল পরাক্রান্ত জাতি রয়েছে। আমরা কখনও সেখানে যাব না, যে পর্যন্ত না তারা সেখান থেকে বের হয়ে যায়। তারা যদি সেখান থেকে বের হয়ে যায় তবে নিশ্চিতই আমরা প্রবেশ করব।" [সুরা মায়েদা, আয়াত: ২২]

"তারা বলল হে মুসা, আমরা জীবনেও কখনো সেখানে যাব না, যতক্ষণ তারা সেখানে থাকবে। অতএব, আপনি ও আপনার পালনকর্তাই যান এবং উভয়ে যুদ্ধ করে নিন। আমরা তো এখানেই বসলাম। মুসা বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমি শুধু নিজের ওপর ও নিজের ভাইয়ের উপর ক্ষমতা রাখি। অতএব, আপনি আমাদের মধ্যে ও এ অবাধ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ করুন। বললেন, এ দেশ চল্লিশ বছর পর্যন্ত তাদের জন্যে হারাম করা হলো। তারা ভূপৃষ্ঠে উদভ্রান্ত হয়ে ফিরবে। অতএব, আপনি অবাধ্য সম্প্রদায়ের জন্যে দুঃখ করবেন না।" [সুরা মায়েদা, আয়াত: ২৪-২৬]

তাদের এই কাপুরুষতা ও অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর রাগান্বিত হলেন এবং তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিলেন। তারা দীর্ঘ চল্লিশ বছর উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরতে থাকে।

সিনাই মরুভুমিতে পৌঁছে মুসা আলাইহিস সালাম প্রথম যে কাজটি করেন সেটি ছিল বনি ইসরাইলের আদমশুমারি। এ সম্পর্কে কথিত তাওরাতে বলা হয়েছে-
"মিশর দেশ হইতে লোকদের বাহির হইয়া আসিবার পর দ্বিতীয় বৎসরের দ্বিতীয় মাসের প্রথম দিবসে সদাপ্রভু সীনয় প্রান্তরে সমাগম-তাম্বুতে মোশিকে কহিলেন, তোমরা লোকদের গোষ্ঠী অনুসারে, পিতৃকুলানুসারে, নাম-সংখ্যানুসারে ইস্রায়েল-সন্তানদের সমস্ত মণ্ডলীর, প্রত্যেক পুরুষের মস্তকের সংখ্যা গ্রহণ কর। বিংশতি বৎসর ও ততধিক বয়স্ক যত পুরুষ ইস্রায়েলের মধ্যে যুদ্ধে গমনযোগ্য, তাহাদের সৈন্য অনুসারে তুমি ও হারোণ তাহাদিগকে গণনা কর।” [৭৬]

গণনার পর এদের সংখ্যা দাঁড়াল ছয় লক্ষ তিন হাজার পাঁচশ পঞ্চাশ জন। তবে লেবীয়দের এই গণনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। [৭৭]

তাওরাতে বর্ণিত এই সংখ্যার সুস্পষ্ট অতিরঞ্জন পরিলক্ষিত হয়। কেননা আদিপুস্তকের ভাষ্য অনুযায়ী ইয়াকুব আলাইহিস সালাম যখন তার সন্তানদেরকে নিয়ে মিশর পৌঁছান তখন তাদের সংখ্যা ছিল সত্তর। এদের মধ্যে মুসা আলাইহিস সালামের দাদা কহাৎ ইবনে লেবি ইবনে ইয়াকুব এর বয়স ছিল তখন সাত বছর। এরপর মিশর ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত বনি ইসরাইলের মাত্র দুটি প্রজন্ম জন্মগ্রহণ করে। কহাৎ এর পুত্র ইমরানের প্রজন্ম এবং ইমরানপুত্র মুসা ও হারুনের প্রজন্ম। সুতরাং মাত্র সত্তরজন নারী-পুরুষ থেকে দুটি প্রজন্মের ব্যবধানে ছয় লক্ষাধিক জনসংখ্যার বিস্তার অসম্ভব। তাও এই সংখ্যাটা বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের বাদ দিয়ে। এজন্যই গবেষকগণ এই বিষয়টি নিয়ে কথিত তাওরাতের ব্যাপক সমালোচনা করে থাকেন। এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ব্রিটানিকাতেও এই সংখ্যা পনেরো হাজারের বেশি নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[৭৮]

কিন্তু কুরআন এই বাস্তবতাকে তুলে ধরে বলেছে—
"নিশ্চয় এরা ক্ষুদ্র একটি দল।" [সুরা শুআরা, আয়াত: ৫৪]

এর স্বপক্ষে তাওরাতের প্রথম বিবরণীরও সমর্থন পাওয়া যায়। যেখানে বলা হয়েছে— যখন তোমরা সেখানে কমসংখ্যক এবং অপরিচিত ছিলে। সংখ্যার এই গরমিল থেকে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কাছে বিদ্যমান তাওরাতের চরম বিকৃত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে।

টিকাঃ
৬৮. আল-আরব ওয়াল-ইয়াহুদ ফিত তারিখ, পৃষ্ঠা: ২৭৮।
৬৯. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ১২, অনুচ্ছেদ: ২৯-৩১।
৭০. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ৯, অনুচ্ছেদ: ১-৭।
৭১. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায় : ১২, অনুচ্ছেদ: ৩৫-৩৬।
৭২. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায় : ১২, অনুচ্ছেদ: ৩৭।
৭৩. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ১৪, অনুচ্ছেদ: ১৫-১৭।
৭৪. আল-আরব ওয়াল ইয়াহুদ ফিত তারিখ, পৃষ্ঠা: ২৮৬।
৭৫. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ১৩, অনুচ্ছেদ: ১৭-১৮।
৭৬. গণনাপুস্তক, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ১-৩।
৭৭. গণনাপুস্তক, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ৪৭।
৭৮. এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ব্রিটানিকা, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৪৮৯, ড. ইহসানুল হক রানা রচিত আল-ইহুদিয়্যাহ ওয়াল মাসিহিয়্যাহ এর সূত্রে।

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 মিশর ত্যাগের তারিখ

📄 মিশর ত্যাগের তারিখ


মুসা আলাইহিস সালামের সময়কাল এবং বনি ইসরাইলকে নিয়ে মিশর ত্যাগের তারিখ নির্ণয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

১। মিশরীয় ইতিহাসবিদ ম্যানিথো (খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০) এর মতে তার সময়কালের ছয় শতাব্দী পূর্বে বনি ইসরাইলের মিশর ত্যাগের ঘটনা ঘটেছিল। ম্যানিথোর এই মতটি উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ব্যাপকাকারে গ্রহণযোগ্য ছিল। তিনি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন যে, মিশরীয় হেক্সোস সম্রাট এ শতাব্দীতেই মিশর থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এই মতের সাথে একমত নয়।

২। দ্বিতীয় মত হলো, মুসা আলাইহিস সালাম ছিলেন বাদশাহ তৃতীয় থোথমোস (১৪৯০-১২৩৬ খ্রিষ্টপূর্ব) এর সামসময়িক। আর মিশর ত্যাগের ঘটনা ঘটে দ্বিতীয় আমুন হোতেফ (১৪৩৬-১৪১১ খ্রিষ্টপূর্ব) এর সময়ে।

৩। তৃতীয় মত হলো, মিসর ত্যাগের ঘটনা দ্বিতীয় র‍্যামেসিস (১২৯০-১২২৩ খ্রিষ্টপূর্ব) এর সময়ে সংঘটিত হয়।

৪। চতুর্থ মত হলো, এটি সংঘটিত হয়েছিল সম্রাট মানেফতাহ (১২২৩-১২১১ খ্রিষ্টপূর্ব) এর শাসনামলে। মিশরীয় বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক ফলকের সুবাদে শেষোক্ত মতটির সমর্থন পাওয়া যায়। এগুলোর খোদাই করা তথ্যানুসারে সম্রাট মানেফতাহ বনি ইসরাইলকে সমূলে উচ্ছেদ করেছিলেন। [৭৯]

টিকাঃ
৭৯. আহমদ বদরি, মাওয়াকিবুশ শামস, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৯১২। ফরাসি বিজ্ঞানী মরিস বুকাইলি তার বিখ্যাত গ্রন্থ কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানে এই মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, "দীর্ঘায়ু লাভ করা দ্বিতীয় র‍্যামেসিস এক্সোডাসের ফিরাউন না হওয়াটাই সুনিশ্চিত। তার পরবর্তী মানেফস্তাহ-ই হলো সেই ফিরাউন যে ইবরানিদের তাড়াতে গিয়ে মারা যায়।"

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 বনি ইসরাইলের মিশরে অবস্থানকাল

📄 বনি ইসরাইলের মিশরে অবস্থানকাল


কথিত আছে, বনি ইসরাইল মিশরে চারশ ত্রিশ বছর বসবাস করেছিল। কিন্তু এই তথ্য সঠিক নয়। হাফেজ ইবনে হাযাম এই সংখ্যাটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “বনি ইসরাইলের মিশরে চারশ ত্রিশ বছর অবস্থানের তথ্যটি যুগ যুগ ধরে চলে আসা একটি চরম ভিত্তিহীন তথ্য। কেননা পূর্বেই বলা হয়েছে, কহাৎ ইবনে লেবি স্বীয় দাদা ইয়াকুব ও বাপ-চাচাদের সাথেই মিশরে আগমন করেন। তিনি সর্বমোট বয়স পেয়েছিলেন একশ তেত্রিশ বছর। আর বনি ইসরাইলকে নিয়ে মিশর থেকে বের হওয়ার সময় মুসা আলাইহিস সালামের বয়স ছিল আশি বছর। এই তথ্যগুলো তাদের কাছে সংরক্ষিত কথিত তাওরাতেই রয়েছে। এখন যদি ধরে নেওয়া হয়, মিশরে প্রবেশের সময় কহাৎ এর বয়স ছিল এক মাস বা তারও কম এবং ইমরানের জন্ম কহাৎ এর মৃত্যুর পরেও হয়। একইভাবে মুসা আলাইহিস সালামের জন্মও ইমরানের মৃত্যুর পর হয় তাহলে সাকুল্যে সময়কাল দাঁড়ায় তিনশ পঞ্চাশ বছর। তাহলে তাদের দাবিকৃত চারশ ত্রিশ বছরের মধ্যে অবশিষ্ট আশি বছর কোথায়? তাদের কারও কারও দাবির প্রেক্ষিতে বাবা ও ভাইদের আগমনের পূর্বে ইউসুফ আলাইহিস সালামের মিশরে অবস্থানকালও যদি যোগ করা হয় তাও সংখ্যাটি চারশ ত্রিশ হয় না। কেননা ইউসুফ আলাইহিস সালাম যখন মিশরে আসেন তখন তার বয়স ছিল সতেরো। আর ইয়াকুব আলাইহিস সালাম যখন পরিবার নিয়ে মিশরে আগমন করেন তখন ইউসুফ আলাইহিস সালামের বয়স ছিল উনচল্লিশ। সুতরাং ভাইদের পূর্বে তিনি বাইশ বছর মিশরে ছিলেন। তিনশ পঞ্চাশের সাথে এই বাইশ বছর যোগ করলে সংখ্যা দাঁড়ায় তিনশ বাহাত্তর বছর। এরপরও আটান্ন বছরের ঘাটতি থেকে যায় যা কোনভাবেই মিলানো সম্ভব না।" এরপর তিনি বলেন, “এটি লোকমুখে চর্চিত একটি ভিত্তিহীন আষাঢ়ে গল্প। সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী কেউই এই সংখ্যাটি বিশ্বাস করবে না।” শেষে তিনি বলেন, “ইসরাইলি গ্রন্থগুলোর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণপূর্বক সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত হলো ইয়াকুব আলাইহিস সালাম পরিবারসহ মিশরে প্রবেশ থেকে নিয়ে মুসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক ইসরাইলিদের নিয়ে বের হওয়া পর্যন্ত সময়কাল হলো সাকুল্যে দুইশ সতেরো বছর।”[৮০]

টিকাঃ
৮০. আল-ফসলু ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়াই ওয়ান নিহাল, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৫৯।

ফন্ট সাইজ
15px
17px