📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 ইবরানি কারা?

📄 ইবরানি কারা?


ড. আহমদ সওসাহ বলেন, "অধিকাংশ আরব ও ইউরোপিয়ান ইতিহাসবিদ ইবারি বা ইবরানি (Hebrews) শব্দটি যে অর্থে ব্যবহার করেছেন প্রাচীন গ্রন্থসমূহে শব্দটি সে অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দ এবং তারও আগে শব্দটি উত্তর আরব এবং শামের মরুঅঞ্চলের কতগুলো গোত্রকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হতো এবং ইবারিয়‍্যাহ (Hebrew) বলতে বোঝানো হতো এদের ভাষাকে। এটি ফিলিস্তিনের প্রাচীনতম অধিবাসী কানানিদের ভাষা। এ ছাড়াও সিনাই উপত্যকায় বসবাসকারী গোত্রসমূহ এবং উত্তর জর্ডানের আমালেকা, মাদায়েনি প্রভৃতি আরবগোত্রের ভাষাও ছিল এটি।

প্রথমদিকে কিছু যাযাবর গোত্রকে ইবারি বলা হলেও পরবর্তী সময় মরুঅঞ্চলের অধিবাসীকেই সাধারণভাবে ইবারি হিসেবে অভিহিত করার প্রচলন পড়ে যায়। প্রাচীন আসমানি গ্রন্থসমূহ এবং ফিরাউনদের বিভিন্ন লিপিতে এ শব্দটির বিভিন্ন ব্যাবহারিক রূপ দেখতে পাওয়া যায়। যে সময়টাতে এই শব্দটি জাতি কিংবা ভাষা অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে তখন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে ইহুদিদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মুসা আলাইহিস সালামের অনুসারী দাবিদার ইহুদিরাও বলে থাকে যে এই ইবরানি হলো কানানিদের ভাষা। পাশাপাশি ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে প্রভাব বিস্তারকারী আরামীয়রাও এই ভাষাভাষি ছিল। সে সময়ে ইবরানি শব্দটি আরামীয়দের সমস্ত শাখাগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল। আর এরা সবাই ছিল খাঁটি আরব। জাযিরাতুল আরব থেকে এসে তারা এখানে বসতি স্থাপন করে। আর তখন পর্যন্ত ইহুদিদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। [৪৪]

ইহুদিদের কথিত তাওরাতে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্য ইবারি শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।[৪৫] তাদের দাবি হলো, ইবরানিরা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বংশধারা থেকে এসেছে। কিন্তু তাদের এই দাবি স্বেচ্ছাচারিতা বৈ কিছুই নয়। তাওরাতের বিরোধপূর্ণ বর্ণনা থেকেই তাদের এই দাবির অসারতা প্রমাণিত হয়। সেখানে কখনো ইসরাইলিদেরকে ইবরানি নামে সম্বোধন করা হয়েছে আবার কখনো এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যেন তাদের সাথে ইবরানিদের দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই। যেমন যাত্রাপুস্তকে বলা হয়েছে-
"তুমি ইব্রীয় দাস ক্রয় করিলে সে ছয় বৎসর দাসত্ব করিবে, পরে সপ্তম বৎসরে বিনামূল্যে মুক্ত হইয়া চলিয়া যাইবে।” [৪৬]

তাদের কাছে বিদ্যমান তাওরাতের তথ্যমতে একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, দাসেরা ইসরাইলি বংশধারার নয়। বরং ভিন্ন বংশধারা থেকেই তাদের উদ্ভব। [৪৭] মরু অঞ্চলের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে মিশরীয় ও ফিলিস্তিনিরা রূপক অর্থে ইসরাইলিদেরকে ইবারি হিসেবে চিহ্নিত করলেও প্রাচীন ইবারি বা ইবরানি তারা নয়, যা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। সংগত কারণে দেখা যায়-বনি ইসরাইল যখন কেনানে বসতি স্থাপন করল এবং মরু অঞ্চলের যাযাবর জীবন ছেড়ে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হতে লাগল সে সময় তাদের জন্য ইবারি শব্দ ব্যবহার করাটাকে তারা অপছন্দ করত।[৪৮]

ইবারি শব্দের উৎসমূল বিষয়ে ভাষাবিদগণ সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। অনেকে মনে করেন, শব্দটি আরবি (عربي) শব্দের বিকৃত রূপ। আরবি শব্দের ‘রা’ এবং ‘বা’ বর্ণের স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমেই শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেকেই এর উল্টো মত পোষণ করেছেন। অর্থাৎ ইবারি (عبري) শব্দ থেকে বর্ণদ্বয়ের স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে আরবি (عربي) শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। এই মতটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ, কেননা প্রায়োগিক দিক থেকে এটি প্রথম খলিলুল্লাহ ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। তাও পৃথিবীতে জাতি হিসেবে ইসরাইলিদের আবির্ভাবের পূর্বে। এজন্যই ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ব্যাপারে ইহুদি হওয়ার যে দাবি তারা করে থাকে কুরআন তা নাকচ করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
"ইবরাহিম ইহুদি ছিলেন না এবং নাসারাও ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন ‘হানিফ’ অর্থাৎ, সব মিথ্যা ধর্মের প্রতি বিমুখ এবং আত্মসমর্পণকারী এবং তিনি মুশরিক ছিলেন না।" [সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৬৭]

অর্থাৎ তিনি ইহুদিদের ইশ্বর যেহোভা (Jehova) এর অনুসারী ছিলেন না। এখন প্রশ্ন হলো, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কে ইবারি নামকরণের কারণ কী? এর জবাবে গবেষকগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন।

১. এটি আরবি ‘আবারা (عبر)’ শব্দ থেকে নির্গত, যার অর্থ পাড়ি দেওয়া। যেহেতু ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ফুরাত ও জর্ডান নদী পাড়ি দিয়েছেন, তাই তাকে এ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
২. অনেকের মতে আবির (عابر) বা ইবার (عبر) নামে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের একজন পূর্বপুরুষ ছিলেন। তার দিকে সম্বন্ধ করে তাকে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে।[৫১]

কিন্তু উইলফেনসন এই দুটি মতের একটিও মেনে নিতে পারেননি। তিনি মনে করেন, ইবারি শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং বনি ইসরাইলের মূল নিবাসের দিকে সম্বন্ধ করেই এই নামকরণ করা হয়। কেননা, বনি ইসরাইল প্রকৃতপক্ষে মরুবাসী ছিল। নির্দিষ্ট কোনো স্থানে তারা থিতু হতো না। পানি ও চারণভূমির সন্ধানে তারা নিজেদের চতুষ্পদ জন্তুগুলো নিয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে বিচরণ করে বেড়াত। তিনি বলেন, ইবারি শব্দটি মূলত আরবি ‘আবারা (عبر)’ ফেয়েল তথা ক্রিয়াবাচক শব্দ থেকে নির্গত। এর অর্থ হচ্ছে, রাস্তা, উপত্যকা কিংবা নদী প্রভৃতি পাড়ি দেওয়া। আরবি এবং ইবরানি উভয় ভাষায় শব্দটি এই অর্থ ধারণ করে। মরুবাসী যাযাবরদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরতে থাকা। পাড়ি দেওয়ার অর্থটি এই শব্দের মধ্যে বিদ্যমান। সুতরাং ইবারি শব্দের অর্থ হচ্ছে মরুবাসী। [৫২]

উইলফেনসনের এই অভিমত ব্যক্ত করার কারণ হলো, তিনি শুধুমাত্র বনি ইসরাইলকে ইবরানি মনে করেন। নতুবা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, শুধু বনি ইসরাইলকে ইবরানি নামে অভিহিত করা বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছু নয়। কেননা, এ নামটি বনি ইসরাইলের অস্তিত্বের বহু আগেও ছিল। তবে কানানি ও আরামীয়রা অন্য জাতি থেকে পার্থক্য করার জন্য বনি ইসরাইলকে ইবরানি নামে অভিহিত করত।

টিকাঃ
৪৪. জেমস উইলফেনসন কর্তৃক রচিত তারিখুল ইয়াহুদ ফিল আরব এবং আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ এর ইবরাহিম আবুল আম্বিয়া এর সূত্রে আর-আরব ওয়াল ইয়াহুদ ফিত তারিখ, পৃষ্ঠা: ২৪৩
৪৫. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১০, অনুচ্ছেদ: ২৪; অধ্যায়: ১১, অনুচ্ছেদ: ১৪; অধ্যায়: ১৪, অনুচ্ছেদ: ১৩।
৪৬. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ২১, অনুচ্ছেদ: ২।
৪৭. লেবীয় পুস্তক, অধ্যায়: ২৫, অনুচ্ছেদ: ৪২।
৪৮. তারিখুল লুগাতিস সামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৭৮।
৪৯. উইলফেনসন তার তারিখল লুগাতিস সামিয়‍্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মিসরের Tell amarna-তে কিছু ঐতিহাসিক চিঠি হস্তগত হয়েছে। এগুলো খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীতে বাদশাহ আমুনহোতেফ এর সময়কার। সে সময় বনি ইসরাইল মিশরের অধীন ছিল। ফিলিস্তিনের কানানি আমিরদের পক্ষ থেকে মিশর সম্রাট বরাবর লিখিত এসব চিঠিতে উল্লেখ হয়েছে যে, ইবারি গোত্রগুলো ফিলিস্তিনে আক্রমণ করছে। আর তারা মিশরের অধীনস্ত মরু অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করছে।
৫০. তারিখুল আরব ওয়াল বিলাদ ফিত তারিখ, পৃষ্ঠা: ২৪৮।
৫১. তানকিহুল আবহাছ লিল মিলালিস সালাস, পৃষ্ঠা: ২২।
৫২. তারিখুল লুগাতিস সামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৭৭-৭৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px