📄 ইবরাহিম আলাইহিস সালামের পরিবারবর্গ
হাজেরার গর্ভে ইসমাইল আলাইহিস সালামের জন্ম হয়। ইসমাইল ইবরানি (Hebrew) শব্দ। এর অর্থ হলো আল্লাহ শোনেন, সাড়া দেন। যেহেতু ৮৬ বছর বয়সে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার কাছে সন্তান কামনা করে দুআ করেছিলেন এবং সেই দুআয় সাড়া দিয়ে আল্লাহ তাআলা ইসমাইল আলাইহিস সালামকে দান করেছিলেন তাই এ নামে নামকরণ করা হয়।[১৮] ইসমাইল আলাইহিস সালাম হলেন সেমেটিকদের আদিপিতা। তার মাধ্যমে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছিল।
বাইবেলের আদিপুস্তকে বর্ণিত হয়েছে, 'আর ইশমায়েলের বিষয়েও তোমার প্রার্থনা শুনিলাম; দেখো আমি তাহাকে আশীর্বাদ করিলাম এবং তাহাকে ফলবান করিয়া তাহার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব; তাহা হইতে দ্বাদশ রাজা উৎপন্ন হইবে, ও আমি তাহাকে বড় জাতি করিব।[১৯] তার বংশের সর্বশেষ নবি হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশ পরম্পরা নিম্নরূপ:
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম ইবনে আবদে মানাফ ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব ইবনে মুররা ইবনে কাআব ইবনে লুয়াই ইবনে গালিব ইবনে ফিহর ইবনে মালেক ইবনে নজর [২০] ইবনে কানানা ইবনে খোজাইমা ইবনে মুদরাকা ইবনে ইলিয়াস ইবনে মুজার ইবনে নিজার ইবনে মাআদ ইবনে আদনান।
বংশবিশারদ, ফুকাহা ও মুহাদ্দিসিনগণ নবিজির বংশ পরম্পরার এ পর্যন্ত বর্ণনার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে একমত। আর এ বর্ণনাটি ইমাম বুখারি তার সহিহ গ্রন্থে 'মানাকিবুল আনসার' এর 'মাবআছুন নবি' অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। ইবনে সাদ তার তাবাকাত গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেন যেখানে বলা হচ্ছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদ ইবনে আদনানের পর আর বংশলতিকা বর্ণনা করতেন না। এতৎসত্ত্বেও বংশবিশারদগণ এ বিষয়ে একমত যে, আদনানের বংশ পরম্পরা ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম পর্যন্ত পৌঁছেছে। সুতরাং তিনি হলেন নবিজির আদিপিতা।
সহিহু মুসলিম গ্রন্থে এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ইসমাইলের বংশ থেকে কিনানাকে বাছাই করেছেন। কিনানার বংশধর থেকে বাছাই করেছেন কুরাইশকে। এরপর কুরাইশদের থেকে নির্বাচন করেছেন বনু হাশেমকে। আর বনু হাশেম থেকে চয়ন করেছেন আমাকে।" [২১]
আদনান ও ইসমাইলের মধ্যবর্তী প্রজন্মসংখ্যা নিয়ে বংশবিশারদদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। তথাপি মুসতাদরাকে হাকেম এবং আল্লামা তাবারানির আল-মুজামুল কাবির গ্রন্থে বর্ণিত উম্মে সালামা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন, আদনানের বংশপরম্পরা হলো, আদনান ইবনে উদ্দ ইবনে বাররি ইবনে আরাকুস সারা। সর্বশেষ বর্ণিত এই আরাকুস সারা হলেন ইসমাইল আলাইহিস সালাম। ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারিতে দশের অধিক মত বর্ণনা করার পর বলেন, 'সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত হলো তাবারানি ও হাকেম যেটা উল্লেখ করেছেন।[২২]
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম দুআ করেছিলেন ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশে একজন রাসুল প্রেরণ করার জন্য। কুরআনে তার সেই দুআটি বর্ণিত হয়েছে—
"হে প্রভু! তাদের মধ্যে থেকেই তাদের নিকট একজন পয়গম্বর প্রেরণ করুন যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন। এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয় তুমিই পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাবান।" [সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৯]
ইসমাইলের মাতা হাজেরা স্বাধীন রমণী ছিলেন নাকি দাসী ছিলেন এ নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। তাওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী হাজেরা দাসী ছিলেন। সারা এর খিদমতের জন্য তাকে দেওয়া হয়েছিল। যেমন আদিপুস্তকে বলা হচ্ছে, "আব্রামের স্ত্রী সারী নিঃসন্তানা ছিলেন, এবং হাগার নামে তাঁহার এক মিসরীয়া দাসী ছিল। তাহাতে সারী অব্রামকে কহিলেন, দেখ, সদাপ্রভু আমাকে বন্ধ্যা করিয়াছেন; বিনয় করি, তুমি আমার দাসীর কাছে গমন কর; কি জানি, ইহা দ্বারা আমি পুত্রবতী হইতে পারিব।”[২৩]
তাওরাতের বিশিষ্ট ব্যাখ্যাকার ডেভ শেলুম (D. Shalum) বলেন, 'হাজেরা ছিল ফিরাউন-কন্যা। সারার অলৌকিক ক্ষমতা দর্শন করে সে নিজ কন্যাকে তার খিদমতে প্রেরণ করে। স্বীয় কন্যা একজন মর্যাদাবান রমণীর সেবা করাটাকে সে পছন্দ করেছিল।[২৪]
সহিহুল বুখারিতে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসের শেষে এসেছে, "আর সে হাজেরাকে খিদমতের জন্য দান করেছে।” আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে আসমানের পানির সন্তানেরা! হাজেরাই তোমাদের আদি মাতা।[২৫] এখান থেকে বুঝা যায় সারা এর খেদমতের জন্যই হাজেরাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনামতে হাজেরার পিতা ছিলেন একজন কিবতি সম্রাট। হাফন নামক একটি মিশরীয় গ্রামে তিনি বসবাস করতেন। একজন ভারতীয় আলেম আন-নুসুসুল বাহিরাহ ফি হুররিয়াতিল হাজেরা নামক একটি পুস্তিকাও রচনা করেছেন।
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে আসমানের পানির সন্তান বলে সম্বোধন করার কারণ হলো, আরবরা যেসব এলাকায় কিছু বৃষ্টিপাত হয় চতুষ্পদ জন্তু চরানোর সুবিধার্থে সেসব এলাকায় বসবাস করত। আবার অনেকে মনে করেন আসমানি পানি বলতে উদ্দেশ্য হচ্ছে জমজম। কেননা আল্লাহ তাআলা হাজেরার জন্য এটি উৎসারিত করেছেন। তার সন্তানও এর ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেছে। সেদিক থেকে তারা এই পানির সন্তানের মতোই। ইবনে হিব্বান বলেন, ইসমাইলের উত্তরসূরিদের আসমানি পানির সন্তান বলা হয়। কেননা ইসমাইল হলেন হাজেরার সন্তান, যাকে হাজেরা জমজমের পানি দিয়ে লালনপালন করেছেন। জমজম হলো আসমানি পানি। [২৬]
টিকাঃ
১৮. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১৬, অনুচ্ছেদ: ১৬।
১৯. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১৭, অনুচ্ছেদ: ২০। ইসমাইল আ. এর বার পুত্রের নাম: ১। নবায়েৎ, ২। কেদর, ৩। অদবেখ, ৪। মিবসম, ৫। মিশম, ৬। দুমা, ৭। মসা, ৮। হদদ, ৯। তেমা, ১০। ফিটুর, ১১। নাফিশ, ১২। কেদমা।
২০. তাঁর উপাধি ছিল কুরাইশ। এখান থেকে কুরাইশ বংশের প্রচলন। অনুবাদক
২১. সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৩৪১।
২২. ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৫৩৬।
২৩. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১৬, অনুচ্ছেদ: ১-২।
২৪. তারিখু আরদিল কুরআন, পৃষ্ঠা: ২৮০।
২৫. সহিহুল বুখারি, কিতাবুল আম্বিয়া, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা: ৩৮৮, হাদিস নং: ৩৩৫৭।
২৬. ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৯৪।
📄 ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর হিজরতের সময় মিশরের অধিবাসী হেক্সোসদের পরিচয়
মিশরীয় রাজবংশের গোড়াপত্তনের পর ত্রয়োদশ প্রজন্ম অতিবাহিত হতে না হতেই মিশরে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়। এসময় মিশরের কর্তৃত্বে আসে আরব সেমেটিকরা। এরাই মূলত হেক্সোস (Hyksos) নামে পরিচিত। আরব ইতিহাসবিদরা অবশ্য এদের নাম দিয়েছিলেন আমালেকা। এটি খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের ঘটনা। এদের আদি নিবাস সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। অনেকের মতে এরা ফিলিস্তিন, সিরিয়া এবং জাযিরাতুল আরব এর বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন আরব গোত্র। দূর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টির সময়ে তারা মিশরে হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিল। আবার অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, একদিক থেকে মিটানি (Mitanni) শাসকদের জুলুম অপরদিকে আরামীয়দের এ অঞ্চলে ব্যাপকহারে হিজরত এই দ্বিমুখী চাপে বাধ্য হয়ে তারা সিরিয়া অঞ্চল থেকে নতুন আবাসস্থলের খোঁজে মিশর এসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জার্মান ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড ম্যুরও এই মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তার মতে মিশরে হেক্সোসদের আগমন ঘটেছিল খ্রিষ্টপূর্ব ষোড়শ শতাব্দীতে। খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে যখন আরামীয়রা তাদের ওপর ঝেঁকে বসছিল তখন থেকেই মূলত বাধ্য হয়ে তারা মিশরে হামলা চালায়। [২৭]
ইহুদি ও খ্রিষ্টান আলেমদের মতে ইউসুফ আলাইহিস সালাম খ্রিষ্টপূর্ব ১৯০৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আর তার কারাবরণের ঘটনা ঘটে ১৮৯০ খ্রিষ্টপূর্বে। এখান থেকে বুঝা যায় হেক্সোসরা কমপক্ষে খ্রিষ্টপূর্ব বিংশ শতাব্দীতে মিসরে এসেছিল। মিশরে বসবাস শুরু করলেও তারা জাতিগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে মিশরীয়দের সাথে মিশে যায়নি। বরং সর্বক্ষেত্রে তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র বজায় রেখেছিল। উভয় জাতির দেবতাদের মধ্যেও ছিল ভিন্নতা। হিজরতের সময় এসব উপাস্যগুলোকে তারা সাথে করে নিয়ে এসেছিল। তাই দেখা যায় পবিত্র কুরআন মিশরীয় শাসকদের ক্ষেত্রে ফিরাউন শব্দটি ব্যবহার করলেও হেক্সোস সম্রাটদের ক্ষেত্রে এ নাম ব্যবহার করেনি। তাদেরকে কুরআন মালিক বা বাদশাহ হিসেবে উল্লেখ করেছে। যেমন সুরা ইউসুফে এসেছে-
"বাদশাহ বলল, নিশ্চয় আমি দেখেছি...।" [সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৪৩]
আরেক আয়াতে এসেছে-
"বাদশাহ বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো...।" [সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫০]
অন্য আয়াতে উল্লেখ হয়েছে-
"বাদশাহ বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে আমার ঘনিষ্ঠজন বানিয়ে নেব।" [সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৪]
হেক্সোস সম্রাট ও মিশরীয় সম্রাটদের মধ্যে এই পার্থক্যকরণের কারণ হলো, সম্রাটদের ফিরাউন অভিধায় ভূষিত করা মিশরীয়দের একটি ধর্মীয় অনুষঙ্গ। আর যেহেতু উভয় জাতির ধর্ম ভিন্ন তাই হেক্সোস সম্রাটদের ক্ষেত্রে মিশরীয় সম্রাটদের এই ধর্মীয় উপাধিটি ব্যবহার করা হয় হয়নি। এই সূক্ষ্ম বিষয়টি কথিত তাওরাত সংকলকদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। তাই দেখা যায়, কুরআন উভয় জাতির সম্রাটদের উপাধিতে ভিন্নতা অবলম্বন করলেও তাওরাতে সেটা করা হয়নি। ফলে ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তাওরাতে হেক্সোস সম্রাটদের জন্য ফিরাউন উপাধিটি ব্যবহার করেছে। শুধু একবারই দেখা গেছে মালিক বা বাদশাহ শব্দটি ব্যবহার বনি ইসরাইলের ঘটনার বর্ণনার শুরুতে।
এখান থেকে কুরআন আল্লাহকর্তৃক অবতীর্ণ ও অলৌকিক হওয়ার দিকটিও চমৎকারভাবে ফুটে উঠে। কুরআন যদি মানবরচিত হতো তাহলে সেখানে পূর্ববর্তী গ্রন্থ বাইবেলের অনুকরণে হেক্সোস সম্রাটদের জন্যও ফিরাউন শব্দটি ব্যবহার করত। কেননা সেই সময় প্রাচীন ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্থ বলতেই ছিল এ বাইবেলই।[২৮]
আর একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, হেক্সোসদের কমপক্ষে তিন শতাব্দী পরে মিশরে ফিরাউনদের রাজত্ব স্থাপিত হয়েছিল। মুসা আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ফিরাউনদের যুগেই।
টিকাঃ
২৭. মাওয়াকিবুশ শামস, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৯৮।
২৮. আল-কুরআন ওয়াল ইলমুল আসরি, (কুরআন এবং আধুনিক বিজ্ঞান, মরিস বুকাইলি) পৃষ্ঠা: ৭৫-নীরিক্ষক।
📄 জবিহুল্লাহ হলেন ইসমাইল আলাইহিস সালাম
ইহুদিদের কূটচালের আরেক ঘুটি হলো-তারা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কর্তৃক পুত্র সন্তানকে জবেহ করার ঘটনাতেও বিকৃতি সাধন করে সেটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে। বহু প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তারা ইসমাইল আলাইহিস সালামের স্থলে জবিহুল্লাহ হিসেবে ইসহাক আলাইহিস সালামের নাম প্রচার করে। এখানে আমরা আদিপুস্তক থেকে এ ঘটনার বিবরণ তুলে ধরছি।
"এই সকল ঘটনার পরে ঈশ্বর অব্রাহামের পরীক্ষা করিলেন। তিনি তাঁহাকে কহিলেন, হে অব্রাহাম; তিনি উত্তর করিলেন, দেখুন, এই আমি। তখন তিনি কহিলেন, তুমি আপন পুত্রকে, তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে, যাহাকে তুমি ভালবাস, সেই ইসহাককে লইয়া মোরিয়া দেশে যাও, এবং তথাকার যে এক পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব, তাহার উপরে তাহাকে হোমার্থে বলিদান কর। পরে অব্রাহাম প্রত্যুষে উঠিয়া গর্দভ সাজাইয়া দুই জন দাস ও আপন পুত্র ইসহাককে সঙ্গে লইলেন, হোমের নিমিত্তে কাষ্ঠ কাটিলেন, আর উঠিয়া ঈশ্বরের নির্দিষ্ট স্থানের দিকে গমন করিলেন। তৃতীয় দিবসে অব্রাহাম চক্ষু তুলিয়া দূর হইতে সেই স্থান দেখিলেন। তখন অব্রাহাম আপন দাসদিগকে কহিলেন, তোমরা এই স্থানে গর্দভের সহিত থাক; আমি ও যুবক, আমরা ঐ স্থানে গিয়া প্রণিপাত করি, পরে তোমাদের কাছে ফিরিয়া আসিব। তখন অব্রাহাম হোমের কাষ্ঠ লইয়া আপন পুত্র ইসহাকের স্কন্ধে দিলেন, এবং নিজ হস্তে অগ্নি ও খড়গ লইলেন; পরে উভয়ে একত্রে চলিয়া গেলেন। আর ইসহাক আপন পিতা অব্রাহামকে কহিলেন, হে আমার পিতা, তিনি কহিলেন, হে বৎস, দেখ, এই আমি। তখন তিনি কহিলেন, এই দেখুন, অগ্নি ও কাষ্ঠ, কিন্তু হোমের নিমিত্তে মেষশাবক কোথায়? অব্রাহাম কহিলেন, বৎস, ঈশ্বর আপনি হোমের জন্য মেষশাবক যোগাইবেন। পরে উভয়ে এক সঙ্গে চলিয়া গেলেন। ঈশ্বরের নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইলে অব্রাহাম সেখানে যজ্ঞবেদি নির্মাণ করিয়া কাষ্ঠ সাজাইলেন, পরে আপন পুত্র ইসহাককে বাঁধিয়া বেদিতে কাষ্ঠের উপরে রাখিলেন। পরে অব্রাহাম হস্ত বিস্তার করিয়া আপন পুত্রকে বধ করণার্থে খড়গ গ্রহণ করিলেন। এমন সময়ে আকাশ হইতে সদাপ্রভুর দূত তাঁহাকে ডাকিলেন, কহিলেন, অব্রাহাম, অব্রাহাম। তিনি কহিলেন, দেখুন, এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, যুবকের প্রতি তোমার হস্ত বিস্তার করিও না, উহার প্রতি কিছুই করিও না, কেননা এখন আমি বুঝিলাম, তুমি ঈশ্বরকে ভয় কর, আমাকে আপনার অদ্বিতীয় পুত্র দিতেও অসম্মত নও। তখন অব্রাহাম চক্ষু তুলিয়া চাহিলেন, আর দেখ, তাঁহার পশ্চাৎ দিকে একটি মেষ, তাহার শৃঙ্গ ঝোপে বদ্ধ; পরে অব্রাহাম গিয়া সেই মেষটি লইয়া আপন পুত্রের পরিবর্তে হোমার্থে বলিদান করিলেন। আর অব্রাহাম সেই স্থানের নাম যিহোবা-যিরি রাখিলেন। এই জন্য অদ্যাপি লোকে বলে, সদাপ্রভুর পর্বতে জোগান হইবে। পরে সদাপ্রভুর দূত দ্বিতীয়বার আকাশ হইতে অব্রাহামকে ডাকিয়া কহিলেন, সদাপ্রভু বলিতেছেন, তুমি এই কার্য করিলে, আমাকে আপনার অদ্বিতীয় পুত্র দিতে অসম্মত হইলে না, এই হেতু আমি আমারই দিব্য করিয়া কহিতেছি, আমি অবশ্য তোমাকে আশীর্বাদ করিব এবং আকাশের তারাগণের ও সমুদ্রতীরস্থ বালুকার ন্যায় তোমার বংশ অতিশয় বৃদ্ধি করিব; তোমার বংশ শত্রুগণের পুরদ্বার অধিকার করিবে; আর তোমার বংশে পৃথিবীর সকল জাতি আশীর্বাদ প্রাপ্ত হইবে; কারণ তুমি আমার বাক্যে অবধান করিয়াছ। পরে অব্রাহাম আপন দাসদের নিকটে ফিরিয়া গেলেন, আর সকলে উঠিয়া একত্রে বের-শেবাতে গেলেন; এবং অব্রাহাম বের-শেবাতে বসতি করিলেন।" [২৯]
কথিত তাওরাতে এই হলো ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কর্তৃক প্রিয় পুত্রকে জবেহ করার ঘটনা। এ পর্যায়ে আমরা তাওরাতের এই বর্ণনাটি বিশ্লেষণ করে দেখব প্রকৃত জবিহুল্লাহ কে ছিলেন। মোটাদাগে চারটি পয়েন্টে আমরা আলোচনা করব।
এক. আল্লাহ তাআলা তাকে একমাত্র পুত্রকে যবেহ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
দুই. এই পুত্র তার কাছে অত্যধিক প্রিয় ছিল।
তিন. জবেহ এর ঘটনার পূর্বে এবং পরে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বের-শেবাতে বসবাস করতেন।
চার. ইসহাক আ. কে জবেহের স্থানে মোরিয়া এবং বের-শেবা[৩০] এর দূরত্ব কমপক্ষে তিনদিন।
এক. আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে একমাত্র পুত্র যবেহ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর এ বাক্যটি শুধু ইসমাইল আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। কেননা তিনিই ছিলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রথম সন্তান। ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের চৌদ্দ বছর পূর্বে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সুতরাং ইসহাক আলাইহিস সালাম কখনোই একক সন্তান ছিলেন না। বড় ভাই ইসমাইলের জীবদ্দশায় তাকে 'একমাত্র সন্তান' হিসেবে অভিহিত করা রীতিমত হাস্যকর। আদিপুস্তকে বলা হচ্ছে—
"পরে হাগার অব্রামের নিমিত্তে পুত্র প্রসব করিল; আর অব্রাম হাগারের গর্ভজাত আপনার সেই পুত্রের নাম ইশ্মায়েল রাখিলেন। অব্রামের ছিয়াশি বৎসর বয়সে হাগার অব্রামের নিমিত্তে ইশ্মায়েলকে প্রসব করিল। [৩১] অব্রাহামের একশত বৎসর বয়সে তাঁহার পুত্র ইসহাকের জন্ম হয়।" [৩২]
সুতরাং এখান থেকে বুঝা যায় জবেহের ঘটনাটি ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের পূর্বেই সংঘটিত হয়েছিল। কেননা তখন ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রথম ও একমাত্র পুত্র ছিলেন ইসমাইল আলাইহিস সালাম।
তাওরাতের ভাষ্যমতে প্রথমজাত সন্তান উৎসর্গ করাটাই হলো নিয়ম। চাই সেটা কোনো মানুষ্যসন্তান হোক কিংবা কোনো প্রাণীর শাবক হোক। আদম আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে মুসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত শরিয়তের বিধান হিসেবে এটিই কার্যকর ছিল। আদিপুস্তকে বলা হয়েছে, “আর হেবলও আপন পালের প্রথমজাত কয়েকটি পশু ও তাহাদের মেদ উৎসর্গ করিল। তখন সদাপ্রভু হেবলকে ও তাহার উপহার গ্রাহ্য করিলেন।” [৩৩]
এটি ছিল আদম আলাইহিস সালামের শরিয়তের বিধান যা মুসা আলাইহিস সালাম-এর যুগ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। প্রথমজাত শাবককে পবিত্রজ্ঞান করে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা হতো। যাত্রাপুস্তকে (Book of Exodus) বলা হয়েছে, “পরে সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, ইস্রায়েল-সন্তানদের মধ্যে মনুষ্য হউক কিম্বা পশু হউক, গর্ভ উন্মোচক সমস্ত প্রথমজাত ফল আমার উদ্দেশ্যে পবিত্র করো; তাহা আমারই।” [৩৪]
নিঃসন্দেহে নবি ইসমাইল আলাইহিস সালাম প্রথমজাত সন্তান। আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত হওয়ার এই বিশেষ মর্যাদা তারই প্রাপ্য।
দুই. এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, 'তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে যাকে তুমি ভালোবাসো।' ইসমাইল আলাইহিস সালামের প্রতি ইবরাহিম আলাইহিস সালামের অধিক ভালোবাসার বিষয়টি একেবারে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। এর জন্য কোনো দলিল-প্রমাণ খোঁজার প্রয়োজন নেই। ছিয়াশি বছর নিঃসন্তান থাকার পর আল্লাহর কাছে দুআর বরকতে জন্ম নেওয়া সন্তানের প্রতি একজন পিতার কী পরিমাণ আবেগ-ভালোবাসা থাকবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। এজন্যই তো তিনি তার নাম রেখেছেন ইসমাইল যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ সাড়া দিয়েছেন। খলিলুল্লাহ ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে যখন দ্বিতীয় সন্তান ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখনও তিনি ইসমাইলের জন্য দুআ করেছিলেন। আদিপুস্তকের ভাষায়, 'পরে অব্রাহাম ঈশ্বরকে কহিলেন, ইম্মায়েলই তোমার গোচরে বাঁচিয়া থাকুক।[৩৫]
সারা যখন ইসমাইল ও তাঁর মাকে দূরবর্তী স্থানে রেখে আসার আবদার করেছিলেন তখন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন।
'আর মিশরীয়া হাগার অব্রাহামের নিমিত্ত যে পুত্র প্রসব করিয়াছিল, সারা তাহাকে পরিহাস করিতে দেখিলেন। তাহাতে তিনি অব্রাহামকে কহিলেন, তুমি ওই দাসীকে ও উহার পুত্রকে দূর করিয়া দেও; কেননা আমার পুত্র ইসহাকের সহিত ওই দাসীর পুত্র উত্তরাধিকারী হইবে না। এই কথায় অব্রাহাম আপন পুত্রের বিষয়ে অতি অসন্তুষ্ট হইলেন। আর ঈশ্বর অব্রাহামকে কহিলেন, ওই বালকের বিষয়ে ও তোমার ওই দাসীর বিষয়ে অসন্তুষ্ট হইও না; সারা তোমাকে যাহা বলিতেছে, তাহার সেই কথা শুনো; কেননা ইসহাকেই তোমার বংশ আখ্যাত হইবে। আর ওই দাসীপুত্র হইতেও আমি এক জাতি উৎপন্ন করিব, কারণ সে তোমার বংশীয়।[৩৬]
এখান থেকে বুঝা যায় প্রিয় সন্তানের ব্যাপারে সারার আবদারে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পেরেশান ছিলেন। তাই আল্লাহ তাআলা তাকে এই বলে সান্ত্বনা দিলেন যে তার বংশ থেকেও একটি জাতি তিনি সৃষ্টি করবেন।
তিন. পুত্রকে জবেহ করার নির্দেশ যখন দেওয়া হয় তখন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বের-শেবাতে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকেই তিনি পুত্রকে নিয়ে মোরিয়া পর্বতে গিয়েছিলেন। আর তাওরাতেই বলা হয়েছে যে, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম হাজের ও ইসমাইলকে বের-শেবাতে রেখে গিয়েছিলেন।[৩৭] এবং ইসমাইল মায়ের সাথে ফারাণ প্রান্তরে[৩৮] বসবাস করতেন।[৩৯]
তাওরাতের এই ভাষ্য যদি সত্য হয় তাহলে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বের-শেবা থেকে ইসমাইল আলাইহিস সালামকে নিয়েই মোরিয়া পর্বতে গিয়েছিলেন। কেননা ইসহাক আলাইহিস সালাম মায়ের সাথে কানানে থাকতেন, বের-শেবাতে নয়। সম্ভবত তাওরাতের লিপিকারকগণ এ বিষয়গুলো খেয়াল না করেই জবেহের ঘটনায় ইসমাইলের জায়গায় ইসহাকের নাম বসিয়ে দিয়েছিলেন।
চার. জবেহের উদ্দেশ্যে মোরিয়া পর্বতে গমন। তাওরাতে উল্লিখিত এই মোরিয়া পর্বতের ভৌগোলিক অবস্থান এবং শাব্দিক বিশ্লেষণ করলেও বুঝা যায় ঘটনাটি ইসমাইল আলাইহিস সালামের সাথে ঘটেছিল। মোরিয়া শব্দটি মূলত আরবি মারওয়া (مروة) শব্দের অপভ্রংশ। তাওরাতের আরবি কপিতে (بلورة مورة) বা মারিয়া এলোন বৃক্ষের কথা বলা হলেও ইবরানি কপিতে মোরিয়া প্রান্তরের কথা উল্লেখ হয়েছে। [৪০] এখান থেকে অন্তত এতটুকু প্রমাণিত হয় যে তাওরাতের ভাষ্যকারগণ মূল শব্দটিকে পরিবর্তন করেছে। শব্দের তারতম্য থাকলেও একটি বিষয়ে ইহুদি-খ্রিষ্টান নির্বিশেষে সকলেই একমত যে জবেহের ঘটনা ইবাদতগৃহের কাছেই সংঘটিত হয়েছিল। আর এই ইবাদতগৃহ হলো বাইতুল্লাহ। সুতরাং বলা যায় জবেহের ঘটনাটি বাইতুল্লাহর পার্শ্ববর্তী মারওয়াহ পর্বতে সংঘটিত হয়েছিল।
তাওরাতে বিদ্যমান এই বিরোধের সুন্দর সমাধান দিয়েছে কুরআন। বলা হচ্ছে-
"হে আমার প্রভু! আমাকে এক সৎ পুত্র দান করো। সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম। অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম তাকে বলল, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখছি যে, তোমাকে আমি জবাই করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখো। সে বলল, পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম তাকে জবাই করার জন্য শোয়াল, তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই নিষ্ঠাবানদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম, জবাই করার জন্যে এক মহান জন্তু। আমি তার জন্যে এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিয়েছি। ইবরাহিমের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। এমনিভাবে আমি নিষ্ঠাবানদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। সে ছিল আমার বিশ্বাসী বান্দাদের একজন। আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছি ইসহাকের, সে সৎকর্মীদের মধ্য থেকে একজন নবি। তাকে এবং ইসহাককে আমি বরকত দান করেছি। তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মী এবং কতক নিজেদের ওপর স্পষ্ট জুলুমকারী।" [সুরা সাফফাত, আয়াত: ১০০-১১০]
কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে দুবার সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছেন। প্রথম সুসংবাদটি ছিল ইসমাইলের জন্মের এবং দ্বিতীয় সুসংবাদটি ইসহাকের জন্মের। আর জবেহের ঘটনা যেখানে সংঘটিত হয়েছিল সেটা ছিল বাইতুল্লাহর পাশে তরুলতাহীন উপত্যকায়। অপরদিকে এ সংক্রান্ত তাওরাতের বর্ণনাগুলো পরস্পর সাঙ্ঘর্ষিক। সেখানে একদিকে বলা হচ্ছে জবেহের ঘটনা ইসহাকের সাথে ঘটেছিল। আবার এ কথাও বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা ইসহাকের জন্মের সুসংবাদের সাথে এ প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন যে, তিনি ইসহাককে বরকতময় করবেন এবং তার বংশধরদের থেকে এক বিশাল জাতি সৃষ্টি করবেন। যেমন আদিপুস্তকে বলা হয়েছে-
'তখন ঈশ্বর কহিলেন, তোমার স্ত্রী সারা অবশ্য তোমার নিমিত্তে পুত্র প্রসব করিবে, এবং তুমি তাহার নাম ইসহাক রাখিবে। আর আমি তাহার সহিত আমার নিয়ম স্থাপন করিব, তাহা তাহার ভাবী বংশের পক্ষে চিরস্থায়ী নিয়ম হইবে। [৪১]
এটা কীভাবে সম্ভব যে, আল্লাহ তাআলা যে ইসহাকের জন্মের পূর্বে প্রদত্ত বিশাল বংশধর সৃষ্টির ওয়াদা পূর্ণ করবেন বলেছেন আবার সেই ইসহাককেই শৈশবে জবেহ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন! আর এটা কীভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্য পরীক্ষা হতে পারে! তিনি তো জানেনই তার পুত্র ইসহাক একটি বিশাল বংশের পিতা হবে। সুতরাং তাওরাতের এই ভাষ্য সুস্পষ্ট স্ববিরোধ ছাড়া আর কিছুই নয়।
উল্লেখ্য, ইসমাইল আলাইহিস সালামের ব্যাপারেও একটি বিশাল বংশের পিতা হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটা ইসমাইলের জন্মের পূর্বে দেওয়া হয়নি। বরং তাওরাতেরই ভাষ্যমতে ইসহাকের জন্মের প্রাক্কালে সেই সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ জবেহের ঘটনার পরে।
কেউ কেউ এভাবেও ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারেন যে, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জীবদ্দশাতেই ইসমাইলের মৃত্যু হয়। ফলে ইসমাইলের মৃত্যুর পর ইসহাককে একমাত্র সন্তান বলাটা আশ্চর্যের কিছু নয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যাটি ধোপে টিকবে না। কেননা তাওরাতেই বলা হয়েছে, উভয় সন্তানের জীবদ্দশায় ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ইন্তেকাল করেন। দুই ভাই পিতার দাফনকার্যে অংশ নেন।
“অব্রাহামের জীবনকাল একশত পঁচাত্তর বৎসর; তিনি এত বৎসর জীবিত ছিলেন। পরে অব্রাহাম বৃদ্ধ ও পূর্ণায়ু হইয়া শুভ বৃদ্ধাবস্থায় প্রাণত্যাগ করিয়া আপন লোকদের নিকটে সংগৃহীত হইলেন। আর তাঁহার পুত্র ইসহাক ও ইম্মael মন্ত্রির সম্মুখে হেতীয় সোহরের পুত্র ইফ্রোণের ক্ষেত্রস্থিত মকপেলা গুহাতে তাঁহার কবর দিলেন।”[৪২]
জবিহুল্লাহর বিষয়টি বোঝার জন্য এতটুকু আলোচনাই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা যাকে হেদায়েত দেন তাকে কেউ বিভ্রান্ত করতে পারে না।[৪৩]
টিকাঃ
২৯. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ২২, অনুচ্ছেদ: ১-১৯।
৩০. ফিলিস্তিনের সর্ববৃহৎ এবং সর্বপ্রাচীন ঐতিহাসিক শহর। জেরুজালেম থেকে পশ্চিমে ৭১ কিলোমিটার দূরত্বে ইসরাইলি সীমানার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। উইকিপিডিয়া নিরীক্ষক।
৩১. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১৬, অনুচ্ছেদ: ১৫-১৬।
৩২. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ২১, অনুচ্ছেদ: ৫।
৩৩. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ৪, অনুচ্ছেদ: ৪।
৩৪. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ১৩, অনুচ্ছেদ: ১-২।
৩৫. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১৭, অনুচ্ছেদ: ১৮।
৩৬. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ২১, অনুচ্ছেদ: ৯-১৩।
৩৭. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ২১, অনুচ্ছেদ: ১৪।
৩৮. ফারাণ প্রান্তর অথবা ফারাণ মরুভূমি। ধারণা করা হয় এ স্থানটি বর্তমান জর্ডানে লুত আলাইহিস সালামের জাতির ধ্বংসাবশেষ ডেড সি অথবা মৃত সাগর থেকে উত্তর-দক্ষিণে অবস্থিত। কারও মতে এটি অবস্থিত সিনাই উপত্যকায়। যা তুর পর্বত দ্বারা বেষ্টিত। বর্তমান মিশরের ওয়াদি ফিরানকেই এ স্থান বলে ধারণা করা হয়। তবে মুসলিম ঐতিহাসিকগণ ইহুদি এবং খ্রিষ্টানদের প্রাচীন বইপুস্তকের সূত্রে ধারণা করেন যে, এ স্থানটি আরব উপদ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। কেউ বলেছেন, ফারাণ হচ্ছে মক্কার একটি পর্বতের নাম। আল্লামা ইয়াকু হামাভি লিখেছেন, ফারাণই হচ্ছে মক্কা। ফারাণ পর্বত মদিনার পাশে অবস্থিত বলেও একটি মত পাওয়া যায়। উইকিপিডিয়া-নিরীক্ষক।
৩৯. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ২১, অনুচ্ছেদ: ২১।
৪০. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১২, অনুচ্ছেদ: ৬।
৪১. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১৭, অনুচ্ছেদ: ১৯।
৪২. আদিপুস্তক, অধ্যায় ২৫, অনুচ্ছেদ: ৭-৯।
৪৩. ভারতীয় আলেম হামিদুদ্দিন ফারাহি রহ. এর এ বিষয়ে একটি চমৎকার পুস্তিকা রয়েছে।
📄 ইবরানি কারা?
ড. আহমদ সওসাহ বলেন, "অধিকাংশ আরব ও ইউরোপিয়ান ইতিহাসবিদ ইবারি বা ইবরানি (Hebrews) শব্দটি যে অর্থে ব্যবহার করেছেন প্রাচীন গ্রন্থসমূহে শব্দটি সে অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দ এবং তারও আগে শব্দটি উত্তর আরব এবং শামের মরুঅঞ্চলের কতগুলো গোত্রকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হতো এবং ইবারিয়্যাহ (Hebrew) বলতে বোঝানো হতো এদের ভাষাকে। এটি ফিলিস্তিনের প্রাচীনতম অধিবাসী কানানিদের ভাষা। এ ছাড়াও সিনাই উপত্যকায় বসবাসকারী গোত্রসমূহ এবং উত্তর জর্ডানের আমালেকা, মাদায়েনি প্রভৃতি আরবগোত্রের ভাষাও ছিল এটি।
প্রথমদিকে কিছু যাযাবর গোত্রকে ইবারি বলা হলেও পরবর্তী সময় মরুঅঞ্চলের অধিবাসীকেই সাধারণভাবে ইবারি হিসেবে অভিহিত করার প্রচলন পড়ে যায়। প্রাচীন আসমানি গ্রন্থসমূহ এবং ফিরাউনদের বিভিন্ন লিপিতে এ শব্দটির বিভিন্ন ব্যাবহারিক রূপ দেখতে পাওয়া যায়। যে সময়টাতে এই শব্দটি জাতি কিংবা ভাষা অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে তখন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে ইহুদিদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মুসা আলাইহিস সালামের অনুসারী দাবিদার ইহুদিরাও বলে থাকে যে এই ইবরানি হলো কানানিদের ভাষা। পাশাপাশি ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে প্রভাব বিস্তারকারী আরামীয়রাও এই ভাষাভাষি ছিল। সে সময়ে ইবরানি শব্দটি আরামীয়দের সমস্ত শাখাগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল। আর এরা সবাই ছিল খাঁটি আরব। জাযিরাতুল আরব থেকে এসে তারা এখানে বসতি স্থাপন করে। আর তখন পর্যন্ত ইহুদিদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। [৪৪]
ইহুদিদের কথিত তাওরাতে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্য ইবারি শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।[৪৫] তাদের দাবি হলো, ইবরানিরা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বংশধারা থেকে এসেছে। কিন্তু তাদের এই দাবি স্বেচ্ছাচারিতা বৈ কিছুই নয়। তাওরাতের বিরোধপূর্ণ বর্ণনা থেকেই তাদের এই দাবির অসারতা প্রমাণিত হয়। সেখানে কখনো ইসরাইলিদেরকে ইবরানি নামে সম্বোধন করা হয়েছে আবার কখনো এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যেন তাদের সাথে ইবরানিদের দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই। যেমন যাত্রাপুস্তকে বলা হয়েছে-
"তুমি ইব্রীয় দাস ক্রয় করিলে সে ছয় বৎসর দাসত্ব করিবে, পরে সপ্তম বৎসরে বিনামূল্যে মুক্ত হইয়া চলিয়া যাইবে।” [৪৬]
তাদের কাছে বিদ্যমান তাওরাতের তথ্যমতে একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, দাসেরা ইসরাইলি বংশধারার নয়। বরং ভিন্ন বংশধারা থেকেই তাদের উদ্ভব। [৪৭] মরু অঞ্চলের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে মিশরীয় ও ফিলিস্তিনিরা রূপক অর্থে ইসরাইলিদেরকে ইবারি হিসেবে চিহ্নিত করলেও প্রাচীন ইবারি বা ইবরানি তারা নয়, যা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। সংগত কারণে দেখা যায়-বনি ইসরাইল যখন কেনানে বসতি স্থাপন করল এবং মরু অঞ্চলের যাযাবর জীবন ছেড়ে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হতে লাগল সে সময় তাদের জন্য ইবারি শব্দ ব্যবহার করাটাকে তারা অপছন্দ করত।[৪৮]
ইবারি শব্দের উৎসমূল বিষয়ে ভাষাবিদগণ সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। অনেকে মনে করেন, শব্দটি আরবি (عربي) শব্দের বিকৃত রূপ। আরবি শব্দের ‘রা’ এবং ‘বা’ বর্ণের স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমেই শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেকেই এর উল্টো মত পোষণ করেছেন। অর্থাৎ ইবারি (عبري) শব্দ থেকে বর্ণদ্বয়ের স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে আরবি (عربي) শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। এই মতটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ, কেননা প্রায়োগিক দিক থেকে এটি প্রথম খলিলুল্লাহ ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। তাও পৃথিবীতে জাতি হিসেবে ইসরাইলিদের আবির্ভাবের পূর্বে। এজন্যই ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ব্যাপারে ইহুদি হওয়ার যে দাবি তারা করে থাকে কুরআন তা নাকচ করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
"ইবরাহিম ইহুদি ছিলেন না এবং নাসারাও ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন ‘হানিফ’ অর্থাৎ, সব মিথ্যা ধর্মের প্রতি বিমুখ এবং আত্মসমর্পণকারী এবং তিনি মুশরিক ছিলেন না।" [সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৬৭]
অর্থাৎ তিনি ইহুদিদের ইশ্বর যেহোভা (Jehova) এর অনুসারী ছিলেন না। এখন প্রশ্ন হলো, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কে ইবারি নামকরণের কারণ কী? এর জবাবে গবেষকগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন।
১. এটি আরবি ‘আবারা (عبر)’ শব্দ থেকে নির্গত, যার অর্থ পাড়ি দেওয়া। যেহেতু ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ফুরাত ও জর্ডান নদী পাড়ি দিয়েছেন, তাই তাকে এ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
২. অনেকের মতে আবির (عابر) বা ইবার (عبر) নামে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের একজন পূর্বপুরুষ ছিলেন। তার দিকে সম্বন্ধ করে তাকে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে।[৫১]
কিন্তু উইলফেনসন এই দুটি মতের একটিও মেনে নিতে পারেননি। তিনি মনে করেন, ইবারি শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং বনি ইসরাইলের মূল নিবাসের দিকে সম্বন্ধ করেই এই নামকরণ করা হয়। কেননা, বনি ইসরাইল প্রকৃতপক্ষে মরুবাসী ছিল। নির্দিষ্ট কোনো স্থানে তারা থিতু হতো না। পানি ও চারণভূমির সন্ধানে তারা নিজেদের চতুষ্পদ জন্তুগুলো নিয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে বিচরণ করে বেড়াত। তিনি বলেন, ইবারি শব্দটি মূলত আরবি ‘আবারা (عبر)’ ফেয়েল তথা ক্রিয়াবাচক শব্দ থেকে নির্গত। এর অর্থ হচ্ছে, রাস্তা, উপত্যকা কিংবা নদী প্রভৃতি পাড়ি দেওয়া। আরবি এবং ইবরানি উভয় ভাষায় শব্দটি এই অর্থ ধারণ করে। মরুবাসী যাযাবরদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরতে থাকা। পাড়ি দেওয়ার অর্থটি এই শব্দের মধ্যে বিদ্যমান। সুতরাং ইবারি শব্দের অর্থ হচ্ছে মরুবাসী। [৫২]
উইলফেনসনের এই অভিমত ব্যক্ত করার কারণ হলো, তিনি শুধুমাত্র বনি ইসরাইলকে ইবরানি মনে করেন। নতুবা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, শুধু বনি ইসরাইলকে ইবরানি নামে অভিহিত করা বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছু নয়। কেননা, এ নামটি বনি ইসরাইলের অস্তিত্বের বহু আগেও ছিল। তবে কানানি ও আরামীয়রা অন্য জাতি থেকে পার্থক্য করার জন্য বনি ইসরাইলকে ইবরানি নামে অভিহিত করত।
টিকাঃ
৪৪. জেমস উইলফেনসন কর্তৃক রচিত তারিখুল ইয়াহুদ ফিল আরব এবং আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ এর ইবরাহিম আবুল আম্বিয়া এর সূত্রে আর-আরব ওয়াল ইয়াহুদ ফিত তারিখ, পৃষ্ঠা: ২৪৩
৪৫. আদিপুস্তক, অধ্যায়: ১০, অনুচ্ছেদ: ২৪; অধ্যায়: ১১, অনুচ্ছেদ: ১৪; অধ্যায়: ১৪, অনুচ্ছেদ: ১৩।
৪৬. যাত্রাপুস্তক, অধ্যায়: ২১, অনুচ্ছেদ: ২।
৪৭. লেবীয় পুস্তক, অধ্যায়: ২৫, অনুচ্ছেদ: ৪২।
৪৮. তারিখুল লুগাতিস সামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৭৮।
৪৯. উইলফেনসন তার তারিখল লুগাতিস সামিয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মিসরের Tell amarna-তে কিছু ঐতিহাসিক চিঠি হস্তগত হয়েছে। এগুলো খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীতে বাদশাহ আমুনহোতেফ এর সময়কার। সে সময় বনি ইসরাইল মিশরের অধীন ছিল। ফিলিস্তিনের কানানি আমিরদের পক্ষ থেকে মিশর সম্রাট বরাবর লিখিত এসব চিঠিতে উল্লেখ হয়েছে যে, ইবারি গোত্রগুলো ফিলিস্তিনে আক্রমণ করছে। আর তারা মিশরের অধীনস্ত মরু অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করছে।
৫০. তারিখুল আরব ওয়াল বিলাদ ফিত তারিখ, পৃষ্ঠা: ২৪৮।
৫১. তানকিহুল আবহাছ লিল মিলালিস সালাস, পৃষ্ঠা: ২২।
৫২. তারিখুল লুগাতিস সামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৭৭-৭৮।