📄 হাইকলে সুলাইমানি ও মসজিদে আকসা
১৯৬৭ সাল থেকে ইসরাইল জেরুজালেম ও এর আশেপাশে সুড়ঙ্গসহ নানা ধরনের খননকার্য শুরু করে। বিশেষ করে কুব্বাতুস সাখরা (Dome of The Rock) এবং মসজিদে আকসার নিচে তারা তাদের কল্পিত হাইকেলে সুলাইমানির [১০] অনুসন্ধান করতে থাকে। কিন্তু তাদেরকে নিরাশ হতে হয়। কল্পিত হাইকেলে সুলাইমানির অস্তিত্ব পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো সেখানে এমন কিছু প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে যেগুলো এই শহর আরব্য হওয়ার প্রমাণ বহন করে এবং ইবরানিদের সাথে এই শহরের সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়। ব্যাবিলনীয় এবং ইরানিদের আক্রমণের পর সেখানে ইসরাইলিদের কোনো ধরনের চিহ্ন আর অবশিষ্ট ছিল না। বিশেষ করে সম্রাট টাইটাস (Titus) আক্রমণের পর তার কোনো এক দেবতার নামে সেখানে বিশাল এক উপাসনাগৃহ নির্মাণ করেন। এমনকি জেরুজালেম নাম পাল্টে দিয়ে ইলিয়া নামকরণ করেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্মৃতিবিজড়িত মসজিদে আকসার নির্মাণ সম্পর্কে সহিহুল বুখারি-তে আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম-
أَيُّ مَسْجِدٍ وُضِعَ فِي الْأَرْضِ أَوَّلَا؟ قَالَ: «الْمَسْجِدُ الْحَرَامُ» قَالَ: قُلْتُ: ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ الْمَسْجِدُ الْأَقْصَى» قُلْتُ: كَمْ كَانَ বেইনাহুমাহ? قَالَ: «أَرْبَعُونَ سَنَةً)) .
পৃথিবীর বুকে নির্মিত প্রথম মসজিদ কোনটি? তিনি বললেন, “মসজিদে হারাম।” আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোনটি? তিনি বললেন, "মসজিদে আকসা।” আমি বললাম উভয় মসজিদের নির্মাণের মাঝে কতদিন ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন "চল্লিশ বছর।”[১১]
ইমাম আযরাকিসহ আরও অনেকেই মসজিদে হারাম নির্মাণসংক্রান্ত বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন। এসব রেওয়ায়াতের সারমর্ম হলো, মসজিদে হারামের প্রথম নির্মাতা হজরত আদম আলাইহিস সালাম। সুতরাং এ কথা ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, আদম আলাইহিস সালাম কর্তৃক মসজিদে হারাম নির্মাণের চল্লিশ বছর পর তারই কোনো পুত্র মসজিদে আকসার ভিত্তি স্থাপন করেন। প্রশ্ন আসতে পারে-তাহলে কাবাঘরের নির্মাতা হিসেবে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের নাম সবার আগে আসে কেন? সে ক্ষেত্রে আমরা বলব, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মসজিদে হারামের প্রথম নির্মাতা নন। বরং তিনি হলেন পুনর্নির্মাতা। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَنْ لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ .
যখন আমি ইবরাহিমকে বাইতুল্লাহর স্থান নির্ধারণ করে দিয়ে বলেছিলাম, আমার সাথে কাউকে শরিক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্য, নামাজে দণ্ডায়মানদের জন্য এবং রুকু- সিজদাকারীদের জন্য। [সুরা হজ, আয়াত: ২৬]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَإِذْ يَرْفَعُ إিব্রাহিম ইমু আল-কাওয়ায়েদা মিনাল বাইতি ওয়া ইসমাইলা রাব্বানা তাকাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আন্তাস সামিউল আলিম।
স্মরণ করো সে সময়ের কথা যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবাঘরের ভিত তুলছিলেন। তারা দুআ করলেন, হে আমাদের রব, আমাদেরকে কবুল করুন। নিশ্চই আপনি শ্রবণকারী ও সর্বজ্ঞ। [সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৭]
এই দুটি আয়াত থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যে স্থানে কাবা নির্মাণ করেছেন সেটি পূর্ব থেকে বাইতুল্লাহর জন্য নির্ধারিত স্থান ছিল।
আল্লামা ইবনে কাসির রহিমাহুল্লাহ তার তাফসিরগ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বাইতুল্লাহর আগের ভিতের ওপরই তার নির্মাণকাজ করেছিলেন।
এ ছাড়া বাইতুল্লাহর পূর্ব অস্তিত্বের বিষয়টি কুরআনে বর্ণিত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সেই বিখ্যাত দুআ থেকেও সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। যেখানে তিনি বলেছিলেন-
রাব্বানা ইন্নী আসকানতু মিন যুররিয়্যাতী বিওয়াদিন গাইরি যী যারইন ইনদা বাইতিকাল মুহাররাম।
হে আমার পালনকর্তা, আমি আমার পরিবারের কতেককে আপনার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে তরুলতাহীন উপত্যকায় বসবাসের জন্য রেখে যাচ্ছি। [সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩৭]
এই দুআটি তিনি করেছিলেন প্রথমবারের মতো শিশুপুত্র ইসমাইল ও স্ত্রী হাজেরাকে আল্লাহর নির্দেশে এই মরুপ্রান্তরে রেখে যাওয়ার সময়। আর তিনি বাইতুল্লাহর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছিলেন পরবর্তী সফরে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের নির্মাণের পূর্বেই বাইতুল্লাহর নির্মাণ সংঘটিত হয়।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
ইন্না আউয়ালা বাইতিন উদিআ লিনাসি লাল্লাযী বিবাক্কাতা মুবারাকান ওয়া হুদাল লিল আলামীন।
নিঃসন্দেহে প্রথম ঘর যা মানুষের জন্য স্থাপিত হয়েছে সেটা হচ্ছে এই ঘর যা বাক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হেদায়েত ও বরকতময়। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৯৬]
আর এ কথাও স্বতঃসিদ্ধ যে, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবিরই ইবাদতগৃহ ছিল। বাইতুল্লাহই যেহেতু প্রথম নির্মিত ঘর তাই নিঃসন্দেহে এটি অন্যান্য নবিদের ইবাদতগৃহ নির্মাণের পূর্বেই নির্মিত হয়েছিল। আর হাদিসের ভাষ্যমতে বাইতুল্লাহর প্রথম নির্মাণের চল্লিশ বছর পর মসজিদে আকসা প্রথমবারের মতো নির্মিত হয়েছিল। আর সেটা আদম আলাইহিস সালামের সময়কালে হওয়াটাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
দাউদ আলাইহিস সালাম কর্তৃক মসজিদে আকসার যে নির্মাণের কথা বলা হয় সেটাও ছিল পুনর্নির্মাণ। প্রথম নির্মাণ অন্য কারও হাতে সম্পাদিত হয়। অতঃপর, কালের আবর্তনে মাটিতে মিশে গিয়ে তার সমস্ত চিহ্ন মুছে যায়। এরপর সে ভূমিতে নতুন করে জনবসতি গড়ে উঠে। তাদের কাছ থেকে স্থানটি ক্রয় করে দাউদ আলাইহিস সালাম মসজিদে আকসার পুনর্নির্মাণ আরম্ভ করেন। আর তার পুত্র সুলাইমান আলাইহিস সালামের তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। অতঃপর আমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ নবি হিসেবে সকল নবির ওয়ারিশ। মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসাতে তাকে রাত্রিকালীন সফর করানো হয়েছে। সুতরাং, তাঁর বর্তমানে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর উম্মতই উত্তরাধিকারসূত্রে এই মসজিদে আকসার মালিক হওয়ার অধিক উপযুক্ত। 'মসজিদে আকসা' এর শাব্দিক অর্থ হলো দূরপ্রান্তের মসজিদ। এটি কুরআন-প্রদত্ত নাম। ইসরাইলি গ্রন্থগুলোতে এ নামের উল্লেখ পাওয়া যায় না। মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা মসজিদে নববির তুলনায় দূরে বিধায় এ নামকরণ করা হয়েছে। নবিজির ইসরা যখন সংঘটিত হয় তখনো মসজিদে নববি নির্মাণ হয়নি। এতৎসত্ত্বেও এ নামকরণের পেছনে এই ইঙ্গিত ছিল যে অচিরেই আরেকটি পবিত্র মসজিদ নির্মিত হবে যা মসজিদে আকসার তুলনায় মসজিদে হারামের নিকটবর্তী।
মোদ্দাকথা, উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে মসজিদে আকসা ও তার আশপাশের এলাকাগুলোর ওপর মুসলমানদের অধিকারের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। মসজিদে আকসা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
সুবহানাল্লাযী আসরা বিআবদিহী লাইলান মিনাল মাসজিদিল হারামি ইলাল মাসজিদিল আকসা আল্লাযী বারাকনা হাওলাহূ লিনুরিয়াহূ মিন আয়াতিনা ইন্নাহূ হুয়াস সামিউল বাসীর।
পরম পবিত্র ও মহিমাময় সেই সত্তা যিনি তার বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারিদিকে আমি বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। [সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১]
বিশুদ্ধ হাদিসে যে তিনটি মসজিদকে উদ্দেশ্য করে সফরের বৈধতা দেওয়া হয়েছে তন্মধ্যে একটি হলো মসজিদে আকসা। মসজিদে আকসার বর্তমান কাঠামো নির্মাণের কৃতিত্বও মুসলিম খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের। ৬৬ হিজরিতে তার নির্দেশে কুব্বাতুসসাখরা ও মসজিদে আকসার বর্তমান ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। শুভকর্মটি সুসম্পন্ন হয় ৭৩ হিজরিতে।
ওপরের পুরো আলোচনা থেকে জেরুজালেম নগরের আরব্য হওয়া এবং মসজিদে আকসায় মুসলিমদের অধিকারের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। হাইকলে সুলাইমানির ওপর মসজিদে আকসা নির্মাণের যে মিথ্যা দাবি ইহুদিরা করে থাকে শত খোঁড়াখুঁড়ির পরও তারা সেটা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি।
টিকাঃ
১০. ইহুদিদের বিশ্বাস মতে দাউদ আ. একটি ইবাদতগৃহ নির্মাণের ইচ্ছা পোষণ করেন। কিন্তু তার সেই পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এরপর তার পুত্র সুলাইমান আ. সেটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। এটিই ইহুদিদের কাছে হাইকলে সুলাইমান (Solomon's Temple) নামে প্রসিদ্ধ। ধর্মীয় বিশ্বাস মতে ইহুদিদের কাছে এই হাইকলের গুরুত্ব অপরিসীম। সুলাইমান আ. এর ইন্তেকালের পর ইহুদিরা অভ্যন্তরীণ কলহে জড়িয়ে পড়ে। এরপর ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে তারা বহিঃশক্তির আগ্রাসনের শিকার হয়। এসব অভিযানে হাইকলও বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমনকি একাধিকবার সেটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। ১৩৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভাঙা-গড়ার এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। সর্বশেষ ১৩৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট হেরোড ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিন থেকে তাড়িয়ে দেন। এরপর তারা আর কখনোই একত্র হতে পারেনি। ফলে হাইকলের পুনর্নির্মাণ করতে পারেনি। এই হলো হাইকল সম্পর্কে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থের বক্তব্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদের এই হাইকল কাহিনির নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ তারা এখন পর্যন্ত উপস্থাপন করতে পারেনি। সুলাইমান আ. কর্তৃক আদৌ এমন কিছু নির্মাণের বিবরণ সুপ্রমাণিত নয়। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের বাসেল নগরীতে থিওডর হারজেলের সভাপতিত্বে জায়নবাদীদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তারা দাবি করে—বর্তমান মসজিদে আকসার স্থানেই ছিল তাদের হাইকলে সুলাইমান। সুতরাং তাদের দাবিমতে মসজিদে আকসাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে তদস্থলে তাদের হাইকলের পুনর্নির্মাণ করতে হবে। দাবি করলেও দাবির স্বপক্ষে তারা কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। এমনকি মসজিদে আকসার নিচে ব্যাপক খোঁড়াখুঁড়ি করেও হাইকলের অস্তিত্ব প্রমাণে প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো নিদর্শনও তারা পেশ করতে পারেনি। হাইকলের গল্প যেন আজও রূপকথারই গল্প।
১১. সহিহুল বুখারি, কিতাবুল আম্বিয়া, খণ্ড: ৬ পৃষ্ঠা: ৪০৭