📄 সাবিত ইব্ন কায়স কর্তৃক উতারিদের বক্তৃতার জবাব প্রদান
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনু হারিস ইব্ন খাযরাজের সাবিত ইব্ন কায়স ইব্ন শাম্মাস (রা)-কে বললেন: দাঁড়াও এবং এই ব্যক্তির ভাষণের জবাব দাও। সাবিত (রা) দাঁড়িয়ে বললেন:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী যার সৃষ্টি, যিনি এর মাঝে জারী করেছেন স্বীয় নির্দেশ। তাঁর জ্ঞান তাঁর কুরসী জুড়ে ব্যাপ্ত। তার অনুগ্রহ ব্যতীত কখনও কোন বস্তু হয়নি। এরপর তাঁর ক্ষমতার এক নিদর্শন এই যে, তিনি আমাদেরকে রাজ-ক্ষমতার অধিকারী করেছেন। তিনি রাসূলরূপে মনোনীত করেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টিকে, যিনি বংশ মর্যাদার সবার সেরা, বাক্যালাপে সব চাইতে সত্যবাদী এবং জ্ঞান-গরিমায় সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি তাঁর প্রতি স্বীয় কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাঁকে সমগ্র সৃষ্টির উপর স্থান দিয়েছেন। সুতরাং তিনি হলেন নিখিল বিশ্বের সর্বাপেক্ষা আল্লাহর পসন্দনীয় ব্যক্তি। এরপর তিনি মানুষকে আহ্বান করলেন তাঁর প্রতি ঈমান আনার জন্য। ফলে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি ঈমান আনলো মুহাজিরগণ, যারা তাঁর নিজ সম্প্রদায়েরই লোক এবং তাঁর আত্মীয়বর্গ, যারা জ্ঞান-গরিমায় শ্রেষ্ঠ মানুষ, চেহারার দিক থেকে সব চাইতে ভাল এবং কাজে-কর্মে সবার সেরা। এরপর রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আল্লাহর ডাকের জবাব সর্বপ্রথম আমরাই দেই। আমরাই আল্লাহ্ আনসার (সাহায্যকারী) ও তাঁর রাসূলের সহযোগী। আমরা অপরাপর লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে আল্লাহ্র প্রতি। যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে, সে তার জানমালের নিরাপত্তা বিধান করে নেয়। পক্ষান্তরে যে কুফরী অবলম্বন করবে আমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে সর্বদা যুদ্ধ চালিয়ে যাব। তাকে হত্যা করা আমাদের জন্য নিতান্তই সহজ। এই হচ্ছে আমার বক্তব্য। আমি আমার নিজের জন্য এবং সকল মু'মিন নর-নারীর জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র শান্তি বর্ষিত হোক।
📄 নিজ সম্প্রদায়কে নিয়ে যিবারকানের অহংকার
এরপর যিবারকান ইব্ন বাদর দাঁড়িয়ে বললো:
আমরাই সম্মানী, আমাদের সমান নয় কোন বংশ, রাজা-বাদশা হয় আমাদেরই মধ্যে আর উপাসনালয় স্থাপিত হয় আমাদেরই মাঝে।
যুদ্ধ-বিগ্রহে আমরা কত বংশ করেছি পর্যুদস্ত, আমাদের বাড়তি ইজ্জত সর্বদা হয় অনুসৃত।
আমরাই সে জাতি, যাদের অন্নদাতা দুর্ভিক্ষকালে খাওয়ায় ভুনা গোশত- যখন দেখা যায় না মেঘের চিহ্ন।
তোমরা তো দেখছ, চতুর্দিক হতে নেতৃস্থানীয় লোক আমাদের কাছে ছুটে আসে, আমরা দেখাই তাদের সৌজন্য।
আমরা আমাদের অতিথিদের জন্য যবাই করি হৃষ্ট-পুষ্ট, নিরোগ অভিজাত উট, তারা হয় পরিতৃপ্ত।
তোমরা দেখবে যে কোন বংশের সামনে আমরা তুলে ধরি নিজেদের গৌরব, তারা তো আমাদের দ্বারা উপকৃত। ফলে তারা হয় নতশির।
আমাদের উপর যে এ নিয়ে বড়াই দেখায় আমরা তাকে চিনি। মানুষ তো আসা যাওয়া করে। কথাও সব রটে যায়।
আমরাই করি প্রত্যাখ্যান, আমাদের করে না কেউ অগ্রাহ্য। এমন করেই আমরা গৌরবে থাকি অপরাজেয়।
منا الملوك وفينا تقسم الربع - - منا الملوك وفينا تنصب البيع : ইবন হিশাম বলেন:
-ও বর্ণিত আছে, যার অর্থ আমাদেরই মধ্য থেকে হয় রাজা-বাদশা এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ বণ্টন হয় আমাদেরই মাঝে।¹
من كل ارض هوانا ثم نتبع ICE - من كل ارض هو يا ثم تصطنع : অনুরূপ
অর্থাৎ সকল অঞ্চল থেকে আসে বশ্যতা স্বীকার করে, এরপর আমরা হই অনুসৃত।'
বনূ তামীমের জনৈক ব্যক্তি এ কবিতা আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তবে কাব্য-সাহিত্যে যারা ধারণা রাখেন, তাদের অধিকাংশই এটাকে যিবারকানের কবিতা বলে স্বীকার করেন না।
টিকাঃ
১. প্রাক-ইসলামী যুগে যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ অধিনায়ক নিজের জন্য রেখে দিত।
📄 যিবারকানের জবাবে হাসানের কবিতা
এ সময় হাসান (রা) সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে ডেকে পাঠালেন। হাসান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বার্তাবাহী এসে আমাকে জানাল যে, তিনি বনূ তামীমের কবির জবাব দেওয়ার জন্য আমাকে ডেকেছেন। তখন আমি এই বলতে বলতে তাঁর নিকট যাত্রা করলাম:
منعنا رسول الله اذ حل وسطنا * على انف راض من معد وراغم
منعناه لما حل بين بيوتنا * باسيافنا من كل باغ وظا لم
ببیت حرید عزه وثراؤه * بجابية الجولان وسط الاعاجم
هل المجد الا السودد العود والندى * وجاه الملوك واحتمال العظائم
রাসূলুল্লাহ্ যখন আমাদের মধ্যে আসলেন, আমরা তাঁকে রক্ষা করলাম, মাআদ তা পসন্দ করুক আর নাই করুক।
আমরা তাঁকে রক্ষা করলাম, যখন তিনি এসে প্রবেশ করলেন আমাদের গৃহে, আমাদের তরবারি দ্বারা যতসব বিদ্রোহী ও অত্যাচারীর হাত থেকে।
এমন এক ঘরে, আজমী জগতের অন্তর্গত— 'জাবিয়াতুল-জাওলানের'¹ পার্শ্বে যার মর্যাদা ও প্রাচুর্য অদ্বিতীয়।
প্রাচীন আভিজাত্য, উদারতা, রাজকীয় সম্মান ও বড় বড় দায়-দায়িত্ব গ্রহণ ছাড়া গৌরব কি অন্য কিছু?
হাসান (রা) বলেন: আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট পৌঁছলাম এবং আগন্তুক সম্প্রদায়ের কবি দাঁড়িয়ে তার বক্তব্য পেশ করলো, তখন আমি তারই কবিতার ধারায় কবিতা বললাম এবং সে যা বলেছিল, সে রকম বললাম।
যিবারকান তাঁর বক্তব্য শেষ করলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাসান ইবন সাবিত (রা)-কে বললেন: ওঠ হে হাসান! ওই লোক যা বললো, তার জবাব দাও। হাসান (রা) দণ্ডায়মান হলেন এবং বললেন—
ফির ও তার সমসাময়িক গোত্রসমূহের নেতৃবর্গ মানুষের জন্য এমন আদর্শ তুলে ধরেছে যা অনুসৃত হয়ে থাকে।
যার অন্তরে আল্লাহ্ ভীতি আছে, এমন প্রত্যেকটি লোক তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং যে কোন ভাল কাজে তারা তৎপর।
তারা যখন যুদ্ধ করে, তখন করে শত্রুর সমূহ ক্ষতি সাধন, আর যখন অনুগামীদের উপকার করার চেষ্টা করে, তখন ঠিকই তারা উপকৃত হয়।
তাদের এই যে স্বভাব-চরিত্র, এটা নয় নতুন কিছু জেনে রেখো, সৃষ্টিরাজির সব চাইতে নিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে যা কিছু নতুন।
মানুষের মধ্যে এদের পরে অগ্রগামী কেউ যদি হয়, তবে (মনে রেখ) তাদের প্রতিটি অগ্রগামিতা পূর্ববর্তীদের মামূলী অগ্রগামিতারও পেছনে থাকবে।
যুদ্ধ-বিগ্রহে তাদের হাত যা কিছু ধ্বংস করে, সকল মানুষ মিলেও তা পারে না মেরামত করতে কিংবা তারা যা মেরামত করে, কেউ পারে না তা ধ্বংস করতে।
যুদ্ধকালে এরা যদি অন্যসব লোকের সম্মুখবর্তী হয়, তবে তাদের সে সম্মুখবর্তিতা হয় সাফল্যমণ্ডিত।
আর সব দানশীল ও অতিথিপরায়ণ লোকদের সঙ্গে তাদের তুলনা করলে দেখা যাবে, এরাই বড় দাতা।
তারা পূত-পবিত্র। ওহীর মাঝে তাদের পবিত্রতা বর্ণিত হয়েছে।
তারা আবিলতায় লিপ্ত হয় না। লালসা তাদের ধ্বংস করে না। তারা নিজ অনুগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতিবেশীর প্রতি কার্পণ্য করে না। লালসার ময়লা করে না তাদের স্পর্শ।
কোনও সম্প্রদায়ের সাথে যখন আমরা যুদ্ধে জড়াই, তখন তাদের দিকে মাটিতে বুক লাগিয়ে অগ্রসর হই না, যেমন বুনো গাভীর দিকে অগ্রসর হয় তার বাছুর।
যখন যুদ্ধ তার নখর থাবা বিস্তার করে আমাদের দিকে, তখন আমরা উঠে দাঁড়াই, আর কাপুরুষেরা তার নখের খোঁচায় হয়ে পড়ে নতজানু।
এরা যখন শত্রুর উপর বিজয়ী হয়, তখন করে না দর্প। আর আক্রান্ত হলেও এরা হয় না হতবল ও ব্যাকুল চিত্ত।
যুদ্ধক্ষেত্রে যখন মৃত্যু হয় সন্নিকট তখন এরা ঠিক হালয়া¹-র বাঁকা-থাবা সিংহের মত।
তাদের ক্রোধের সময় তাদের থেকে যা ইচ্ছা অবাধে নাও, কিন্তু সাবধান, যা তারা দিতে চায় না, তার প্রতি যেন তোমার লালসা না জাগে।
তাদের সাথে যুদ্ধে নিহিত থাকে বিষ ও সালা² মিশ্রিত সর্বনাশ। কাজেই তাদের সাথে শত্রুতা পরিহার কর।
কী মহান সে জাতি, আল্লাহর রাসূল-যাদের দলনেতা! যখন চতুর্দিকে বিরাজমান স্বেচ্ছাচারিতা ও দলাদলি।
তাদের জন্য উৎসর্গ করে আমার চিত্ত এমন এক বন্দনা। আমার বাঞ্ছিত কাজে যার অনুকূল এক তৎপর-মুখর রসনা।
কারণ, তারা সকল সম্প্রদায়ের সেরা; তা লোকে ঠাট্টা করেই বলুক, আর বাস্তবে।
ইন হিশام বলেন: আবূ যায়দ يرضى بهم كل من كانت سريرته এর স্থলে আবৃত্তি করে শোনান:
يرض بها كل من كانت سريرته * تقوى الاله وبالامر الذي شرعوا
যার অন্তরে আল্লাহ্ ভীতি আছে-এমন প্রত্যেকটি লোক সন্তুষ্ট থাকে তাতে এবং সেই অনুশাসনে, যা তারা প্রবর্তন করেছে।
টিকাঃ
১. 'জাবিয়াতুন-জাওলান' সিরিয়ার একটি নগর।
১. ইয়ামানের একটি বন। এককালে এখানে প্রচুর সিংহের বাস ছিল।
২. সালা-এ প্রকার বিষাক্ত উদ্ভিদ।
📄 যিবারকান ইন্ন বাদরের কয়েকটি কবিতা
ইব্ন হিশام বলেন: কাব্য-সাহিত্যে পারদর্শী বনূ তামীমের এমন এক ব্যক্তি আমার নিকট বর্ণনা করেন, যিবারকান ইব্ন বাদর যখন বনূ তামীমের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আগমন করেন, তখন তিনি তাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন:
আমরা আপনার নিকট এসেছি, যাতে মানুষ আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করতে পারে—যখন বাৎসরিক পর্বে তারা একত্র হয় সমাবেশে (তারা যাতে উপলব্ধি করতে পারে) যে, আমরাই সর্বক্ষেত্রে সব মানুষের শীর্ষস্থানীয় এবং হিজায মুলুকে দারিমের¹ মত আর কেউ নাই।
আমরা চিহ্নধারী উন্নাসিক সৈনিকদের হটিয়ে দেই আর মুণ্ডুপাত করি সব দর্পিত বীর যোদ্ধার।
নাজদ বা আজমের কোন অঞ্চলে আমরা যত যুদ্ধাভিযান চালাই, তাতে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ পাই আমরাই।
যিবারকানের কবিতার জবাবে হাসান (রা)-এর দ্বিতীয় কবিতা।
এরপর হযরত হাসান ইবন সাবিত (রা) দাঁড়িয়ে তার জবাব দিলেন। তিনি বললেন:
প্রাচীন আভিজাত্য, আতিথেয়তা, রাজকীয় মর্যাদা এবং বড় বড় দায়-দায়িত্ব গ্রহণ ছাড়া আর কিসে গৌরব?
আমরা সাহায্য করেছি ও আশ্রয় দিয়েছি নবী মুহাম্মদকে তা মাআদ বংশ পসন্দ করুক, আর নাই করুক।
(আশ্রয় দিয়েছি) এমন এক গোত্রে, যারা আজম জগতের অন্তর্গত জাবিয়াতুল-জাওলানের পার্শ্বে আভিজাত্য ও প্রাচুর্যে অদ্বিতীয়।
তিনি যখন আসলেন আমাদের দেশে, তখন আমরা তাঁর সাহায্য করলাম আমাদের তরবারি দিয়ে যতসব বিদ্রোহী ও অত্যাচারীর বিরুদ্ধে।
আমরা আমাদের পুত্র-কন্যাদের তার প্রহরায় নিযুক্ত করেছি। গনীমতের যে হিস্যা আমরা পাই, তাতে তাঁর জন্য আমাদের অন্তর খুশী।
আমরা তীক্ষ্ণ তরবারি চালাতে থাকি মানুষের উপরে। ফলে, তারা দলে দলে ছুটে আসছে তাঁর দীনের দিকে।
আমরাই জন্ম দিয়েছি কুরায়শের মহান ব্যক্তিকে¹ জন্ম দিয়েছি আমরা বনু হাশিমের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের নবীকে।
হে বনূ দারিম! তোমরা অহংকার করো না, কেননা মহৎ চরিত্রমালার বর্ণনাকালে তোমাদের গৌরব এক বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
তোমাদের জননী তোমাদের হারিয়ে ফেলুক, তোমরা আমাদের উপর বড়াই কর, অথচ আমাদের সামনে তোমরা গোলাম-বাঁদী সমতুল্য সেবক।
তোমরা যদি নিজেদের রক্ত হিফাযত করার জন্য, এবং নিজেদের অর্থ-সম্পদকে গনীমতরূপে বণ্টন করা হতে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে এসে থাক, তা হলে আল্লাহ্র কোন সমকক্ষ দাঁড় করিও না আর ইসলাম গ্রহণ কর এবং আজমীদের মত পোশাক পরিচ্ছেদ ব্যবহার করা ছেড়ে দাও।
টিকাঃ
১. দারিম বনূ তামীমের অধঃস্তন পুরুষ, যার থেকে একটি শাখাগোত্রের সৃষ্টি হয়েছে।
১. এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিবের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাঁর মা ছিলেন আনসার সম্প্রদায়ের কন্যা।