📄 হুজরা তথা কক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ
ইব্ন হিশাম বলেন: উতারিদ ইব্ন হাজিব (রা) ছিলেন বনূ দারিম ইব্ন মালিক ইব্ন হানজাল ইব্ন মালিক ইব্ন যায়দ মানাত ইব্ন তামীমের লোক। অনুরূপ আকরা ইব্ন হাবিস (রা) হুতাত ইব্ন ইয়াযীদ (রা)-ও ছিলেন বনূ দারিম ইবন মালিকের লোক। যিবারকান ইব্ন বাদর ছিলেন বনু বাহদালা ইব্ন আওফ ইব্ন কা'ব ইব্ন যায়দ মানাত ইব্ন তামীমের লোক। আমর ইব্ন আহতাম ছিলেন বনূ মিনকার ইবন উবায়দ ইবন হারিস ইন্ন আমর ইব্ন কা'ব ইব্ন সা'দ ইব্ন যায়দ মানাত ইব্ন তামীমের লোক। কায়স ইব্ন আসিম (রা)-ও ছিলেন- বন্ মিনকার ইব্ন উবায়দ ইবন হারিসের লোক।
ইবন ইসহাক বলেন: উয়ায়না ইব্ন হিস্ন ইব্ন হুযায়ফা ইব্ন বাদ্র ফাযারী (রা)-ও এ প্রতিনিধি দলে ছিলেন। আকরা ইব্ন হাবিস (রা) ও উয়ায়না ইব্ন হিস্ন (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে মক্কা বিজয় এবং হুনায়ন ও তায়েফ যুদ্ধে শরীফ ছিলেন।
বনূ তামীমের প্রতিনিধি দল যখন আগমন করে, তখন এ দু'জনও তাদের সাথে ছিলেন। প্রতিনিধি দলটি মসজিদে প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাঁর প্রকোষ্ঠের পিছন থেকে চিৎকার করে ডাক দিল, হে মুহাম্মদ! আমাদের নিকট বের হয়ে আসুন! তাদের এ চেঁচামেচি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য পীড়াদায়ক হয়। তিনি তাদের নিকট বের হয়ে আসেন, তারা বললো: হে মুহাম্মদ! আমরা গৌরবজনক বিষয়ে আপনার সাথে প্রতিযোগিতা করতে এসেছি। আপনি আমাদের কবি ও বাগ্মীকে অনুমতি দিন। তিনি বললেন: আমি তোমাদের বাগ্মীকে অনুমতি দিলাম। সে তার বক্তব্য পেশ করুক।
📄 উতারিদের ভাষণ
তখন উতারিদ ইব্ন হাজিব দাঁড়িয়ে বললেন: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, আমাদের প্রতি যার অনুগ্রহ ও করুণা অশেষ। বস্তুত তিনিই প্রশংসার যোগ্য। তিনি আমাদের রাজা বানিয়েছেন। আমাদের দান করেছেন প্রচুর ধন-দৌলত, যাদ্বারা আমরা দান-দক্ষিণা করি। তিনি আমাদেরকে প্রাচ্যবাসীদের মধ্যে সব চাইতে শক্তিশালী, জনসংখ্যায় বৃহত্তম এবং অস্ত্রসম্ভারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়েছেন। মানুষের মধ্যে কারা আছে আমাদের সমকক্ষ? আমরা কি মানুষের শীর্ষস্থানে ও তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী নই? যারা আমাদের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে চায়, তারা আমাদের মত গৌরবজনক বিষয়ের তালিকা পেশ করুক। ইচ্ছা করলে আমরা আরও অনেক বলতে পারি, কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার দেওয়া অঢেল নিআমতের কথা বলে বেড়াতে আমরা লজ্জাবোধ করি। আর এ ব্যাপারে আমরা সুখ্যাত।
এই যা কিছু বললাম, তা কেবল এজন্যই, যাতে আপনারা আমাদের অনুরূপ বিষয় উপস্থিত করতে পারেন এবং আমাদের চেয়ে উত্তম কিছু পেশ করতে সক্ষম হন। এই বলে তিনি বসে পড়লেন।
📄 সাবিত ইব্ন কায়স কর্তৃক উতারিদের বক্তৃতার জবাব প্রদান
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনু হারিস ইব্ন খাযরাজের সাবিত ইব্ন কায়স ইব্ন শাম্মাস (রা)-কে বললেন: দাঁড়াও এবং এই ব্যক্তির ভাষণের জবাব দাও। সাবিত (রা) দাঁড়িয়ে বললেন:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী যার সৃষ্টি, যিনি এর মাঝে জারী করেছেন স্বীয় নির্দেশ। তাঁর জ্ঞান তাঁর কুরসী জুড়ে ব্যাপ্ত। তার অনুগ্রহ ব্যতীত কখনও কোন বস্তু হয়নি। এরপর তাঁর ক্ষমতার এক নিদর্শন এই যে, তিনি আমাদেরকে রাজ-ক্ষমতার অধিকারী করেছেন। তিনি রাসূলরূপে মনোনীত করেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টিকে, যিনি বংশ মর্যাদার সবার সেরা, বাক্যালাপে সব চাইতে সত্যবাদী এবং জ্ঞান-গরিমায় সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি তাঁর প্রতি স্বীয় কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাঁকে সমগ্র সৃষ্টির উপর স্থান দিয়েছেন। সুতরাং তিনি হলেন নিখিল বিশ্বের সর্বাপেক্ষা আল্লাহর পসন্দনীয় ব্যক্তি। এরপর তিনি মানুষকে আহ্বান করলেন তাঁর প্রতি ঈমান আনার জন্য। ফলে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি ঈমান আনলো মুহাজিরগণ, যারা তাঁর নিজ সম্প্রদায়েরই লোক এবং তাঁর আত্মীয়বর্গ, যারা জ্ঞান-গরিমায় শ্রেষ্ঠ মানুষ, চেহারার দিক থেকে সব চাইতে ভাল এবং কাজে-কর্মে সবার সেরা। এরপর রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আল্লাহর ডাকের জবাব সর্বপ্রথম আমরাই দেই। আমরাই আল্লাহ্ আনসার (সাহায্যকারী) ও তাঁর রাসূলের সহযোগী। আমরা অপরাপর লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে আল্লাহ্র প্রতি। যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে, সে তার জানমালের নিরাপত্তা বিধান করে নেয়। পক্ষান্তরে যে কুফরী অবলম্বন করবে আমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে সর্বদা যুদ্ধ চালিয়ে যাব। তাকে হত্যা করা আমাদের জন্য নিতান্তই সহজ। এই হচ্ছে আমার বক্তব্য। আমি আমার নিজের জন্য এবং সকল মু'মিন নর-নারীর জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র শান্তি বর্ষিত হোক।
📄 নিজ সম্প্রদায়কে নিয়ে যিবারকানের অহংকার
এরপর যিবারকান ইব্ন বাদর দাঁড়িয়ে বললো:
আমরাই সম্মানী, আমাদের সমান নয় কোন বংশ, রাজা-বাদশা হয় আমাদেরই মধ্যে আর উপাসনালয় স্থাপিত হয় আমাদেরই মাঝে।
যুদ্ধ-বিগ্রহে আমরা কত বংশ করেছি পর্যুদস্ত, আমাদের বাড়তি ইজ্জত সর্বদা হয় অনুসৃত।
আমরাই সে জাতি, যাদের অন্নদাতা দুর্ভিক্ষকালে খাওয়ায় ভুনা গোশত- যখন দেখা যায় না মেঘের চিহ্ন।
তোমরা তো দেখছ, চতুর্দিক হতে নেতৃস্থানীয় লোক আমাদের কাছে ছুটে আসে, আমরা দেখাই তাদের সৌজন্য।
আমরা আমাদের অতিথিদের জন্য যবাই করি হৃষ্ট-পুষ্ট, নিরোগ অভিজাত উট, তারা হয় পরিতৃপ্ত।
তোমরা দেখবে যে কোন বংশের সামনে আমরা তুলে ধরি নিজেদের গৌরব, তারা তো আমাদের দ্বারা উপকৃত। ফলে তারা হয় নতশির।
আমাদের উপর যে এ নিয়ে বড়াই দেখায় আমরা তাকে চিনি। মানুষ তো আসা যাওয়া করে। কথাও সব রটে যায়।
আমরাই করি প্রত্যাখ্যান, আমাদের করে না কেউ অগ্রাহ্য। এমন করেই আমরা গৌরবে থাকি অপরাজেয়।
منا الملوك وفينا تقسم الربع - - منا الملوك وفينا تنصب البيع : ইবন হিশাম বলেন:
-ও বর্ণিত আছে, যার অর্থ আমাদেরই মধ্য থেকে হয় রাজা-বাদশা এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ বণ্টন হয় আমাদেরই মাঝে।¹
من كل ارض هوانا ثم نتبع ICE - من كل ارض هو يا ثم تصطنع : অনুরূপ
অর্থাৎ সকল অঞ্চল থেকে আসে বশ্যতা স্বীকার করে, এরপর আমরা হই অনুসৃত।'
বনূ তামীমের জনৈক ব্যক্তি এ কবিতা আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তবে কাব্য-সাহিত্যে যারা ধারণা রাখেন, তাদের অধিকাংশই এটাকে যিবারকানের কবিতা বলে স্বীকার করেন না।
টিকাঃ
১. প্রাক-ইসলামী যুগে যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ অধিনায়ক নিজের জন্য রেখে দিত।