📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হাসান (রা)-এর কবিতা

📄 হাসান (রা)-এর কবিতা


আনসারগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে যে সব যুদ্ধাভিযানে শরীক থেকেছেন তার সংখ্যা ও স্থানের উল্লেখপূর্বক হযরত হাসান ইব্‌ন সাবিত (রা) নিম্নলিখিত কবিতা রচনা করেন। ইব্‌ন হিশাম বলেন: এক বর্ণনামতে কবিতাটি তাঁর পুত্র আবদুর রহমান ইব্‌ন হাসানের রচিত।
সমবেত হলে মা'দ গোত্রের আপামর-সাধারণ, নইকি আমি ব্যক্তিত্বে, খান্দানে সবার সেরা?
এরা এমন সম্প্রদায়, যারা সকলে রাসূলের সাথে বদরে থেকেছে শরীক, করেনি কোন ত্রুটি, ছাড়েনি সহযোগিতা
তারা রাসূলের হাতে করেছে বায়'আত, একজনও তা করেনি ভংগ, হয়নি তাদের প্রতিশ্রুতি বিনষ্ট।
যেদিন প্রাতে উহুদের গিরি-সংকটে তাদের উপর আসে অগ্নিশিখার মত তপ্ত দীপ্ত তরবারির আঘাত, আর যেদিন যূ-কারদে, অশ্বপৃষ্ঠে তাদের করা হয় উত্তেজিত। সেদিন হয়নি তারা হীনবল, ভীত-সন্ত্রস্ত।
একবার যুল-উশায়রাকে তারা রাসূলের সাথে করে অশ্ব-পদ-পিষ্ট। তারা ছিল সজ্জিত চকচকে তরবারি, আর দীর্ঘ সড়কিতে।
ওয়াদ্দানের যুদ্ধে অশ্ব-পৃষ্ঠে হেলেদুলে— করে তার অধিবাসীদের উৎখাত, যাবত না আমাদের গতিরোধ করে টিলা আর পাহাড়।
সে রাতেও তারা ছিল উপস্থিত, যখন আল্লাহর পথে করে তারা শত্রুর অনুসন্ধান। বস্তুত আল্লাহ্ তাদের ঠিকই দিবেন কাজের পুরস্কার।
নাজদের যুদ্ধেও তারা রাসূলের সাথে থেকে নিহত শত্রুর মালপত্র পেয়েছিল, করেছিল গনীমত লাভ।
আল-কা'-এর যুদ্ধে আমরা শত্রুদের করি ছত্রভঙ্গ যেমন পানির ঘাটে উটদের করা হয় বিশৃংখল।
যেদিন যুদ্ধের জন্য রাসূলের নিকট করা হয় বায়'আত, সেদিন তারা ছিল সে বায়'আতে শরীক। অনন্তর তারা হয় তার সহমর্মী, কখনই যায়নি ঘুরে।
মক্কা বিজয়ে তারা থাকে তাঁর বাহিনীর রক্ষীদলে। তখন তারা হয়নি দিশেহারা, করেনি তাড়াহুড়ো।
খায়বরের যুদ্ধে তারা ছিল তাঁর সেনাদলে কী সাহসী গতি তাদের দৃপ্ত পদক্ষেপ!
নাঙা তরবারি ছিল আন্দোলিত তাদের ডান হাতে কখনও বেঁকে যায় তা আঘাতকালে, কখনও ঋজুস্থির।
সওয়াবের আশায় যেদিন আল্লাহ্র রাসূল তাবুক অভিমুখে আগুয়ান হন, তারা সামনে তখন ঠিক ঝাণ্ডা যেন তাঁর।
যদি তাদের সামনে ঘটে যুদ্ধের প্রকাশ, তবে তার সাথে করে বোঝাপড়া, যাবত না তারা এগিয়ে চলে সামনে, কিংবা ফিরে আসে জয়ী হয়ে।
এরা সেই সে জাতি, যারা নবীর সাহায্যকারী। আমারই সম্প্রদায় তারা, কুল পরিচয়ে তাদেরই সাথে মিলিত আমি।
তারা সসম্মানে করে মৃত্যুবরণ। তাদের অংগীকার হয় না ভংগ। করে শাহাদত লাভ নিহত হলে— আল্লাহ্ রাহে।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: এ কবিতার শেষ লাইনের দ্বিতীয় পংক্তি ইবন ইসহাক ভিন্ন অপর সূত্রে প্রাপ্ত।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন, হাসান ইব্‌ন সাবিত (রা) আরও বলেন:
মুহাম্মাদের পূর্বে আমরা ছিলাম রাজা মানুষের। ইসলাম আসার পরে শ্রেষ্ঠত্ব থাকে আমাদেরই।
এক আল্লাহ্, যিনি ছাড়া নেই কোন ইলাহ, আমাদের করেছেন সম্মানিত নজীরবিহীন এক যুগ দ্বারা, আল্লাহর, তাঁর রাসূলের ও দ্বীনের সাহায্য দ্বারা।
সে দীনে আমাদের করেছেন ভূষিত, এক অনন্য নামে।
তারাই আমার সম্প্রদায়, সেরা সকল সম্প্রদায়ের। ভাল যা কিছু হিসাবে আসে, আমার সম্প্রদায় যোগ্য তার।
তারা তাদের ন্যায় নীতি দ্বারা করে সংশোধন অন্যের হৃত-নৈতিকতা ন্যায়-নীতি হতে তাদের নেই কোন প্রতিবন্ধকতা।
যখন তারা যায় মজলিসে তাদের, বলে না অশ্লীল কথা। যাঞ্চাকারীদের প্রতি তাদের থাকে না কোন কার্পণ্য।
তারা যদি যুদ্ধ করে কিংবা সন্ধি, তাতে রাখে না কোন অস্পষ্টতা। তাদের সাথে যুদ্ধের ফল মৃত্যু নির্ঘাত তবে সন্ধি নেহাত সোজা।
তাদের প্রতিবেশী হয় ওয়াদা রক্ষাকারী, উচ্চ ভূমিতে যার বাড়ি। আমাদের মাঝে তার জন্য রয়েছে মহানুভবতা, আর ত্যাগের ঠাঁই।
তাদের কোন ব্যক্তি কাউকে হত্যা করলে যে রক্তপণ বর্তায় তার উপর আদায় করে তা পুরোপুরি কোন জরিমানা তার থাকে না অনাদায় কিংবা সে অসহায়ভাবে হয় না পরিত্যক্ত।
তাদের যে যা বলে, বলে খাঁটি সত্য।
তাদের সহনশীলতার ঘটে পুনরাবৃত্তি, ফয়সালা তাদের ন্যায্য।
মুসলিমদের আমীর ছিলেন জীবনভর আমাদেরই এক ব্যক্তি। গোসল করিয়ে তার অশুচিতা করে দূর ফেরেশতাগণ।
ইবন হিশাম বলেন: والبسناه اسما ইবন ইসহাক ভিন্ন অপর সূত্রে প্রাপ্ত।
ইবন ইসহাক বলেন, হাসান ইব্‌ন সাবিত (রা) আরও বলেন:
শুধালে তুমি জানতে পারবে আমার সম্প্রদায় মহানুভব অতি অতিথির তরে, যবে এসে পৌঁছায় তারা।
তাদের জুয়াড়িদের বড় বড় পাতিল।
তাতে রান্না করা হয় বৃহৎ কুঁজবিশিষ্ট উট।
তারা তাদের প্রবাসীদের করে অংশীদার নিজেদের ঐশ্বর্যে তাদের গোলামও নির্যাতিত হলে করে তার সাহায্য।
তারা ছিল স্বদেশের রাজা, অন্যায়-অনাচার রোধে তারা তরবারিকে জানাত আহ্বান।
মানুষের রাজা তারা চিরকাল
কসম ভাংগার জন্যও যেন তারা কোন কালে একদিনও ছিল না কারও প্রজা।
আ'দ এবং তার সমতুল্য জাতি ছামূদ ও ইরামের এখনও যারা আছে অবশিষ্ট, জেনে রেখ তারা, ইয়াসরিবের খর্জুর বীথিতে গড়েছে দুর্গ। আর তাতে পালন করেছে গবাদি পশু।
পানি বহনকারী উটদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইয়াহুদীরা, বলেছে হটো, এসো।
তারা তাদের চাহিদামত পান করে ফলের রস, করে যাপন আয়েশী জীবন, চিন্তাহীন।
আমরা ভারী অস্ত্র নিয়ে তেজোদীপ্ত সফেদ উটে সওয়ার হয়ে তাদের দিক হলাম অগ্রসর। তার সাথে রেখেছিলাম উৎকৃষ্টতম ঘোড়া, মোটা চামড়ায় আবৃত।
তারা যখন সিরারের দু'পাশে উট থামাল এবং তার উপর হাওদা বাঁধল জীর্ণ রশিতে, তখন তারা ভড়কে গেল কেবল অতর্কিত উপস্থিতিতে আমাদের অশ্বের। হল দিকভ্রান্ত পশ্চাৎ দিকের আকস্মিক হামলায়। তারা সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে লাগল দ্রুত।
আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম তাদের উপর বনের সিংহের মত সুরক্ষিত দীর্ঘকায় অশ্বে চড়ে, যা হয় না কখনও ক্লান্ত, অবসন্ন।
তামাটে রঙের সে ঘোড়া চিত্ত চঞ্চল, সুগঠিত মজবুত তার পায়ের গ্রন্থি তীরের মত মজবুত। তার আরোহী অভ্যস্ত গেরিলার সাথে যুদ্ধ করতে, বীর প্রতিপক্ষকে আঘাত হানতে।
তারা এমন দ্বিগ্বিজয়ী রাজা, দেশে দেশে যখন অভিযান চালায়, তখন— সামনেই এগিয়ে যেতে থাকে, পেছনে হটতে জানে না।
এরপর আমরা তাদের সর্দার ও নারীদের নিয়ে ফিরে এলাম। তাদের সন্তানদের তখন বণ্টন করা হচ্ছিল যোদ্ধাদের মাঝে।
তাদের পর আমরা তাদের বাসভূমির অধিকারী হই। আমরা এখন সেখানকার রাজা, কে পারে আমাদের হটাতে?
সুপথে চালিত রাসূল যখন আসলেন আমাদের নিকট সত্য নিয়ে এবং আনলেন আঁধারের পর আলো।
আমরা বললাম : সত্য বলেছেন হে মহাপ্রভুর রাসূল! আসুন আমাদের কাছে এবং থেকে যান আমাদের মাঝে।
আমরা সাক্ষ্য দেই আপনি আল্লাহর রাসূল, প্রেরিত হয়েছেন জ্যোতিরূপে, সুপ্রতিষ্ঠিত দীনসহ।
আমরা ও আমাদের সন্তান-সন্ততি হব আপনার ঢাল।
আমরা করব আপনার নিরাপত্তা বিধান, আমাদের অর্থ-সম্পদে আপনার অবারিত অধিকার।
আমরা আপনার প্রতি বিশ্বাসী, আপনার সাহায্যকারী, অন্যরা আপনাকে করলেও প্রত্যাখ্যান।
আপনি জানান উদাত্ত আহ্বান, কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নয়।
যে বার্তা আপনি রেখেছিলেন অপ্রকাশ, করুন তা প্রচার খোলাখুলি, কোনরূপ রেখে-ঢেকে নয়।
এরপর বিভ্রান্ত লোকেরা তাঁর দিকে তরবারি নিয়ে অগ্রসর হল, ভেবেছিল বুঝি বা বধ করা যাবে তাঁকে।
আমরাও তরবারি নিয়ে এগুলাম তাদের দিকে, বিদ্রোহী জাতিকে তাঁর পক্ষ হতে করতে দমন।
সে কি তীক্ষ্ণ শাণিত চকচকে তরবারি! নিমিষে কেটে করে খণ্ড-বিখণ্ড।
কঠিন হাড়েও যখন আঘাত হানে। তখন তা হয় না ব্যর্থ, যায় না ভোঁতা হয়ে।
আমাদেরে তার উত্তরাধিকারী করে গেছেন, আমাদের মহাসম্মানিত প্রাচীন গৌরবের অধিকারী পূর্ব-পুরুষেরা।
এক প্রজন্ম গত হলে অন্য প্রজন্ম করে তার স্থান পূরণ। আবার তারা যখন চলে যায়, রেখে যায় উত্তরসূরী।
এমন কোন লোক পাবে না তুমি, যে নয় আমাদের কৃপাধন্য, যদিও কেউ করে অকৃতজ্ঞতা।
ইন্ন হিশাম বলেন :
فكانوا ملوكا بارضيهم * ينادون غضبا با مرغشم
كل كميت مطار الفؤاد * بيشرب قد شيدوا في النخيل * حصونا ودجن فيها النعم
-শ্লোক দু'টিও তারই বর্ণনায় প্রাপ্ত।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 এ বছরকে ওফুদ তথা প্রতিনিধি দলসমূহের আগমনের বছর বলা হয়

📄 এ বছরকে ওফুদ তথা প্রতিনিধি দলসমূহের আগমনের বছর বলা হয়


ইব্‌ন হিশাম বলেন: আমার নিকট আবু উবায়দা (র) বর্ণনা করেছেন যে, এটা হিজরী ৯ম সালের ঘটনা। এ বছরকে ওযুদ তথা প্রতিনিধি দলসমূহের আগমনের বছর বলা হত।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সূরা নাসরের নাযিল হওয়া

📄 সূরা নাসরের নাযিল হওয়া


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মক্কা জয় করলেন, তাবুক অভিযান সমাপ্ত করলেন এবং সাকীফ গোত্রও ইসলাম ও বায়'আত গ্রহণ করল, তখন চতুর্দিক হতে আরব প্রতিনিধি দলসমূহ তাঁর নিকট উপস্থিত হতে লাগল।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন: সাধারণ আরববাসী ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও কুরায়শ গোত্রের মাঝে বিরাজমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিল। কেননা, কুরায়শ গোত্র ছিল আরবদের নেতা ও তাদের পথের দিশারী। সেই সাথে তারা ছিল পবিত্র কা'বা ঘরের তত্ত্বাবধায়ক এবং ইসমাঈল ইবন ইবরাহীম (আ)-এর সাক্ষাত বংশধর। আরবের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণও এটা অস্বীকার করতে পারত না। সেই কুরায়শ গোত্রই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে যখন মক্কাও বিজিত হলো, কুরায়শ গোত্র তাঁর বশ্যতা স্বীকার করল এবং ইসলাম তাদেরকে স্বীয় পক্ষপটে নিয়ে নিল, তখন আরব জাহান উপলব্ধি করলো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা তাদের নেই। তাঁর সাথে শত্রুতা পোষণ করা তাদের সাধ্যাতীত। সুতরাং তারা সকলে আল্লাহ্ দীনে দাখিল হলো এবং আল্লাহ্ তা'আলার ভাষায়, তারা তাঁর দীনে প্রবশে করলো দলে দলে। তারা চুতর্দিক হতে ইসলামের প্রতি ছুটে আসতে লাগলো। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবী (সা)-কে লক্ষ্য করে বলেন:
اذا جاء نَصْرُ اللهِ وَالْفَتْحُ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللهِ أَفْوَاجًا - فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا .
'যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে দেখবে, তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো এবং তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি তো তওবা কবুলকারী (১১০ : ১-৩)। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা যে তোমার দীনকে জয়ী করলেন, সেজন্য তাঁর প্রশংসা করো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00