📄 নবীকে ক্লেশ দানকারীদের সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে তাদের প্রতারণা এবং তাঁকে তাদের ক্লেশদান সম্পর্কে নাযিল হয় :
وَمِنْهُمُ الَّذِينَ يُؤْذُونَ النَّبِيَّ وَيَقُولُونَ هُوَ أُذُنٌ قُلْ أُذُنُ خَيْرٍ لَّكُمْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَيُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِينَ وَرَحْمَةً لِّلَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ رَسُولَ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
'এবং তাদের মধ্যে এমন লোক আছে, যারা নবীকে ক্লেশ দেয় এবং বলে, সে তো কর্ণপাতকারী। বল, তার কান তোমাদের জন্য যা মংগল তাই শোনে। সে আল্লাহতে ঈমান আনে এবং মু'মিনদেরকে বিশ্বাস করে। তোমাদের মধ্যে যারা মু'মিন সে তাদের জন্য রহমত এবং যারা আল্লাহর রাসূলকে ক্লেশ দেয়, তাদের জন্য আছে মর্মন্তুদ শাস্তি'। (৯: ৬১)। এ উক্তি যে করত আমার নিকট পৌছা বর্ণনামতে তার নাম নাবতাল ইব্ন হারিস। সে ছিল বনু আমর ইব্ন আওফের লোক। তার সম্পর্কেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সে বলতো: মুহাম্মদ তো কর্ণপাতকারী, কেউ তাকে কিছু বললেই বিশ্বাস করে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: قُلْ أُذُنُ خَيْرِ لَكُمْ অর্থাৎ তিনি তোমাদের জন্য যা মংগল তাই শোনেন ও বিশ্বাস করেন। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَكُمْ لِيُرْضُوكُمْ وَاللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَقُّ أَن يُرْضُوهُ إِنْ كَانُوا مُؤْمِنِينَ .
'তারা তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য তোমাদের নিকট আল্লাহ্ শপথ করে। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল এরই বেশী হকদার যে, তারা তাদেরকেই সন্তুষ্ট করবে, যদি তারা মু'মিন হয়'। (৯: ৬২)। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ..... إِن نُعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً .
'এবং তুমি তাদেরকে প্রশ্ন করলে তারা নিশ্চয়ই বলবে, আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করেছিলাম। বল, তোমরা কি আল্লাহ্, তার নিদর্শন ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে? (দোষ স্খালনের চেষ্টা করো না। তোমরা ঈমান আনার পর কুফরী করেছ)। তোমাদের মধ্যে কোন দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দিব। (কারণ তারা অপরাধী) (৯: ৬৫-৬৬)। এ উক্তি করেছিল ওয়াদী'আ ইব্ন সাবিত। সে ছিল বনূ আম্ম ইব্ন আওফের শাখা বনূ উমাইয়া ইব্ন যায়দের লোক। আর যাকে ক্ষমা করা হয়েছিল, আমার নিকট পৌছা বর্ণনা মতে তার নাম মুখাশিন ইবন হুমায়্যির আশজা'ঈ। বনূ সালিমার মিত্র। কারণ তিনি তাদের কিছু উক্তির প্রতিবাদ করেছিলেন।
এভাবে তাদের কাহিনী বিবৃত হয়ে এ আয়াতে এসে শেষ হয়েছে:
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ وَمَأ وَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ - يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلامِهِمْ وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَعْنَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولَهُ مِنْ فَضْلِهِ ..... من ولي ولا نَصِيرٍ .
'হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর ও তাদের প্রতি কঠোর হও। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম। তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল! তারা আল্লাহ্ শপথ করে যে, তারা কিছু বলেনি। কিন্তু তারা তো কুফরীর কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর তারা কাফির হয়েছে; তারা যা সংকল্প করেছিল তা পায়নি। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল নিজ কৃপায় তাদেরকে অভাবমুক্ত করেছিলেন বলেই বিরোধিতা করেছিল। (তারা তওবা করলে তা তাদের জন্য ভাল হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে আল্লাহ্ ইহলোক ও পরলোকে তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিবেন)। পৃথিবীতে তাদের কোন অভিভাবক অথবা সাহায্যকারী নেই' (৯: ৭৩-৭৪)।
এ উক্তি করেছিল জুলাস ইব্ন সুওয়ায়দ ইব্ন সামিত। তারই পরিবারের উমায়র ইব্ন সা'দ নামক এক ব্যক্তি তা বলে দেন। কিন্তু সে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর নামে কসম করে বলে যে, এরূপ কথা সে বলেনি। এরপর যখন তাদের সম্পর্কে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়, তখন সে তা থেকে বিরত হয় ও তওবা করে। পরে তার অবস্থা ও তওবা, আমার প্রাপ্ত বর্ণনা অনুযায়ী, ভাল হয়েছিল।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَمِنْهُمْ مَنْ عَاهَدَ اللهُ لَئِنْ أَتَانَا مِنْ فَضْلِهِ لَنَصَّدَّ فَنَّ وَلَنَكُونَنَّ مِنَ الصَّالِحِينَ
'তাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর নিকট অঙ্গীকার করেছিল, আল্লাহ্ নিজ কৃপায় আমাদের দান করলে আমরা নিশ্চয়ই সাদাকা দিব এবং সৎ কর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হব' (৯: ৭৫)। তাদের মধ্যে আল্লাহ্র নিকট এ অঙ্গীকার করেছিল ছা'লাবা ইব্ন হাতিম ও মু'আত্তিব ইব্ন কুশায়র। তারা ছিল বনূ আম্ম ইব্ন আওফের লোক।
📄 আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায়্য-এর জানাযার সালাত আদায় করার কারণে যা নাযিল হয়
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট যুহরী (র) উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন উত্তা (র) হতে এবং তিনি ইব্ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমি উমর ইবন খাত্তাব (রা)-কে বলতে শুনেছি, আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্য-এর মৃত্যু হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তার জানাযা পড়ার জন্য ডাকা হল। তিনি তাতে সাড়া দিলেন। যখন তিনি জানাযা পড়ার জন্য তার বরাবর দাঁড়ালেন, তখন আমি ঘুরে গিয়ে তার সামনাসামনি দাঁড়ালাম এবং বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আল্লাহর দুশমন আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্য ইবন সালূলের জানাযা পড়বেন? অথচ সে অমুক দিন এই বলেছিল, অমুক দিন এই বলেছিল? আমি গুনে গুনে দেখাতে লাগলাম সে কোন দিন কি বলেছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) শুনছিলেন আর মুচকি হাসছিলেন। আমি যখন এভাবে বলেই যেতে থাকলাম, তখন তিনি বললেন: উমর সরে যাও, আল্লাহর পক্ষ হতে আমি এখতিয়ার লাভ করেছি এবং আমি তাই গ্রহণ করেছি। আমাকে বলা হয়েছে:
اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْلَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ .
'তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না কর-একই কথা। তুমি সত্তরবার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ্ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না' (৯: ৮০)।
আমি যদি জানতাম সত্তর বারের বেশী ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাকে ক্ষমা করা হবে, তবে তাও করতাম। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার জানাযার সালাত আদায় করলেন। এমনি কি তার শবযানের সাথে হেঁটে হেঁটে কবর পর্যন্ত গেলেন এবং দাফন শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকলেন।
উমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে আমার সে দুঃসাহসিক আচরণের জন্য আমি নিজের প্রতি বিস্মিত হই। বস্তুতঃ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই প্রকৃত অবস্থা ভাল জানেন। কিন্তু আল্লাহ্র কসম, ক্ষণিকের মধ্যেই এ আয়াত দু'টি নাযিল হয়:
وَلا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ أَبَدًا وَلا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ .
'তাদের মধ্যে কারও মৃত্যু হলে তুমি কখনও তার জন্য জানাযার সালাত আদায় করবে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না। তারা তো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং পাপাচারী অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে' (৯: ৮৪)।
এর পরে স্বীয় ওফাত পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ (সা) আর কোন মুনাফিকের জানাযা পড়েননি।
📄 নিষ্ঠাবান মরুবাসীদের সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর নিষ্ঠাবان ও খাঁটি মু'মিন মরুবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَمِنَ الْأَعْرَابِ مَنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَيَتَّخِذُ مَا يُنْفِقُ قُرُبَاتِ عِنْدَ اللَّهِ وَصَلَوَاتِ الرَّسُولِ أَلَا إِنَّهَا قُرْبَةً لَهُمْ .
'মরুবাসীদের কেউ কেউ আল্লাহতে ও পরকালে ঈমান রাখে এবং যা ব্যয় করে তাকে আল্লাহর সান্নিধ্য ও রাসূলের দু'আ লাভের উপায় মনে করে। বাস্তবিকই তা তাদের জন্য আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়, (আল্লাহ্ তাদেরকে নিজ রহমতে দাখিল করবেন। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু) (৯: ৯৯)।
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যাঁরা অগ্রগামী তাদের মাহাত্ম্য এবং তাঁদের জন্য আল্লাহ্র প্রতিশ্রুত প্রতিদানের উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সাথে যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে তাদেরকেও মেলানো হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ 'আল্লাহ্ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট' (৯: ১০০)।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَمِمَّنْ حَوْلَكُمْ مِّنَ الْأَعْرَابِ مُنْفِقُونَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ .
'মরুবাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের আশে-পাশে আছে, তাদের কেউ কেউ মুনাফিক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কেউ কেউ - তারা কপটতায় সিদ্ধ'। অর্থাৎ তারা কপটতার আশ্রয় নিয়েছে এবং তা ভিন্ন সব প্রত্যাখ্যান করেছে। سَنُعَذِّبُهُم مُّرَّتَيْنِ - আমি তাদেরকে দু'বার শাস্তি দেব। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে যে দু'বার শাস্তির হুঁশিয়ারী দিয়েছেন, আমার নিকট পৌঁছা বর্ণনামতে তা হচ্ছে - ইসলামের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থানগত দুশ্চিন্তা, প্রতিপক্ষের প্রতি অন্যায় আক্রোশ ও বিদ্বেষ, এরপর কবরে যাওয়ার পর সেখানকার শাস্তি, তদুপরি আখিরাতের মহাশাস্তি তথা জাহান্নামের স্থায়ী আযাব। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلاً صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَنْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ .
'এবং অপর কতক লোক নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে, তারা এক সৎকর্মের সাথে অপর অসৎকর্ম মিশ্রিত করেছে। আল্লাহ্ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (৯: ১০২)।