📄 উভয় আহলে কিতাব সম্পর্কে যা অবতীর্ণ হয়
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা উভয় আহলে কিতাব (অর্থাৎ ইয়াহুদী ও নাসারা)-এর দুষ্কৃতি এবং আল্লাহ্ সম্পর্কে তাদের মিথ্যা ভাষণের বিবরণ দিতে গিয়ে শেষ পর্যায়ে বলেন: إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ يَكْسِرُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَ لَا يَنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ .
'পণ্ডিত এবং সংসার-বিরাগীদের মধ্যে অনেকে লোকের ধন অন্যায়ভাবে ভোগ করে থাকে এবং লোককে আল্লাহ্র পথ হতে নিবৃত্ত করে। আর যারা সোনা-রূপা পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও' (৯ : ৩৪)।
📄 মাস পিছানো সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর النسئ মাস পিছানো এবং এ ব্যাপারে আরবদের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে। النسئ হচ্ছে তাদের কর্তৃক আল্লাহ্র হারামকৃত মাসকে হালাল করা এবং হালালকৃত মাসকে হারাম করা। আল্লাহ্ বলেন:
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللهِ اثنا عَشَرَ شَهْرًا في كتب الله يَوْمَ خَلَقَ السَّمَواتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَربَعَةٌ حرم ذلكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ .
'আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহ্ বিধানে আল্লাহ্র নিকট মাস গণনায় মাস বারটি, তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করো না' (৯: ৩৬)। অর্থাৎ তার মধ্যে যা হারাম তাকে হালাল এবং যা হালাল তাকে হারাম করো না, যেমন করেছিল মুশরিকরা।
إِنَّمَا النسى 'এই যে মাসকে পিছিয়ে দেওয়া' যা তারা করতো এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন :
زِيَادَةٌ فِي الْكُفْرِ يُضَلُّ بِهِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا يُحِلُّونَهُ عَامًا وَيُحَرِّمُونَهُ عَامًا لَيُوَاطِئُوا عِدَّةَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَيُحِلُّوا مَا حَرَّمَ اللهُ زُيِّنَ لَهُمْ سوءُ أَعْمَالِهِمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ .
'এতো কেবল কুফরীর বৃদ্ধি করা, যা দ্বারা কাফিরদের বিভ্রান্ত করা হয়। তারা একে কোন বছর বৈধ করে এবং কোন বছর অবৈধ করে, যাতে তারা আল্লাহ্ যেগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন, সেগুলোর গণনা পূর্ণ করতে পারে। অনন্তর আল্লাহ্ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা হালাল করতে পারে। তাদের মন্দ কাজগুলো তাদের জন্য শোভনীয় করা হয়েছে। আল্লাহ্ কাফির সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না' (৯: ৩৭)।
📄 তাবুকের যুদ্ধ সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর তাবুক যুদ্ধপ্রসঙ্গ। এতে অংশগ্রহণে মুসলিমদের শৈথিল্য; রোমানদের সাথে যুদ্ধ করাকে বড় করে দেখা—যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের জন্য তাদেরকে ডাক দেন; মুনাফিক সম্প্রদায়ের কপট-আচরণ, যখন তাদেরকে জিহাদের আহ্বান জানান হয়, এরপরে ইসলামে নতুন বিষয় উদ্ভাবন করার কারণে তাদের প্রতি তিরস্কার ইত্যাদি বিষয়সমূহ বিধৃত হয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ ٱنفِرُوا۟ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ ٱثَّاقَلْتُمْ إِلَى ٱلْأَرْضِ .
'হে মু'মিনগণ! তোমাদের কী হল যে, যখন তোমাদের আল্লাহর পথে অভিযানে বের হতে বলা হয়, তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে ভূতলে ঝুঁকে পড়?' (৯: ৩৮)। এভাবে এ কাহিনী বিবৃত হয়েছে:
يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَيَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ۙ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيْـًٔا ۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ . إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ ٱللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ ثَانِىَ ٱثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِى ٱلْغَارِ .
'(যদি তোমরা অভিযানে বের না হও, তবে) তিনি তোমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন (এবং তোমরা তার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান)। যদি তোমরা তাঁকে সাহায্য না কর, তবে স্মরণ কর, আল্লাহ্ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিরগণ তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দুইজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল' (৯: ৩৯-৪০)।
📄 মুনাফিকদের সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের প্রসংগ উল্লেখপূর্বক তাঁর নবী (সা)-কে বলেন:
لَوْ كَانَ عَرَضًا قَرِيبًا وَسَفَرًا قَاصِدًا لَّاتَّبَعُوكَ وَلَٰكِنْ بَعُدَتْ عَلَيْهِمُ ٱلشُّقَّةُ ۚ وَسَيَحْلِفُونَ بِٱللَّهِ لَوِ ٱسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنفُسَهُمْ وَٱللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَٰذِبُونَ .
'আশু সম্পদ লাভের সম্ভাবনা থাকলে ও সফর সহজ হলে তারা নিশ্চয়ই তোমার অনুসরণ করত, কিন্তু তাদের নিকট যাত্রাপথ সুদীর্ঘ মনে হল। তারা আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে, আমাদের ক্ষমতা থাকলে আমরা নিশ্চয়ই তোমাদের সঙ্গে বের হতাম। তারা নিজদেরকেই ধ্বংস করে। তারা যে মিথ্যাচারী তা তো আল্লাহ্ জানেন' (৯: ৪২)। অর্থাৎ তাদের ক্ষমতা আছে। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
عَفَا اللَّهُ عَنْكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ ... لَوْ خَرَجُوا فِيكُمْ مَّا زَادُوكُمْ إِلا خَبَالاً ولا أَوْضَعُوا خِلالَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ .
'আল্লাহ্ তোমাকে ক্ষমা করেছেন। কারা সত্যবাদী তা তোমার নিকট স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এবং কারা মিথ্যবাদী তা না জানা পর্যন্ত তুমি কেন তাদেরকে অব্যাহতি দিলে? (যারা আল্লাহতে ও শেষ দিবসে ঈমান আনে তারা নিজ সম্পদ ও জীবন দ্বারা জিহাদে অব্যাহতি পাওয়ার প্রার্থনা তোমার নিকট করে না। আল্লাহ্ মুত্তাকীদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। তোমার নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা করে কেবল তারাই যারা আল্লাহ্ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে না। আর যাদের চিত্ত সংশয়যুক্ত, তারা তো আপন সংশয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। তারা বের হতে চাইলে তারা নিশ্চয়ই তজ্জন্য প্রস্তুতির ব্যবস্থা করত, কিন্তু তাদের অভিযাত্রা আল্লাহর মনঃপূত ছিল না। সুতরাং তিনি তাদেরকে বিরত রাখেন এবং তাদেরকে বলা হয়, যারা বসে আছে তাদের সাথে বসে থাক)। তারা তোমাদের সাথে বের হলে তোমাদের বিভ্রান্তিই বৃদ্ধি করত এবং তোমাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের মধ্যে ছুটাছুটি করত। তোমাদের মধ্যে তাদের কথা শুনবার লোক আছে। আল্লাহ্ জালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত' (৯: ৪৩-৪৭)।
ইবন হিশাম বলেন : أَوْضَعُوا خِلالَكُمْ অর্থ তোমাদের ব্যুহাভ্যন্তরে ছুটাছুটি করত। الايضاع -বিশেষ ধরনের চলন, যা হাঁটা অপেক্ষা দ্রুত। আজদা' ইবন মালিক হামদানী বলেন:
بصطادك الوحد المدل بشأوه * بشريج بين الشد والايضاع
'ঘোড়াটি তার অগ্রগামিতা দ্বারা তোমার জন্য শিকার করে আনবে বুনো গরু। তার সে গতি দৌড় ও দুল্কির মাঝামাঝি ধরনের।'
এটি তার একটি কাসিদার অংশবিশেষ।
ইব্ন ইসহাক বলেন: সম্ভ্রান্ত লোকদের মধ্যে যারা তাঁর নিকট যুদ্ধ হতে অব্যাহতি প্রার্থনা করেছিলেন, তাদের মধ্যে আমার নিকট পৌছা বর্ণনামতে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায়্য ইব্ন সাল্ল ও জাদ্দ ইব্ন কায়স উল্লেখযোগ্য। তারা ছিল আপন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্মানী লোক। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে বিরত রাখেন। কারণ, তিনি জানতেন তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে বের হলে তাঁর সৈন্যদের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে। তাঁর সৈন্যদের মাঝে এমন কিছু লোক ছিল, যারা তাদের ভাল বাসত এবং তারা তাদের যা বলতো, তা মানতো। যেহেতু তাদের মাঝে তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ - لَقَدِ ابْتَغُوا الْفِتْنَةَ مِنْ قَبْلُ .
'তোমাদের মধ্যে তাদের কথা শোনবার লোক আছে। আল্লাহ্ জালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত'। পূর্বেও তারা ফিত্না সৃষ্টি করতে চেয়েছিল' (৯: ৪৭-৪৮)।