📄 মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বিশেষ চুক্তি ভংগকারী মুশরিকদের বিরুদ্ধে এবং চারমাস গত হওয়ার শর্ত সাপেক্ষে সাধারণ চুক্তিতে আবদ্ধ মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার নির্দেশ দেন। শেষোক্ত ক্ষেত্রে চার মাস তাদেরকে অবকাশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সে চারমাসের ভেতরও কেউ যদি সীমালংঘন করে, তবে সে সীমালংঘনের কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
أَلَا تُقَاتِلُونَ قَوْمًا نُكَثُوا أَيْمَانَهُمْ وَهَمُوا بِاخْرَاجِ الرَّسُولِ وَهُمْ بَدَءُوكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ أَتَخْشَوْنَهُمْ فَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَوهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرُكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ - وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ - أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تُتْرَكُوا وَلَمَّا يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَلَمْ يَتَّخِذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَا رَسُولِهِ وَلَا الْمُؤْمِنِينَ وَلِيجَةُ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ .
'তোমরা কি সেই সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করবে না, যারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভংগ করেছে ও রাসূলের বহিষ্করণের জন্য সংকল্প করেছে? তারাই প্রথম তোমাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। তোমরা কি তাদেরকে ভয় কর? মু'মিন হলে আল্লাহকে ভয় করাই তোমাদের পক্ষে সমীচীন। তোমরা তাদের সাথে সংগ্রাম করবে। তোমাদের হাতে আল্লাহ্ তাদেরকে শাস্তি দিবেন, তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে বিজয়ী করবেন ও মু'মিনদের চিত্ত-প্রশান্ত করবেন। এবং তাদের অন্তরের ক্ষোভ দূর করবেন। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হন, আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
তোমরা কি মনে কর যে, আল্লাহ্ তোমাদেরকে এমনি ছেড়ে দিবেন, অথচ এখনো তিনি প্রকাশ করেননি তোমাদের মধ্যে কে মুজাহিদ এবং কে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে তাঁর রাসূল ও মু'মিনগণ ব্যতীত অন্য কাউকে গ্রহণ করেনি? তোমরা যা কর আল্লাহ্ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত (৯: ১৩-১৬)।
ইবন হিশাম বলেন, وليجة অর্থ প্রবিষ্ট। এর বহুবচন ولائج এটা ولج - بلج (প্রবেশ করেছে, প্রবেশ করে) হতে উৎপন্ন। কুরআন মাজীদে আছে: حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ 'যতক্ষণ না সূঁচের ছিদ্রপথে উট প্রবেশ করে' (৭: ৪০)। আল্লাহ্ তা'আলা বলছেন: যারা আল্লাহ্, রাসূল ও মু'মিন ছাড়া কাউকে অন্তরে প্রবেশকারীরূপে গ্রহণ করেনি যে, তার কাছে গোপনে এমন কথা বলে, যা অন্যত্র প্রকাশ করে না; ঠিক মুনাফিকদের আচারতুল্য। তারা মু'মিনদের কাছে ঈমান প্রকাশ করে, কিন্তু واذا خلوا الى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ 'যখন তারা নিভৃতে তাদের শয়তানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সাথেই রয়েছি' (২:১৪)।
কবি বলেন:
واعلم بانك قد جعلت وليجة * ساقوا اليك الحتف غير مشوب - 'জেনে রাখ, তোমাকে বানান হয়েছে অন্তরঙ্গ বন্ধু, তারা তোমার দিকে টেনে এনেছে নির্ঘাত মৃত্যু'।
📄 কুরআন মজীদ কুরায়শদের এ দাবী খণ্ডন করেছে যে, তারা বায়তুল্লাহ্র রক্ষণাবেক্ষণকারী
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর কুরায়শদের এ উক্তি বিধৃত হয়েছে যে, আমরা পবিত্র স্থানের অধিবাসী, হাজীদের পানি সরবরাহকারী এবং এই গৃহের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই আমাদের চেয়ে উত্তম কেউ নয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ - 'তারাই তো আল্লাহ্র মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যারা ঈমান আনে আল্লাহ্ ও পরকালে' (৯: ১৮)। অর্থাৎ তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ, সে তো ঈমানের ভিত্তিতে নয়। সত্যিকারের রক্ষণাবেক্ষণ করে তারা, যারা ঈমানদার। আল্লাহ্ আরো বলেন:
مَنْ أَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلوةَ وَأَتَى الزَّكُوةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلا الله - 'যারা ঈমান আনে আল্লাহ্ ও আখিরাতে এবং সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করে না'। অর্থাৎ এরাই প্রকৃত রক্ষণাবেক্ষণকারী। আল্লাহ্ বলেন:
فَعَسَى أُولَئِكَ أَنْ يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ - 'তাদেরই সৎপথ প্রাপ্তির আশা আছে (৯ : ১৮)। আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে عَلَى-এর ব্যবহার সন্দেহের অর্থে নয়; বরং নিশ্চয়তার অর্থে। এরপর আল্লাহ্ বলেন:
اجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الحَاجِّ وَعِمَارَةِ المَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ أَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لا يَسْتَوْنَ عِنْدَ الله . 'যারা হাজীদের পানি সরবরাহ করে এবং মাসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করে, তোমরা কি তাদেরকে তাদের পুণ্যের সমজ্ঞান কর, যারা আল্লাহ্ ও আখিরাতে ঈমান আনে এবং আল্লাহ্ পথে জিহাদ করে? আল্লাহ্র নিকট তারা সমতুল্য নয়' (৯ : ১৯)।
এরপর তাদের শত্রুদের বৃত্তান্ত বর্ণনা প্রসংগে হুনায়ন যুদ্ধের আলোচনা আসে। তাতে এ যুদ্ধে যা-কিছু হয়েছিল, শত্রুদের থেকে মুসলিমদের পলায়ন, অবশেষে তাদের প্রতি আল্লাহ্ তা'আলার সাহায্য আগমন প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلا يَقْرَبُوا المَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَذَا وَإِنْ خِفْتُمْ عَيْلَةً . 'মুশরিকরা তো অপবিত্র; সুতরাং এই বছরের পর তারা যেন মাসজিদুল-হারামের নিকট না আসে। যদি তোমরা দারিদ্র্যের আশংকা কর' (৯: ২৮)। এর প্রেক্ষাপট এই যে, একদল লোক মন্তব্য করল, আমাদের থেকে বাজার উচ্ছেদ হয়ে যাবে, ব্যবসা-বাণিজ্য উচ্ছন্নে যাবে এবং আমাদের লাভজনক সবকিছু বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাদের জবাবে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ عَيْلَةً فَسَوْفَ يُغْنِيكُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ إِنْ شَاءَ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ. 'যদি তোমরা দারিদ্র্যের আশংকা কর, তবে জেনে রাখ, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তার নিজ করুণায় তোমাদেরকে অভাবমুক্ত করতে পারেন। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়' (৯ : ২৮)। তাঁর নিজ করুণায় মানে, ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া অন্য ভাবেও। আল্লাহ্ আরো বলেন:
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولَهُ وَلَا يَدِينُونَ دينَ الحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أوتُوا الْكِتَبَ حَتَّى يُعْطُومُ الجِزْيَةَ عَنْ يُدِ وَهُمْ صَاغِرُونَ . 'যাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা আল্লাহতে ও পরকালেও ঈমান আনে না। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা নিষিদ্ধ করে না এবং সত্য দীন অনুসরণ করে না, তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে স্বহস্তে জিযয়া দেয়' (৯: ২৯)। অর্থাৎ তোমরা যে বাজার বন্ধ হয়ে দারিদ্র্য-পীড়িত হওয়ার আশংকা করছ, তার উত্তম বিকল্প রয়েছে এর মাঝে। সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা শিরকের অবসানে তাদের বাজার-অর্থনীতির যে ক্ষতিসাধন হয়েছে, আহলে কিতাব থেকে জিযয়া আদায়ের মাধ্যমে তার প্রতিকার করে দিয়েছেন।
📄 উভয় আহলে কিতাব সম্পর্কে যা অবতীর্ণ হয়
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা উভয় আহলে কিতাব (অর্থাৎ ইয়াহুদী ও নাসারা)-এর দুষ্কৃতি এবং আল্লাহ্ সম্পর্কে তাদের মিথ্যা ভাষণের বিবরণ দিতে গিয়ে শেষ পর্যায়ে বলেন: إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ يَكْسِرُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَ لَا يَنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ .
'পণ্ডিত এবং সংসার-বিরাগীদের মধ্যে অনেকে লোকের ধন অন্যায়ভাবে ভোগ করে থাকে এবং লোককে আল্লাহ্র পথ হতে নিবৃত্ত করে। আর যারা সোনা-রূপা পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও' (৯ : ৩৪)।
📄 মাস পিছানো সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর النسئ মাস পিছানো এবং এ ব্যাপারে আরবদের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে। النسئ হচ্ছে তাদের কর্তৃক আল্লাহ্র হারামকৃত মাসকে হালাল করা এবং হালালকৃত মাসকে হারাম করা। আল্লাহ্ বলেন:
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللهِ اثنا عَشَرَ شَهْرًا في كتب الله يَوْمَ خَلَقَ السَّمَواتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَربَعَةٌ حرم ذلكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ .
'আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহ্ বিধানে আল্লাহ্র নিকট মাস গণনায় মাস বারটি, তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করো না' (৯: ৩৬)। অর্থাৎ তার মধ্যে যা হারাম তাকে হালাল এবং যা হালাল তাকে হারাম করো না, যেমন করেছিল মুশরিকরা।
إِنَّمَا النسى 'এই যে মাসকে পিছিয়ে দেওয়া' যা তারা করতো এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন :
زِيَادَةٌ فِي الْكُفْرِ يُضَلُّ بِهِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا يُحِلُّونَهُ عَامًا وَيُحَرِّمُونَهُ عَامًا لَيُوَاطِئُوا عِدَّةَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَيُحِلُّوا مَا حَرَّمَ اللهُ زُيِّنَ لَهُمْ سوءُ أَعْمَالِهِمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ .
'এতো কেবল কুফরীর বৃদ্ধি করা, যা দ্বারা কাফিরদের বিভ্রান্ত করা হয়। তারা একে কোন বছর বৈধ করে এবং কোন বছর অবৈধ করে, যাতে তারা আল্লাহ্ যেগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন, সেগুলোর গণনা পূর্ণ করতে পারে। অনন্তর আল্লাহ্ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা হালাল করতে পারে। তাদের মন্দ কাজগুলো তাদের জন্য শোভনীয় করা হয়েছে। আল্লাহ্ কাফির সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না' (৯: ৩৭)।