📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 লাত নিধন

📄 লাত নিধন


ইবন ইসহাক বলেন: প্রতিনিধি দল তাদের কাজ শেষ করে যখন স্বদেশের উদ্দেশে রওনা হলো, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের সাথে আবু সুফিয়ান ইবন হাব (রা) ও মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা)-কে লাত নিধনের জন্য পাঠালেন। তাঁরা তাদের সাথে মদীনা ত্যাগ করলেন। যখন তায়েফে এসে পৌঁছলেন, তখন মুগীরা (রা) আবূ সুফিয়ান ইব্‌ন হাব (রা)-কে আগে আগে পাঠাতে চাইলেন, কিন্তু আবূ সুফিয়ান (রা) অস্বীকার করলেন এবং বললেন, তোমার সম্প্রদায়ের নিকট তুমিই আগে যাও।
আবু সুফিয়ান তার মালপত্র নিয়ে যুল-হাদমে অপেক্ষা করলেন। মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা) যখন গন্তব্যস্থলে গিয়ে লাতের উপর চড়লেন এবং কুঠার দ্বারা তার উপর আঘাত করতে থাকলেন, তখন তার গোত্র বনূ মুআতিব তাকে রক্ষা করার জন্য চারদিক থেকে ঘিরে রাখলো। তাদের আশংকা ছিল, তাঁর প্রতি তীর নিক্ষেপ করা হতে পারে কিংবা উরওয়া (রা)-এর মত আচরণ তাঁর সাথেও করা হতে পারে। ছাকীফ গোত্রের নারীরা খোলা মাথায় বের হয়ে আসলো। তারা লাতের শোকে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল। তখন তারা বলছিল:
لتبكين دفاع * اسلمها الرضاع لم يحسنوا المصاع
কাঁদো রক্ষাকর্তার জন্য, নীচাশয়েরা তাকে করেছে পরিত্যাগ, তারা করলো না তরবারির সদ্ব্যবহার।
ইন হিশাম বলেন : لتبكين ইবন ইসহাক ব্যতীত অন্য সূত্রে প্রাপ্ত।
ইবন ইসহাক বলেন: মুগীরা (রা) যখন লাতকে কুঠার দ্বারা আঘাত করছিলেন, তখন আবু সুফিয়ান বলছিলেন, واهالك آمالك হায়, হায়! সর্বনাশ!
মুগীরা (রা) লাতকে ধ্বংস করার পর তার ধনরাশি ও অলংকারাদি বের করে নিলেন এবং আবু সুফিয়ানকে খবর দিলেন। অলংকার ছিল বিভিন্ন রকমের। আর ধনরাশি বলতে সোনা ও মণিমুক্তা।
উরওয়া রা)-এর শাহাদতের পর বনূ সাকীফের প্রতিনিধি দলের পূর্বে আবূ মুলায়হ ইব্‌ উরওয়া ও কারিব ইব্‌ন আসওয়াদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বনু সাকীফকে পরিত্যাগ করা এবং চিরদিনের জন্য কোন ব্যাপারে তাদের সাথে একত্র না হওয়া। তারা ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের বলেছিলেন: তোমরা যাকে ইচ্ছা অভিভাবকরূপে গ্রহণ কর। তারা বললো আমরা আল্লাহ্ ও তার রাসূলকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: সেই সাথে তোমাদের মামা আৰু সুফিয়ান ইব্‌ন হাবকেও। তারা বললো আমাদের মামা আবু সুফিয়ান ইব্‌ন হাবকেও।
তায়েফবাসীর ইসলাম গ্রহণ এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক আবু সুফিয়ান ও মুগীরাকে মূর্তি ধ্বংস করার জন্য প্রেরণের পর আবূ মুলায়হ ইব্‌ন উরওয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট আবেদন করলো, যেন প্রতিমার সম্পদ থেকে তার মরহুম পিতার ঋণ শোধ করে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার আবেদন গ্রহণ করলেন। তখন কারিব ইব্‌ন আসওয়াদ বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার পিতা আসওয়াদের ঋণও শোধ করে দিন। উরওয়া (রা) ও আসওয়াদ ছিলেন আপন ভাই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আসওয়াদ তো মুশরিক অবস্থায় মারা গেছে। কারিব বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিন্তু একজন আত্মীয় মুসলিমের প্রতি অনুগ্রহ করুন। এর দ্বারা সে নিজেকে বোঝাচ্ছিল। ঋণ তো এখন আমার উপর। আর আমিই তা পরিশোধের জন্য সাহায্য চাচ্ছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু সুফিয়ানকে নির্দেশ দিলেন, যেন প্রতিমার সম্পদ দ্বারা উরওয়া ও আসওয়াদের ঋণ শোধ করে দেয়।
মুগীরা (রা) প্রতিমার সম্পদ একত্র করে আবু সুফিয়ানকে বললেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমাকে নির্দেশ দিয়েছেন এ মাল দ্বারা উরওয়া ও আসওয়াদের ঋণ শোধ করে দিতে। তিনি তাদের ঋণ শোধ করে দিলেন。

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বনূ সাকীফের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিরাপত্তানামা

📄 বনূ সাকীফের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিরাপত্তানামা


রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের জন্য যে নিরাপত্তানামা লিখে দিয়েছিলেন, তা ছিল নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد النبي رسول الله الى المؤمنين ان عضاه وج وصيده لا يعضد من وجد يفعل شيئا من ذلك فانه يجلد وتنزع ثيابه فان تعدى ذلك فانه يؤخذ فيبلغ به النبي محمد وان هذا امر النبي محمد رسول الله .
"দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে আল্লাহর রাসূল, নবী মুহাম্মাদের পক্ষ হতে মু'মিনদের জন্য। ওয়াজ্জ¹-এর গাছপালা ও জীব জানোয়ারের কোন ক্ষতিসাধন করা যাবে না। কেউ তা করলে তাকে কশাঘাত করা হবে এবং তার পোশাক খুলে নেওয়া হবে। পুনরাবৃত্তি করলে তাকে ধরে নবী মুহাম্মদের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এটা আল্লাহর রাসূল, নবী মুহাম্মাদের নির্দেশ।"
খালিদ ইব্‌ন সাঈদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশে লেখেন: মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশ কেউ লংঘন করবে না। যে করবে, সে তার নিজের উপরই জুলুম করবে。

টিকাঃ
১ ওয়াজ্‌জ: তায়েফের একটি স্থানের নাম।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবূ বকর (রা)-এর নেতৃত্বে হজ্জ পালন

📄 আবূ বকর (রা)-এর নেতৃত্বে হজ্জ পালন


ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) রমযানের বাকী দিনগুলো, শাওয়াল ও যুলকাদা মাস কোথাও বের হলেন না। পরে তিনি আবূ বকর (রা)-কে ৯ম হিজরীর হজ্জের আমীর বানিয়ে পাঠান, যাতে তিনি মুসলিমদের হজ্জ অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন। মুশরিকরা তখনও তাদের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী হজ্জ পালন করত। আবূ বকর (রা) মুসলিমদের সাথে নিয়ে হজ্জের জন্য যাত্রা করেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে মুশরিকদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণাদানের জন্য মনোনয়ন প্রদান

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে মুশরিকদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণাদানের জন্য মনোনয়ন প্রদান


এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুশরিকদের মাঝে সম্পাদিত চুক্তি ভংগের অনুমতিসম্বলিত ওহী নাযিল হয়। চুক্তি হয়েছিল যে, বায়তুল্লাহ্-যাত্রী কোন ব্যক্তিকে বাধা দেওয়া যাবে না। নিষিদ্ধ মাসে কারও কোনরূপ ভয়ের কারণ থাকবে না। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুশরিকদের মাঝে সম্পাদিত একটি সাধারণ চুক্তি। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও আরব সম্প্রদায়সমূহের মাঝে নির্ধারিত মেয়াদের জন্য বহু বিশেষ চুক্তিও সম্পাদিত হয়। এ সম্পর্কে এবং সেই সাথে তাবুক যুদ্ধে পশ্চাদপদ মুনাফিকদের সম্পর্কে কুরআন মজীদের অনেকগুলো আয়াত নাযিল হয়। তাতে কোন কোন মুনাফিকদের উক্তিও বিধৃত হয়েছে। এসব আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা সেইসব লোকের গোপন কথা ফাঁস করে দেন, যারা অন্তরে যা পোষণ করত, প্রকাশ করত তার বিপরীত। তাদের কারও কারও নাম আমাদেরকে জানানো হয়েছে এবং কারও নাম রয়ে গেছে আমাদের অগোচরে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
بَرَاءَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى الَّذِينَ عَاهَدتُّمْ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ -
'এটা সম্পর্কচ্ছেদ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে সেইসব মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা পারস্পরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলে' (৯: ১)। অর্থাৎ মুশরিকদের মধ্যে যাদের সাথে সাধারণ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ। এরপর আল্লাহ্ বলেন:
فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَ اعْلَمُوا أَنَّكُمْ غَيْرُ مُعْجِزِي اللَّهِ وَأَنَّ اللَّهَ مُخْزِي الْكَافِرِينَ . وَاذَانَّ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجَ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ وَرَسُولَهُ .
এরপর তোমরা দেশে চার মাসকাল পরিভ্রমণ কর ও জেনে রাখ যে, তোমরা আল্লাহকে হীনবল করতে পারবে না এবং আল্লাহ্ কাফিরদের লাঞ্ছিত করে থাকেন। মহান হজ্জের দিনে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে মানুষের প্রতি এ এক ঘোষণা যে, আল্লাহর সাথে মুশরিকদের কোন সম্পর্ক রইল না এবং তাঁর রাসূলের সাথেও নয়' (৯: ২-৩)। অর্থাৎ এই হজ্জের পরে। আল্লাহ্ বলেন:
فَإِنْ تُبْتُمْ فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ غَيْرُ مُعْجِزِي اللَّهِ وَبَشِّرِ الَّذِينَ كَفَرُوا بِعَذَابٍ اليم - الا الَّذِينَ عَاهَدْتُمْ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ .
'তোমরা যদি তওবা কর তবে তোমাদের কল্যাণ হবে। আর তোমরা যদি মুখ ফিরাও, তবে জেনে রাখ যে, তোমরা আল্লাহকে হীনবল করতে পারবে না এবং কাফিরদের মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। তবে মুশরিকদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিতে আবদ্ধ (৯: ৩-৪)। অর্থাৎ নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বিশেষ চুক্তি। আল্লাহ্ আরো বলেন:
ثُمَّ لَمْ يَنْقُصُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَى مُدَّتِهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ المُتَّقِينَ - فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ .
'এবং. পরে যারা তোমাদের চুক্তি রক্ষায় কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করেনি, তাদের সাথে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পালন করবে; আল্লাহ্ মুত্তাকীদের পসন্দ করেন। এরপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে' (৯: ৪-৫)। অর্থাৎ যে চার মাসকে তাদের জন্য মেয়াদ নির্দিষ্ট করা হয়েছে, সেই মাসগুলো। আল্লাহ্ বলেন:
فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلِّ مَرْصَدٍ فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَتُوا الزَّكُوةَ فَخَلُوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ ، وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ .
'মুশরিকদের যেখানে পাবে হত্যা করবে, তাদের বন্দী করবে, অবরোধ করবে এবং প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের জন্য ওঁৎ পেতে থাকবে, কিন্তু যদি তারা তওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে তাদের পথ ছেড়ে দিবে; আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। মুশরিকদের মধ্যে কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে' (৯: ৫-৬)। অর্থাৎ যাদের হত্যা করার জন্য আমি তোমাকে নির্দেশ দিয়েছি, তাদের মধ্যে। আল্লাহ্ বলেন:
فَاجِرَهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللهِ ثُمَّ ابْلِغْهُ مَأْمَنَةٌ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَا يَعْلَمُونَ .
'তুমি তাকে আশ্রয় দিবে যাতে সে আল্লাহ্র বাণী শুনতে পায়, এরপর তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিবে; কারণ তারা অজ্ঞ লোক' (৯: ৬)। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
كَيْفَ يَكُونَ لِلْمُشْرِكِينَ عَهْدٌ عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ رَسُولِهِ -
'আল্লাহ্ ও তার রাসূলের নিকট মুশরিকদের চুক্তি কি করে বলবৎ থাকবে'? (৯: ৭)। অর্থাৎ সেই সব মুশরিকদের চুক্তি, যারা এবং তোমরা এই সাধারণ চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলে যে, তারা তোমাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবে না এবং তোমরাও তাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবে না-পবিত্র স্থানে এবং পবিত্র মাসে। আল্লাহ্ আরো বলেন:
إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدتُّمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ -
'তবে যাদের সাথে মাসজিদুল হারামের সন্নিকটে তোমরা পারস্পরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলে' (৯: ৭)। এরা ছিল বনু বকরের কয়েকটি উপগোত্র। তারা হুদায়বিয়ার দিনে কুরায়শ ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মাঝে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কারায়শদের চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সে চুক্তি কুরায়শদের পক্ষে কেবল বনূ বাকর ইব্‌ন ওয়াইলের শাখা দীল গোত্রই ভংগ করেছিলে, যারা কুরায়শদের চুক্তি ও অংগীকারে শামিল হয়েছিল। বনূ বাকরের অন্যান্য যারা চুক্তি ভংগ করেনি তাদের সাথে নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়। আল্লাহ্ বলেন:
فَمَا اسْتَقَامُوا لَكُمْ فَاسْتَقِيمُوا لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ -
'যাবৎ তারা তোমাদের চুক্তিতে স্থির থাকবে, তোমরাও তাদের চুক্তিতে স্থির থাকবে; আল্লাহ্ মুত্তাকীদের পসন্দ করেন' (৯: ৭)। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
كَيْفَ وَإِنْ يُظْهَرُوا عَلَيْكُمْ لَا يَرْقُبُوا فِيكُمْ إِلَّا وَلَا ذِمَّةً -
'কেমন করে থাকবে, তারা যদি তোমাদের উপর জয়ী হয়, তবে তারা তোমাদের আত্মীয়তার ও অংগীকারের কোন মর্যাদা দিবে না' (৯: ৮)। অর্থাৎ যেসকল মুশরিক নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কোন সাধারণ চুক্তিতে আবদ্ধ নয়, তাদের কথা বলা হয়েছে। ইবন হিশাম বলেন: الال অর্থ চুক্তি। বনূ উসায়্যিদ ইবন আমর ইবন তামীমের কবি আওস ইবন হাজার তার এক কাসীদায় বলেন:
لولا بنو مالك والال مرقية * ومالك فيهم الآلاء والشرف -
যদি না বনু মালিক ও চুক্তির মর্যাদা লক্ষণীয় হতো-বস্তুত বনূ মালিকের মধ্যে প্রাচুর্য ও মাহাত্ম্য আছে।
الال এর বহুবচন الال কবি বলেন:
فلا ال من الا لال بيني * وبينكم فلا تألن جهدا
আমার ও তোমাদের মধ্যে নাই কোন চুক্তি, কাজেই তোমরা চেষ্টার করো না ত্রুটি। الذمة অর্থ অংগীকার। আজদা ইব্‌ন মালিক হামদানী, যিনি আবূ মাসরূক আজদা ফাকীহ নামে পরিচিত তিনি বলেন:
كان علينا ذمة ان تجاوزوا * من الارض معروفا الينا ومنكرا -
'আমাদের অংগীকার ছিল তোমরা এদেশ ছেড়ে চলে যাবে, চাই তোমরা আমাদের প্রতি সদ্ব্যবহারই কর কিংবা অসদ্ব্যবহার।' এটা তার ত্রিপদি একটি কবিতার অংশবিশেষ। ذمة এর বহু বচন। এরপর আল্লাহ্ বলেন:
يُرْضُونَكُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ وَتَأْبِي قُلُوبُهُمْ وَأَكْثَرُهُمْ فَاسِقُونَ - اشْتَرَوا بِآيَاتِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ - لَا يَرْقُبُونَ فِي مُؤْمِنِ إِلَّا وَلَا ذِمَّةً وَ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُعْتَدُونَ .
তারা মুখে তোমাদের সন্তুষ্ট রাখে, কিন্তু তাদের হৃদয় তা অস্বীকার করে। তাদের অধিকাংশ সত্যত্যাগী। তারা আল্লাহ্ আয়াতকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে ও তারা লোকদের তাঁর পথ হতে নিবৃত্ত করে; তারা যা করে থাকে তা অতি নিকৃষ্ট। তারা কোন মু'মিনের সাথে আত্মীয়তার ও অংগীকারের মর্যাদা রক্ষা করে না। তারাই সীমালংঘনকারী (৯: ৮-১০)। অর্থাৎ তারা তোমাদের প্রতি সীমালংঘন করেছে। আল্লাহ্ বলেন:
فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَتُوا الزَّكُوةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّيْنِ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يُعْلَمُونَ .
এরপর তারা যদি তওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে তারা তোমাদের দীন সম্পর্কীয় ভাই। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আমি নিদর্শন স্পষ্টরূপে বিবৃত করি' (১১: ১১)।
রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক আলী (রা)-কে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট করা
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট হাকীম ইব্‌ন হাকীম ইব্‌ন আব্বাদ ইবন হুনায়ফ (র) আবূ জা'ফর মুহাম্মদ ইব্‌ন আলী (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন:
যখন সম্পর্কচ্ছেদ সম্পর্কিত নির্দেশ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি অবতীর্ণ হলো, এ দিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু বকর সিদ্দীক (রা)-কে মানুষের হজ্জ কায়েম করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, তখন তাঁকে বলা হলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি যদি এ নির্দেশ আবু বকরের নিকট পাঠিয়ে দিতেন! কিন্তু তিনি বললেন: আমার পক্ষ হতে এটা আমার আহলে বায়তের মধ্য হতেই একজন ঘোষণা করবে। এরপর তিনি আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা)-কে ডাকলেন। তিনি তাঁকে বললেন: তুমি সূরা বারাআতের শুরুর এ আয়াতগুলো নিয়ে রওনা হয়ে যাও এবং কুরবানীর দিন যখন মিনায় সকলে সমবেত হবে, তখন তাদের মাঝে ঘোষণা করে দেবে যে,
* কোন, কাফির জান্নাতে প্রবেশ করবে না। * এ বছরের পর আর কোন মুশরিক হজ্জ করতে পারবে না। * বিবস্ত্র অবস্থায় বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করা যাবে না। * রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট যার কোন চুক্তি ছিল, তার সে চুক্তি নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
এরপর আলী (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উটনী 'আসবা'-তে সওয়ার হয়ে রওনা হয়ে গেলেন। পথিমধ্যে আবূ বকর (রা)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাত হলো।
আবূ বকর (রা) তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন : অধিনায়ক হয়ে, না অধীনস্থ? তিনি বললেন : বরং অধীনস্থ। এরপর তারা উভয়ে সম্মুখে চলতে থাকলেন। আবু বকর (রা) মানুষের হজ্জের নেতৃত্ব দিলেন। 'আরববাসী সে বছরও তাদের প্রাচীন জাহিলী রীতি অনুযায়ী হজ্জ আদায় করে। অবশেষে যখন কুরবানীর দিন উপস্থিত হলো, তখন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) দণ্ডায়মান হলেন, এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে যে কথা ঘোষণা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন :
হে জনমণ্ডলী! কোন কাফির জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এ বছরের পর আর কোন মুশরিক হজ্জ করতে পারবে না। কোন বিবস্ত্র ব্যক্তি বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে যার কোন চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত তার চুক্তি বলবৎ থাকবে।
এ ঘোষণা প্রদানের পর মানুষকে চার মাসের সুযোগ দেওয়া হলো, যাতে প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ নিরাপদ স্থান ও বাসভূমিতে ফিরে যেতে পারে। এরপরে আর কোন মুশরিকের জন্য কোনরূপ দায়-দায়িত্ব ও যিম্মাদারী থাকবে না, কেবল সেই সব লোক ব্যতিক্রম, যাদের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত কোন চুক্তি আছে। এরপর আর কোন মুশরিক হজ্জ করেনি এবং বিবস্ত্র অবস্থায় কেউ বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করেনি।
এরপর আবু বকর সিদ্দীক (রা) ও আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) মদীনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট ফিরে আসেন।
ইবন ইসহাক বলেন: এটাই ছিল মুশরিকদের সাথে সাধারণ চুক্তির সম্পর্কেচ্ছেদ এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য যাদের সঙ্গে বিশেষ চুক্তি ছিল, তাদের সাথেও।
মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বিশেষ চুক্তি ভংগকারী মুশরিকদের বিরুদ্ধে এবং চারমাস গত হওয়ার শর্ত সাপেক্ষে সাধারণ চুক্তিতে আবদ্ধ মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার নির্দেশ দেন। শেষোক্ত ক্ষেত্রে চার মাস তাদেরকে অবকাশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সে চারমাসের ভেতরও কেউ যদি সীমালংঘন করে, তবে সে সীমালংঘনের কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
أَلَا تُقَاتِلُونَ قَوْمًا نُكَثُوا أَيْمَانَهُمْ وَهَمُوا بِاخْرَاجِ الرَّسُولِ وَهُمْ بَدَءُوكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ أَتَخْشَوْنَهُمْ فَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَوهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرُكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ - وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ - أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تُتْرَكُوا وَلَمَّا يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَلَمْ يَتَّخِذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَا رَسُولِهِ وَلَا الْمُؤْمِنِينَ وَلِيجَةُ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ .
'তোমরা কি সেই সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করবে না, যারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভংগ করেছে ও রাসূলের বহিষ্করণের জন্য সংকল্প করেছে? তারাই প্রথম তোমাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। তোমরা কি তাদেরকে ভয় কর? মু'মিন হলে আল্লাহকে ভয় করাই তোমাদের পক্ষে সমীচীন। তোমরা তাদের সাথে সংগ্রাম করবে। তোমাদের হাতে আল্লাহ্ তাদেরকে শাস্তি দিবেন, তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে বিজয়ী করবেন ও মু'মিনদের চিত্ত-প্রশান্ত করবেন। এবং তাদের অন্তরের ক্ষোভ দূর করবেন। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হন, আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
তোমরা কি মনে কর যে, আল্লাহ্ তোমাদেরকে এমনি ছেড়ে দিবেন, অথচ এখনো তিনি প্রকাশ করেননি তোমাদের মধ্যে কে মুজাহিদ এবং কে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে তাঁর রাসূল ও মু'মিনগণ ব্যতীত অন্য কাউকে গ্রহণ করেনি? তোমরা যা কর আল্লাহ্ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত (৯: ১৩-১৬)।
ইবন হিশাম বলেন, وليجة অর্থ প্রবিষ্ট। এর বহুবচন ولائج এটা ولج - بلج (প্রবেশ করেছে, প্রবেশ করে) হতে উৎপন্ন। কুরআন মাজীদে আছে: حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ 'যতক্ষণ না সূঁচের ছিদ্রপথে উট প্রবেশ করে' (৭: ৪০)। আল্লাহ্ তা'আলা বলছেন: যারা আল্লাহ্, রাসূল ও মু'মিন ছাড়া কাউকে অন্তরে প্রবেশকারীরূপে গ্রহণ করেনি যে, তার কাছে গোপনে এমন কথা বলে, যা অন্যত্র প্রকাশ করে না; ঠিক মুনাফিকদের আচারতুল্য। তারা মু'মিনদের কাছে ঈমান প্রকাশ করে, কিন্তু واذا خلوا الى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ 'যখন তারা নিভৃতে তাদের শয়তানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সাথেই রয়েছি' (২:১৪)।
কবি বলেন:
واعلم بانك قد جعلت وليجة * ساقوا اليك الحتف غير مشوب - 'জেনে রাখ, তোমাকে বানান হয়েছে অন্তরঙ্গ বন্ধু, তারা তোমার দিকে টেনে এনেছে নির্ঘাত মৃত্যু'।
কুরআন মজীদ কুরায়שদের এ দাবী খণ্ডন করেছে যে, তারা বায়তুল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণকারী
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর কুরায়שদের এ উক্তি বিধৃত হয়েছে যে, আমরা পবিত্র স্থানের অধিবাসী, হাজীদের পানি সরবরাহকারী এবং এই গৃহের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই আমাদের চেয়ে উত্তম কেউ নয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ - 'তারাই তো আল্লাহ্র মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যারা ঈমান আনে আল্লাহ্ ও পরকালে' (৯: ১৮)। অর্থাৎ তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ, সে তো ঈমানের ভিত্তিতে নয়। সত্যিকারের রক্ষণাবেক্ষণ করে তারা, যারা ঈমানদার। আল্লাহ্ আরো বলেন:
مَنْ أَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلوةَ وَأَتَى الزَّكُوةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلا الله - 'যারা ঈমান আনে আল্লাহ্ ও আখিরাতে এবং সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করে না'। অর্থাৎ এরাই প্রকৃত রক্ষণাবেক্ষণকারী। আল্লাহ্ বলেন:
فَعَسَى أُولَئِكَ أَنْ يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ - 'তাদেরই সৎপথ প্রাপ্তির আশা আছে (৯ : ১৮)। আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে عَلَى-এর ব্যবহার সন্দেহের অর্থে নয়; বরং নিশ্চয়তার অর্থে। এরপর আল্লাহ্ বলেন:
اجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الحَاجِّ وَعِمَارَةِ المَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ أَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لا يَسْتَوْنَ عِنْدَ الله . 'যারা হাজীদের পানি সরবরাহ করে এবং মাসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করে, তোমরা কি তাদেরকে তাদের পুণ্যের সমজ্ঞান কর, যারা আল্লাহ্ ও আখিরাতে ঈমান আনে এবং আল্লাহ্ পথে জিহাদ করে? আল্লাহ্র নিকট তারা সমতুল্য নয়' (৯ : ১৯)।
এরপর তাদের শত্রুদের বৃত্তান্ত বর্ণনা প্রসংগে হুনায়ন যুদ্ধের আলোচনা আসে। তাতে এ যুদ্ধে যা-কিছু হয়েছিল, শত্রুদের থেকে মুসলিমদের পলায়ন, অবশেষে তাদের প্রতি আল্লাহ্ তা'আলার সাহায্য আগমন প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلا يَقْرَبُوا المَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَذَا وَإِنْ خِفْتُمْ عَيْلَةً . 'মুশরিকরা তো অপবিত্র; সুতরাং এই বছরের পর তারা যেন মাসজিদুল-হারামের নিকট না আসে। যদি তোমরা দারিদ্র্যের আশংকা কর' (৯: ২৮)। এর প্রেক্ষাপট এই যে, একদল লোক মন্তব্য করল, আমাদের থেকে বাজার উচ্ছেদ হয়ে যাবে, ব্যবসা-বাণিজ্য উচ্ছন্নে যাবে এবং আমাদের লাভজনক সবকিছু বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাদের জবাবে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ عَيْلَةً فَسَوْفَ يُغْنِيكُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ إِنْ شَاءَ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ. 'যদি তোমরা দারিদ্র্যের আশংকা কর, তবে জেনে রাখ, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তার নিজ করুণায় তোমাদেরকে অভাবমুক্ত করতে পারেন। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়' (৯ : ২৮)। তাঁর নিজ করুণায় মানে, ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া অন্য ভাবেও। আল্লাহ্ আরো বলেন:
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولَهُ وَلَا يَدِينُونَ دينَ الحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أوتُوا الْكِتَبَ حَتَّى يُعْطُومُ الجِزْيَةَ عَنْ يُدِ وَهُمْ صَاغِرُونَ . 'যাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা আল্লাহতে ও পরকালেও ঈমান আনে না। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা নিষিদ্ধ করে না এবং সত্য দীন অনুসরণ করে না, তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে স্বহস্তে জিযয়া দেয়' (৯: ২৯)। অর্থাৎ তোমরা যে বাজার বন্ধ হয়ে দারিদ্র্য-পীড়িত হওয়ার আশংকা করছ, তার উত্তম বিকল্প রয়েছে এর মাঝে। সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা শিরকের অবসানে তাদের বাজার-অর্থনীতির যে ক্ষতিসাধন হয়েছে, আহলে কিতাব থেকে জিযয়া আদায়ের মাধ্যমে তার প্রতিকার করে দিয়েছেন।
উভয় আহলে কিতাব সম্পর্কে যা অবতীর্ণ হয়
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা উভয় আহলে কিতাব (অর্থাৎ ইয়াহুদী ও নাসারা)-এর দুষ্কৃতি এবং আল্লাহ্ সম্পর্কে তাদের মিথ্যা ভাষণের বিবরণ দিতে গিয়ে শেষ পর্যায়ে বলেন:
إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ يَكْسِرُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَ لَا يَنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ .
'পণ্ডিত এবং সংসার-বিরাগীদের মধ্যে অনেকে লোকের ধন অন্যায়ভাবে ভোগ করে থাকে এবং লোককে আল্লাহ্র পথ হতে নিবৃত্ত করে। আর যারা সোনা-রূপা পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও' (৯ : ৩৪)।
মাস পিছানো সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর النسئ মাস পিছানো এবং এ ব্যাপারে আরবদের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে। النسئ হচ্ছে তাদের কর্তৃক আল্লাহ্র হারামকৃত মাসকে হালাল করা এবং হালালকৃত মাসকে হারাম করা। আল্লাহ্ বলেন:
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللهِ اثنا عَشَرَ شَهْرًا في كتب الله يَوْمَ خَلَقَ السَّمَواتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَربَعَةٌ حرم ذلكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ .
'আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহ্ বিধানে আল্লাহ্র নিকট মাস গণনায় মাস বারটি, তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করো না' (৯: ৩৬)। অর্থাৎ তার মধ্যে যা হারাম তাকে হালাল এবং যা হালাল তাকে হারাম করো না, যেমন করেছিল মুশরিকরা।
إِنَّمَا النسى 'এই যে মাসকে পিছিয়ে দেওয়া' যা তারা করতো এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন :
زِيَادَةٌ فِي الْكُفْرِ يُضَلُّ بِهِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا يُحِلُّونَهُ عَامًا وَيُحَرِّمُونَهُ عَامًا لَيُوَاطِئُوا عِدَّةَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَيُحِلُّوا مَا حَرَّمَ اللهُ زُيِّنَ لَهُمْ سوءُ أَعْمَالِهِمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ .
'এতো কেবল কুফরীর বৃদ্ধি করা, যা দ্বারা কাফিরদের বিভ্রান্ত করা হয়। তারা একে কোন বছর বৈধ করে এবং কোন বছর অবৈধ করে, যাতে তারা আল্লাহ্ যেগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন, সেগুলোর গণনা পূর্ণ করতে পারে। অনন্তর আল্লাহ্ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা হালাল করতে পারে। তাদের মন্দ কাজগুলো তাদের জন্য শোভনীয় করা হয়েছে। আল্লাহ্ কাফির সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না' (৯: ৩৭)।
তাবুকের যুদ্ধ সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর তাবুক যুদ্ধপ্রসঙ্গ। এতে অংশগ্রহণে মুসলিমদের শৈথিল্য; রোমানদের সাথে যুদ্ধ করাকে বড় করে দেখা—যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের জন্য তাদেরকে ডাক দেন; মুনাফিক সম্প্রদায়ের কপট-আচরণ, যখন তাদেরকে জিহাদের আহ্বান জানান হয়, এরপরে ইসলামে নতুন বিষয় উদ্ভাবন করার কারণে তাদের প্রতি তিরস্কার ইত্যাদি বিষয়সমূহ বিধৃত হয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ ٱنفِرُوا۟ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ ٱثَّاقَلْتُمْ إِلَى ٱلْأَرْضِ .
'হে মু'মিনগণ! তোমাদের কী হল যে, যখন তোমাদের আল্লাহর পথে অভিযানে বের হতে বলা হয়, তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে ভূতলে ঝুঁকে পড়?' (৯: ৩৮)। এভাবে এ কাহিনী বিবৃত হয়েছে:
يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَيَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ۙ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيْـًٔا ۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ . إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ ٱللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ ثَانِىَ ٱثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِى ٱلْغَارِ .
'(যদি তোমরা অভিযানে বের না হও, তবে) তিনি তোমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন (এবং তোমরা তার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান)। যদি তোমরা তাঁকে সাহায্য না কর, তবে স্মরণ কর, আল্লাহ্ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিরগণ তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দুইজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল' (৯: ৩৯-৪০)।
মুনাফিকদের সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের প্রসংগ উল্লেখপূর্বক তাঁর নবী (সা)-কে বলেন:
لَوْ كَانَ عَرَضًا قَرِيبًا وَسَفَرًا قَاصِدًا لَّاتَّبَعُوكَ وَلَٰكِنْ بَعُدَتْ عَلَيْهِمُ ٱلشُّقَّةُ ۚ وَسَيَحْلِفُونَ بِٱللَّهِ لَوِ ٱسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنفُسَهُمْ وَٱللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَٰذِبُونَ .
'আশু সম্পদ লাভের সম্ভাবনা থাকলে ও সফর সহজ হলে তারা নিশ্চয়ই তোমার অনুসরণ করত, কিন্তু তাদের নিকট যাত্রাপথ সুদীর্ঘ মনে হল। তারা আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে, আমাদের ক্ষমতা থাকলে আমরা নিশ্চয়ই তোমাদের সঙ্গে বের হতাম। তারা নিজদেরকেই ধ্বংস করে। তারা যে মিথ্যাচারী তা তো আল্লাহ্ জানেন' (৯: ৪২)। অর্থাৎ তাদের ক্ষমতা আছে। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
عَفَا اللَّهُ عَنْكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ ... لَوْ خَرَجُوا فِيكُمْ مَّا زَادُوكُمْ إِلا خَبَالاً ولا أَوْضَعُوا خِلالَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ .
'আল্লাহ্ তোমাকে ক্ষমা করেছেন। কারা সত্যবাদী তা তোমার নিকট স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এবং কারা মিথ্যবাদী তা না জানা পর্যন্ত তুমি কেন তাদেরকে অব্যাহতি দিলে? (যারা আল্লাহতে ও শেষ দিবসে ঈমান আনে তারা নিজ সম্পদ ও জীবন দ্বারা জিহাদে অব্যাহতি পাওয়ার প্রার্থনা তোমার নিকট করে না। আল্লাহ্ মুত্তাকীদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। তোমার নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা করে কেবল তারাই যারা আল্লাহ্ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে না। আর যাদের চিত্ত সংশয়যুক্ত, তারা তো আপন সংশয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। তারা বের হতে চাইলে তারা নিশ্চয়ই তজ্জন্য প্রস্তুতির ব্যবস্থা করত, কিন্তু তাদের অভিযাত্রা আল্লাহর মনঃপূত ছিল না। সুতরাং তিনি তাদেরকে বিরত রাখেন এবং তাদেরকে বলা হয়, যারা বসে আছে তাদের সাথে বসে থাক)। তারা তোমাদের সাথে বের হলে তোমাদের বিভ্রান্তিই বৃদ্ধি করত এবং তোমাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের মধ্যে ছুটাছুটি করত। তোমাদের মধ্যে তাদের কথা শুনবার লোক আছে। আল্লাহ্ জালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত' (৯: ৪৩-৪৭)।
ইবন হিশাম বলেন : أَوْضَعُوا خِلالَكُمْ অর্থ তোমাদের ব্যুহাভ্যন্তরে ছুটাছুটি করত। الايضاع -বিশেষ ধরনের চলন, যা হাঁটা অপেক্ষা দ্রুত। আজদা' ইবন মালিক হামদানী বলেন:
بصطادك الوحد المدل بشأوه * بشريج بين الشد والايضاع
'ঘোড়াটি তার অগ্রগামিতা দ্বারা তোমার জন্য শিকার করে আনবে বুনো গরু। তার সে গতি দৌড় ও দুল্কির মাঝামাঝি ধরনের।'
এটি তার একটি কাসিদার অংশবিশেষ।
ইব্ন ইসহাক বলেন: সম্ভ্রান্ত লোকদের মধ্যে যারা তাঁর নিকট যুদ্ধ হতে অব্যাহতি প্রার্থনা করেছিলেন, তাদের মধ্যে আমার নিকট পৌছা বর্ণনামতে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবায়্য ইব্‌ন সাল্‌ল ও জাদ্দ ইব্‌ন কায়স উল্লেখযোগ্য। তারা ছিল আপন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্মানী লোক। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে বিরত রাখেন। কারণ, তিনি জানতেন তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে বের হলে তাঁর সৈন্যদের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে। তাঁর সৈন্যদের মাঝে এমন কিছু লোক ছিল, যারা তাদের ভাল বাসত এবং তারা তাদের যা বলতো, তা মানতো। যেহেতু তাদের মাঝে তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ - لَقَدِ ابْتَغُوا الْفِتْنَةَ مِنْ قَبْلُ .
'তোমাদের মধ্যে তাদের কথা শোনবার লোক আছে। আল্লাহ্ জালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত'। পূর্বেও তারা ফিত্না সৃষ্টি করতে চেয়েছিল' (৯: ৪৭-৪৮)। অর্থাৎ তোমার নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা করার পূর্বে।
وَقَلْبُوا لَكَ الْأُمُورِ ‘এবং তারা তোমার কর্ম পণ্ড করার জন্য গণ্ডগোল সৃষ্টি করেছিল' অর্থাৎ তোমার সঙ্গীদেরকে তোমার সহযোগিতা করা হতে বিরত রাখার এবং তোমার কাজ ব্যর্থ করে দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। আল্লাহ্ বলেন:
حَتَّى جَاءَ الحَقُّ وَظَهَرَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَارِهُونَ - وَمِنْهُمْ مِّنْ يَقُولُ انْدَن لَي وَلَا تَفْتِنِّى أَلَا في الفتنة سقطوا .
'... যতক্ষণ না তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সত্য আসল এবং আল্লাহ্র আদেশ বিজয়ী হল। আর তাদের মধ্যে এমন লোক আছে যে বলে, আমাকে অব্যাহতি দাও এবং আমাকে ফিতনায় ফেলো না। সাবধান! তারাই ফিতনায় পড়ে আছে'। (৯: ৪৮-৪৯)। এ কথা যে বলেছিল, আমাদের নিকট তার নাম বর্ণিত হয়েছে জাদ্দ ইব্‌ন কায়স বলে। সে ছিল বনূ সালিমার লোক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন তাকে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আহ্বান জানান তখন সে একথা বলেছিল।
এরপর এ কাহিনী বর্ণনার শেষ পর্যায়ে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
لوْ يَجِدُونَ مَلْجَا أَوْ مَغْرَت أَوْ مُدَّخَلاً لولوا إِلَيْهِ وَهُمْ يَجْمَعُونَ وَ مِنْهُمْ مَّنْ يُلْمِزُكَ فِي الصَّدَقَاتِ فَإِنْ أَعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَإِن لَّمْ يُعْطُوا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ .
'তারা কোন আশ্রয়স্থল, কোন গিরি-গুহা অথবা কোন প্রবেশস্থল পেলে তার দিকে পলায়ন করবে ক্ষিপ্রগতিতে। তাদের মধ্যে এমন লোক আছে, যে সাদাকা বণ্টন সম্পর্কে তোমাকে দোষারোপ করে। এরপর এর কিছু তাদেরকে দেওয়া হলে তারা পরিতুষ্ট হয় এবং তারা কিছু তাদেরকে না দেওয়া হলে তারা বিক্ষুদ্ধ হয়' (৯: ৫৭-৫৮)। অর্থাৎ তাদের উদ্দেশ্য, তাদের সন্তুষ্টি ও ক্ষোভ সবকিছু পার্থিব জীবনকেন্দ্রিক।
সাদাকা পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে যা নাযিল হয়।
এরপর সাদাকা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তা কাদের জন্য? আল্লাহ্ তা'আলা তাদের নাম বিবৃত করতে গিয়ে বলেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسْكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ.
'সাদাকা তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তদসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত-আকর্ষণ করা হয়-তাদের জন্য, দাস মুক্তির জন্য, ঋণ ভারাক্রান্তদের, আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহ্র বিধান। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়' (৯:৬০)।
নবীকে ক্লেশ-দানকারীদের সম্পর্কে যা নাযিল হয়: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে তাদের প্রতারণা এবং তাঁকে তাদের ক্লেשদান সম্পর্কে নাযিল হয় :
وَمِنْهُمُ الَّذِينَ يُؤْذُونَ النَّبِيَّ وَيَقُولُونَ هُوَ أُذُنٌ قُلْ أُذُنُ خَيْرٍ لَّكُمْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَيُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِينَ وَرَحْمَةً لِّلَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ رَسُولَ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
'এবং তাদের মধ্যে এমন লোক আছে, যারা নবীকে ক্লেש দেয় এবং বলে, সে তো কর্ণপাতকারী। বল, তার কান তোমাদের জন্য যা মংগল তাই শোনে। সে আল্লাহতে ঈমান আনে এবং মু'মিনদেরকে বিশ্বাস করে। তোমাদের মধ্যে যারা মু'মিন সে তাদের জন্য রহমত এবং যারা আল্লাহর রাসূলকে ক্লেশ দেয়, তাদের জন্য আছে মর্মন্তুদ শাস্তি'। (৯: ৬১)। এ উক্তি যে করত আমার নিকট পৌছা বর্ণনামতে তার নাম নাবতাল ইব্‌ন হারিস। সে ছিল বনু আমর ইব্‌ন আওফের লোক। তার সম্পর্কেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সে বলতো: মুহাম্মদ তো কর্ণপাতকারী, কেউ তাকে কিছু বললেই বিশ্বাস করে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: قُلْ أُذُنُ خَيْرِ لَكُمْ অর্থাৎ তিনি তোমাদের জন্য যা মংগল তাই শোনেন ও বিশ্বাস করেন। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَكُمْ لِيُرْضُوكُمْ وَاللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَقُّ أَن يُرْضُوهُ إِنْ كَانُوا مُؤْمِنِينَ .
'তারা তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য তোমাদের নিকট আল্লাহ্ শপথ করে। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল এরই বেশী হকদার যে, তারা তাদেরকেই সন্তুষ্ট করবে, যদি তারা মু'মিন হয়'। (৯: ৬২)। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ..... إِن نُعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً .
'এবং তুমি তাদেরকে প্রশ্ন করলে তারা নিশ্চয়ই বলবে, আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করেছিলাম। বল, তোমরা কি আল্লাহ্, তার নিদর্শন ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে? (দোষ স্খালনের চেষ্টা করো না। তোমরা ঈমান আনার পর কুফরী করেছ)। তোমাদের মধ্যে কোন দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দিব। (কারণ তারা অপরাধী) (৯: ৬৫-৬৬)। এ উক্তি করেছিল ওয়াদী'আ ইব্‌ন সাবিত। সে ছিল বনূ আম্ম ইব্‌ন আওফের শাখা বনূ উমাইয়া ইব্‌ন যায়দের লোক। আর যাকে ক্ষমা করা হয়েছিল, আমার নিকট পৌছা বর্ণনা মতে তার নাম মুখাশিন ইবন হুমায়্যির আশজা'ঈ। বনূ সালিমার মিত্র। কারণ তিনি তাদের কিছু উক্তির প্রতিবাদ করেছিলেন।
এভাবে তাদের কাহিনী বিবৃত হয়ে এ আয়াতে এসে শেষ হয়েছে:
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ وَمَأ وَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ - يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلامِهِمْ وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَعْنَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولَهُ مِنْ فَضْلِهِ ..... من ولي ولا نَصِيرٍ .
'হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর ও তাদের প্রতি কঠোর হও। তাদের আবাসস্থল জাহান্নام। তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল! তারা আল্লাহ্ শপথ করে যে, তারা কিছু বলেনি। কিন্তু তারা তো কুফরীর কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর তারা কাফির হয়েছে; তারা যা সংকল্প করেছিল তা পায়নি। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল নিজ কৃপায় তাদেরকে অভাবমুক্ত করেছিলেন বলেই বিরোধিতা করেছিল। (তারা তওবা করলে তা তাদের জন্য ভাল হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে আল্লাহ্ ইহলোক ও পরলোকে তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিবেন)। পৃথিবীতে তাদের কোন অভিভাবক অথবা সাহায্যকারী নেই' (৯: ৭৩-৭৪)।
এ উক্তি করেছিল জুলাস ইব্‌ন সুওয়ায়দ ইব্‌ন সামিত। তারই পরিবারের উমায়র ইব্‌ন সা'দ নামক এক ব্যক্তি তা বলে দেন। কিন্তু সে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর নামে কসম করে বলে যে, এরূপ কথা সে বলেনি। এরপর যখন তাদের সম্পর্কে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়, তখন সে তা থেকে বিরত হয় ও তওবা করে। পরে তার অবস্থা ও তওবা, আমার প্রাপ্ত বর্ণনা অনুযায়ী, ভাল হয়েছিল।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَمِنْهُمْ مَنْ عَاهَدَ اللهُ لَئِنْ أَتَانَا مِنْ فَضْلِهِ لَنَصَّدَّ فَنَّ وَلَنَكُونَنَّ مِنَ الصَّالِحِينَ
'তাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর নিকট অঙ্গীকার করেছিল, আল্লাহ্ নিজ কৃপায় আমাদের দান করলে আমরা নিশ্চয়ই সাদাকা দিব এবং সৎ কর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হব' (৯: ৭৫)। তাদের মধ্যে আল্লাহ্র নিকট এ অঙ্গীকার করেছিল ছা'লাবা ইব্‌ন হাতিম ও মু'আত্তিব ইব্‌ন কুশায়র। তারা ছিল বনূ আম্ম ইব্‌ন আওফের লোক।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوَعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَحْرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
'মু'মিনদের মধ্যে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাদাকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ব্যতিরেকে কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে ও বিদ্রূপ করে আল্লাহ্ তাদের বিদ্রূপ করেন। তাদের জন্য আছে মর্মন্তুদ শাস্তি' (৯: ৭৯)।
মু'মিনদের মধ্যে এরূপ স্বতঃস্ফূর্ত সাদাকাদানকারী ছিলেন আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) এবং বনূ আজলানের আসিম ইব্‌ন আদী (রা)। একবার রাসূলুল্লাহ্ (সা) দান খয়রাতের প্রতি উৎসাহিত করলে আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) চার হাজার দিরহাম সাদাকা করে দেন। আসিম ইব্‌ন আদী (রা) সাদাকা করেন একশ' ওয়াসাক খেজুর। তা দেখে মুনাফিকরা তাদেরকে বিদ্রূপ করে এবং মন্তব্য করে যে, এ তো লোক দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়।
যিনি কষ্টার্জিত সম্পদ ব্যয় করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন বনু উনায়ফের আবূ আকীল। তিনি এক সা' খেজুর এনে সাদাকার মালের মধ্যে ঢেলে দেন। তা দেখে মুনাফিকরা হেসে উঠে এবং বলে: আবূ আকীলের এক সা' আল্লাহর কোন কাজে লাগবে না।
এরপর প্রচণ্ড গরম ও দুর্ভিক্ষের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিহাদের উদ্দেশ্যে তাবুক অভিমুখে যাত্রার নির্দেশ দিলে, তারা পরস্পরে যা বলেছিল, তা ব্যক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ্ বলেন:
وَقَالُوا لَا تَنْفِرُوا فِي الحَرِّ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرّاً لَوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ - فَلْيَضْحَكُوا قَلِيلًا وَلِيَبْكُوا كَثِيرًا ولا تُعْجِبُكَ أَمْوَالُهُمْ وَأَوْلَادُهُمْ .
'এবং তারা বললো, গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বল, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম, যদি তারা বুঝত। অতএব, তারা কিঞ্চিত হেসে নিক, তারা প্রচুর কাঁদবে, তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ। (আল্লাহ্ যদি তোমাকে তাদের কোন দলের নিকট ফেরত আনেন এবং তারা অভিযানে বের হওয়ার জন্য তোমার অনুমতি প্রার্থনা করে, তখন তুমি বলবে : তোমরা তো আমার সাথে কখনও বের হবে না এবং তোমরা আমার সংগী হয়ে কখনও শত্রুর সাথে যুদ্ধ করবে না। তোমরা তো প্রথমবার বসে থাকাই পসন্দ করেছিলে; সুতরাং যারা পিছনে থাকে তাদের সাথে বসেই থাক। তাদের মধ্যে কারও মৃত্যু হলে তুমি কখনও তার জন্য জানাযার সালাত পড়বে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না। তারা তো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং পাপাচারী অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে)। সুতরাং তাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাকে যেন বিমুগ্ধ না করে, (আল্লাহ্ তো তার দ্বারাই তাদেরকে পার্থিব জীবনে শান্তি দিতে চান; তারা কাফির থাকা অবস্থায় তাদের আত্মা দেহ-ত্যাগ করবে' (৯: ৮১-৮৫)।
আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্য-এর জানাযার সালাত আদায় করার কারণে যা নাযিল হয়
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট যুহরী (র) উবায়দুল্লাহ্ ইব্‌ন উত্তা (র) হতে এবং তিনি ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমি উমর ইবন খাত্তাব (রা)-কে বলতে শুনেছি, আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্য-এর মৃত্যু হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তার জানাযা পড়ার জন্য ডাকা হল। তিনি তাতে সাড়া দিলেন। যখন তিনি জানাযা পড়ার জন্য তার বরাবর দাঁড়ালেন, তখন আমি ঘুরে গিয়ে তার সামনাসামনি দাঁড়ালাম এবং বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আল্লাহর দুশমন আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্য ইবন সালূলের জানাযা পড়বেন? অথচ সে অমুক দিন এই বলেছিল, অমুক দিন এই বলেছিল? আমি গুনে গুনে দেখাতে লাগলাম সে কোন দিন কি বলেছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) শুনছিলেন আর মুচকি হাসছিলেন। আমি যখন এভাবে বলেই যেতে থাকলাম, তখন তিনি বললেন: উমর সরে যাও, আল্লাহর পক্ষ হতে আমি এখতিয়ার লাভ করেছি এবং আমি তাই গ্রহণ করেছি। আমাকে বলা হয়েছে:
اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْلَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ .
'তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না কর-একই কথা। তুমি সত্তরবার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ্ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না' (৯: ৮০)।
আমি যদি জানতাম সত্তর বারের বেশী ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাকে ক্ষমা করা হবে, তবে তাও করতাম। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার জানাযার সালাত আদায় করলেন। এমনি কি তার শবযানের সাথে হেঁটে হেঁটে কবর পর্যন্ত গেলেন এবং দাফন শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকলেন।
উমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে আমার সে দুঃসাহসিক আচরণের জন্য আমি নিজের প্রতি বিস্মিত হই। বস্তুতঃ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই প্রকৃত অবস্থা ভাল জানেন। কিন্তু আল্লাহ্র কসম, ক্ষণিকের মধ্যেই এ আয়াত দু'টি নাযিল হয়:
وَلا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ أَبَدًا وَلا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ .
'তাদের মধ্যে কারও মৃত্যু হলে তুমি কখনও তার জন্য জানাযার সালাত আদায় করবে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না। তারা তো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং পাপাচারী অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে' (৯: ৮৪)।
এর পরে স্বীয় ওফাত পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ (সা) আর কোন মুনাফিকের জানাযা পড়েননি।
অব্যাহতি প্রার্থনাকারী, অজুحات প্রদর্শনকারী, ক্রন্দনকারী ও মরুবাসী মুনাফিকদের সম্পর্কে যা নাযিল হয়
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَإِذَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ أَنْ أَمِنُوا بِاللَّهِ وَجَاهِدُوا مَعَ رَسُولِهِ اسْتَأْذَنَكَ أُولُوا الطُّولِ مِنْهُمْ .
'আল্লাহতে ঈমান আন এবং রাসূলের সংগী হয়ে জিহাদ কর'-এই মর্মে যখন কোন সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের মধ্যে যাদের শক্তি-সামর্থ্য আছে, তারা তোমার নিকট অব্যাহতি চায়' (৯: ৮৬)।
আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্য ছিল এদেরই একজন। আল্লাহ্ তা'আলা তার সে অবস্থা প্রকাশ করে দিয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তার সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
لكن الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ جَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ وَأُولَئِكَ لَهُمُ الخَيْرَاتُ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ - أَعَدَّ اللهُ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ، وَجَاءَ الْمُعَذَرُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ لِيُؤْذَنَ لَهُمْ وَقَعَدَ الَّذِينَ كَذَّبُوا اللَّهَ وَرَسُولُهُ .
'কিন্তু রাসূল এবং যারা তার সঙ্গে ঈমান এনেছিল, তারা নিজ সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তাদের জন্যই কল্যাণ আছে এবং তারাই সফলকাম। আল্লাহ্ তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত। সেথায় তারা স্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য। মরুবাসীদের মধ্যে কিছু লোক অজুحات পেশ করে অব্যাহতি প্রার্থনার জন্য আসল এবং যারা আল্লাহকে ও তাঁর রাসূলকে মিথ্যা কথা বলেছিল, তারা বসে থাকল' (৯: ৮৮-৯০)।
এভাবে তাদের পূর্ণ ঘটনা বিবৃত হয়েছে। যারা অজুحات পেশ করার জন্য এসেছিল, আমার নিকট পৌঁছা বর্ণনামতে তারা ছিল বনূ গিফারের একদল লোক। খুফাফ ইব্‌ন আয়মা ইব্‌ন রাহাদা তাদের একজন। এর পরে অপারগ ও অক্ষমদের অবস্থা বিবৃত হয়েছে, যা শেষ হয়েছে এই আয়াতে:
وَلَا عَلَى الَّذِينَ إِذَا مَا أَتَوكَ لِتَحْمِلَهُمْ قُلْتَ لَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ تَوَلُّوا وَأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلَا يَجِدُوا مَا يُنْفِقُونَ .
তাদেরও কোন অপরাধ নেই, যারা তোমার নিকট বাহনের জন্য আসলে তুমি বলেছিলে, তোমাদের জন্য কোন বাহন আমি পাচ্ছি না। তারা অর্থব্যয়ে অসামর্থ্যজনিত দুঃখে অশ্রুবিগলিত নেত্রে ফিরে গেল" (৯: ৯২)।
এরাই ছিল ক্রন্দনকারী দল। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَسْتَأْذِنُونَكَ وَهُمْ أَغْنِيَاءُ رَضُوا بِأَنْ يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ وَطَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ .
'যারা অভাবমুক্ত হয়েও অব্যাহতি প্রার্থনা করেছে, অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের হেতু আছে। তারা অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে থাকাই পসন্দ করেছিল। আল্লাহ্ তাদের অন্তর মোহর করে দিয়েছেন, ফলে তারা বুঝতে পারে না' (৯: ৯৩)।
الْخَوَالِفُ — অর্থ নারী। অতঃপর মুসলিমদের নিকট তাদের শপথ ও অজুহাত পেশ করার কথা উল্লেখ করে আল্লাহ্ বলেন:
فَأَعْرِضُوا عَنْهُمْ ..... فَإِنْ تَرْضُوا عَنْهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ .
'(তোমরা তাদের নিকট ফিরে আসলে তারা আল্লাহর শপথ করবে যাতে তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর;) সুতরাং তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা করবে। (তারা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ জাহান্নام তাদের আবাসস্থল। তারা তোমাদের নিকট শপথ করবে, যাতে তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হও)। তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হলেও আল্লাহ্ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি তুষ্ট হবেন না' (৯: ৯৫-৯৬)।
এরপর মরুবাসীদের মধ্যে যারা কপটতা অবলম্বন করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুমিনদের ভাগ্যবিপর্যয়ের প্রতীক্ষা করেছিল, তাদের কথা বিধৃত হয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَ مِنَ الْأَعْرَابِ مَن يَتَّخِذُ مَا يُنْفِقُ مَغْرَمًا
ব্যয় করে, তাকে অর্থদণ্ড বলে গণ্য করে, অর্থাৎ আল্লাহ্‌র পথে খরচাদি ও দান-খয়রাতকে।
وَيَتَرَبَّصُ بِكُمُ الدَّوَائِرَ عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ وَاللَّهُ سَمِعٌ عَلِيمٌ 'এবং তারা তোমাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের প্রতীক্ষা করে। মন্দ ভাগ্যচক্র তাদেরই হোক। আল্লাহ্ সবশ্রোতা, সর্বজ্ঞ' (৯: ৯৮)।
নিষ্ঠাবান মরুবাসীদের সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর নিষ্ঠাবান ও খাঁটি মু'মিন মরুবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ্‌ তা'আলা বলেন:
وَمِنَ الْأَعْرَابِ مَنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَيَتَّخِذُ مَا يُنْفِقُ قُرُبَاتِ عِنْدَ اللَّهِ وَصَلَوَاتِ الرَّسُولِ أَلَا إِنَّهَا قُرْبَةً لَهُمْ .
'মরুবাসীদের কেউ কেউ আল্লাহতে ও পরকালে ঈমান রাখে এবং যা ব্যয় করে তাকে আল্লাহর সান্নিধ্য ও রাসূলের দু'আ লাভের উপায় মনে করে। বাস্তবিকই তা তাদের জন্য আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়, (আল্লাহ্ তাদেরকে নিজ রহমতে দাখিল করবেন। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু) (৯: ৯৯)।
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যাঁরা অগ্রগামী তাদের মাহাত্ম্য এবং তাঁদের জন্য আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুত প্রতিদানের উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সাথে যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে তাদেরকেও মেলানো হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ 'আল্লাহ্ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট' (৯: ১০০)।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَمِمَّنْ حَوْلَكُمْ مِّنَ الْأَعْرَابِ مُنْفِقُونَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ .
'মরুবাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের আশে-পাশে আছে, তাদের কেউ কেউ মুনাফিক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কেউ কেউ - তারা কপটতায় সিদ্ধ'। অর্থাৎ তারা কপটতার আশ্রয় নিয়েছে এবং তা ভিন্ন সব প্রত্যাখ্যান করেছে।
سَنُعَذِّبُهُم مُّرَّتَيْنِ - আমি তাদেরকে দু'বার শাস্তি দেব। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে যে দু'বার শাস্তির হুঁশিয়ারী দিয়েছেন, আমার নিকট পৌঁছা বর্ণনামতে তা হচ্ছে - ইসলামের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থানগত দুশ্চিন্তা, প্রতিপক্ষের প্রতি অন্যায় আক্রোש ও বিদ্বেষ, এরপর কবরে যাওয়ার পর সেখানকার শাস্তি, তদুপরি আখিরাতের মহাশাস্তি তথা জাহান্নামের স্থায়ী আযাব। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلاً صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَنْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ .
'এবং অপর কতক লোক নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে, তারা এক সৎকর্মের সাথে অপর অসৎকর্ম মিশ্রিত করেছে। আল্লাহ্ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (৯: ১০২)।
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, ‘তাদের সম্পদ হতে সাদাকা গ্রহণ করবে; এর দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশোধিত করবে' (৯ : ১০৩)।
وَآخَرُونَ مُرْجَوْنَ لِأَمْرِ اللهِ إِمَّا يُعَذِّبُهُمْ وَإِمَّا يَتُوبُ عَلَيْهِمْ
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : 'এবং আল্লাহ্র আদেশের প্রতীক্ষায় অপর কতকের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রইলো, হয় তিনি তাদের শাস্তি দিবেন, না হয় ক্ষমা করবেন (৯:১০৬)।
এরা হচ্ছেন সেই তিন ব্যক্তি, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয় এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-ও আল্লাহ্র পক্ষ হতে তাদের তওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা না আসা পর্যন্ত তাদের বিষয়টি মূলতবী রাখেন।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : وَالَّذِيْنَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا 'এবং যারা মসজিদ নির্মাণ করেছে ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে' (৯: ১০৭)। এভাবে ঘটনার শেষ পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে।
إِنَّ اللهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
الْجَنَّةَ ‘আল্লাহ্ মু'মিনদের নিকট হতে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে এর বিনিময়ে' (৯: ১১১)।
এরপর সূরার শেষ পর্যন্ত তাবুক যুদ্ধের বৃত্তান্ত এবং তদসংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী বিধৃত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর পরবর্তীকালে সূরা বারাআত পরিচিত ছিল সূরা মুব'আছিরা (উদ্‌ঘাটনকারী) নামে। যেহেতু এ সূরা মানুষের রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে। তাবূকই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধাভিযান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00