📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দল ও তাদের ইসলাম গ্রহণের বিবরণ

📄 সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দল ও তাদের ইসলাম গ্রহণের বিবরণ


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাবুক হতে রমযান মাসে মদীনায় ফিরে আসেন। এ মাসেই তাঁর নিকট সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দল উপস্থিত হয়।
তাদের সমাচার ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন তাদের ওখান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন উরওয়া ইবন মাসউদ সাকাফী তাঁর অনুগমন করেন। রাসূলুল্লাহ্ মদীনায় পৌঁছার আগেই তিনি তাঁকে ধরে ফেলেন এবং তখনই ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সে অবস্থায় তার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: যেমন তার সম্প্রদায়ের লোক বর্ণনা করে থাকে, তারা তোমাকে হত্যা করে ফেলবে।' রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের মাঝে তার প্রতি বিরূপ মনোভাব লক্ষ্য করেছিলেন। কিন্তু উরওয়া বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি তাদের নিকট তাদের প্রথম সন্তান অপেক্ষাও প্রিয়।
ইবন হিশাম বলেন: অন্য বর্ণনায় আছে, আমি তাদের চোখের তাঁরা অপেক্ষাও প্রিয়।
ইবন ইসহাক বলেন: বস্তুতই তিনি তাদের নিকট অত্যন্ত প্রিয় ও মান্যগণ্য লোক ছিলেন। তিনি তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাতে বের হলেন। আশা ছিল তারা তাঁর বিরোধিতা করবে না। তাদের মাঝে নিজের মর্যাদা ও অবস্থানের কথা ভেবেই তিনি এ আশা করেছিলেন।
কিন্তু যখন তিনি নিজের একটি কক্ষ হতে তাদের দিকে মুখ বাড়িয়ে দিলেন এবং নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করে তাদেরকেও সেদিকে আহবান জানালেন, তখন তারা চারদিক হতে তার প্রতি তীর নিক্ষেপ শুরু করে দিল। একটি তীর লক্ষ্যভেদ করলো এবং তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। মালিকের বংশধরগণ মনে করে, তাদেরই একটি লোক তাকে হত্যা করেছিল। তার নাম আওস ইব্‌ন আওফ এবং সে বনূ সালিম ইবন মালিকের লোক। পক্ষান্তরে আহলাফের¹ দাবী হলো, তাঁকে হত্যা করে তাদেরই এক ব্যক্তি। সে ছিল আত্তাব ইবন মালিকের বংশধর এবং নাম ওয়াহাব ইব্‌ন জাবির।
(ইন্তিকালের পূর্বে) উরওয়াকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: আপনি আপনার রক্ত সম্পর্কে কী মনে করেন? তিনি বললেন: এটা একটা সম্মান, যা দিয়ে আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে সম্মানিত করেছেন। এটা শাহাদত, যা আল্লাহ্ তা'আলা আমার দিকে টেনে এনেছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমাদের নিকট হতে চলে যাওয়ার পূর্বে তাঁর সাথের যে সকল লোক শাহাদত লাভ করেছে, তাদেরই একজনরূপে আমি নিজেকে মনে করি। কাজেই তোমরা আমাকে তাদের সাথেই দাফন করো। সুতরাং তাঁকে তাঁদের সাথেই দাফন করা হয়
তারা বলে থাকে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: ان مثله في قومه لكمثل صاحب ياسين في قومه তাঁর সম্প্রদায়ের মাঝে তাঁর দৃষ্টান্ত আপন সম্প্রদায়ের মাঝে ইয়াসীনের² লোকটির দৃষ্টান্ত তুল্য।
উরওয়া (রা)-এর শাহাদতের পরও বনূ সাকীফ কয়েক মাস স্বধর্মে বিদ্যমান থাকে। এরপর তারা এ নিয়ে পরামর্শে বসে। তারা চিন্তা করে দেখলো যে, তাদের চারদিক দিয়ে ঘেরা গোটা আরববাসীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার মত শক্তি তাদের নেই। কাজেই, বশ্যতাস্বীকার করে নেওয়াই সমীচীন। সুতরাং তারা বায়'আত গ্রহণ করলো এবং ইসলামে দীক্ষিত হলো।
আমার নিকট ইয়াকূব ইব্‌ন উতবা ইব্‌ন মুগীরা ইব্‌ন আখনাস (র) বর্ণনা করেন যে, বনু ইলাজের আমর ইবন উমাইয়া কোন এক ঘটনার জেরে আব্দ ইয়ালীল ইব্‌ন আমরের সাথে কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমর ইবন উমাইয়া ছিল আরবের একজন শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান লোক। সে আব্দ ইয়ালীলের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো এবং তার কাছে বলে পাঠাল যে, আমর ইবন উমাইয়া তোমাকে বের হতে বলছে। আব্দ ইয়ালীল বার্তাবাহককে বললো: কী বলছ মিয়া, আমরই কি তোমাকে আমার নিকট পাঠিয়েছে? সে বললো: হ্যাঁ, আর ওই তো তিনি আপনার বাড়ির ভিতর দাঁড়িয়ে আছেন। আব্দ ইয়ালীল বললো: আমি তো এরূপ ধারণা করছিলাম না। আমর তো নিজের প্রাণ রক্ষার ব্যাপারে খুব বেশি যত্নবান। যা হোক আব্দ ইয়ালীল তার কাছে বের হয়ে আসলো এবং তাকে দেখে অভিনন্দন জানালো।
আমর তাকে বললো আমরা এখন যে অবস্থায় উপনীত হয়েছি, সে অবস্থায় পরস্পরে কথাবার্তা বন্ধ রাখা চলে না। এই ব্যক্তির ব্যাপারটি যা দাঁড়িয়েছে, তাতো দেখছ। সারাটা আরব ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাদের সাথে লড়াই করার মত শক্তি তোমাদের নেই। এখন তোমরা কী করবে ভেবে দেখ।
সুতরাং বনু সাকীফ পরামর্শে বসলো। তারা একে অন্যকে বললো: তোমরা কি দেখছ না তোমাদের জানমালের কোন নিরাপত্তা নেই? তোমাদের কোন লোক বের হলে তার সর্বস্ব লুণ্ঠিত হয়ে যায়?
তারা আলাপ-আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এক ব্যক্তিকে পাঠাবে, যেমন উরওয়াকে পাঠিয়েছিল। সেমতে তারা আব্দ ইয়ালীল ইব্‌ন আমর ইবন উমায়রের সাথে কথা বলল। সে ছিল উরওয়া ইবন মাসউদের সমবয়সী। তারা তার কাছে এ প্রস্তাব রাখলো, কিন্তু সে তা গ্রহণ করতে অসম্মতি জানাল। তার আশংকা ছিল, উরওয়া ইবন মাসউদের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে, সে ফিরে আসলে তার প্রতিও একই আচরণ করা হবে।
আব্দ ইয়ালীল বললো: আমি এটা করবার নই, যদি না আমার সাথে আরও কয়েকজনকে পাঠাও। তারা স্থির করলো, তারা তার সাথে আহলাফের দু'জন এবং বনূ মালিকের তিনজন লোক পাঠাবে। এভাবে তাদের সংখ্যা দাঁড়াবে ছয়জন। কাজেই আব্দ ইয়ালীলের সাথে তারা হাকাম ইব্‌ন আম্ম ইব্‌ন ওয়াহাব ইব্‌ন মুআত্তিব, শুরাহবীল ইব্‌ন গায়লান ইব্‌ন সালিমা ইব্‌ন মুআত্তিব, বনূ মালিকের ইয়াসার বংশোদ্ভূত উসমান ইব্‌ন আবুল আস ইব্‌ন বিশর ইব্‌ন আব্দ দুহমান, সালিম ইব্‌ন আওফ বংশোদ্ভূত আওস ইব্‌ন আওফ এবং হারিস বংশোদ্ভূত নুমায়র ইব্‌ন খারাশা ইব্‌ন রবীআকে পাঠালো।
আব্দ ইয়ালীল উপরোক্ত প্রতিনিধি দল নিয়ে যাত্রা করল। সে ছিল তাদের মুখপাত্র এবং সিদ্ধান্তদাতা। সে এই কারণেই তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছিল, পাছে উরওয়া ইব্‌ন মাসউদের মত আচরণ তার সাথেও করা হয়। সে ক্ষেত্রে তায়েফে আপন সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে আসার পর সবাই মিলে পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে পারবে।
তারা যখন মদীনার নিকটবর্তী হলো এবং কানাতে বিরাম নিল, তখন মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা)-এর সঙ্গে তাদের সাক্ষাত হলো। এদিন ছিল তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উট চরানোর পালা। তিনি তাতে নিয়োজিত ছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উট চরাতেন। মুগীরা (রা) যখন তাদেরকে দেখলেন, তখন তাদের আগমনের সংবাদ দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট ছুটে গেলেন এবং উটগুলোকে তাদের কাছে ছেড়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট পৌঁছার আগে আবূ বকর (রা)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাত হলো। তিনি তাঁকে জানালেন যে, বনূ সাকীফের একটি কাফেলা বশ্যতা স্বীকার ও ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে আগমন করেছে। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সমস্ত শর্ত মেনে নেবে। তবে এজন্য তারা তাদের সম্প্রদায়, দেশ ও ধন-সম্পদের নিরাপত্তার পক্ষে একটি নিশ্চয়তা পত্র লিখিয়ে নিতে চায়।
আবূ বকর (রা) মুগীরা (রা)-কে বললো: আমি আল্লাহ্র কসম দিয়ে তোমাকে বলছি, তুমি আমার আগে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট গিয়ে এ সংবাদ জানিও না। আমিই আগে তাঁর কাছে এটা প্রকাশ করব। মুগীরা (রা) তাঁর কথা রাখলেন। তখন আবূ বকর (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে সাক্ষাত করলেন এবং তাঁকে তাদের আগমন বার্তা দিলেন। মুগীরা (রা) চলে গেলেন কাফেলার কাছে। তিনি জুহর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় তাদের সাথেই কাটালেন। এ সময় তিনি তাদের শেখালেন কিভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অভিবাদন জানাবে। কিন্তু তারা জাহিলিয়াতের অভিবাদন রীতিই অনুসরণ করলো। তারা যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হলো, তখন তিনি মসজিদের এক পাশে তাদের জন্য তাঁবু খাটিয়ে দিলেন, যেমন বর্ণনা করা হয়ে থাকে।
খালিদ ইব্‌ন সাঈদ ইব্‌ন আস (রা) তাদের ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মাঝে মধ্যস্থতা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা লিখিয়ে নিল। খালিদ (রা) নিজ হাতে সেটা লিখে দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ হতে তাদেরকে যা-কিছু আহার্য দেওয়া হত, তা খালিদ যতক্ষণ না কিছু আহার করতেন, ততক্ষণ তারা তা স্পর্শ করতো না। অবশেষে তারা ইসলাম গ্রহণ করলো এবং নিরাপত্তানামা লেখার কাজ সমাপ্ত হলো।
তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট যেসব দাবী জানিয়েছিল, তন্মধ্যে একটা এই যে, তাদের দেবী লাতকে যেন তাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্ততঃ তিন বছরের মধ্যে যেন তাকে ধ্বংস করা না হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এটা মানতে অস্বীকার করলেন। শেষে তারা এক বছরের জন্য অবকাশ চাইলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাও অস্বীকার করলেন। অবশেষে, তারা ফিরে যাওয়ার পর কেবল এক মাসের সময় চাইলো, কিন্তু তিনি তাদেরকে নির্দিষ্ট কোন সময় দিতেই রাযী হলেন না। এদ্বারা তাদের উদ্দেশ্য ছিল কিছুকালের জন্য লাতকে ছেড়ে দেওয়া হলে গোয়ার প্রকৃতির লোক, নারী ও বাচ্চাদের থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হবে। তারা চাচ্ছিল না লাতকে ধ্বংস করে তাদের সম্প্রদায়কে সন্ত্রস্ত করে তোলা হোক, যতক্ষণ না তারা সকলে ইসলামে প্রবেশ করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) রাযী হলেন না। তিনি আবু সুফিয়ান ইব্‌ন্ন হাব (রা) ও মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা)-কে লাতের ধ্বংস সাধনের জন্য পাঠিয়ে দিলেন।
তাদের আরও দাবী ছিল, সালাতের বিধান থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হোক এবং তাদের দেব-দেবীদেরকে তাদের হাতে নিধন করতে বাধ্য না করা হোক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমাদের হাতে তোমাদের প্রতিমাদের নিধন করার দায় থেকে তোমাদেরকে অব্যাহতি দিচ্ছি, কিন্তু সালাত থেকে তো অব্যাহতি দিতে পারি না। যে দীনে সালাত নেই, তাতে ভাল কিছু নেই। তারা বললো, হে মুহাম্মদ! আমরা না হয় এটা মেনে নিচ্ছি, যদিও এটা অপমানজনক কাজ।
তারা যখন ইসলাম গ্রহণ করলো এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা লিখে দিলেন, তখন তিনি উসমান ইব্‌ন আবুল আসকে তাদের নেতা নিযুক্ত করে দিলেন। তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে বয়োকনিষ্ঠ, তথাপি তাকে নেতা নিযুক্ত করার কারণ ছিল এই যে, তিনি ইসলামের জ্ঞান লাভ এবং কুরআন শিক্ষার প্রতি তাদের সকলের চেয়ে বেশী উৎসাহী ছিলেন। তাই আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি দেখছি এই যুবক তাদের মধ্যে সবচাইতে বেশি ইসলামী জ্ঞানার্জন ও কুরআন শিক্ষার প্রতি আগ্রহী।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট ঈসা ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন আতিয়্যা ইব্‌ন সুফ্যান ইব্‌ন রবীআ সাকাফী (র) তাদের জনৈক প্রতিনিধি হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: আমরা ইসলাম গ্রহণ করার পর রমাযানের অবশিষ্ট দিনগুলোতে যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে রোযা রাখলাম, তখন তাঁর নিকট হতে বিলাল আমাদের জন্য ইফতার ও সাহরী নিয়ে আসতেন। তিনি যখন সাহরী নিয়ে আসতেন, তখন আমরা বলতাম আমরা তো দেখছি ফজর হয়ে গেছে। তিনি বলতেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সাহরীরত অবস্থায় রেখে এসেছি। তিনি যখন ইফতার নিয়ে আসতেন, তখন আমরা বলতাম এখনও তো সূর্য পুরোপুরি অস্ত যায়নি। তিনি বলতেন: রাসূলুল্লাহ (সা) ইফতার না করা পর্যন্ত আমি তোমাদের নিকট আসিনি। এরপর তিনি পাত্রের ভিতর হাত দিয়ে তা থেকে লোকমা গ্রহণ করতেন।
ইবন হিশাম سحورنا بفطورنا এর স্থলে বলেন سحورنا وفطورنا (অর্থ একই)।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট সাঈদ ইব্‌ন আবূ হিনদ (র) মুতাররিফ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন শিখীর (র) হতে এবং তিনি উসমান ইব্‌ন আবুল আস (রা) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, বনূ সাকীফের নিকট আমাকে প্রেরণকালে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে শেষ উপদেশ এই দিয়েছিলেন:
يا عثمان تجاوز في الصلوة واقدر الناس باضعفهم فان فيهم الكبير والصغير والضعيف وذا الحاجة
'হে উসমান! সালাত সংক্ষেপ করবে। মানুষকে তাদের দুর্বলতম ব্যক্তি দ্বারা বিচার করবে। মনে রাখবে, তাদের মধ্যে বৃদ্ধ, বাচ্চা অসুস্থ ও প্রয়োজনতাড়িত লোক রয়েছে।

টিকাঃ
১. আহ্লাফ: আবদুদদার, জুমাহ, মাখযূম, আদী, কা'ব ও সাহম এই ছয়টি গোত্রকে একত্রে আহ্লাফ অর্থাৎ মিত্র সম্প্রদায় বলা হয়ে থাকে। এরা পরস্পর মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ছিল। আন-নিহায়া, ১খণ্ড, ৪২৫ পৃ.।
২. ইয়াসীনের লোকটি বলে হয়ত সূরা ইয়াসীনে বর্ণিত সেই ব্যক্তিকে বোঝান হয়েছে, যে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল : اتبعو المرسلين তোমরা রাসূলদের অনুসরণ কর'। ফলে, তারা তাকে হত্যা করে। তার নাম চিল হাবীব নাজ্জার। অথবা এর দ্বারা আল-ইয়াসা (আ) কিংবা ইলয়াস ইন্ন ইয়াসীনকে বোঝান হয়েছে। ইয়াস (আ)-কে ইয়াসীনও বলা হয়ে থাকে。

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 লাত নিধন

📄 লাত নিধন


ইবন ইসহাক বলেন: প্রতিনিধি দল তাদের কাজ শেষ করে যখন স্বদেশের উদ্দেশে রওনা হলো, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের সাথে আবু সুফিয়ান ইবন হাব (রা) ও মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা)-কে লাত নিধনের জন্য পাঠালেন। তাঁরা তাদের সাথে মদীনা ত্যাগ করলেন। যখন তায়েফে এসে পৌঁছলেন, তখন মুগীরা (রা) আবূ সুফিয়ান ইব্‌ন হাব (রা)-কে আগে আগে পাঠাতে চাইলেন, কিন্তু আবূ সুফিয়ান (রা) অস্বীকার করলেন এবং বললেন, তোমার সম্প্রদায়ের নিকট তুমিই আগে যাও।
আবু সুফিয়ান তার মালপত্র নিয়ে যুল-হাদমে অপেক্ষা করলেন। মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা) যখন গন্তব্যস্থলে গিয়ে লাতের উপর চড়লেন এবং কুঠার দ্বারা তার উপর আঘাত করতে থাকলেন, তখন তার গোত্র বনূ মুআতিব তাকে রক্ষা করার জন্য চারদিক থেকে ঘিরে রাখলো। তাদের আশংকা ছিল, তাঁর প্রতি তীর নিক্ষেপ করা হতে পারে কিংবা উরওয়া (রা)-এর মত আচরণ তাঁর সাথেও করা হতে পারে। ছাকীফ গোত্রের নারীরা খোলা মাথায় বের হয়ে আসলো। তারা লাতের শোকে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল। তখন তারা বলছিল:
لتبكين دفاع * اسلمها الرضاع لم يحسنوا المصاع
কাঁদো রক্ষাকর্তার জন্য, নীচাশয়েরা তাকে করেছে পরিত্যাগ, তারা করলো না তরবারির সদ্ব্যবহার।
ইন হিশাম বলেন : لتبكين ইবন ইসহাক ব্যতীত অন্য সূত্রে প্রাপ্ত।
ইবন ইসহাক বলেন: মুগীরা (রা) যখন লাতকে কুঠার দ্বারা আঘাত করছিলেন, তখন আবু সুফিয়ান বলছিলেন, واهالك آمالك হায়, হায়! সর্বনাশ!
মুগীরা (রা) লাতকে ধ্বংস করার পর তার ধনরাশি ও অলংকারাদি বের করে নিলেন এবং আবু সুফিয়ানকে খবর দিলেন। অলংকার ছিল বিভিন্ন রকমের। আর ধনরাশি বলতে সোনা ও মণিমুক্তা।
উরওয়া রা)-এর শাহাদতের পর বনূ সাকীফের প্রতিনিধি দলের পূর্বে আবূ মুলায়হ ইব্‌ উরওয়া ও কারিব ইব্‌ন আসওয়াদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বনু সাকীফকে পরিত্যাগ করা এবং চিরদিনের জন্য কোন ব্যাপারে তাদের সাথে একত্র না হওয়া। তারা ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের বলেছিলেন: তোমরা যাকে ইচ্ছা অভিভাবকরূপে গ্রহণ কর। তারা বললো আমরা আল্লাহ্ ও তার রাসূলকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: সেই সাথে তোমাদের মামা আৰু সুফিয়ান ইব্‌ন হাবকেও। তারা বললো আমাদের মামা আবু সুফিয়ান ইব্‌ন হাবকেও।
তায়েফবাসীর ইসলাম গ্রহণ এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক আবু সুফিয়ান ও মুগীরাকে মূর্তি ধ্বংস করার জন্য প্রেরণের পর আবূ মুলায়হ ইব্‌ন উরওয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট আবেদন করলো, যেন প্রতিমার সম্পদ থেকে তার মরহুম পিতার ঋণ শোধ করে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার আবেদন গ্রহণ করলেন। তখন কারিব ইব্‌ন আসওয়াদ বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার পিতা আসওয়াদের ঋণও শোধ করে দিন। উরওয়া (রা) ও আসওয়াদ ছিলেন আপন ভাই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আসওয়াদ তো মুশরিক অবস্থায় মারা গেছে। কারিব বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিন্তু একজন আত্মীয় মুসলিমের প্রতি অনুগ্রহ করুন। এর দ্বারা সে নিজেকে বোঝাচ্ছিল। ঋণ তো এখন আমার উপর। আর আমিই তা পরিশোধের জন্য সাহায্য চাচ্ছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু সুফিয়ানকে নির্দেশ দিলেন, যেন প্রতিমার সম্পদ দ্বারা উরওয়া ও আসওয়াদের ঋণ শোধ করে দেয়।
মুগীরা (রা) প্রতিমার সম্পদ একত্র করে আবু সুফিয়ানকে বললেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমাকে নির্দেশ দিয়েছেন এ মাল দ্বারা উরওয়া ও আসওয়াদের ঋণ শোধ করে দিতে। তিনি তাদের ঋণ শোধ করে দিলেন。

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বনূ সাকীফের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিরাপত্তানামা

📄 বনূ সাকীফের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিরাপত্তানামা


রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের জন্য যে নিরাপত্তানামা লিখে দিয়েছিলেন, তা ছিল নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد النبي رسول الله الى المؤمنين ان عضاه وج وصيده لا يعضد من وجد يفعل شيئا من ذلك فانه يجلد وتنزع ثيابه فان تعدى ذلك فانه يؤخذ فيبلغ به النبي محمد وان هذا امر النبي محمد رسول الله .
"দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে আল্লাহর রাসূল, নবী মুহাম্মাদের পক্ষ হতে মু'মিনদের জন্য। ওয়াজ্জ¹-এর গাছপালা ও জীব জানোয়ারের কোন ক্ষতিসাধন করা যাবে না। কেউ তা করলে তাকে কশাঘাত করা হবে এবং তার পোশাক খুলে নেওয়া হবে। পুনরাবৃত্তি করলে তাকে ধরে নবী মুহাম্মদের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এটা আল্লাহর রাসূল, নবী মুহাম্মাদের নির্দেশ।"
খালিদ ইব্‌ন সাঈদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশে লেখেন: মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশ কেউ লংঘন করবে না। যে করবে, সে তার নিজের উপরই জুলুম করবে。

টিকাঃ
১ ওয়াজ্‌জ: তায়েফের একটি স্থানের নাম।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবূ বকর (রা)-এর নেতৃত্বে হজ্জ পালন

📄 আবূ বকর (রা)-এর নেতৃত্বে হজ্জ পালন


ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) রমযানের বাকী দিনগুলো, শাওয়াল ও যুলকাদা মাস কোথাও বের হলেন না। পরে তিনি আবূ বকর (রা)-কে ৯ম হিজরীর হজ্জের আমীর বানিয়ে পাঠান, যাতে তিনি মুসলিমদের হজ্জ অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন। মুশরিকরা তখনও তাদের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী হজ্জ পালন করত। আবূ বকর (রা) মুসলিমদের সাথে নিয়ে হজ্জের জন্য যাত্রা করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00