📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 তাবুক যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনকালে মসজিদ-ই যিরার প্রসংগ

📄 তাবুক যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনকালে মসজিদ-ই যিরার প্রসংগ


ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। যূ-আওয়ান নামক স্থানে পৌঁছে তিনি বিশ্রাম নিলেন। এটা মদীনার হতে এক প্রহরের ব্যবধানে অবস্থিত একটি শহর। তিনি যখন তাবুক যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন মসজিদ-ই যিরারের উদ্যোক্তরা তাঁর নিকট এসে আরয করেছিল: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা অসুস্থ, অভাবগ্রস্ত, বর্ষা রাত ও শৈত্য রজনীর জন্য একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের ইচ্ছা আপনি এসে মসজিদটি উদ্বোধন করে দিন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : انى على جناح سفر وحال شغل আমি একটি সফরের মুখোমুখী এবং অত্যন্ত ব্যস্ত। কিংবা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এমনই কিছু বলেছিলেন। তারপর বললেন: অভিযান শেষে যদি ফিরে আসি, তা হলে ইনশাআল্লাহ্ তোমাদের ওখানে যাব এবং সে মসজিদে তোমাদের নিয়ে সালাত আদায় করবো।
ইবন ইসহাক বলেন তিনি যখন যু-আওয়ানে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তখন তাঁর নিকট মসজিদ-ই যিরারের সংবাদ পৌঁছলো। তিনি বনূ সালিম ইব্‌ন আওফের মালিক ইব্‌ন দুষ্টুম এবং বনু আজলানের মান ইব্‌ন আদী অথবা তার ভাই আসিম ইব্‌ন আদীকে ডেকে বললেন: তোমরা এই জালিমদের মসজিদে যাও এবং মসজিদটি ধ্বংস কর ও জ্বালিয়ে দাও।
তাঁরা দু'জন দ্রুত বের হয়ে পড়লেন। যখন মালিক ইব্‌ন দুখশুমের গোত্র বনূ সালিম ইব্‌ন আওফে এসে পৌঁছলেন, তখন মালিক (রা) মা'ন (রা)-কে বললেন: একটু অপেক্ষা কর। আমি বাড়ি থেকে আগুন নিয়ে আসি। তিনি বাড়ি গিয়ে খেজুর গাছের বাকলে আগুন ধরিয়ে নিয়ে আসলেন। এরপর উভয়ে ছুটে চললেন। তারা মসজিদের ভেতরে ঢুকে তাতে আগুন লাগিয়ে দিলেন এবং মসজিদ ধ্বংস করলেন। তখন অপরাধীচক্র মসজিদের ভিতরে ছিল। তারা সবাই ছত্রভংগ হয়ে গেল। তাদের সম্পর্কে কুরআন মাজীদের এ আয়াত নাযিল হয়:
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدا ضراراً وكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ
'যারা মসজিদ নির্মাণ করেছে ক্ষতিসাধন, কুফরী ও মু'মিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে" (৯: ১০৭)।
এ মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেছিল বারজন লোক। নিম্নে তাদের পরিচয় দেওয়া হলো:
খিযাম ইব্‌ন খালিদ। সে ছিল বনূ আমর ইব্‌ন আওফের শাখা বনু উবায়দ ইব্‌ন যায়দের লোক। বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তৈরি মসজিদটি তার বাড়িতেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
সা'লাবা ইব্‌ন হাতিব। সে ছিল বনূ উমাইয়া ইন্ন যায়দের লোক।
মু'আত্তিব ইব্‌ন কুশায়র। সে ছিল বনু দুবায়'আ ইবন যায়দের লোক।
আবূ হাবীবা ইব্‌ন আয'আর। সেও ছিল বনূ দুবায়'আ, ইন্ন যায়দের একজন।
সাহল ইবন হুনায়ফের ভাই আব্বাদ ইব্‌ন হুনায়ফ। সে ছিল বনূ আমর ইব্‌ন আওফের লোক।
জারিয়া ইন্ন আমির, তার দুই পুত্র মুজাম্মি' ইব্‌ন জারিয়া ও যায়দ ইব্‌ন জারিয়া এবং নাবতাল ইবন হারিস। এরা ছিল দুবায়'আ গোত্রের লোক।
বাহ্যাজ, বিজাদ ইবন উসমান। এরাও দুবায়'আ গোত্রের লোক ছিল।
ওয়াদী'আ ইব্‌ন সাবিত। সে ছিল আবু লুবাবা ইব্‌ন আবদুল মুনযিরের গোত্র বনু উমাইয়া ইবন যায়দের একজন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মসজিদসমূহ

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মসজিদসমূহ


মদীনা ও তাবুকের মাঝে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মসজিদসমূহ ছিল সুবিদিত ও নির্দিষ্ট নামে খ্যাত। সেগুলো নিম্নরূপ, তাবৃকে একটি মসজিদ, সানয়াতুল-মাদারানে একটি মসজিদ, যাতুয-বিরাবে একটি মসজিদ, আল-আখদাবে একটি মসজিদ, যাতুল-খিতামীতে একটি মসজিদ, আলা'তে একটি মসজিদ, বাতরা'র প্রান্তে একটি মসজিদ, যানু কাওয়াকিবে একটি মসজিদ, অশ-শিকে একটি মসজিদ, এটা ছিল তারা-র অন্তর্গত শিক্ক। যুল-জীফায় একটি মসজিদ, সাদূর হাওয়ায় একটি মসজিদ, আল-হিজরে একটি মসজিদ, আস-সাঈদে একটি মসজিদ, আল-ওয়াদীতে একটি মসজিদ, বর্তমানে যার নাম ওয়াদী'ল-কুরা। আশ-শিক্কার অন্তর্গত আর রুক'আতে একটি মসজিদ। এ শিক্কা ছিল বনূ উযরার বাসভূমি। যুল মারওয়ায় একটি মসজিদ, ফায়ফাতে একটি মসজিদ এবং যূখুশুবে একটি মসজিদ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 যাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল তাদের এবং অজুহাত প্রদর্শনকারীদের বৃত্তান্ত

📄 যাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল তাদের এবং অজুহাত প্রদর্শনকারীদের বৃত্তান্ত


এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় ফিরে আসলেন। একদল মুনাফিক এ যুদ্ধ হতে পেছনে ছিল। সেই সাথে তিনজন মুসলিমও পিছিয়ে ছিলেন, তবে তাদের মনে কোনও সন্দেহ ও কপটতা ছিল না। তাঁরা হচ্ছেন কা'ব ইবন মালিক (রা), মুরা ইবন রাবী (রা) ও হিলাল ইব্‌ন উমাইয়া (রা)।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) অপরাপর সাহাবীদের বললেন: তোমরা এই তিনজনের সঙ্গে কিছুতেই কথা বলবে না।
যেসব মুনাফিক পেছনে ছিল, তারা তাঁর কাছে এসে কসম করে করে অজুহাত দেখাতে লাগলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে উপেক্ষা করলেন। আল্লাহ্ তা'আলা এবং তাঁর রাসূল তাদের দেখানো অজুহাত গ্রহণ করলেন না। মুসলমানরা এ তিন ব্যক্তির সংগে কথাবার্তা বন্ধ করে দেন।
ইবন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্‌ন মুসলিম ইন্ন শিহাব যুহরী (র) আবদুর রহমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন কা'ব ইবন মালিক (রা) হতে বর্ণনা করেন যে, তার পিতা আবদুল্লাহ্ ছিলেন তাঁর পিতার চালক, যখন তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন: আমি আমার পিতা কা'ব ইবন মালিক (রা)-কে তাবুক যুদ্ধে তার পিছিয়ে থাকাজনিত বৃত্তান্ত এবং তাঁর অপর দুই সাথীরও বৃত্তান্ত বর্ণনা করতে শুনেছি। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা) যে সব অভিযান চালিয়েছেন তার কোনওটিতে আমি পিছিয়ে থাকিনি। তবে বদরযুদ্ধে আমি শরীক হইনি। আর সেটা ছিল এমন যুদ্ধ, যাতে শরীক না হওয়ার কারণে আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল (সা) কাউকে তিরস্কার করেননি। তার কারণ রাসূলুল্লাহ্ (সা) আসলে কুরায়শ-কাফেলার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। কোনরূপ পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর ও তাঁর শত্রুদের মুখোমুখি করে দেন।
আমি আকাবায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে হাযির ছিলাম, যখন আমরা ইসলামে প্রতিষ্ঠিত থাকার অংগীকার তাঁকে দিয়েছিলাম। বদরের যুদ্ধকে আমি আকাবার সে বায়আতের উপর প্রাধান্য দিতে পসন্দ করি না, যদিও তার চাইতে মানুষের নিকট বদর যুদ্ধই বেশি প্রসিদ্ধ ও আলোচিত।
কা'ব ইবন মালিক (রা) বলেন: তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হতে আমি যে পিছিয়ে ছিলাম তার বৃত্তান্ত ছিল এই যে, প্রকৃতপক্ষে তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালেই আমি যত সচ্ছল ও সমর্থ ছিলাম, তেমন আর কখনও ছিলাম না। আল্লাহর কসম! দু' দুটি সওয়ারীর ব্যবস্থা আমার কখনই ছিল না, কিন্তু এই যুদ্ধে ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যে কোনও অভিযান চালাতেন মানুষকে দেখাতেন তার বিপরীত দিক। অবশেষে আসল তাবুকের যুদ্ধ। সময়টা ছিল প্রচণ্ড গরমের। তিনি বহু দূর সফরের সংকল্প করেছেন। যে শত্রুর বিরুদ্ধে এ অভিযান, বিশাল তাদের বাহিনী। তিনি মানুষের নিকট তাদের বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, যাতে তারা এজন্য ভাল করে প্রস্তুতি নিতে পারে। তিনি কোন দিকে যাত্রা করবেন তাও সকলকে জানিয়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অনুসারী মুসলিমদের সংখ্যা ছিল অনেক। কোন এক রেজিস্টারে তাদের স্থান সংকুলান হওয়া সম্ভব ছিল না।
কা'ব (রা) বলেন: মুষ্টিমেয় যেসব লোক অনুপস্থিত থাকতে চেয়েছিল তাদের ধারণা ছিল, আল্লাহ্র পক্ষ হতে ওহী নাযিল না হলে তাদের অনুপস্থিতির কথা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট গোপনই থাকবে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন এ অভিযানটি চালান, তখন ছিল গাছের ফল তোলার সময়। গাছের ছায়াই ছিল তখন সকলের প্রিয়। কাজেই লোকেরা সেদিকেই আকৃষ্ট হলো। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং মুসলিমগণ প্রস্তুতি নিয়ে ফেললেন। আমি তাদের সংগে তৈরি হতে গিয়েও আবার বিরত থাকি, কাজ শেষ করি না। আমার ধারণা ছিল, যখন ইচ্ছা তখনই আমি এটা করতে পারব। এভাবে আমার আলস্য দীর্ঘায়িত হতে থাকলো। ওদিকে সকলের প্রস্তুতিপর্ব শেষ হয়ে গেল। একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যাত্রা শুরু করলেন এবং মুসলিমগণও তাঁর সংগে, কিন্তু আমার প্রস্তুতি তখনও শেষ হয়নি। মনে মনে বললাম: এক দু' দিনের ভেতরই প্রস্তুত হয়ে যাব, এরপর তাদের সংগে মিলিত হবো। তাঁরা চলে যাওয়ার পর আমি প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তৈরি হলাম। কিন্তু আবার বিরত হলাম, কিছুই শেষ করতে পারলাম না। পরে আবার শুরু করলাম, কিন্তু কিছু শেষ না করেই বিরত হলাম। আমার এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হতে থাকলো তারাও দ্রুত এগিয়ে চললেন এবং আমার আয়ত্তের বাইরে চলে গেলেন। ইচ্ছা করলাম, যাত্রা শুরু করে দেব এবং তাদের ধরে ফেলব। হায়, তখনও যদি তা করতাম। কিন্তু আমি তা করলাম না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) চলে যাওয়ার পর আমি যখন বাড়ি থেকে বের হতাম, তখন যাদের সম্পর্কে নিফাক ও কপটতার অভিযোগ ছিল, তাদের ছাড়া আর কাউকেই দেখতাম না। কিংবা দেখা যেত এমন দু' চারজন লোক, যারা দুর্বল হওয়ার কারণে আল্লাহ্ তা'আলাই তাদেরকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
তাবুক পৌঁছার পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমার কথা উল্লেখ করলেন না। তাবুকে তিনি যখন মুসলিমদের মাঝে উপবিষ্ট, তখন তিনি প্রথম মুখ খুললেন। বললেন: কা'ব ইবন মালিকের কী খবর? বনূ সালিমার এক ব্যক্তি বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! তাকে তার দামী পোশাক এবং গর্বিত চাল-চলনই আটকে রেখেছে? এ কথা শুনে মু'আয ইব্‌ন জাবাল তাকে বললেন: তুমি নেহাত মন্দ বলেছ! ইয়া রাসূলাল্লাহ্। আল্লাহ্র কসম, আমরা তাকে তো ভালই জানি। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) চুপ করে থাকলেন।
যখন আমি সংবাদ পেলাম যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাবুক হতে (ফেরত) রওনা হয়ে গেছেন, তখন আমার অনুতাপ জেগে উঠলো। একবার অসত্যের কল্পনা করলাম এবং মনে মনে চিন্তা করতে লাগলাম, কী উপায়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ক্রোধ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করব! স্থির করলাম, এ ব্যাপারে আমার খান্দানের বিবেকবান ব্যক্তিদের সাহায্য নেব। যখন বলা হলো, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনার নিকটে পৌঁছে গেছেন, তখন আমার অন্তর থেকে সব অসত্য দূর হয়ে গেল। উপলব্ধি করলাম যে, সত্য ছাড়া আমার মুক্তি নেই। কাজেই সত্য বলাই স্থির করলাম।
সকালে তিনি মদীনায় পৌঁছে গেলেন। তাঁর নিয়ম ছিল, কোনও সফর হতে ফিরে আসলে প্রথমে মসজিদে প্রবেশ করতেন এবং দু' রাক'আত সালাত আদায় করতেন। এরপর তিনি সকলকে নিয়ে বসতেন। এদিনও তিনি যখন এরূপ বসলেন, তখন যারা যুদ্ধে অশগ্রহণ করেনি, তারা এসে তাঁর কাছে শপথ করে অজুহাত পেশ করতে লাগলো। এদের সংখ্যা ছিল আশিজনেরও বেশি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের অজুহাত ও শপথ গ্রহণ করে নেন এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আর তাদের অন্তরের গোপন বিষয়কে আল্লাহর উপর ন্যস্ত করেন।
অবশেষে আমি আসলাম এবং তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি ক্রোধমিশ্রিত হাসি দিলেন। এরপর তিনি আমাকে বললেন : এদিকে এসো। আমি হেঁটে হেঁটে তার সামনে গিয়ে বসে পড়লাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন : অভিযানে শরীক হলে না কেন? তুমি কি বাহন কিনেছিলে না? আমি বললাম : ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি যদি আপনি ছাড়া দুনিয়ার আর কারও সামনে বসতাম, তা হলে কোন মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে তার ক্রোধ থেকে বেঁচে যেতাম। যুক্তি-তর্কের যোগ্যতা আমার প্রচণ্ড। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! আমি জানি, আজ যদি আমি আপনার নিকট কোন মিথ্যা কথা বলি এবং তাতে আপনি খুশীও হয়ে যান, আল্লাহ্ তা'আলা তো আমাকে ছাড়বেন না। তিনি আপনাকে আমার উপর অসন্তুষ্ট করে তুলবেন। পক্ষান্তরে, সত্য কথা বলে দিলে আপনি অসন্তুষ্ট হবেন ঠিক, কিন্তু পরিণামে আল্লাহর পক্ষ হতে আমি সন্তুষ্টির আশা রাখি। আল্লাহর কসম! আমার কোন ওজর ছিল না। আল্লাহর শপথ! এ জিহাদে আপনার সংগে অংশ গ্রহণ না করে পিছিয়ে থাকার সময় আমি যতটা সবল ও সচ্ছল ছিলাম, ততটা আর কখনও ছিলাম না।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : আমি এ ব্যক্তিকে সত্যবাদী বলেই মনে করি। ঠিক আছে, উঠে যাও। তোমার ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা কী ফয়সালা করেন, তার অপেক্ষা কর।
তখন আমি উঠে গেলাম। বনূ সালিমার অনেক লোক আমার সাথে উঠল এবং আমার পেছনে পেছনে আসতে লাগলো। তারা বললো : আল্লাহ্র কসম! ইতোপূর্বে তুমি কোন অপরাধ করেছ বলে আমরা জানি না। অন্যরা পেছনে থাকার যেমন অজুহাত পেশ করেছে, তেমনিভাবে তুমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট একটা অজুহাত দেখাতে পারলে না? রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ক্ষমা প্রার্থনাই তোমার অপরাধ মোচনের জন্য যথেষ্ট হতো।
কা'ব (রা) বলেন : আল্লাহ্র কসম! তারা এভাবে আমার পেছনে লেগে থাকলো যে, শেষ পর্যন্ত আমি মনস্থির করলাম, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে গিয়ে নিজেকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করব। এরপর আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম: আমার মত অবস্থা আর কারুর হয়েছে কি? তারা বললো: হ্যাঁ। আরও দুইজন লোক তোমার মতই বলেছে এবং তাদেরকেও একই উত্তর দেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম: তারা কারা? তারা বললো: মুরারা ইব্‌ন রাবী আমরী বন্ আমর ইব্‌ন আওফের লোক এবং হিলাল ইব্‌ন আবূ উমাইয়া ওয়াকিফী। বস্তুত তাঁরা আমার নিকট দু'জন নেক্কার ব্যক্তিরই নাম বলল। তাদের মাঝে আদর্শ আছে। তাদের কথা শুনে আমি চুপ করে গেলাম। যারা পেছনে রয়ে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে আমাদের এই তিনজনের সাথে অন্যদের কথাবার্তা বলতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিষেধ করে দিলেন। কাজেই সকলে আমাদের থেকে দূরে থাকতে লাগল। আমাদের ক্ষেত্রে তারা অন্য মানুষ হয়ে গেল। এমন কি আমার জন্য পৃথিবীটাই সম্পূর্ণ অপরিচিতি হয়ে গেল। এতদিন যে পৃথিবীকে চিনতাম, এ যেন তা নয়। এভাবে পঞ্চাশ দিন কাটালাম।
আমার সাথীদ্বয় দুর্বল হয়ে পড়লো। তারা ঘরের মধ্যে দিনাতিপাত করতে লাগলো। আমি ছিলাম গোত্রের মধ্যে সবচাইতে নওজোয়ান ও সবল ও সমর্থ ব্যক্তি। কাজেই আমি 'বাড়ির বাইরে যেতাম এবং মুসলিমদের সাথে সালাতে শরীক হতাম। বাজারেও ঘোরাফেরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলত না। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট হাযির হতাম। তাকে সালাম দিতাম। তখন তিনি সালাত আদায় শেষে মজলিসে বসা থাকতেন। মনে মনে বলতাম: তিনি কি আমার সালামের জবাবে ওষ্ঠদ্বয় নেড়েছেন? এরপর তাঁর নিকটে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতাম। গোপনে লক্ষ্য করতাম যে, আমি যখন সালাতে লিপ্ত হই, তখন তিনি আমার দিকে তাকান, আর যখন আমিও তাঁর দিকে লক্ষ্য করি, তখন তিনি চোখ ফিরিয়ে নেন। এভাবে মুসলিমদের কঠোর আচরণের দরুন আমার এ দুরবস্থা যখন দীর্ঘায়িত হলো, তখন একদিন আমি আবু কাতাদার বাগানের কাছে চলে গেলাম এবং তাঁর প্রাচীরে উঠে দাঁড়ালাম। আবু কাতাদা ছিলেন আমার চাচাত ভাই এবং আমার সর্বাপেক্ষা প্রিয় ব্যক্তি। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। আল্লাহর কসম! কিন্তু সে আমার সালামের জবাব দিল না। আমি বললাম: হে আবু কাতাদা! আমি আল্লাহর কসম দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, তুমি কি জান না, আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি? সে চুপ করে রইলো। আমি আবারও তাকে শপথ দিয়ে সে কথা জিজ্ঞাসা করলাম। এবারও সে চুপ করে রইলো। আবারও তাকে শপথ দিয়ে একই কথা জিজ্ঞাসা করলাম। এবারও যে চুপ করে থাকলো। চতুর্থবার যখন শপথ দিয়ে সে কথাটিই বললাম, তখন সে বললো: আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। একথা শুনে আমার চোখ অশ্রুসজল হলো। আমি দেওয়াল টপকে চলে আসলাম। এরপর আমি বাজারে গেলাম। বাজারের রাস্তায় রাস্তায় আমি যখন ঘুরছি, সহসা দেখি শাম থেকে আগত এক 'নাবাতী' আমাকে খোঁজ করছে। সে মদীনায় খাদ্য-সামগ্রী বিক্রয় উপলক্ষ্যে এসেছিল। সে বলছিল: কেউ কি কা'ব ইব্‌ন মালিককে দেখিয়ে দিতে পারে? লোকেরা আমার দিকে ইঙ্গিত করলো। সে আমার কাছে আসলো। আমার হাতে একটি রেশমী চিঠি দিল। চিঠিটি গাস্সানের রাজার দেখা। তাতে সে লিখেছিল:
اما بعد فانه قد بلغنا ان صاحبك قد جفاك ولم يجعلك الله بدار هوان ولا مضيعة فالحق بنا نواسك .
"আমরা জানতে পারলাম, তোমার নেতা তোমার প্রতি জুলুম করেছে। আল্লাহ্ তা'আলা তো তোমাকে কোন অপমান ও ক্ষতিকর স্থানের জন্য সৃষ্টি করেননি। কাজেই তুমি আমাদের দেশে চলে এসো। আমরা তোমাকে সাহায্য করব।"
কা'ব (রা) বলেন: চিঠিটি পড়ে আমি উপলব্ধি করলাম। এটাও আমার জন্য এক পরীক্ষা। আমার এ দুরবস্থার কারণে একজন মুশরিক পর্যন্ত আমার দ্বারা ফায়দা লুটতে চাচ্ছে। কাজেই, আমি চিঠিটি নিয়ে চুলার কাছে গেলাম এবং অগ্নিশিখার মাঝে তা নিক্ষেপ করলাম।
এ অবস্থায় আমাদের দিন কাটতে থাকলো। পঞ্চাশ দিনের চল্লিশ দিন পার হয়ে গেল। সহসা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একজন বার্তাবাহক আমার কাছে আসলো এবং আমাকে বললো: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমাকে তোমার স্ত্রী হতে পৃথক থাকতে বলেছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম: তাকে কি তালাক দিয়ে দেব। না অন্য কিছু করবো? সে বললো না, বরং তুমি তার থেকে আলাদা থাকবে, তার নিকটে যাবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমার অপর দুই সঙ্গীর কাছেও অনুরূপ নির্দেশ পাঠালেন।
আমি আমার স্ত্রীকে বললাম: তুমি তোমার বাপের বাড়ি চলে যাও। যতক্ষণ না আল্লাহ্ তা'আলা আমার ব্যাপারে কোনও ফয়সালা করেন, ততদিন সেখানেই থাক।
কা'ব (রা) বলেন: হিলাল ইবন উমাইয়া (রা)-এর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট গিয়ে আরয করলোঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! হিলাল ইবন উমাইয়া একজন অতিশয় বৃদ্ধ মানুষ। সে তো মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তার কোন খাদিমও নেই। আমি তার খিদমত করলে আপনি কি অপসন্দ করবেন? তিনি বললেন না, তবে সে যেন তোমার সাথে মিলিত না হয়। সে বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার প্রতি সে চাহিদা তার বাকী নেই। আল্লাহ্র কসম! যেদিন থেকে সে এ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত সে অবিরাম কেঁদেই চলেছে। আমার তো "আশংকা হয়, তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যাবে।
কা'ব (রা) বলেন: আমার খান্দানের কিছু লোক আমাকে বললো, তুমি যদি তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে অনুমতি চাইতে, তা হলে তিনি হয়ত অনুমতি দিতেন। তিনি তো হিলাল ইবন উমাইয়ার স্ত্রীকে তার স্বামীর খিদমত করার অনুমতি দিয়েছেন। আমি বললাম: আল্লাহ্র কসম! তাঁর নিকট এরূপ অনুমতি আমি চাইতে পারব না। কি জানি স্ত্রীর ব্যাপারে অনুমতি চাইতে গেলে তিনি আমাকে কী উত্তর দেন। কারণ আমি তো পূর্ণ যুবক। এরপর আমাদের আরও দশদিন অতিবাহিত হলো। যেদিন থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের সাথে মুসলিমদের কথাবার্তা বলতে নিষেধ করেছেন, এর পঞ্চাশ দিন পার হয়ে গেল। পঞ্চাশতম দিনের ফজরের সালাত আমি আমার একটি ঘরের ছাদে আদায় করলাম। তখন আমার অবস্থা আল্লাহ্ তা'আলার বর্ণনা অনুযায়ী এই দিন যে, প্রশস্ত পৃথিবী আমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেছে, প্রাণ সংকুচিত হয়ে গেছে। আমি সালা পাহাড়ের উপর একটি তাঁবু খাঁটিয়ে সেখানে থাকতাম। হঠাৎ শুনতে পেলাম সেই, পর্বতশীর্ষ থেকে এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলছে: হে কা'ব ইবন মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ কর। এ কথা শোনামাত্র আমি সিজদায় লুটিয়ে পড়লাম এবং বুঝাতে পারলাম আমার দুঃখের অবসান হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) ফজরের সালাত আদায়ের পর মানুষকে জানিয়ে ছিলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের তওবা কবুল করেছেন। লোকেরা আমাদের সুসংবাদ দেওয়ার জন্য ছুটে আসলো। আমার দুই বন্ধুর নিকট একদল সুসংবাদবাহী চলে গেল। একজন লোক আমার দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে এলো। আসলাম গোত্রের একজন লোক দৌঁড়ে গিয়ে পাহাড়ে চড়লো। আওয়ায ছিল ঘোড়ার চেয়ে বেশী দ্রুতগামী। যে ব্যক্তি আমাকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য এসেছিল, আমি আনন্দের আতিশয্যে আমার কাপড়ে দু'টি খুলে তাঁকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহ্হ্ কসম! আমার কাছে তখন সে কাপড় দু'টি ছাড়া আর কোন কাপড় ছিল না। কাজেই আমি দু'টি কাপড় ধার করে পরিধান করলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লাম। পথে লোকেরা আমাকে তওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদ দিয়ে অভিবাদন জানাল। তাঁরা বলছিল : ليهنك توبة الله عليك 'আল্লাহ্ তোমার তওবা কবুল করার অভিনন্দন গ্রহণ কর'। এভাবে যেতে যেতে আমি মসজিদে ঢুকে পড়লাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) একদল সাহাবী-বেষ্টিত ছিলেন। তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ্ আমাকে দেখামাত্রই আমার দিকে ছুটে আসলেন এবং আমাকে অভিবাদন জানালেন ও অভিনন্দন জ্ঞাপন করলেন। আল্লাহ্র কসম! তিনি ছাড়া আর কোন মুহাজির আমার দিকে এগিয়ে আসেনি। বর্ণনাকারী বলেন: কা'ব ইবন মালিক (রা) তালহা (রা)-এর এই সৌজন্য কখনও ভুলতে পারেননি।
কা'ব (রা) বলেন: আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সালাম দিলাম, তখন তিনি হর্ষোজ্জ্বল মুখে আমাকে বললেন :
ابشر بخير يوم مر عليك منذ ولدتك امك 'তোমার জন্মদিন থেকে অদ্যকার পর্যন্ত শ্রেষ্ঠতম দিনের সুসংবাদ গ্রহণ কর।'
আমি বললাম: এটা কি আপনার পক্ষ হতে ইয়া রাসূলাল্লাহ্! নাকি আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: বরং আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষে হতে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খুশি হতেন, তখন তাঁর পবিত্র চেহারাকে মনে হতো একটি চাঁদের টুকরা। আমরা তাঁর চেহারা দেখে সে খুশি আঁচ করতে পারতাম। আমি তাঁর সামনে বসে বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্ তা'আলার নিকট আমার তাওবার অংশ হিসাবে আমি আমার যাবতীয় সম্পত্তি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পথে সাদকা করতে চাই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: কিছু সম্পদ বাকি রাখ, এটা তোমার জন্য শ্রেয়। আমি বললাম: খায়বরে আমি যে অংশ লাভ করেছিলাম, সেটা বাকি রাখলাম।
আমি আরও বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে সততার বদৌলতে মুক্তি দিয়েছেন। আমার তওবার অংশ হিসাবে আমি প্রতিশ্রুতি করলাম, যত দিন বেঁচে থাকবো, ততদিন সত্য কথা বলবো।
কা'ব (রা) বলেন: আল্লাহ্র কসম! আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট সত্য প্রকাশ করি, তখন থেকে এ পর্যন্ত সত্যের ব্যাপারে আমার চেয়ে উত্তম পরীক্ষা আল্লাহ্ তা'আলা আর কারও নিয়েছেন বলে আমি জানি না। আল্লাহ্র কসম। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট যে প্রতিশ্রুতি করার পর আজ পর্যন্ত আমি কখনও কোন মিথ্যা কথা বলার ইচ্ছা করিনি। আশাকরি ভবিষ্যতেও আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে হিফাযত করবেন।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
لَقَدْ تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيعُ قُلُوبُ فَرِيقٌ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ - وَعَلَى الثُّلُثَةِ الَّذِينَ خُلَفُوا (حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَا مَلْجَا مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ - يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُو اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مع الصادقين .
"আল্লাহ্ অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা তার অনুসরণ করেছিল সংকটকালে, এমন কি যখন তাদের একদলের চিত্ত-বৈকল্যের উপক্রম হয়েছিল। পরে আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমা করলেন; তিনি তাদের প্রতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিন জনকেও, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল (যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য তা সংকুচিত হয়েছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিল এবং তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নেই। পরে তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হলেন। যাতে তারা তওবা করে। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও” (৯ : ১১৭-১১৯)।
কা'ব (রা) বলেন: আল্লাহর কসম! আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে ইসলামের প্রতি পথ-নির্দেশ করার পর এমন কোন অনুগ্রহ আমার উপর করেননি, যেটা আমার নিকট রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে সত্য কথা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। আল্লাহ্ মেহেরবানী যে, সেদিন আমি তার নিকট মিথ্যা কথা বলিনি। তা হলে মিথ্যাবাদীরা যেভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, তেমনি আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম। কেননা, মিথ্যাবাদীদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা ওহী নাযিল করে যে মন্তব্য করেছেন, তা কোন ব্যক্তি সম্পর্কে কঠোরতম উক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ের।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
سَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَكُمْ إِذَا انْقَلَبْتُمْ إِلَيْهِمْ لِتُعْرِضُوا عَنْهُمْ فَاعْرِضُوا عَنْهُمْ إِنَّهُمْ رِجْسٌ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ جَزَاء بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ يَحْلِفُونَ لَكُمْ لِتَرْضُوا عَنْهُمْ فَإِنْ تَرْضَوا عَنْهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ .
'তোমরা তাদের নিকট ফিরে আসলে তারা আল্লাহর নামে শপথ করবে যাতে তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর। সুতরাং তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা করবে, তারা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ জাহান্নাম তাদের আবাসস্থল। তারা তোমাদের নিকট শপথ করবে, যাতে তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হও; তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হলেও আল্লাহ্ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি তুষ্ট হবেন না' (৯: ৯৫-৯৬)।
কা'ব (রা) বলেন: যেসব লোক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট শপথ করতঃ অজুحات প্রদর্শন করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের, অজুحات গ্রহণ করে তাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন, তাদের থেকে আমাদের তিনজনের বিষয়টি স্থগিত রাখা হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আপততঃ মূলতবী রাখেন। অবশেষে আল্লাহ্ তা'আলা যে ফয়সালা করার তা করলেন। এজন্যই আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন : وَعَلَى الثَّلْنَة الَّذِينَ خُلِفُوا - অর্থাৎ 'যে তিনজনের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল। এস্থলে خلفوا দ্বারা আমাদের যুদ্ধ হতে পিছিয়ে থাকা বোঝান হয়নি; বরং যেসব লোক শপথের মাধ্যমে অজুহাত প্রদর্শন করে এবং তাদের সে অজুহাত গৃহীত হয়, তাদের থেকে আমাদের সিদ্ধান্তকে স্থগিত ও পিছিয়ে রাখাই বোঝান হয়েছে।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দল ও তাদের ইসলাম গ্রহণের বিবরণ

📄 সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দল ও তাদের ইসলাম গ্রহণের বিবরণ


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাবুক হতে রমযান মাসে মদীনায় ফিরে আসেন। এ মাসেই তাঁর নিকট সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দল উপস্থিত হয়।
তাদের সমাচার ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন তাদের ওখান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন উরওয়া ইবন মাসউদ সাকাফী তাঁর অনুগমন করেন। রাসূলুল্লাহ্ মদীনায় পৌঁছার আগেই তিনি তাঁকে ধরে ফেলেন এবং তখনই ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সে অবস্থায় তার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: যেমন তার সম্প্রদায়ের লোক বর্ণনা করে থাকে, তারা তোমাকে হত্যা করে ফেলবে।' রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের মাঝে তার প্রতি বিরূপ মনোভাব লক্ষ্য করেছিলেন। কিন্তু উরওয়া বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি তাদের নিকট তাদের প্রথম সন্তান অপেক্ষাও প্রিয়।
ইবন হিশাম বলেন: অন্য বর্ণনায় আছে, আমি তাদের চোখের তাঁরা অপেক্ষাও প্রিয়।
ইবন ইসহাক বলেন: বস্তুতই তিনি তাদের নিকট অত্যন্ত প্রিয় ও মান্যগণ্য লোক ছিলেন। তিনি তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাতে বের হলেন। আশা ছিল তারা তাঁর বিরোধিতা করবে না। তাদের মাঝে নিজের মর্যাদা ও অবস্থানের কথা ভেবেই তিনি এ আশা করেছিলেন।
কিন্তু যখন তিনি নিজের একটি কক্ষ হতে তাদের দিকে মুখ বাড়িয়ে দিলেন এবং নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করে তাদেরকেও সেদিকে আহবান জানালেন, তখন তারা চারদিক হতে তার প্রতি তীর নিক্ষেপ শুরু করে দিল। একটি তীর লক্ষ্যভেদ করলো এবং তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। মালিকের বংশধরগণ মনে করে, তাদেরই একটি লোক তাকে হত্যা করেছিল। তার নাম আওস ইব্‌ন আওফ এবং সে বনূ সালিম ইবন মালিকের লোক। পক্ষান্তরে আহলাফের¹ দাবী হলো, তাঁকে হত্যা করে তাদেরই এক ব্যক্তি। সে ছিল আত্তাব ইবন মালিকের বংশধর এবং নাম ওয়াহাব ইব্‌ন জাবির।
(ইন্তিকালের পূর্বে) উরওয়াকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: আপনি আপনার রক্ত সম্পর্কে কী মনে করেন? তিনি বললেন: এটা একটা সম্মান, যা দিয়ে আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে সম্মানিত করেছেন। এটা শাহাদত, যা আল্লাহ্ তা'আলা আমার দিকে টেনে এনেছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমাদের নিকট হতে চলে যাওয়ার পূর্বে তাঁর সাথের যে সকল লোক শাহাদত লাভ করেছে, তাদেরই একজনরূপে আমি নিজেকে মনে করি। কাজেই তোমরা আমাকে তাদের সাথেই দাফন করো। সুতরাং তাঁকে তাঁদের সাথেই দাফন করা হয়
তারা বলে থাকে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: ان مثله في قومه لكمثل صاحب ياسين في قومه তাঁর সম্প্রদায়ের মাঝে তাঁর দৃষ্টান্ত আপন সম্প্রদায়ের মাঝে ইয়াসীনের² লোকটির দৃষ্টান্ত তুল্য।
উরওয়া (রা)-এর শাহাদতের পরও বনূ সাকীফ কয়েক মাস স্বধর্মে বিদ্যমান থাকে। এরপর তারা এ নিয়ে পরামর্শে বসে। তারা চিন্তা করে দেখলো যে, তাদের চারদিক দিয়ে ঘেরা গোটা আরববাসীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার মত শক্তি তাদের নেই। কাজেই, বশ্যতাস্বীকার করে নেওয়াই সমীচীন। সুতরাং তারা বায়'আত গ্রহণ করলো এবং ইসলামে দীক্ষিত হলো।
আমার নিকট ইয়াকূব ইব্‌ন উতবা ইব্‌ন মুগীরা ইব্‌ন আখনাস (র) বর্ণনা করেন যে, বনু ইলাজের আমর ইবন উমাইয়া কোন এক ঘটনার জেরে আব্দ ইয়ালীল ইব্‌ন আমরের সাথে কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমর ইবন উমাইয়া ছিল আরবের একজন শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান লোক। সে আব্দ ইয়ালীলের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো এবং তার কাছে বলে পাঠাল যে, আমর ইবন উমাইয়া তোমাকে বের হতে বলছে। আব্দ ইয়ালীল বার্তাবাহককে বললো: কী বলছ মিয়া, আমরই কি তোমাকে আমার নিকট পাঠিয়েছে? সে বললো: হ্যাঁ, আর ওই তো তিনি আপনার বাড়ির ভিতর দাঁড়িয়ে আছেন। আব্দ ইয়ালীল বললো: আমি তো এরূপ ধারণা করছিলাম না। আমর তো নিজের প্রাণ রক্ষার ব্যাপারে খুব বেশি যত্নবান। যা হোক আব্দ ইয়ালীল তার কাছে বের হয়ে আসলো এবং তাকে দেখে অভিনন্দন জানালো।
আমর তাকে বললো আমরা এখন যে অবস্থায় উপনীত হয়েছি, সে অবস্থায় পরস্পরে কথাবার্তা বন্ধ রাখা চলে না। এই ব্যক্তির ব্যাপারটি যা দাঁড়িয়েছে, তাতো দেখছ। সারাটা আরব ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাদের সাথে লড়াই করার মত শক্তি তোমাদের নেই। এখন তোমরা কী করবে ভেবে দেখ।
সুতরাং বনু সাকীফ পরামর্শে বসলো। তারা একে অন্যকে বললো: তোমরা কি দেখছ না তোমাদের জানমালের কোন নিরাপত্তা নেই? তোমাদের কোন লোক বের হলে তার সর্বস্ব লুণ্ঠিত হয়ে যায়?
তারা আলাপ-আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এক ব্যক্তিকে পাঠাবে, যেমন উরওয়াকে পাঠিয়েছিল। সেমতে তারা আব্দ ইয়ালীল ইব্‌ন আমর ইবন উমায়রের সাথে কথা বলল। সে ছিল উরওয়া ইবন মাসউদের সমবয়সী। তারা তার কাছে এ প্রস্তাব রাখলো, কিন্তু সে তা গ্রহণ করতে অসম্মতি জানাল। তার আশংকা ছিল, উরওয়া ইবন মাসউদের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে, সে ফিরে আসলে তার প্রতিও একই আচরণ করা হবে।
আব্দ ইয়ালীল বললো: আমি এটা করবার নই, যদি না আমার সাথে আরও কয়েকজনকে পাঠাও। তারা স্থির করলো, তারা তার সাথে আহলাফের দু'জন এবং বনূ মালিকের তিনজন লোক পাঠাবে। এভাবে তাদের সংখ্যা দাঁড়াবে ছয়জন। কাজেই আব্দ ইয়ালীলের সাথে তারা হাকাম ইব্‌ন আম্ম ইব্‌ন ওয়াহাব ইব্‌ন মুআত্তিব, শুরাহবীল ইব্‌ন গায়লান ইব্‌ন সালিমা ইব্‌ন মুআত্তিব, বনূ মালিকের ইয়াসার বংশোদ্ভূত উসমান ইব্‌ন আবুল আস ইব্‌ন বিশর ইব্‌ন আব্দ দুহমান, সালিম ইব্‌ন আওফ বংশোদ্ভূত আওস ইব্‌ন আওফ এবং হারিস বংশোদ্ভূত নুমায়র ইব্‌ন খারাশা ইব্‌ন রবীআকে পাঠালো।
আব্দ ইয়ালীল উপরোক্ত প্রতিনিধি দল নিয়ে যাত্রা করল। সে ছিল তাদের মুখপাত্র এবং সিদ্ধান্তদাতা। সে এই কারণেই তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছিল, পাছে উরওয়া ইব্‌ন মাসউদের মত আচরণ তার সাথেও করা হয়। সে ক্ষেত্রে তায়েফে আপন সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে আসার পর সবাই মিলে পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে পারবে।
তারা যখন মদীনার নিকটবর্তী হলো এবং কানাতে বিরাম নিল, তখন মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা)-এর সঙ্গে তাদের সাক্ষাত হলো। এদিন ছিল তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উট চরানোর পালা। তিনি তাতে নিয়োজিত ছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উট চরাতেন। মুগীরা (রা) যখন তাদেরকে দেখলেন, তখন তাদের আগমনের সংবাদ দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট ছুটে গেলেন এবং উটগুলোকে তাদের কাছে ছেড়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট পৌঁছার আগে আবূ বকর (রা)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাত হলো। তিনি তাঁকে জানালেন যে, বনূ সাকীফের একটি কাফেলা বশ্যতা স্বীকার ও ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে আগমন করেছে। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সমস্ত শর্ত মেনে নেবে। তবে এজন্য তারা তাদের সম্প্রদায়, দেশ ও ধন-সম্পদের নিরাপত্তার পক্ষে একটি নিশ্চয়তা পত্র লিখিয়ে নিতে চায়।
আবূ বকর (রা) মুগীরা (রা)-কে বললো: আমি আল্লাহ্র কসম দিয়ে তোমাকে বলছি, তুমি আমার আগে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট গিয়ে এ সংবাদ জানিও না। আমিই আগে তাঁর কাছে এটা প্রকাশ করব। মুগীরা (রা) তাঁর কথা রাখলেন। তখন আবূ বকর (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে সাক্ষাত করলেন এবং তাঁকে তাদের আগমন বার্তা দিলেন। মুগীরা (রা) চলে গেলেন কাফেলার কাছে। তিনি জুহর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় তাদের সাথেই কাটালেন। এ সময় তিনি তাদের শেখালেন কিভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অভিবাদন জানাবে। কিন্তু তারা জাহিলিয়াতের অভিবাদন রীতিই অনুসরণ করলো। তারা যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হলো, তখন তিনি মসজিদের এক পাশে তাদের জন্য তাঁবু খাটিয়ে দিলেন, যেমন বর্ণনা করা হয়ে থাকে।
খালিদ ইব্‌ন সাঈদ ইব্‌ন আস (রা) তাদের ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মাঝে মধ্যস্থতা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা লিখিয়ে নিল। খালিদ (রা) নিজ হাতে সেটা লিখে দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ হতে তাদেরকে যা-কিছু আহার্য দেওয়া হত, তা খালিদ যতক্ষণ না কিছু আহার করতেন, ততক্ষণ তারা তা স্পর্শ করতো না। অবশেষে তারা ইসলাম গ্রহণ করলো এবং নিরাপত্তানামা লেখার কাজ সমাপ্ত হলো।
তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট যেসব দাবী জানিয়েছিল, তন্মধ্যে একটা এই যে, তাদের দেবী লাতকে যেন তাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্ততঃ তিন বছরের মধ্যে যেন তাকে ধ্বংস করা না হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এটা মানতে অস্বীকার করলেন। শেষে তারা এক বছরের জন্য অবকাশ চাইলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাও অস্বীকার করলেন। অবশেষে, তারা ফিরে যাওয়ার পর কেবল এক মাসের সময় চাইলো, কিন্তু তিনি তাদেরকে নির্দিষ্ট কোন সময় দিতেই রাযী হলেন না। এদ্বারা তাদের উদ্দেশ্য ছিল কিছুকালের জন্য লাতকে ছেড়ে দেওয়া হলে গোয়ার প্রকৃতির লোক, নারী ও বাচ্চাদের থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হবে। তারা চাচ্ছিল না লাতকে ধ্বংস করে তাদের সম্প্রদায়কে সন্ত্রস্ত করে তোলা হোক, যতক্ষণ না তারা সকলে ইসলামে প্রবেশ করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) রাযী হলেন না। তিনি আবু সুফিয়ান ইব্‌ন্ন হাব (রা) ও মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা)-কে লাতের ধ্বংস সাধনের জন্য পাঠিয়ে দিলেন।
তাদের আরও দাবী ছিল, সালাতের বিধান থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হোক এবং তাদের দেব-দেবীদেরকে তাদের হাতে নিধন করতে বাধ্য না করা হোক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমাদের হাতে তোমাদের প্রতিমাদের নিধন করার দায় থেকে তোমাদেরকে অব্যাহতি দিচ্ছি, কিন্তু সালাত থেকে তো অব্যাহতি দিতে পারি না। যে দীনে সালাত নেই, তাতে ভাল কিছু নেই। তারা বললো, হে মুহাম্মদ! আমরা না হয় এটা মেনে নিচ্ছি, যদিও এটা অপমানজনক কাজ।
তারা যখন ইসলাম গ্রহণ করলো এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা লিখে দিলেন, তখন তিনি উসমান ইব্‌ন আবুল আসকে তাদের নেতা নিযুক্ত করে দিলেন। তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে বয়োকনিষ্ঠ, তথাপি তাকে নেতা নিযুক্ত করার কারণ ছিল এই যে, তিনি ইসলামের জ্ঞান লাভ এবং কুরআন শিক্ষার প্রতি তাদের সকলের চেয়ে বেশী উৎসাহী ছিলেন। তাই আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি দেখছি এই যুবক তাদের মধ্যে সবচাইতে বেশি ইসলামী জ্ঞানার্জন ও কুরআন শিক্ষার প্রতি আগ্রহী।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট ঈসা ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন আতিয়্যা ইব্‌ন সুফ্যান ইব্‌ন রবীআ সাকাফী (র) তাদের জনৈক প্রতিনিধি হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: আমরা ইসলাম গ্রহণ করার পর রমাযানের অবশিষ্ট দিনগুলোতে যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে রোযা রাখলাম, তখন তাঁর নিকট হতে বিলাল আমাদের জন্য ইফতার ও সাহরী নিয়ে আসতেন। তিনি যখন সাহরী নিয়ে আসতেন, তখন আমরা বলতাম আমরা তো দেখছি ফজর হয়ে গেছে। তিনি বলতেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সাহরীরত অবস্থায় রেখে এসেছি। তিনি যখন ইফতার নিয়ে আসতেন, তখন আমরা বলতাম এখনও তো সূর্য পুরোপুরি অস্ত যায়নি। তিনি বলতেন: রাসূলুল্লাহ (সা) ইফতার না করা পর্যন্ত আমি তোমাদের নিকট আসিনি। এরপর তিনি পাত্রের ভিতর হাত দিয়ে তা থেকে লোকমা গ্রহণ করতেন।
ইবন হিশাম سحورنا بفطورنا এর স্থলে বলেন سحورنا وفطورنا (অর্থ একই)।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট সাঈদ ইব্‌ন আবূ হিনদ (র) মুতাররিফ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন শিখীর (র) হতে এবং তিনি উসমান ইব্‌ন আবুল আস (রা) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, বনূ সাকীফের নিকট আমাকে প্রেরণকালে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে শেষ উপদেশ এই দিয়েছিলেন:
يا عثمان تجاوز في الصلوة واقدر الناس باضعفهم فان فيهم الكبير والصغير والضعيف وذا الحاجة
'হে উসমান! সালাত সংক্ষেপ করবে। মানুষকে তাদের দুর্বলতম ব্যক্তি দ্বারা বিচার করবে। মনে রাখবে, তাদের মধ্যে বৃদ্ধ, বাচ্চা অসুস্থ ও প্রয়োজনতাড়িত লোক রয়েছে।

টিকাঃ
১. আহ্লাফ: আবদুদদার, জুমাহ, মাখযূম, আদী, কা'ব ও সাহম এই ছয়টি গোত্রকে একত্রে আহ্লাফ অর্থাৎ মিত্র সম্প্রদায় বলা হয়ে থাকে। এরা পরস্পর মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ছিল। আন-নিহায়া, ১খণ্ড, ৪২৫ পৃ.।
২. ইয়াসীনের লোকটি বলে হয়ত সূরা ইয়াসীনে বর্ণিত সেই ব্যক্তিকে বোঝান হয়েছে, যে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল : اتبعو المرسلين তোমরা রাসূলদের অনুসরণ কর'। ফলে, তারা তাকে হত্যা করে। তার নাম চিল হাবীব নাজ্জার। অথবা এর দ্বারা আল-ইয়াসা (আ) কিংবা ইলয়াস ইন্ন ইয়াসীনকে বোঝান হয়েছে। ইয়াস (আ)-কে ইয়াসীনও বলা হয়ে থাকে。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00