📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হুনায়ন ও তায়েফ সম্পর্কে বুজায়র ইবন যুহায়রের কাসীদা

📄 হুনায়ন ও তায়েফ সম্পর্কে বুজায়র ইবন যুহায়রের কাসীদা


তায়েফের যুদ্ধ ও অবরোধের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন, তখন হুনায়ন ও তায়েফের স্মরণে বুজায়র ইব্‌ন যুহায়র ইব্‌ন আবূ সুলামী বলেন:
হুনায়ন, আওতাস ও আব্রাকে যুদ্ধ চলে একটির পর আরেকটি।
হাওয়াযিন বিভ্রান্তিবশত সংগ্রহ করে বিশাল বাহিনী, কিন্তু তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল ছিন্নভিন্ন পাখির মত।
তারা আমাদের হাত থেকে একটি স্থানও রক্ষা করতে পারলো না, কেবল তাদের প্রাচীর ও গর্ত ছাড়া।
আমরা তাদের মুখোমুখি হই, যাতে তারা বের হয়ে আসে, কিন্তু তারা অবরুদ্ধ ফটকের ভিতর দুর্গের আশ্রয় নিল।
অবশেষে নিরুপায় হয়ে তাদের ফিরে আসতেই হলো মৃত্যুবাহী চকমকে অস্ত্রধারী রণোন্মত্ত বিশাল বাহিনীর সামনে।
হরিৎ বর্ণ ঘননিবদ্ধ সে বাহিনীকে যদি নিক্ষেপ করা হত হাদান পর্বতের উপর, তা হলে তা হয়ে যেত সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন।
তারা হেলেদুলে চলছিল ঠিক হারাস ঘাসের উপর বিচরণকারী বাঘের মত।
যেন আমরা একপাল অশ্ব, যারা পেছনের পা সামনের পায়ের স্থানে একই সাথে করে স্থাপিত, আর ক্ষণে বিচ্ছন্ন হয়, আবার শ্রেণীবদ্ধ।
তারা ছিল এমন সব সুদৃঢ় বর্মে সজ্জিত যে, অশ্বারূঢ় অবস্থায় তাদের মনে হচ্ছিল একটা জলাশয়ের মত, বাতাসে যার পানি তরঙ্গায়িত।
সে বর্মের বাড়তি অংশ আমাদের জুতা স্পর্শ করছিল আর তা ছিল দাউদ ও মুহাররিক পরিবারের হাতে বোনা।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হাওয়াযিন গোত্রের কাছ থেকে পাওয়া যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, তাদের বন্দী, যাদের চিত্তজয় করা উদ্দেশ্য ছিল তাদের অংশ এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রদত্ত উপহার উপঢৌকনের বৃত্তান্ত

📄 হাওয়াযিন গোত্রের কাছ থেকে পাওয়া যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, তাদের বন্দী, যাদের চিত্তজয় করা উদ্দেশ্য ছিল তাদের অংশ এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রদত্ত উপহার উপঢৌকনের বৃত্তান্ত


তায়েফ হতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) দাহনা¹ হয়ে জি'ইব্রানায় এসে থামলেন। সঙ্গে তার সাহাবিগণ এবং হাওয়াযিনের বহু সংখ্যক বন্দী।
বনু সাকীফ হতে প্রত্যাবর্তনকালে এক সাহাবী তাঁকে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তাদের প্রতি অভিসম্পাত করুন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: হে আল্লাহ্! বনূ সাকীফকে হিদায়াত দান করুন এবং তাদের এনে দিন।
জি'ইব্রানায় হাওয়াযিনের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করলো। তাঁর কাছে হাওয়াযিনের বন্দী নারী ও শিশুদের সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। আর উট ও ছাগল ছিল অসংখ্য।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আমর ইব্‌ন শু'আয়ব বর্ণনা করেছেন তার পিতা হতে, দাদা আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আমার (র)-এর সূত্রে যে, হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণপূর্বক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করলো। তারা বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা তো একই মূল ও কুল হতে উদ্ভূত। আমরা যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছি তা আপনার অজানা নয়। আপনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন; আল্লাহ্ তা'আলা আপনার প্রতি অনুগ্রহ করবেন।
বর্ণনাকারী বলেন: হাওয়াযিনের শাখা সা'দ ইব্‌ন বকর গোত্রীয় আবূ সুরাদ যুহায়র নামক এক ব্যক্তি উঠে বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ওই খোয়াড়ে রয়েছে আপনার ফুফু, খালা ও দুধমাতাগণ, যারা আপনার সযত্ন লালন-পালন করেছিলেন। আমরা হারিস ইব্‌ন আবূ শিমর কিংবা নু'মান ইব্‌ন মুনযিরকে দুধ পান করালে পরে সে আপনার মত আমাদের উপর অভিযান চালালে, যেমন আপনি চালালেন; তা হলে আমরা তার অনুগ্রহ ও করুণার আশা করতে পারতাম। আর যাদের লালন-পালন করা হয়, তাদের মধ্যে আপনি শ্রেষ্ঠতম।
ইবন হিশাম বলেন: বর্ণনান্তরে আছে আমরা যদি হারিছ ইব্‌ন আবূ শিমর বা নু'মান ইব্‌ন মুনাযিরের সাথে একত্রে দুধপান করতাম।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আমর ইবন মু'আয়ব তার পিতা হতে তার দাদা আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আমর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
এ কথার জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমাদের কাছে সন্তান-সন্ততি ও নারীগণ অধিক প্রিয়, না তোমাদের মালামাল? তারা বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। আপনি আমাদের মালামাল ও স্ত্রী-পুত্র-এর যে কোন একটি বেছে নিতে বলছেন, তা আপনি আমাদের স্ত্রী-পুত্রদেরই আমাদের হাতে ফিরিয়ে দিন। তারাই আমাদের কাছে বেশি প্রিয়। তিনি তাদের বললেন: আমার আর বনূ মুত্তালিবের যা কিছু আছে তা তোমাদের। আমি যখন লোকদের নিয়ে জুহরের সালাত আদায় করব, তখন তোমরা দাঁড়িয়ে বলো, আমরা মুসলিমদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সুপারিশ কামনা করি এবং মুসলিমদের কাছে অনুরোধ তারাও যেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আমাদের সন্তান-সন্ততি ও নারীদের জন্য সুপারিশ করে। তখন আমি তা তোমাদের দেব এবং তোমাদের জন্য সুপারিশ করব।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন লোকদের নিয়ে জুহরের সালাত আদায় করলেন, তখন তারা দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশ মত উক্ত কথা বললো। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমার আর বনু আবদুল মুত্তালিবের যা হিস্যা তা তোমাদের দেওয়া গেল। তখন মুহাজিরগণ বললেন: আমাদের যা-কিছু তা তো আল্লাহ্র রাসূলেরই। আনসারগণ বললেন: আমাদের সবও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য। কিন্তু আকরা' ইবন হাবিস বললেন: আমি ও বনূ তামীম এতে একমত নই। উয়ায়না ইবন হিস্স্ন বললেন: আমার ও বনূ ফাযারার কথাও তাই। আব্বাস ইব্‌ন মিরদাস বললেন, আমার ও বনূ সুলায়মেরও সেই কথা। বনূ সুলায়ম বলে উঠলো, কখনও নয়; আমাদের হিস্যাও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য।
বর্ণনাকারী বলেন: তখন আব্বাস ইব্‌ন মিরদাস বনূ সুলায়মকে বললেন, তোমরা আমাকে অপমান করলে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: এই বন্দীদের থেকে তোমাদের যে কেউ তার অংশ রেখে দিতে চায়, তাকে প্রতি একটি লোকের বদলে আগামীবারের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হতে ছয়টি করে হিস্যা দেওয়া হবে। কাজেই তোমরা লোকদেরকে তাদের স্ত্রী-পুত্রদের ফিরিয়ে দাও।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আবূ ওয়াজ্যাহ ইয়াযীদ ইবন উবায়দ সা'দী বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে একটি বাঁদী দিয়েছিলেন। তার নাম রায়তা বিনত হিলাল ইবন হায়‍্যান ইবন উমায়রা ইবন হিলাল ইব্‌ন নাসিরা ইব্‌ন কুসায়‍্যা ইব্‌ নাস্ত্র ইবন সা'দ ইব্‌ন বকর। উসমান ইবন আফফান (রা)-কে দিয়েছিলেন যয়নাব বিন্ত হায়‍্যান ইব্‌ন আমর ইবন হায়‍্যান নাম্নী একটি বাঁদী। উমর ইবন খাত্তাব (রা)-কেও একটি বাঁদী দিয়েছিলেন। তিনি সেটি তার পুত্র আবদুল্লাহ্ (রা)-কে দিয়েছেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম নাফি' (র) আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি তাকে বাঁদীটিকে বনূ জুমাহের কাছে আমার মামাদের ওখানে পাঠিয়ে দিলাম, যাতে তারা তাকে আমার উপযুক্ত করে তোলে এবং তাকে তৈরী করে দেয়। ইচ্ছা ছিল তাওয়াফ শেষে তাদের কাছে যাব এবং সে বাঁদীর সাথে মিলিত হব। ইবন উমর (রা) বলেন: তাওয়াফ শেষে আমি মসজিদ থেকে বের হয়েই দেখি সব লোক ব্যস্তসমস্ত। আমি বললাম: তোমাদের অবস্থা কী? তারা বললো: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের স্ত্রী-পুত্রদের ফেরত দিয়ে দিয়েছেন। আমি বললাম: তোমাদের সেই মেয়েটি তো বনূ জুমাহের হিফাজতে আছে। তোমরা গিয়ে তাকে নিয়ে আস। তারা সেখানে গেল এবং তাকে নিয়ে নিল।
ইবন ইসহাক বলেন: আর উয়ায়না ইন্ন হিস্নের বৃত্তান্ত এই যে, তিনি হাওয়াযিনের এক বৃদ্ধাকে হস্তগত করলেন। তাকে ধরার সময় তিনি বললেন, একে দেখছি বৃদ্ধা এবং আমার ধারণা গোত্রের মাঝে এর বিশেষ আভিজাত্য আছে। আশা করা যায় এর মুক্তিপণ হবে অনেক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন ছয়গুণ বেশী হিস্যার বিনিময়ে বন্দীদের ফিরিয়ে দিলেন, তখন উয়ায়না সে বৃদ্ধাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করলেন। যুহায়র আবূ সুরাদ তাকে বললেন: ছয়গুণ নিয়েই তাকে ছেড়ে দাও। কসম আল্লাহ্! এর মুখ কমনীয় নয়, স্তন উন্নত নয়, গর্ভ সন্তান ধারণে সক্ষম নয়, স্বামী ব্যথিত নয় এবং এর পর্যাপ্ত দুধও নাই। যুহায়রের একথায় তিনি ছয়গুণের বদলেই তাকে ছেড়ে দিলেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, উয়ায়না অতঃপর আকরা' ইবন হাবিসের সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাকে ঘটনা জানান। আকরা' বললেন: আল্লাহর কসম! তুমি কোন মধ্য বয়সী রূপসীকে ধরনি, কিংবা নরম শরীরের মোটাতাজা মহিলাকেও নয়।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাওয়াযিন প্রতিনিধিবর্গের কাছে মালিক ইব্‌ন আওফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, সে কোথায় কী করছে। তারা বলল, সে তায়েফে বনূ সাকীফের কাছে আছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তোমরা মালিককে বল, সে যদি ইসলাম গ্রহণ করে আমার কাছে আসে, তা হলে আমি তার পরিবারবর্গ ও মালামাল তাকে ফেরত দিয়ে দেব। অধিকন্তু তাকে একশ' উটও দেব। মালিককে এ সংবাদ দেওয়া হল। তিনি তায়েফ হতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লেন। তার আশংকা ছিল বনূ সাকীফ যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উক্ত কথা জানতে পারে, তা হলে তারা তাকে আটকে রাখবে। কাজেই তিনি তার উট প্রস্তুত করতে বললেন। তা প্রস্তুত করা হল। তিনি তার ঘোড়াটিকে তায়েফে এনে রাখতে বললেন। তাও এনে রাখা হল। তিনি রজনীযোগে বের হয়ে সে ঘোড়ায় সওয়ার হলেন এবং তাকে হাঁকিয়ে যেখানে উট বেঁধে রাখতে বলেছিলেন, সেখানে এসে তাতে সওয়ার হলেন। এভাবে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে চলে আসলেন। তিনি তাঁকে পেয়ে ছিলেন জি'ইব্রানা অথবা মক্কায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার পরিবারবর্গ ও মালামাল ফেরত দিয়ে দিলেন এবং অতিরিক্ত একশ' উট দিলেন। মালিক ইসলাম গ্রহণ করলেন। তার ইসলাম গ্রহণ ছিল নিষ্ঠাপূর্ণ। ইসলাম গ্রহণকালে মালিক বলেছিলেন:
আমি মানুষের মাঝে তার মত আর দেখিনি, শুনিনি। সমগ্র মানবের মাঝে নাই তার তুলনা।
তিনি অনুগ্রহপ্রার্থীকে দান করেন পূর্ণ মাত্রায়। তুমি যখনই চাইবে তোমাকে জানিয়ে দেবে ভবিতব্য।
যখন সৈন্যদল বর্শা ও তরবারি দ্বারা প্রদর্শন করে প্রচণ্ড দাপট, তখন তিনি গর্জে ওঠেন সেই সিংহের মত যে নিজ খাঁটিতে শাবকদের রক্ষার্থে ওঁত পেতে আছে শত্রুর উদ্দেশে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে তার সম্প্রদায়ের নও-মুসলিমদের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। সেই সাথে ছুমালা, সালিমা ও ফাহ্‌ম গোত্রেগুলোকেও তাঁর অধীন করে দেন। তারা তাঁর অধীনে বনু ছাকীফের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। তাদের যে কোনও কাফেলা বের হত, মালিক তার উপর আক্রমণ চালিয়ে দিতেন। এভাবে তিনি তাদের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন করে তোলেন। এ সম্পর্কে আবূ মিহজান ইবন হাবীব ইন্ন আমর ইবন উমায়র সাকাফী আবৃত্তি করে:
আমাদের দিকে অগ্রসর হতে শত্রুরা ছিল সন্ত্রস্ত, এখন বনূ সালিমাও আমাদের উপর চড়াও হয়।
মালিক তাদের নিয়ে আমাদের উপর হামলা চালায়। সে ভংগ করেছে প্রতিশ্রুতি আর নিষিদ্ধ সীমারেখা।
তারা আমাদের ঘর-বাড়িতে এসে হানা দেয়, অথচ আমরাই ছিলাম এক সময় শাস্তিদাতা।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা) হুনায়নের বন্দীদেরকে তাদের লোকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ শেষ করে সওয়ারীতে চড়ে বসলেন। সংগীরাও তাঁর অনুসরণ করল এবং তারা বলতে লাগলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ! উট, ছাগল প্রভৃতি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আমাদের মাঝে বণ্টন করে দিন। এই করতে করতে তারা তাঁকে একটি গাছের নীচে নিয়ে এল এবং তারা তাঁর চাদর টেনে নিল। তিনি বললেন: লোকসব! তোমার আমার চাদর দিয়ে দাও। আল্লাহর কসম! তিহমায় যতগুলো গাছ আছে, তত সংখ্যক উটও যদি তোমাদের হয়ে থাকে, তবু তা আমি তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দেব। তোমরা আমাকে কৃপণ, ভীরু কিংবা মিথ্যুক পাবে না। এরপর তিনি একটি উটের পাশে দাঁড়ালেন এবং তার কুঁজ হতে একটি পশম তুলে দুই আংগুলের মাঝে রাখলেন, এরপর তা উপরে তুলে বললেন: হে লোক সকল! আল্লাহ্র শপথ! খুমুস (এক-পঞ্চমাংশ) ব্যতীত তোমাদের এই যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হতে আমি এই পশমটাও নেব না। আর খুমুস তো শেষ পর্যন্ত তোমাদের মাঝেই বিতরণ করা হয়। অতএব তোমরা সুঁই-সূতা সহ সবকিছু জমা দিয়ে দাও। গনীমতের মালে খিয়ানত কিয়ামতের দিন খিয়ানতকারীর পক্ষে বড়ই লজ্জার বিষয় হবে এবং তা হবে তার জন্য আগুন ও চরম লাঞ্ছনা।
একথা শুনে জনৈক আনসার এক বাণ্ডিল পশমের সূতা এনে বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি আমার উটের গদি বানানোর জন্য এটা নিয়েছিলাম।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমার ভাগে যতটুকু পড়বে তা তুমি নিয়ে নিও।
তখন সে আনসার বললো: অবস্থা যদি এই হয়, তা হলে এর কোন প্রয়োজন আমার নাই। এই বলে সে তা হাত থেকে ফেলে দিল।
ইবন হিশাম বলেন: যায়দ ইব্‌ন আসলাম তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, হুনায়নের যুদ্ধের দিন আকীল ইব্‌ন আবু তালিব তার স্ত্রী ফাতিমা বিন্ত শায়বা ইন্ন রবী'আর নিকটে উপস্থিত হন। তখন তার তরবারি রক্তরঞ্জিত ছিল। ফাতিমা বললেন: আমি বুঝে ফেলেছি, তুমি মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করেছ। তা কতটুকু গনীমত পেয়েছ? তিনি বললেন: এই সুঁইটা। এর দ্বারা তোমার কাপড়-চোপড় সেলাই করতে পারবে। এই বলে তিনি সুঁইটা তাকে দিয়ে দিলেন। এমনি মুহূর্তে শুনতে পেলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ঘোষক ঘোষণা করছে, কেউ কিছু নিয়ে থাকলে তা জমা দিয়ে দিক, এমন কি সুঁই-সূতা পর্যন্ত। আকীল ফিরে এসে স্ত্রীকে বললেন: যা দেখছি তোমার সুইও গেল। তিনি সুইটা নিয়ে গনীমতের মাঝে ফেলে দিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুআল্লাফাতুল কুলুব¹ (যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা উদ্দেশ্য, তাদের)-কে কিছু কিছু করে দেন। এরা ছিল অভিজাত শ্রেণীর লোক। তিনি তাদের অন্তর জয়ের চেষ্টা করতেন এবং তাদের মাধ্যমে তাদের গোত্রীয় লোকদের মন জয় করতেন। সুতরাং তিনি আবু সুফিয়ান ইব্‌ন্ন হারবকে একশ' উট, তাঁর পুত্র মু'আবিয়াকে একশ' উট, হাকীম ইবন হিযামকে একশ' উট এবং বনূ 'আব্দুদদার-এর হারিস ইন্ন হারিছ ইব্‌ন কালাদাকেও একশ' উট প্রদান করেন।
ইবন হিশাম বলেন: (হারিস ইবন হারিস নয়; বরং) নুসায়ব ইবন হারিস ইন কালাদা। তবে তার নাম হারিসও হতে পারে।
ইবন ইসহাক বলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) হারিস ইন হিশامকে একশ' উট, সুহায়ল ইন উমরকে একশ' উট, হুওয়াতিব ইব্‌ন আবদুল-উয্যা ইব্‌ন আবূ কায়সকে একশ উট এবং আলা ইন্ন জারিয়া সাকাফীকেও একশ' উট প্রদান করেন। আলা ছিল বনূ যুহরার মিত্র। অনুরূপ উয়ায়না ইব্‌ন হিস্স ইবন হুযায়ফা ইন্ন বদরকে একশ' উট, আকরা' ইবন হাবিস তামীমীকে একশ' উট, মালিক ইব্‌ন আওফ নাসরীকে একশ' উট এবং সাওয়ান ইবন উমাইয়াকেও একশ' উট দিয়েছিলেন। এরা সবাই ছিল একশ' উটপ্রাপ্তের অন্তর্ভুক্ত।
কুরায়শদের কতিপয় লোককে তিনি একশ'র কম উট দিয়েছিলেন। যেমন মাখরামা ইব্‌ন নাওফাল যুহরী (রা), উমায়র ইব্‌ন ওয়াহাব জুমাহী (রা), বনূ আমির ইব্‌ন লুআইয়ের হিশাম ইবন আম্র (রা)। তাদেরকে কী পরিমাণ দিয়েছিলেন, তা আমার জানা নেই, তবে এতটুকু জানি যে, তা একশ'র নীচে ছিল।
এ ছাড়া সাঈদ ইব্‌ন ইয়ারবূ' ইব্‌ন আনকাছা ইবন আমির ইবন মাখযূমকে পঞ্চাশটি উট এবং সাহমীকেও পঞ্চাশটি উট প্রদান করেন।
ইবন হিশাম বলেন: সাহমীর নাম ছিল আদী ইবন কায়স।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আব্বাস ইব্‌ন মিরদাসকে কয়েকটি উট দিয়েছিলেন।
তার পরিমাণ কম হওয়ার কারণে সে চটে যায় এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে নিম্নের কবিতাটি রচনা করে:
এই যুদ্ধলব্ধ মাল তো আমিই অর্জন করেছি, সমতল ভূমিতে ঘোড়ার পিঠে আক্রমণ চালিয়ে।
ঘুমন্ত সম্প্রদায়কে আমিই রাখি জাগ্রত, তারা ঘুমিয়ে পড়লেও আমি হইনি নিদ্রালু।
পরিণামে আমার হিস্যা আর (আমার অশ্ব) উবায়দের হিস্যা বণ্টন হয় উয়ায়না ও আকরা'র মাঝে।
অথচ রণক্ষেত্রে আমি ছিলাম সম্প্রদায়ের রক্ষক। কিন্তু আমাকে দেওয়া হলো না, আবার করা হল না বঞ্চিতও।
আমি প্রাপ্ত হলাম কয়েকটা ছোট ছোট উট, তার পদচুতষ্টয়ের সমসংখ্যক।
কোন সভা-সমিতিতে (উয়ায়নার পিতা) হিস্স আর (আকরা'র পিতা) হাবিস, বেশী সম্মান পেত না, আমার পিতা অপেক্ষা।
আমি নিজেও ব্যক্তি হিসাবে নই তাদের নীচে। আর আজ যাকে নীচে নামান হচ্ছে সে উপরে উঠবে না কোনও দিন।
ইবন হিশাম বলেন: ইউনুস নাহবী আমাকে এরূপ আবৃত্তি করে শুনিয়েছেন: হিস্স ও হাবিস কোন সভা-সমিতিতে মিরদাসের উপরে স্থান পেত না।
ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমরা যাও এবং আমার পক্ষ হতে তার জিহ্বা স্তব্ধ করে দাও। সুতরাং তারা তাকে আরও দিলেন। অবশেষে সে সন্তুষ্ট হল। আর এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ঈপ্সিত তার জিহ্বা কর্তন।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: জনৈক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, আব্বাস ইব্‌ন মিরদাস রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হলে, তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমিই কি বলেছ- فاصبح نهبي ونهب العبيد بين الاقرع وعيينة আমার অংশ এবং উবায়দের অংশ বণ্টন হয়ে গেল-আকরা' ও 'উয়ায়নার মাঝে'?
আবূ বকর সিদ্দীক (রা) বললেন : بين والاقرع وعيينة নয় বরং بين عيينة والاقرع
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: উভয়টি একই। তখন আবূ বকর (রা) বললেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ঠিক তেমনই, যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন- وما علمناه الشعروما ينبغى له 'আমি তাকে কবিতা শিক্ষা দেইনি এবং সেটা তার জন্য শোভনও নয়'।

টিকাঃ
১. তায়েফের একটি জায়গার নাম।
১. যে অমুসলিমের ইসলাম গ্রহণ করার আশা আছে, কিংবা যে অমুসলিমকে কিছু দিলে তার ইসলামের প্রতি বিশ্বাস আরও দৃঢ় হওয়ার আশা আছে, এরূপ ব্যক্তিবর্গ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 নিম্নে এরূপ ব্যক্তিবর্গের নাম উল্লেখ করা গেল

📄 নিম্নে এরূপ ব্যক্তিবর্গের নাম উল্লেখ করা গেল


ইব্‌ন হিশাম বলেন: আমি নির্ভরযোগ্য মনে করি এমন জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁর নিজ সনদে ইব্‌ন শিহাব যুহরী (র) হতে আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, তিনি উবায়দুল্লাহ্ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উত্ত্বা হতে এবং তিনি ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে যে, কুরায়শ ও অন্যান্য গোত্রের বহু লোক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট বায়'আত গ্রহণ করেন তিনি জি'রানায় গনীমত বণ্টনের দিন হুনায়নের গনীমত হতে তাদেরকেও অংশ দেন।
বনূ উমাইয়া ইব্‌ন আব্দ শামসের-আবু সুফিয়ান ইব্‌ন হাব ইবন উমাইয়া (রা), তুলায়ক ইব্‌ন সুফিয়ান ইবন উমাইয়া (রা) ও খালিদ ইব্‌ন আসীদ ইব্‌ন আবুল 'আয়স ইন্ন উমাইয়া।
বনু আবদুদদার ইব্‌ন কুসাঈ-এর-শায়বা ইবন উসমান ইব্‌ন আবূ তালহা ইব্‌ন আবদুল-উয্যা ইবন উসমান ইব্‌ন আবদুদদার (রা), আবুস-সানাবিল ইন্ন বা'কাক ইন্ন হারিস ইন্ন উমায়লা ইন্ন সাব্বাক ইন্ন আবদুদদার (রা) ও ইকরিমা ইবন আমির ইবন হাশিম ইবন আব্দ মানাফ ইব্‌ন আবদুদদার (রা)।
মাখযূম ইব্‌ন ইয়াকজা গোত্রের-যুহায়র ইবন আবূ উমাইয়া ইবন মুগীরা (রা), হারিস ইবন হিশাম ইবন মুগীরা (রা), খালিদ ইবন হিশাম ইবন মুগীরা (রা) হিশাম ইব্‌ন ওয়ালীদ ইন্ন মুগীরা (রা), সুফয়ান ইব্‌ন আবদুল-আসাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ইবন মাখযূম (রা) ও সাইব ইব্‌ন আবুস সাইব ইব্‌ন আইয ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ইবন মাখযূম (রা)।
বনূ আদী ইব্‌ন কা'বের-মুতী' ইব্‌ন আসওয়াদ ইবন হারিসা ইব্‌ নাদলী (রা) ও আবূ জাম ইবন হুযায়ফা ইন্ন গানিম (রা)।
বনূ জুমাহ ইব্‌ন আম্রের-সাওয়ান ইবন উমাইয়া ইন্ন খাল্‌ল্ফ (রা), উহায়হা ইব্‌ন উমাইয়া ইন্ন খাল্‌ল্ফ (রা) ও উমায়র ইব্‌ন ওয়াহাব ইন্ন খাল্‌ল্ফ (রা)।
বনু সাহমের-আদী ইব্‌ন কায়স ইন্ন হুযাফা (রা)।
বনু আমির ইব্‌ন লুআঈ-এর-হুওয়ায়তিব ইব্‌ন আবদুল-উয্যা ইব্‌ন আবু কায়স ইন আব্দ উদ্‌দ (রা) ও হিশাম ইব্‌ন আম্ম ইন্ন রবী'আ ইবন হারিস ইন্ন হুবায়্যিব।
এরপর অন্যান্য ছোটখাট গোত্রের যেসব লোক বায়'আত গ্রহণ করেছিল তাদের নাম:
বন্ধু বকর ইব্‌ন আব্দ মানাত ইব্‌ন কিনানার নাওফাল ইব্‌ন মু'আবিয়া ইব্‌ন উরওয়া ইন সাখ্র ইন্ন রায ইব্‌ন ইয়া'মার ইব্‌ নুফাসা ইব্‌ন আদী ইন্ন দীল (রা)।
বনু কায়সের শাখা বনু আমির ইবন সা'সা'আ এবং তারও শাখা বনূ কিলাব ইব্‌ন রবী'আ ইবন আমির ইবন সা'সা'আর-আলকামা ইব্‌ন উলাসা ইব্‌ন আওফ ইব্‌ন আহওয়াস ইব্‌ন জা'ফর ইব্‌ন কিলাব (রা) ও লাবীদ ইব্‌ন রবী'আ ইব্‌ন মালিক ইব্‌ন জা'ফার ইব্‌ন কিলাব (রা)।
বনু 'আমির ইব্‌ন রবী'আর—খালিদ ইব্‌ন হাওযা ইব্‌ন রবী'আ ইব্‌ন আম্র ইব্‌ন আমির ইব্‌ন রবী'আ ইব্‌ন আমির ইব্‌ন সা'সা'আ (রা) ও হারমালা ইব্‌ন হাওযা ইব্‌ন রবী'আ ইব্‌ন আমর (রা)।
বনু নাস্ত্র ইব্‌ন মু'আবিয়ার—মালিক ইব্‌ন আওফ ইব্‌ন সাঈদ ইব্‌ন ইয়ারবু' (রা)।
বনু সুলায়ম ইব্‌ন মানসূরের—আব্বাস ইব্‌ন মিরদাস ইব্‌ন আবূ আমির (রা)। তিনি বনু হারিস ইব্‌ন বুহসা ইব্‌ন সুলায়মের লোক ছিলেন।
বনু গাফ্ফানের শাখা বনু ফাযারার—উয়ায়না ইব্‌ন হিস্স ইব্‌ন হুযায়ফা ইব্‌ন বাদ্র (রা)।
বনু তামীমের শাখা বনু হানজালার—আকরা' ইব্‌ন হাবিস ইব্‌ন ইকাল (রা)। তিনি ছিলেন—মুজাশি' ইব্‌ন দারিম গোত্রীয়।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আনসারের ঘটনা

📄 আনসারের ঘটনা


ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্‌ন ইবরাহীম ইব্‌ন হারিস তামীমী বর্ণনা করেন যে, সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলেছিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি উয়ায়না ইব্‌ন হিস্স ও আকরা' ইব্‌ন হাবিসকে একশ' করে উট দিয়েছেন, আর জু'আয়ল ইব্‌ন সুরাকা দামরীকে বাদ রেখেছেন? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: শোন, সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, নিঃসন্দেহে জু'আয়ল ইব্‌ন সুরাকা ভূ-পৃষ্ঠের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। বাকি সকলে উয়ায়না ইব্‌ন হিস্স ও আকরা' ইব্‌ন হাবিসের সমতুল্য। কিন্তু আমি তাদের হৃদয় আকৃষ্ট করার জন্য দিয়েছি, যাতে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর জু'আয়ল ইব্‌ন সুরাকাকে তার ইসলামের উপর ছেড়ে দিয়েছি।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আবু উবায়দা ইব্‌ন মুহাম্মদ ইব্‌ন আম্মার ইব্‌ন ইয়াসির (র) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন হারিস ইব্‌ন নাওফালের আযাদকৃত গোলাম মিকসাম আবুল কাসিম (র) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: আমি ও তালীদ ইব্‌ন কিলাব লায়সী বের হয়ে পড়লাম এবং আবদুল্লাহ ইব্‌ন আম্র ইব্‌ন আস (রা)-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি তখন বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করছিলেন। চটি ছিল তাঁর হাতে ঝুলানো। আমরা তাঁকে বললাম: হুনায়নের দিন তামীমী যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে কথা বলছিল, তখন কি আপনি উপস্থিত ছিলেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ; যুল-খুওয়ায়সিরা নামে বনূ তামীমের একটি লোক এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পাশে দাঁড়াল, তিনি তখন মানুষের মাঝে গনীমত বিতরণ করছিলেন। লোকটি বললো: হে মুহাম্মদ! আপনি আজ যা করেছেন আমি দেখেছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আচ্ছা, তা তুমি কী দেখলে? সে বললো: দেখলাম, আপনি ন্যায়ের পরিচয় দেননি। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি তাকে ধিক্কার দিয়ে বললেন: আমার কাছে যদি ন্যায় না থাকে, তা হলে আর কার কাছে থাকবে? তখন উমর ইব্‌ন খাত্তাব (রা) বলে উঠলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি তাকে হত্যা করব না? তিনি বললেন : না, তাকে ছেড়ে দাও। অদূর ভবিষ্যতে তার একটি দল গড়ে উঠবে, যারা দীনের মাঝে অতিশয় বাড়াবাড়ি করতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তারা দীন থেকে এভাবে বের হয়ে যাবে, যেভাবে শিকার ভেদ করে তীর বের হয়ে যায়, যে তীরের ফলকে লক্ষ্য করলে কিছু পাওয়া যায় না। এরপর দণ্ডেও কিছু পাওয়া যায় না। তারপর তার পালকেও দৃষ্টিপাত করে কিছু মেলে না। বিদ্ধ হল এবং অন্ত্রের গোবর ও রক্তের ভিতরে দিয়ে বের হয়ে গেল।
ইবন ইসহাক বলেন : আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্‌ন আলী ইবন হুসায়ন আবূ জা'ফর (র) আবূ উবায়দা (র)-এর অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনিও লোকটির নাম বলেছেন যুল-খুওয়ায়সিরা।
ইবন ইসহাক বলেন : আমার নিকট আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ নাজীহ (র)-ও তার পিতার সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
ইব্‌ন হিশাম বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরায়শ ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলোকে যা দেওয়ার দিলেন। আনসারদেরকে কিছুই দিলেন না। এ কারণে হাসান ইবন সাবিত (রা) তাঁর প্রতি অনুযোগ করে বলেন:
দুঃখ-বেদনা বেড়ে গেছে, চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে প্রবল ধারায়, যখন সে পানিকে জমা করেছে অশ্রুরান।
এসব বেদনা তো শাম্মা'র জন্য। পরিপুষ্ট তার দেহ, সরু কোমর। কোনরূপ আবিলতা নেই : নেই দুর্বলতা।
এখন ছেড়ে দাও শাম্মার কথা, কারণ তার প্রেম ছিল নিতান্তই তুচ্ছ। নিকৃষ্টতম মিলন তো সেটাই, যা হয় ক্ষণিকের।
বরং রাসূলের কাছে যাও এবং তাঁকে বল, হে মু'মিনদের শ্রেষ্ঠতম আশ্রয়স্থল! যখন মানুষকে গণনা করা হয়— তখন কিসের ভিত্তিতে ডাকা হয় বনূ সুলায়মকে
অথচ তারা সে সম্প্রদায়ের সামনে নিতান্তই তুচ্ছ, যারা দিয়েছে আশ্রয়, করেছে সাহায্য?
আল্লাহ্ তা'আলাই তাদের নাম দিয়েছেন আনসার, যেহেতু তারা সাহায্য করেছে সত্য-সরল দীনের, যখন যুদ্ধের আগুন ছিল প্রজ্বলিত।
তারা আল্লাহ্ পথে ছিল অগ্রগামী, বিপদাপদে ছিল স্থির-অবিচল; হয়নি ভীত ও অস্থির।
সকল মানুষ আপনার ব্যাপারে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের উপর। কেবল তরবারি ও বর্শার ডগা ছাড়া আমাদের কোন আশ্রয় নেই।
আমরা প্রতিপক্ষের মুকাবিলা করি বীরত্বের সাথে এক্ষেত্রে কারও প্রতি করি না কৃপা।
আমরা নষ্ট করি না সূরাসমূহের প্রত্যাদেশ। যুদ্ধাপরাধীরা আমাদের মজলিসকে করে না উত্তেজিত
যখন সমরানল লেলিহান হয়ে ওঠে, তখন আমরাও জ্বলে উঠি প্রচণ্ডভাবে।
বদর যুদ্ধে মুনাফিকরা যা চেয়েছিল আমরা তা করি নস্যাৎ। আর আমাদের ভাগে আসে জয়মাল্য।
উহুদ পর্বতের পাদদেশে যে যুদ্ধ হয়, তাতে আমরাই ছিলাম আপনার সৈনিক, যখন মুদার গোত্র গর্বোদ্ধত হয়ে বিভিন্ন সেনাদল করে সংগ্রহ।
আমরা দুর্বল হইনি, ভীত হইনি, পায়নি কেউ আমাদের থেকে কোন স্খলন, যখন আর সকলেরই ঘটেছিল পদস্খলন
ইবন হিশাম বলেন: আমার নিকট যিয়াদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমার নিকট বর্ণনা করেন ইবন ইসহাক এবং তিনি বলেন, আমার নিকট আসিম ইবন উমর ইবন কাতাদা (র) মাহমূদ ইব্‌ন লাবীদ (র) হতে এবং তিনি আবু সাঈদ খুদরী (রা) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) উক্ত মালামাল হতে যখন কুরায়শ ও অন্যান্য আরব গোত্রসমূহকে যা দেওয়ার দিলেন এবং আনসার সম্প্রদায় তা হতে কিছুই পেল না, তখন তাদের অন্তরে ব্যথা লাগে এবং এ নিয়ে তাদের পক্ষ হতে ক্রমে কথা বাড়তে থাকে। এমনকি তাদের এক ব্যক্তি এ পর্যন্ত বলল যে, আল্লাহ্র কসম, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার সম্প্রদায়ের সাথে মিলে গিয়েছেন। তখন সা'দ ইবন উবাদা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করলেন এবং তাকে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যুদ্ধলব্ধ মালামালের ক্ষেত্রে আপনি যে নীতি অবলম্বন করেছেন, তাতে আনসারদের এই গোত্রটি আপনার উপর মনে কষ্ট পেয়েছে। আপনি আপনার সম্প্রদায়ের মাঝে তা বণ্টন করেছেন। আরবের অন্যান্য গোত্রেকেও বিপুল পরিমাণ দিয়েছেন। কিন্তু আনসারগণ তা হতে কিছুই পায়নি।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: এ ব্যাপারে তোমার কী অভিমত হে সা'দ? তিনি বললো: আমি আমার সম্প্রদায়ের তো একজন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি তোমার সম্প্রদায়কে আমার সামনে সমবেত কর।
আবু সাঈদ (রা) বলেন: সা'দ ইব্‌ন্ন উবাদা (রা) তখনই বের হয়ে গেলেন এবং আনসারদেরকে সেইস্থানে একত্র করলেন। কিছু সংখ্যক মুহাজিরও সেখানে উপস্থিত হলেন। সা'দ তাদের কিছুই বললেন না। এরপর অন্যান্য সম্প্রদায়ের কিছু লোকও সেখানে আসল, কিন্তু সা'দ (রা) তাদের বের করে দিলেন। সকলে সমবেত হয়ে গেলে সা'দ (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হলেন এবং বললেন: আনসারগণ আপনার জন্য সমবেত হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের সামনে উপস্থিত হলেন। তারপর আল্লাহ্ তা'আলার যথাযোগ্য প্রশংসা ও স্তুতি জ্ঞাপনের পর তিনি বললেন:
يا معشر الانصار ما قالة بلغتني منكم وجدة وجدتموها على في انفسكم ؟ الم أتكم ضلالا فهداكم الله وعالة فاغناكم الله واعداء فالف الله بين قلوبكم ؟
'হে আনসার সম্প্রদায়! এটা তোমাদের কীরূপ উক্তি, যা আমার কানে এসেছে? তোমরা নাকি আমার প্রতি মনে কষ্ট পেয়েছ? আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট পাইনি, এরপর আল্লাহ্ তোমাদের সুপথ দেখালেন? তোমরা কি দরিদ্র ছিলে না, এরপর আল্লাহ্ তোমাদের অভাব মোচন করেছেন? তোমরা কি পরস্পর শত্রু ছিলেন না, এরপর আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের অন্তরে ভালবাসা সঞ্চার করেছেন?
আনসারগণ উত্তর দিলেন : بلی الله ورسوله امن وافضل निश्चयই! আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল করুণাময় ও শ্রেষ্ঠতম।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : الا تجيبونني يا معشر الانصار 'তোমরা কি আমার কথার জবাব দেবে না, হে আনসার সম্প্রদায়?
بما ذا نجيبك يارسول الله لله ولرسوله المن والفضل : Gal freea pata জবাব দেব ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সকল অনুগ্রহ ও শ্রেষ্ঠত্ব আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন:
اما والله لو شئتم لقلتم فلصدقتم والصدقتم : اتيتنا مكذبا فصدقناك ومخذولا فنصرتك وطريد افاويناك وعائلا فأسيناك أوجدتم يا معشر الانصار في انفسكم في العاعة من الدينا تألفت بها قوما ليسلموا ووكلتكم الى اسلامكم الا ترضون با معشر الانصار ان يذهب الناس بالشاة والبعير وترجعوا برسول الله الى رحالكم فوالذي نفس محمد بيده لولا الهجرة لكنت أمراً من الانصار ولو سلك الناس شعبا وسلكت الانصار شعبا لسلكت شعب الانصار اللهم ارحم الانصار وابناء الانصار وابناء ابناء الانصار -
শোন, আল্লাহ্র কসম! তোমরা ইচ্ছা করলে আমাকে বলতে পার এবং তাতে তোমরা সঠিকই বলবে এবং তা মেনেও নেওয়া হবে; তোমরা বলতে পার : আপনি আমাদের নিকট এসেছেন প্রত্যাখ্যাত হয়ে, আমরাই আপনার উপর ঈমান এনেছি। আপনি অসহায় ছিলেন, আমরা আপনার সাহায্য করেছি। আপনি বিতাড়িত ছিলেন, আমরা আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি এবং আপনি নিঃস্ব ছিলেন, আমরা আপনার অভাব দূর করেছি। হে আনসার সম্প্রদায়! তোমরা এই পার্থিব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে গেলে? আমি এর দ্বারা একদল লোককে খুশি করতে চেয়েছি, যাতে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। তোমাদের ইসলামের প্রতি তো আমার আস্থা আছে। হে আনসার সম্প্রদায়, তোমরা কি এতে খুশি নও যে, আর সব লোক তো ছাগল-উট নিয়ে ফিরে যাচ্ছে, আর তোমরা দেশে ফিরে যাবে আল্লাহ্র রাসূলকে নিয়ে? সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, হিজরতের বিষয়টি না হলে আমি আনসারদেরই একজন হতাম। সব মানুষ যদি এক পথে চলে, আর আনসারগণ চলে ভিন্ন পথে, তা হলে আমি আনসারদেরই পথে চলব। হে আল্লাহ্! তুমি আনসারদের প্রতি রহমত বর্ষণ কর, আনসারদের সন্তানদের প্রতিও এবং আনসারদের সন্তানদের বংশধরদের প্রতিও।
তাঁর এ ভাষণে আনসারগণ এত কাঁদলেন যে, তাদের দাঁড়ি ভিজে গেল। তারা সমস্বরে বলে উঠলেন : رضينا برسول الله قسما وحظا এই ভাগ ও হিস্যা বণ্টনে আমরা আল্লাহ্ রাসূলকে নিয়েই সন্তুষ্ট। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) চলে গেলেন এবং সভা শেষ হয়ে গেল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00