📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 তায়েফ যুদ্ধের শহীদান

📄 তায়েফ যুদ্ধের শহীদান


ইবন ইসহাক বলেন: তায়েফের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে শরীক থেকে যেসব মুসলিম শাহাদতবরণ করেন, নিম্নে তাদের নাম উল্লেখ করা হলো:
কুরায়শ গোত্রের শাখা বনু উমাইয়া ইব্‌ন আব্দ শাসের সাঈদ ইব্‌ন সাঈদ ইব্‌ন আস ইবন উমাইয়া (রা) এবং তাদের মিত্র আসাদ ইব্‌ন আওস গোত্রীয় উরফতা ইবন জান্নাব (রা)।
ইবন হিশام বলেন: উরফুতার পিতার নাম হুবাবও বলা হয়ে থাকে।
ইবন ইসহাক বলেন: তায়ম ইব্‌ন মুরা গোত্রের আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবু বকর সিদ্দীক (রা)। তিনি একটি তীরবিদ্ধ হয়েছিলেন এবং তারই ফলে মদীনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ওফাতের পর ইন্তিকাল করেন।
বনূ মাখযূমের আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ উমাইয়া ইব্‌ন মুগীরা। তিনি এ যুদ্ধে একটি তীরবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
বনূ আদী ইব্‌ন কা'বের মিত্র আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আমির ইবন রবী'আ (রা)।
বনূ সাহম ইব্‌ন আয়ের সাইব ইবন-হারিছ ইব্‌ন কায়স ইব্‌ন আদী (রা) ও তার ভাই আবদুল্লাহ্ ইবন হারিছ (রা)।
এবং বনূ সা'দ ইব্‌ন লায়ছের জুলায়হা ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা)।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আরও আনসারদের মধ্যে শাহাদত লাভ করেন নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গ

📄 আরও আনসারদের মধ্যে শাহাদত লাভ করেন নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গ


আর আনসারদের মধ্যে শাহাদত লাভ করেন নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গ
বনূ সালিমা-এর সাবিত ইন-জাযা' (রা)।
বন্ মাযিন ইব্‌ নাজ্জার-এর হারিস ইন সাহল ইব্‌ন আবূ সা'সা'আ (রা)।
বনূ সাঈদা-এর মুনযির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা)।
এবং আওস গোত্রীয় রুকায়ম ইন্ন সাবিত ইন্ন ছালাবা ইন্ন যায়দ ইব্‌ন লাওযান ইন্ন মু'আবিয়া (রা)।
সুতরাং তায়েফে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মোট বারজন সাহাবী শাহাদত লাভ করেন। তন্মধ্যে সাতজন কুরায়শ গোত্রের, চারজন আনসার সম্প্রদায়ের এবং একজন বনূ লায়ছের।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হুনায়ন ও তায়েফ সম্পর্কে বুজায়র ইবন যুহায়রের কাসীদা

📄 হুনায়ন ও তায়েফ সম্পর্কে বুজায়র ইবন যুহায়রের কাসীদা


তায়েফের যুদ্ধ ও অবরোধের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন, তখন হুনায়ন ও তায়েফের স্মরণে বুজায়র ইব্‌ন যুহায়র ইব্‌ন আবূ সুলামী বলেন:
হুনায়ন, আওতাস ও আব্রাকে যুদ্ধ চলে একটির পর আরেকটি।
হাওয়াযিন বিভ্রান্তিবশত সংগ্রহ করে বিশাল বাহিনী, কিন্তু তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল ছিন্নভিন্ন পাখির মত।
তারা আমাদের হাত থেকে একটি স্থানও রক্ষা করতে পারলো না, কেবল তাদের প্রাচীর ও গর্ত ছাড়া।
আমরা তাদের মুখোমুখি হই, যাতে তারা বের হয়ে আসে, কিন্তু তারা অবরুদ্ধ ফটকের ভিতর দুর্গের আশ্রয় নিল।
অবশেষে নিরুপায় হয়ে তাদের ফিরে আসতেই হলো মৃত্যুবাহী চকমকে অস্ত্রধারী রণোন্মত্ত বিশাল বাহিনীর সামনে।
হরিৎ বর্ণ ঘননিবদ্ধ সে বাহিনীকে যদি নিক্ষেপ করা হত হাদান পর্বতের উপর, তা হলে তা হয়ে যেত সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন।
তারা হেলেদুলে চলছিল ঠিক হারাস ঘাসের উপর বিচরণকারী বাঘের মত।
যেন আমরা একপাল অশ্ব, যারা পেছনের পা সামনের পায়ের স্থানে একই সাথে করে স্থাপিত, আর ক্ষণে বিচ্ছন্ন হয়, আবার শ্রেণীবদ্ধ।
তারা ছিল এমন সব সুদৃঢ় বর্মে সজ্জিত যে, অশ্বারূঢ় অবস্থায় তাদের মনে হচ্ছিল একটা জলাশয়ের মত, বাতাসে যার পানি তরঙ্গায়িত।
সে বর্মের বাড়তি অংশ আমাদের জুতা স্পর্শ করছিল আর তা ছিল দাউদ ও মুহাররিক পরিবারের হাতে বোনা।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হাওয়াযিন গোত্রের কাছ থেকে পাওয়া যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, তাদের বন্দী, যাদের চিত্তজয় করা উদ্দেশ্য ছিল তাদের অংশ এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রদত্ত উপহার উপঢৌকনের বৃত্তান্ত

📄 হাওয়াযিন গোত্রের কাছ থেকে পাওয়া যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, তাদের বন্দী, যাদের চিত্তজয় করা উদ্দেশ্য ছিল তাদের অংশ এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রদত্ত উপহার উপঢৌকনের বৃত্তান্ত


তায়েফ হতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) দাহনা¹ হয়ে জি'ইব্রানায় এসে থামলেন। সঙ্গে তার সাহাবিগণ এবং হাওয়াযিনের বহু সংখ্যক বন্দী।
বনু সাকীফ হতে প্রত্যাবর্তনকালে এক সাহাবী তাঁকে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তাদের প্রতি অভিসম্পাত করুন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: হে আল্লাহ্! বনূ সাকীফকে হিদায়াত দান করুন এবং তাদের এনে দিন।
জি'ইব্রানায় হাওয়াযিনের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করলো। তাঁর কাছে হাওয়াযিনের বন্দী নারী ও শিশুদের সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। আর উট ও ছাগল ছিল অসংখ্য।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আমর ইব্‌ন শু'আয়ব বর্ণনা করেছেন তার পিতা হতে, দাদা আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আমার (র)-এর সূত্রে যে, হাওয়াযিনের প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণপূর্বক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করলো। তারা বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা তো একই মূল ও কুল হতে উদ্ভূত। আমরা যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছি তা আপনার অজানা নয়। আপনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন; আল্লাহ্ তা'আলা আপনার প্রতি অনুগ্রহ করবেন।
বর্ণনাকারী বলেন: হাওয়াযিনের শাখা সা'দ ইব্‌ন বকর গোত্রীয় আবূ সুরাদ যুহায়র নামক এক ব্যক্তি উঠে বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ওই খোয়াড়ে রয়েছে আপনার ফুফু, খালা ও দুধমাতাগণ, যারা আপনার সযত্ন লালন-পালন করেছিলেন। আমরা হারিস ইব্‌ন আবূ শিমর কিংবা নু'মান ইব্‌ন মুনযিরকে দুধ পান করালে পরে সে আপনার মত আমাদের উপর অভিযান চালালে, যেমন আপনি চালালেন; তা হলে আমরা তার অনুগ্রহ ও করুণার আশা করতে পারতাম। আর যাদের লালন-পালন করা হয়, তাদের মধ্যে আপনি শ্রেষ্ঠতম।
ইবন হিশাম বলেন: বর্ণনান্তরে আছে আমরা যদি হারিছ ইব্‌ন আবূ শিমর বা নু'মান ইব্‌ন মুনাযিরের সাথে একত্রে দুধপান করতাম।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আমর ইবন মু'আয়ব তার পিতা হতে তার দাদা আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আমর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
এ কথার জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমাদের কাছে সন্তান-সন্ততি ও নারীগণ অধিক প্রিয়, না তোমাদের মালামাল? তারা বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। আপনি আমাদের মালামাল ও স্ত্রী-পুত্র-এর যে কোন একটি বেছে নিতে বলছেন, তা আপনি আমাদের স্ত্রী-পুত্রদেরই আমাদের হাতে ফিরিয়ে দিন। তারাই আমাদের কাছে বেশি প্রিয়। তিনি তাদের বললেন: আমার আর বনূ মুত্তালিবের যা কিছু আছে তা তোমাদের। আমি যখন লোকদের নিয়ে জুহরের সালাত আদায় করব, তখন তোমরা দাঁড়িয়ে বলো, আমরা মুসলিমদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সুপারিশ কামনা করি এবং মুসলিমদের কাছে অনুরোধ তারাও যেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আমাদের সন্তান-সন্ততি ও নারীদের জন্য সুপারিশ করে। তখন আমি তা তোমাদের দেব এবং তোমাদের জন্য সুপারিশ করব।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন লোকদের নিয়ে জুহরের সালাত আদায় করলেন, তখন তারা দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশ মত উক্ত কথা বললো। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমার আর বনু আবদুল মুত্তালিবের যা হিস্যা তা তোমাদের দেওয়া গেল। তখন মুহাজিরগণ বললেন: আমাদের যা-কিছু তা তো আল্লাহ্র রাসূলেরই। আনসারগণ বললেন: আমাদের সবও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য। কিন্তু আকরা' ইবন হাবিস বললেন: আমি ও বনূ তামীম এতে একমত নই। উয়ায়না ইবন হিস্স্ন বললেন: আমার ও বনূ ফাযারার কথাও তাই। আব্বাস ইব্‌ন মিরদাস বললেন, আমার ও বনূ সুলায়মেরও সেই কথা। বনূ সুলায়ম বলে উঠলো, কখনও নয়; আমাদের হিস্যাও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য।
বর্ণনাকারী বলেন: তখন আব্বাস ইব্‌ন মিরদাস বনূ সুলায়মকে বললেন, তোমরা আমাকে অপমান করলে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: এই বন্দীদের থেকে তোমাদের যে কেউ তার অংশ রেখে দিতে চায়, তাকে প্রতি একটি লোকের বদলে আগামীবারের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হতে ছয়টি করে হিস্যা দেওয়া হবে। কাজেই তোমরা লোকদেরকে তাদের স্ত্রী-পুত্রদের ফিরিয়ে দাও।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আবূ ওয়াজ্যাহ ইয়াযীদ ইবন উবায়দ সা'দী বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে একটি বাঁদী দিয়েছিলেন। তার নাম রায়তা বিনত হিলাল ইবন হায়‍্যান ইবন উমায়রা ইবন হিলাল ইব্‌ন নাসিরা ইব্‌ন কুসায়‍্যা ইব্‌ নাস্ত্র ইবন সা'দ ইব্‌ন বকর। উসমান ইবন আফফান (রা)-কে দিয়েছিলেন যয়নাব বিন্ত হায়‍্যান ইব্‌ন আমর ইবন হায়‍্যান নাম্নী একটি বাঁদী। উমর ইবন খাত্তাব (রা)-কেও একটি বাঁদী দিয়েছিলেন। তিনি সেটি তার পুত্র আবদুল্লাহ্ (রা)-কে দিয়েছেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম নাফি' (র) আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি তাকে বাঁদীটিকে বনূ জুমাহের কাছে আমার মামাদের ওখানে পাঠিয়ে দিলাম, যাতে তারা তাকে আমার উপযুক্ত করে তোলে এবং তাকে তৈরী করে দেয়। ইচ্ছা ছিল তাওয়াফ শেষে তাদের কাছে যাব এবং সে বাঁদীর সাথে মিলিত হব। ইবন উমর (রা) বলেন: তাওয়াফ শেষে আমি মসজিদ থেকে বের হয়েই দেখি সব লোক ব্যস্তসমস্ত। আমি বললাম: তোমাদের অবস্থা কী? তারা বললো: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের স্ত্রী-পুত্রদের ফেরত দিয়ে দিয়েছেন। আমি বললাম: তোমাদের সেই মেয়েটি তো বনূ জুমাহের হিফাজতে আছে। তোমরা গিয়ে তাকে নিয়ে আস। তারা সেখানে গেল এবং তাকে নিয়ে নিল।
ইবন ইসহাক বলেন: আর উয়ায়না ইন্ন হিস্নের বৃত্তান্ত এই যে, তিনি হাওয়াযিনের এক বৃদ্ধাকে হস্তগত করলেন। তাকে ধরার সময় তিনি বললেন, একে দেখছি বৃদ্ধা এবং আমার ধারণা গোত্রের মাঝে এর বিশেষ আভিজাত্য আছে। আশা করা যায় এর মুক্তিপণ হবে অনেক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন ছয়গুণ বেশী হিস্যার বিনিময়ে বন্দীদের ফিরিয়ে দিলেন, তখন উয়ায়না সে বৃদ্ধাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করলেন। যুহায়র আবূ সুরাদ তাকে বললেন: ছয়গুণ নিয়েই তাকে ছেড়ে দাও। কসম আল্লাহ্! এর মুখ কমনীয় নয়, স্তন উন্নত নয়, গর্ভ সন্তান ধারণে সক্ষম নয়, স্বামী ব্যথিত নয় এবং এর পর্যাপ্ত দুধও নাই। যুহায়রের একথায় তিনি ছয়গুণের বদলেই তাকে ছেড়ে দিলেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, উয়ায়না অতঃপর আকরা' ইবন হাবিসের সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাকে ঘটনা জানান। আকরা' বললেন: আল্লাহর কসম! তুমি কোন মধ্য বয়সী রূপসীকে ধরনি, কিংবা নরম শরীরের মোটাতাজা মহিলাকেও নয়।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাওয়াযিন প্রতিনিধিবর্গের কাছে মালিক ইব্‌ন আওফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, সে কোথায় কী করছে। তারা বলল, সে তায়েফে বনূ সাকীফের কাছে আছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তোমরা মালিককে বল, সে যদি ইসলাম গ্রহণ করে আমার কাছে আসে, তা হলে আমি তার পরিবারবর্গ ও মালামাল তাকে ফেরত দিয়ে দেব। অধিকন্তু তাকে একশ' উটও দেব। মালিককে এ সংবাদ দেওয়া হল। তিনি তায়েফ হতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লেন। তার আশংকা ছিল বনূ সাকীফ যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উক্ত কথা জানতে পারে, তা হলে তারা তাকে আটকে রাখবে। কাজেই তিনি তার উট প্রস্তুত করতে বললেন। তা প্রস্তুত করা হল। তিনি তার ঘোড়াটিকে তায়েফে এনে রাখতে বললেন। তাও এনে রাখা হল। তিনি রজনীযোগে বের হয়ে সে ঘোড়ায় সওয়ার হলেন এবং তাকে হাঁকিয়ে যেখানে উট বেঁধে রাখতে বলেছিলেন, সেখানে এসে তাতে সওয়ার হলেন। এভাবে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে চলে আসলেন। তিনি তাঁকে পেয়ে ছিলেন জি'ইব্রানা অথবা মক্কায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার পরিবারবর্গ ও মালামাল ফেরত দিয়ে দিলেন এবং অতিরিক্ত একশ' উট দিলেন। মালিক ইসলাম গ্রহণ করলেন। তার ইসলাম গ্রহণ ছিল নিষ্ঠাপূর্ণ। ইসলাম গ্রহণকালে মালিক বলেছিলেন:
আমি মানুষের মাঝে তার মত আর দেখিনি, শুনিনি। সমগ্র মানবের মাঝে নাই তার তুলনা।
তিনি অনুগ্রহপ্রার্থীকে দান করেন পূর্ণ মাত্রায়। তুমি যখনই চাইবে তোমাকে জানিয়ে দেবে ভবিতব্য।
যখন সৈন্যদল বর্শা ও তরবারি দ্বারা প্রদর্শন করে প্রচণ্ড দাপট, তখন তিনি গর্জে ওঠেন সেই সিংহের মত যে নিজ খাঁটিতে শাবকদের রক্ষার্থে ওঁত পেতে আছে শত্রুর উদ্দেশে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে তার সম্প্রদায়ের নও-মুসলিমদের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। সেই সাথে ছুমালা, সালিমা ও ফাহ্‌ম গোত্রেগুলোকেও তাঁর অধীন করে দেন। তারা তাঁর অধীনে বনু ছাকীফের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। তাদের যে কোনও কাফেলা বের হত, মালিক তার উপর আক্রমণ চালিয়ে দিতেন। এভাবে তিনি তাদের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন করে তোলেন। এ সম্পর্কে আবূ মিহজান ইবন হাবীব ইন্ন আমর ইবন উমায়র সাকাফী আবৃত্তি করে:
আমাদের দিকে অগ্রসর হতে শত্রুরা ছিল সন্ত্রস্ত, এখন বনূ সালিমাও আমাদের উপর চড়াও হয়।
মালিক তাদের নিয়ে আমাদের উপর হামলা চালায়। সে ভংগ করেছে প্রতিশ্রুতি আর নিষিদ্ধ সীমারেখা।
তারা আমাদের ঘর-বাড়িতে এসে হানা দেয়, অথচ আমরাই ছিলাম এক সময় শাস্তিদাতা।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা) হুনায়নের বন্দীদেরকে তাদের লোকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ শেষ করে সওয়ারীতে চড়ে বসলেন। সংগীরাও তাঁর অনুসরণ করল এবং তারা বলতে লাগলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ! উট, ছাগল প্রভৃতি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আমাদের মাঝে বণ্টন করে দিন। এই করতে করতে তারা তাঁকে একটি গাছের নীচে নিয়ে এল এবং তারা তাঁর চাদর টেনে নিল। তিনি বললেন: লোকসব! তোমার আমার চাদর দিয়ে দাও। আল্লাহর কসম! তিহমায় যতগুলো গাছ আছে, তত সংখ্যক উটও যদি তোমাদের হয়ে থাকে, তবু তা আমি তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দেব। তোমরা আমাকে কৃপণ, ভীরু কিংবা মিথ্যুক পাবে না। এরপর তিনি একটি উটের পাশে দাঁড়ালেন এবং তার কুঁজ হতে একটি পশম তুলে দুই আংগুলের মাঝে রাখলেন, এরপর তা উপরে তুলে বললেন: হে লোক সকল! আল্লাহ্র শপথ! খুমুস (এক-পঞ্চমাংশ) ব্যতীত তোমাদের এই যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হতে আমি এই পশমটাও নেব না। আর খুমুস তো শেষ পর্যন্ত তোমাদের মাঝেই বিতরণ করা হয়। অতএব তোমরা সুঁই-সূতা সহ সবকিছু জমা দিয়ে দাও। গনীমতের মালে খিয়ানত কিয়ামতের দিন খিয়ানতকারীর পক্ষে বড়ই লজ্জার বিষয় হবে এবং তা হবে তার জন্য আগুন ও চরম লাঞ্ছনা।
একথা শুনে জনৈক আনসার এক বাণ্ডিল পশমের সূতা এনে বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি আমার উটের গদি বানানোর জন্য এটা নিয়েছিলাম।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমার ভাগে যতটুকু পড়বে তা তুমি নিয়ে নিও।
তখন সে আনসার বললো: অবস্থা যদি এই হয়, তা হলে এর কোন প্রয়োজন আমার নাই। এই বলে সে তা হাত থেকে ফেলে দিল।
ইবন হিশাম বলেন: যায়দ ইব্‌ন আসলাম তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, হুনায়নের যুদ্ধের দিন আকীল ইব্‌ন আবু তালিব তার স্ত্রী ফাতিমা বিন্ত শায়বা ইন্ন রবী'আর নিকটে উপস্থিত হন। তখন তার তরবারি রক্তরঞ্জিত ছিল। ফাতিমা বললেন: আমি বুঝে ফেলেছি, তুমি মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করেছ। তা কতটুকু গনীমত পেয়েছ? তিনি বললেন: এই সুঁইটা। এর দ্বারা তোমার কাপড়-চোপড় সেলাই করতে পারবে। এই বলে তিনি সুঁইটা তাকে দিয়ে দিলেন। এমনি মুহূর্তে শুনতে পেলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ঘোষক ঘোষণা করছে, কেউ কিছু নিয়ে থাকলে তা জমা দিয়ে দিক, এমন কি সুঁই-সূতা পর্যন্ত। আকীল ফিরে এসে স্ত্রীকে বললেন: যা দেখছি তোমার সুইও গেল। তিনি সুইটা নিয়ে গনীমতের মাঝে ফেলে দিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুআল্লাফাতুল কুলুব¹ (যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা উদ্দেশ্য, তাদের)-কে কিছু কিছু করে দেন। এরা ছিল অভিজাত শ্রেণীর লোক। তিনি তাদের অন্তর জয়ের চেষ্টা করতেন এবং তাদের মাধ্যমে তাদের গোত্রীয় লোকদের মন জয় করতেন। সুতরাং তিনি আবু সুফিয়ান ইব্‌ন্ন হারবকে একশ' উট, তাঁর পুত্র মু'আবিয়াকে একশ' উট, হাকীম ইবন হিযামকে একশ' উট এবং বনূ 'আব্দুদদার-এর হারিস ইন্ন হারিছ ইব্‌ন কালাদাকেও একশ' উট প্রদান করেন।
ইবন হিশাম বলেন: (হারিস ইবন হারিস নয়; বরং) নুসায়ব ইবন হারিস ইন কালাদা। তবে তার নাম হারিসও হতে পারে।
ইবন ইসহাক বলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) হারিস ইন হিশامকে একশ' উট, সুহায়ল ইন উমরকে একশ' উট, হুওয়াতিব ইব্‌ন আবদুল-উয্যা ইব্‌ন আবূ কায়সকে একশ উট এবং আলা ইন্ন জারিয়া সাকাফীকেও একশ' উট প্রদান করেন। আলা ছিল বনূ যুহরার মিত্র। অনুরূপ উয়ায়না ইব্‌ন হিস্স ইবন হুযায়ফা ইন্ন বদরকে একশ' উট, আকরা' ইবন হাবিস তামীমীকে একশ' উট, মালিক ইব্‌ন আওফ নাসরীকে একশ' উট এবং সাওয়ান ইবন উমাইয়াকেও একশ' উট দিয়েছিলেন। এরা সবাই ছিল একশ' উটপ্রাপ্তের অন্তর্ভুক্ত।
কুরায়শদের কতিপয় লোককে তিনি একশ'র কম উট দিয়েছিলেন। যেমন মাখরামা ইব্‌ন নাওফাল যুহরী (রা), উমায়র ইব্‌ন ওয়াহাব জুমাহী (রা), বনূ আমির ইব্‌ন লুআইয়ের হিশাম ইবন আম্র (রা)। তাদেরকে কী পরিমাণ দিয়েছিলেন, তা আমার জানা নেই, তবে এতটুকু জানি যে, তা একশ'র নীচে ছিল।
এ ছাড়া সাঈদ ইব্‌ন ইয়ারবূ' ইব্‌ন আনকাছা ইবন আমির ইবন মাখযূমকে পঞ্চাশটি উট এবং সাহমীকেও পঞ্চাশটি উট প্রদান করেন।
ইবন হিশাম বলেন: সাহমীর নাম ছিল আদী ইবন কায়স।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আব্বাস ইব্‌ন মিরদাসকে কয়েকটি উট দিয়েছিলেন।
তার পরিমাণ কম হওয়ার কারণে সে চটে যায় এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে নিম্নের কবিতাটি রচনা করে:
এই যুদ্ধলব্ধ মাল তো আমিই অর্জন করেছি, সমতল ভূমিতে ঘোড়ার পিঠে আক্রমণ চালিয়ে।
ঘুমন্ত সম্প্রদায়কে আমিই রাখি জাগ্রত, তারা ঘুমিয়ে পড়লেও আমি হইনি নিদ্রালু।
পরিণামে আমার হিস্যা আর (আমার অশ্ব) উবায়দের হিস্যা বণ্টন হয় উয়ায়না ও আকরা'র মাঝে।
অথচ রণক্ষেত্রে আমি ছিলাম সম্প্রদায়ের রক্ষক। কিন্তু আমাকে দেওয়া হলো না, আবার করা হল না বঞ্চিতও।
আমি প্রাপ্ত হলাম কয়েকটা ছোট ছোট উট, তার পদচুতষ্টয়ের সমসংখ্যক।
কোন সভা-সমিতিতে (উয়ায়নার পিতা) হিস্স আর (আকরা'র পিতা) হাবিস, বেশী সম্মান পেত না, আমার পিতা অপেক্ষা।
আমি নিজেও ব্যক্তি হিসাবে নই তাদের নীচে। আর আজ যাকে নীচে নামান হচ্ছে সে উপরে উঠবে না কোনও দিন।
ইবন হিশাম বলেন: ইউনুস নাহবী আমাকে এরূপ আবৃত্তি করে শুনিয়েছেন: হিস্স ও হাবিস কোন সভা-সমিতিতে মিরদাসের উপরে স্থান পেত না।
ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমরা যাও এবং আমার পক্ষ হতে তার জিহ্বা স্তব্ধ করে দাও। সুতরাং তারা তাকে আরও দিলেন। অবশেষে সে সন্তুষ্ট হল। আর এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ঈপ্সিত তার জিহ্বা কর্তন।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: জনৈক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, আব্বাস ইব্‌ন মিরদাস রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হলে, তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমিই কি বলেছ- فاصبح نهبي ونهب العبيد بين الاقرع وعيينة আমার অংশ এবং উবায়দের অংশ বণ্টন হয়ে গেল-আকরা' ও 'উয়ায়নার মাঝে'?
আবূ বকর সিদ্দীক (রা) বললেন : بين والاقرع وعيينة নয় বরং بين عيينة والاقرع
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: উভয়টি একই। তখন আবূ বকর (রা) বললেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ঠিক তেমনই, যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন- وما علمناه الشعروما ينبغى له 'আমি তাকে কবিতা শিক্ষা দেইনি এবং সেটা তার জন্য শোভনও নয়'।

টিকাঃ
১. তায়েফের একটি জায়গার নাম।
১. যে অমুসলিমের ইসলাম গ্রহণ করার আশা আছে, কিংবা যে অমুসলিমকে কিছু দিলে তার ইসলামের প্রতি বিশ্বাস আরও দৃঢ় হওয়ার আশা আছে, এরূপ ব্যক্তিবর্গ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00