📄 আব্বাস ইব্ন মিরদাস হুনায়নের যুদ্ধ সম্পর্কে আরও বলেন
ওহে উম্মু ফারওয়া! যদি দেখতে আমাদের তাজী ঘোড়াগুলো। কোনটি ছিল সওমারীহীন; যাকে নেওয়া হচ্ছিল টেনে, কোনটি খোঁড়া। উপর্যুপরি যুদ্ধ ওদের করেছে ক্লান্ত, ক্ষতস্থান হতে নির্গত হচ্ছে অনবরত রক্তধারা। কত নারী এখন বলছে, আমাদের দাপট তাদের শান্তি দিয়েছে, যুদ্ধের কঠিন ঘাত হতে, করেছে তাকে শংকামুক্ত। প্রথম সেই প্রতিনিধিদলের মত আর প্রতিনিধি দল নাই, তারা আমাদের জন্য মুহাম্মদের রজ্জুতে দিয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। প্রতিনিধি হয়ে এসেছিল আবূ কুতন হুযাবা আর ছিল আবুল-গুয়ূস, ওয়াসি ও মিকনা। তিনি নিয়ে এসেছিলেন একশ' সৈন্য, ফলে নয়শ' পৌছুলো হাজারের কোঠায়। বনু আওফ ও মুখাশিনের দল জোগায় আরও ছয়শ সেই সাথে খুফাফ গ্রোত্র চারশত। নবী যখন আমাদের হাজার সৈন্যের সহযোগিতায় হলেন জয়ী, তুলে দিলেন আমাদের হাতে আন্দোলিত পতাকা। সে পতাকাতলে আমরা করলাম জয়লাভ। তার দায়িত্ব অর্পিত হল এক মহানুভব ব্যক্তিত্বের উপর, যার নেতৃত্ব ছিল অব্যাহত।
যে দিন আমরা মক্কা উপত্যকায় ছিলাম নবীর পার্শ্বে তার এক ডানা স্বরূপ, যখন আন্দোলিত হচ্ছিল বর্শা। যে ছিল আমাদের প্রতিপালকের দিকে প্রকৃত আহবানকারীর ডাকের এক সাড়া বিশেষ।
আমাদের মধ্যে কেউ ছিল শিরস্ত্রাণবিহীন, কেউ বা শিরস্ত্রাণ পরিহিত। কারও পরিধানে ছিল বাছাইকৃত বড়-সড় বর্ম, লোহার তারে যা বুনেছিল দাউদ ও তুব্বা।¹
হুনায়নের দুই কুয়ার পাদদেশে ছিল আমাদের বাহিনী, যারা ঘোর মুনাফিকের মস্তক করে চূর্ণ, আর যারা ছিল অবিচল পাহাড়ের মত।
আমাদের দ্বারা নবী হন সাহায্যপ্রাপ্ত। বস্তুত আমরা এমন এক দল যে, যে কোন জরুরী অবস্থায় আসি উপকার-অপকারে। আমরা সেদিন বর্শা দ্বারা হাওয়াযিনকে করি প্রতিহত।
উৎক্ষিপ্ত ধূলায় আমাদের তাজী ঘোড়া হয়েছিল সমাচ্ছন্ন।
যখন নবী তাদের দাপটে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন, আর তারা ধেয়ে এসেছিল সুগঠিত নাহিনী নিয়ে, যার তেজে সূর্যও প্রায় হয়ে যাচ্ছিল নিষ্প্রভ।
তখন ডাকা হয়েছিল বনু জুশামকে, আর তার মাঝে নাসরের সকল শাখা-শাখাকে, যখন চলছিল বর্শা বৃষ্টি।
অবশেষে নবী মুহাম্মদ (সা) বললেন: হে বনূ সুলায়ম! তোমরা তোমাদের ওয়াদা পূর্ণ করেছ, এবার ক্ষান্ত হও।
আমরা চলে গেলাম। আমরা না থাকলে তাদের শক্তিমত্তা ক্ষতি সাধন করতে পারত মু'মিনদের এবং বাঁচাতে পারত যা তারা করেছিল অর্জন。
টিকাঃ
১. তুব্বা-ইয়ামানের প্রাচীন বাদশাহদের উপাধি।
📄 আব্বাস ইব্ন মিরদাস আরও বলেন
উম্মু মুআম্মালের সাথে বাকি সম্পর্কও ঘুচে গেল অবশেষে, তার ইচ্ছা গেছে পাল্টে, করেছে ওয়াদা ভঙ্গ, আল্লাহর নামে শপথ করেছিল সে বন্ধন করবে না ছিন্ন সে সততার পরিচয় দেয়নি, করেনি অংগীকার রক্ষা।
সে বনূ খুফাফের সন্তান, যারা গ্রীষ্মকাল কাটায় বাতনুল আকীকে। আর যাযাবর শ্রেণীর মাঝে ওয়াজরা ও উরাফায় করে যাতায়াত।
উম্মু মুআম্মাল যদিও কাফিরদের অনুসরণ করে, আর তার ও আমার মাঝে রয়েছে ঢের দূরত্ব, তবু আমার হৃদয়ে সে করেছে গভীর অনুরাগ সৃষ্টি।
শীঘ্রই বার্তাবাহী তাকে জানাবে, আমরা কুফ্র করেছি পরিত্যাগ। আমাদের প্রতিপালক ছাড়া চাই না কারও সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে।
আমরা পথ-প্রদর্শক নবী মুহাম্মাদের পক্ষে। আমাদের সঙ্গে হাজার সৈন্য, যা পারেনি দেখাতে আর কোন দল।
বনূ সুলায়মের সত্যনিষ্ঠ বীর জওয়ানরা ছিল সাথে। তারা করেছে তাঁর আনুগত্য, করেনি তাঁর নির্দেশ এক অক্ষরও অমান্য।
খুফাফ, যাকওয়ান ও আওফ গোত্রগুলোকে মনে হচ্ছিল কালো মাদী উটনীর মাঝে চিত্ত চঞ্চল যুবা উট।
তাদের পরিধানে যেন রক্তিমাভ-ও শ্বেত বর্ণ বস্ত্র, আর তারা যেন দীর্ঘকর্ণ সিংহ, সমবেত হয়েছে তাদের ঘাঁটিতে।
আমাদের দ্বারা আল্লাহ্র শাশ্বত দীনের শক্তি বৃদ্ধি হয়েছে, আমরা তাঁর সহগামীদের সাথে দ্বিগুণ লোক করেছি যোগ।
আমরা যখন মক্কায় পৌঁছি আমাদের পতাকা যেন লক্ষ্যস্থিরকারী বাজপাখী। যা ছোঁ মারতে উদ্যত বিস্ফারিত নেত্ররাজির উপর।
ঘোড়াগুলো যখন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছিল চারণভূমিতে। (দেখলে) তুমি, ভাবতে তার মাঝে বায়ুর শনশন।
যেদিন আমরা মুশরিকদের করি পদপিষ্ট, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশের পাইনি কোনরূপ ব্যত্যয়।
সেদিন রণক্ষেত্রের মাঝে মানুষ শুধু শুনেছে আমাদের উৎসাহব্যঞ্জক হাঁকডাক এবং খুলি উড়ানোর শব্দ।
শুভ্র-সতেজ তরবারির কোপে উড়ে যেত মাথার খুলি কিংবা ছিন্ন হতো গুপ্ত ঘাতকের ঘাড়।
কত নিহতের লাশ আমরা ফেলে রেখেছি খণ্ড বিখণ্ড করে। বিধবারা তাদের স্বামীদের তরে জুড়ে দিত বিলাপ।
আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের লক্ষ্য মানুষের খুশীর ধারি না ধার। গোপন-প্রকাশ্য সবই তো আল্লাহ্ জন্য।
📄 আব্বাস ইব্ন মিরদাস আরও বলেন
কি হলো তোমার চোখের যে, তাতে নিদ্রাহীনতা আর যন্ত্রণা। পাতা ফেললে কি অনুভূত হয় ভুসিমত কিছু?
বিষাদভরা এ চোখে রাতে আসে না ঘুম, তাতে কখনও অশ্রু জমে, কখনও বা হয় তা প্রবাহিত, যেন গাঁথুনীর হাতের মুক্তার মালা- সূতিকা ছিঁড়ে দানাগুলো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষিপ্ত;
হায়, কত দূর মনজিলে, যার প্রণয়ে উতলা তুমি— যার পথে বাধা সাম্মান ও হাফরের।
বিগত যৌবনের কথা রেখে দাও, যৌবন পালিয়ে গেছে, চুলে ধরেছে পাক, আর মাথায় টাক।
তার চাইতে বরং স্মরণ কর সুলায়মের লড়াইয়ের কথা—রণক্ষেত্রে। বস্তুত সুলায়ম গোত্রের যুদ্ধে গর্বকারীর জন্য গর্ব রয়েছে।
তারা তো এমন সম্প্রদায়, যারা সাহায্য করেছে রহমানের পক্ষে তারা অনুসরণ করেছে রাসূলের দীনের, যেখানে অপরাপর মানুষ দ্বিধা-বিভক্ত।
তারা লাগায় না খেজুরের চারা তাদের বাগানে, কিংবা হাম্বা ডাকে না গাভী তাদের বাড়ির সামনে।
তবে হ্যাঁ, তাদের বাড়ীর কাছে আছে শ্যেণতুল্য অশ্ব, আর তার চারদিকে পাল-পাল উট।
তাদের পাশে দাঁড়াতে ডাকা হয়েছিল খুফাফ ও আওফকে, আর ডাকা হয়েছিল অস্ত্র-শস্ত্রহীন, নির্লিপ্ত বনূ যাকওয়ানকে।
তারা মুশরিক বাহিনীর উপর আঘাত হেনেছে প্রকাশ্য— দিবালোকে, মক্কা উপত্যকায়। দ্রুত তারা তাদের করে বিনাশ।
এরপর আমরা যখন চলে যাই, তাদের লাশগুলো উন্মুক্ত উপত্যকায় পড়ে থাকে কর্তিত খর্জুর বৃক্ষবৎ।
হুনায়নের যুদ্ধের দিনে আমাদের উপস্থিতি শক্তি সঞ্চার করেছিল দীনের এবং আল্লাহর কাছে তা রয়েছে সংরক্ষিত।
যখন আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম মৃত্যুর, যা করেছিল কালো ছায়া বিস্তার। আর অশ্বখুরের আঘাতে উৎক্ষিপ্ত— হচ্ছিল কালোবর্ণ ধূলো।
আমরা লড়াই করি যাহ্হাকের পতাকাতলে। তিনি ছিলেন আমাদের পুরোভাগে যেমন সিংহ বীরদর্পে এগিয়ে চলে অরণ্যের ভেতর।
আমরা লড়াই করি বিপদ-সংকুল সংকীর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে, যার প্রচণ্ড ঘনঘটার চন্দ্র-সূর্য প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল
আমরা স্থৈর্যের পরিচয় দেই আওতাসে, যেখানে আমরা বর্শা তাক করি আল্লাহ্র সন্তুষ্টির খাতিরে, আমরা যাকে ইচ্ছা সাহায্য করি এবং বিজয়ী হই।
এরপর সকল দল ফিরে যায় আপন ঘরে, আল্লাহ্ মালিক, আর আমরা না হলে তারা ফিরত না কখনও।
ছোট-বড় যাই হোক এমন কোন সম্প্রদায় তুমি পাবে না, যাদের মাঝে আমাদের কিছু না কিছু কীর্তি নেই।
📄 ইন্ন ইসহাক বলেন : আব্বাস ইন্ন মিরদাস আরও বলেন
আমরা আল্লাহ্র রাসূলকে সাহায্য করেছি— তাঁর পক্ষ হয়ে, ক্রোধ-দৃপ্ত সহস্র বীরসহ, আর বর্মহীন যোদ্ধাদের তো কোন হিসাবই ছিল না।
আমরা বর্শাগ্রে বহন করি পতাকা তাঁর, মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে তাঁর সাহায্যকারী রক্ষা করে সে ঝাণ্ডা, আমরা করি তা রক্তে রঞ্জিত, হুনায়নের যুদ্ধে সেটাই হয় তার রঙ, যেদিন সাওয়ান ছোঁড়ে বর্শা তার।
আমরা ইসলাম রক্ষায় ছিলাম তাঁর দক্ষিণ বাহু, আমাদেরই উপর ছিল পতাকার ভার ও তা ওড়ানোর দায়িত্ব।
আমরা ছিলাম শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁর দেহরক্ষী।
তিনি তাঁর ব্যাপারে আমাদের পরামর্শ নিতেন, আমরাও নিতাম পরামর্শ তাঁর।
তিনি আমাদের ডেকে নেন তাঁর অন্তরংগ ও অগ্রগণ্য করে, আর আমরা ছিলাম তাঁর সাহায্যকারী, তাঁর অপ্রিয়দের হতে।
আল্লাহ্ তাঁর নবী মুহাম্মদকে দিন উত্তম প্রতিদান এবং তাকে শক্তিশালী করুন আপন সাহায্যে; বস্তুত আল্লাহ্ই তাঁর সাহায্যকারী।
ইবন হিশাম বলেন : وكنا على الاسلام হতে শেষ পর্যন্ত জনৈক বাক্যবিশারদ আমাকে আবৃত্তি করে শুনিয়েছেন। তিনি এর পূর্ববর্তী حملنا له في عامل الرمع راية শ্লোকটি সম্পর্কে নিজ অজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তার পূর্বে শ্লোক : وشاهره وكان لنا عقد اللواء ونحن خضبناه এবং দমা فهو لونه আমাকে আবৃত্তি করে শোনান।
ইবন ইসহাক বলেন: আব্বাস ইব্ন মিরদাস আরও বলেন: কে সকল সম্প্রদায়কে পৌঁছে দেবে এ বার্তা যে, মুহাম্মদ আল্লাহ্র রাসূল, যেখানেই যান পান সঠিক পথের দিশা।
তিনি ডাক দিলেন আল্লাহকে এবং যাচনা করলেন এক আল্লাহ্রই সাহায্য। ফলে তিনি ওয়াদা পূর্ণ করলেন আর করলেন অনুগ্রহ।
আমরা যাত্রা করলাম এবং কুদায়দে গিয়ে মুহাম্মদের সঙ্গে মিলিত হলাম। আল্লাহ্ পক্ষ হতে তিনি আমাদের জন্য করলেন এক মজবুত সংকল্প।
তারা প্রভাতকালে আমাদের সম্পর্কে পড়লো সন্দেহে, অবশেষে প্রভাত থাকতেই তারা স্পষ্ট দেখলো একদল জোয়ান আর ঋজু বর্শা।
সওয়ার তাজী ঘোড়ার উপর। আমাদের দেহে বাঁধা বর্ম। আর একদল ছিল পদাতিক, স্রোতধারার মত বহমান বিশাল বাহিনী।
যদি জানতে চাও বলি, গোত্র-শ্রেষ্ঠ তো সুলায়ম, আর তাদের মধ্যে আছে এমন কিছু লোক যারা নিজেদের সুলায়ম গোত্রীয় বলে পরিচয় দেয়।
আর আনসারদের একটি বাহিনী, যারা তাকে পরিত্যাগ করেনি, করেছে সদা তাঁর আনুগত্য, কোন কথা করেনি তাঁর অমান্য।
তুমি যদি খালিদকে দলনেতা নিযুক্ত করে থাক, করে থাক তাকে অগ্রগামী, সে তো অগ্রগামী হয়েছে একটি বাহিনী নিয়ে। আল্লাহ্ তাকে দেখিয়েছেন সঠিক পথ।
আর তুমি তো তার আমীর রয়েছই। তাঁর দ্বারা জালিমকে তুমি সত্যের পক্ষে কর শায়েস্তা।
আমি মুহাম্মদের কাছে শপথ করেছিলাম সত্য সঠিক। লাগাম-বদ্ধ সহস্র সৈন্য দিয়ে আমি তা করেছি রক্ষা।
মু'মিনদের নবী বললেন: অগ্রসর হও তোমরা, আসলে অগ্রগামী থাকার প্রতি আমাদের ছিল দারুণ আগ্রহ।
আমরা রাত কাটালাম মুসতাদীর কুয়ার পাশে। আমাদের ছিল না কোন শঙ্কা, ছিল প্রাণচাঞ্চল্য ও কঠিন সংকল্প।
আমরা তোমার আনুগত্য করলাম, শেষতক সব লোক করল আত্মসমর্পণ এবং ইয়ালামলামবাসীদের¹ প্রতি উষাকালে করলাম আক্রমণ।
সাদা-কালো রক্তিমাভ ঘোড়াটি হারিয়ে গেল ভীড়ের মধ্যে दलনেতা ঘোড়াটি চিহ্নিত করতে না পারা পর্যন্ত শান্তি পেলেন না।
আমরা ওদের আক্রমণ করলাম প্রাতঃতাড়িত বুনো হাঁসের মত। তুমি থাকলে দেখতে, তারা প্রত্যেকে ভাইকে ছেড়ে আপনাকে বাঁচাতে ব্যস্ত।
এভাবে সকাল থেকে রণব্যস্ত থাকলাম। অবশেষে সন্ধ্যাকালে হুনায়ন ত্যাগ করলাম। তখন তার নালাগুলোতে বহমান রক্তের ধারা।
তুমি ইচ্ছা করলেই সেখানে দেখতে পাবে ইতস্ততঃ পড়ে আছে তাজী ঘোড়া সব, তাদের পতিত সওয়ারগণ, আর ভাঙা বর্শা।
হাওয়াযিন তাদের মালামাল রক্ষা করেছিল আমাদের থেকে। বড়ই আশাবাদী ছিল তারা আমরা ব্যর্থমনোরথ হব, সাফল্য লাভে হব বঞ্চিত!