📄 দুরায়দ ইবন সাম্মার হত্যাকাণ্ড
ইবন ইসহাক বলেন: মুশরিকরা যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে তায়েফে আশ্রয় নেয়। মালিক ইব্ আওফও তাদের সাথে যায়। তাদের কোন কোন বাহিনী আওতাসে চলে যায়। কোন কোন বাহিনী যায় নাখলা অভিমুখে। নাখলায় সাকীফ গোত্রের গিয়ারা উপগোত্রীয়রা ছাড়া আর কেউ যায়নি। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অশ্বারোহী বাহিনী নাখলাগামীদের পশ্চাদ্ধাবন করে, কিন্তু যারা পার্বত্য পথে পালিয়ে গিয়েছিল তারা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন নি।
রবী'আ ইব্ন রুফাই ইব্ন আহবান ইব্ন দা'লারাই ইব্ন রবী'আ ইব্ন ইয়ারবূ' ইব্ন সামাল ইব্ন আওফ ইমরাউল কায়েস, যাকে তার মা দুগনার নামানুসারে ইবনু দুগনা বলা হতো, এ নামেই সে প্রসিদ্ধ ছিল। ইব্ন হিশামের ভাষ্য অনুসারে যাকে ইব্ন লাযু'আ বলা হতো- সে দুরায়দ ইব্ন সাম্মাকে ধরে ফেলতে সমর্থ হয়। রবী'আ দুরায়দের উটের লাগাম ধরে ফেলে। তার ধারণা ছিল উটটির আরোহী একজন মহিলা। কেননা, সে একটি ঘেরা হাওদার উপর বসে ছিল। তালাশী নিতেই দেখা গেল, সে তো নারী নয় বরং একজন পুরুষ এবং লোকটি জরাজীর্ণ বৃদ্ধ। আসলে সে ছিল দুরায়দ ইব্ন সাম্মা অথচ ঐ কিশোরটি তাকে চিনতো না। তখন দুরায়দ বলে উঠলো: তুমি আমাকে কি করতে চাও? জবাবে সে বললো: আমি তোমাকে হত্যা করবো। তখন সে জিজ্ঞাসা করলো: তুমি কে? জবাবে সে বললো: আমি হচ্ছি রবী'আ ইব্ন রুফাই সুলামী। তারপর সে তার তরবারি দ্বারা তাকে আঘাত করলো, কিন্তু সে তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলো। তখন বৃদ্ধ দুরায়দ বলে উঠলো: "তোমার মা তোমাকে কী মন্দ অস্ত্রই না সজ্জিত করে দিয়েছে! ঐ আমার হাওদার পিছন থেকে আমার তলোয়ারটা টেনে নেও।" আসলেও ঐ হাওদার মধ্যে তার তলোয়ারখানা মওজুদ ছিল। "তারপর অস্থি বাদ দিয়ে মগজের নীচে আঘাত কর, কেননা আমি এ ভাবেই লোকদের হত্যা করতাম। তারপর যখন তুমি তোমার মায়ের কাছে যাবে, তখন তাকে বলবে যে, তুমি দুরায়দ ইব্ন সাম্মাকে হত্যা করেছো। আল্লাহ্র কসম, কত যুদ্ধেই না আমি তোমাদের মহিলাদের রক্ষা করেছি।
বনূ সুলায়ম গোত্রীয়রা বলে: রবী'আ যখন দুরায়দকে আঘাত হানলো, তখন সে উলঙ্গ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তখন দেখা গেল যে, তার নিতম্ব এবং উরুদ্বয় উদোম অশ্বপৃষ্ঠে সব সময় আরোহণ করার কারণে একেবারে কাগজের মত সাদা হয়ে রয়েছে। দুরায়দকে হত্যার পর রবী'আ যখন তার মায়ের কাছে ফিরে গেল এবং তার হত্যার সংবাদ তাকে দিল, তখন তার মা বলে উঠলেন: আল্লাহ্র কসম! ও তো তোমার মায়েদের তিন তিনবার স্বাধীন করেছে।
📄 দুরায়দের হত্যা প্রসংগে তার কন্যার শোকগাথা
রবী'আর হাতে দুরায়দের হত্যা প্রসঙ্গে দুরায়দ-দুহিতা উমরা তার শোকগাথায় বলে:
শপথ তোমার জীবনের, দুরায়দের ব্যাপারে আমার লেশমাত্র শঙ্কা ছিল না সুমায়রা প্রান্তরে, বিপজ্জনক বাহিনীর কোন আশঙ্কাও আমি অন্তরে পোষণ করতাম না।
আল্লাহ্ বনূ সুলায়মকে দেবেন তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল। তারা যে রূঢ় আচরণ করেছে, তিনিও তাদের সাথে করবেন তদ্রূপ রূঢ় আচরণ।
আর আমরা যখন আমাদের ঘোড়া নিয়ে রণক্ষেত্রে তাদের দিকে ধাবিত হবো,- হবো তাদের মুখোমুখী; তখন তিনি তাদের নির্বাচিত লোকদের রক্তে আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করবেন। (হে দুরায়দ!)
তাদের কত দুর্দিনেই না তুমি তাদের হয়ে গড়ে তুলেছো মস্ত প্রতিরোধ, অথচ তখন তাদের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা হয়েছিল। আর তাদের কত সম্ভ্রান্ত মহিলাদের না তুমি আযাদ করে দিয়েছো! আর তাদের কত মহিলাকেই না করেছো বন্ধনমুক্ত!
আর সুলায়মের কত লোকই না তোমাকে কতরূপ উপাধিতে সম্বোধন করতো। আর যখন তাদের প্রাণান্তকর অবস্থা ছিল তখন তুমি তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছ! কিন্তু এর প্রতিদানে তারা করেছে চরম দুর্ব্যবহার। আর দিয়েছে আমাকে এমনি মর্মবেদনা— যাতে আমার পায়ের গোছার অস্থিমজ্জা পর্যন্ত— গলে প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। হে দুরায়দ!
তোমার অশ্বখুরের দাগ মুছে গেছে যী-বকর থেকে নুহাক প্রান্তর অবধি। হায়, সে পদচিহ্নগুলো আর কোনদিনই দেখা যাবে না।
📄 উমরা বিন্ত দুরায়দ তার কবিতায় আরো বলে
তারা বললো: আমরা হত্যা করেছি দুরায়দকে। আমি বললাম: তারা যথার্থই বলেছে।
তারপর আমার অশ্রু আমার কামিজের উপর গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
যদি সে সর্বগ্রাসী শক্তি না হতো, যা সকল জাতিকে তার প্রভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে,
তা হলে সুলায়ম ও কা'ব গোত্র- বুঝতে পারতো যে, কী করে হুকুম তামিল করতে হয়।
যদি তা না হতো, তা হলে- এমন একটি বাহিনী তাদের আঘাত হানতো, কখনো প্রতি দিন, আবার কখনো একদিন অন্তর। যাদের অস্ত্রের আঁচ পেলেই তারা শিউরে উঠতো।
ইব্ন হিশام বলেন: মতান্তরে দুরায়দের হত্যাকারীর নাম ছিল-আবদুল্লাহ্ ইব্ন কুনাঈ' ইন উহ্হ্বান ইবন সা'লাবা ইব্ন রবী'আ।
📄 আবূ আমর আশ'আরীর শাহাদত
ইবন ইসহাক বলেন: শত্রু বাহিনীর মধ্যকার যারা আওতাসের দিকে পালিয়েছিল, তাদের পশ্চাদ্ধাবনের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবূ আমির আশআরী (রা)-কে প্রেরণ করেন। তিনি পরাজিতদের এক দলের নিকটে পৌঁছে যান। উভয় পক্ষে দূর থেকে তীর নিক্ষেপের যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। একটি তীর এসে আবূ অমিরের উপর পতিত হয়, আর তাতেই তিনি শহীদ হন। তারপর তাঁর চাচাতো ভাই আবূ মূসা আশআরী পতাকা ধারণ করেন এবং তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। আল্লাহ্ তাঁর হাতে বিজয় দান করেন এবং মুশরিকদের পরাজিত করেন। লোকে বলে যে, আবূ আমির আশআরী (রা)-কে যে ব্যক্তি তীর নিক্ষেপ করেছিল, সে ছিল দুরায়দের পুত্র সালামা। তা তাঁর হাঁটুতে এসে পড়েছিল এবং তাতেই তিনি নিহত হন।
এ প্রসঙ্গে সালামা তার কবিতায় বলে:
জানতে যদি চাও হে, কী বা আমার পরিচয়, জেনে নাও, আমার নাম সালামা নিশ্চয়।
জানতে যদি চাও হে, আরো পরিচয় নিখুঁত জেনে নাও, আমি হচ্ছি সামাদীরের পুত।
জেনে নাও আমি হচ্ছি সেই সুপুরুষ বীর তরবারিতে কাটি যে مسلمانوں শির।
আর সামাদীর হচ্ছে তার মায়ের নাম।