📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ইবন মিরদাসের আরেকটি কবিতা

📄 ইবন মিরদাসের আরেকটি কবিতা


কারিব ইব্‌ন আসওয়াদের ভাইদের রেখে পলায়ন এবং যুলখিমারকর্তৃক তার গোত্রীয় লোকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার কথা উল্লেখ করে আব্বাস ইব্‌ন মিরদাস বলেন:
الا من مبلغ غيلان عنى * و سوف إخال يأتيه الخبير
ওহে, কেউ আছো কি যে গায়লানকে আমার পয়গাম পৌঁছিয়ে দেবে? আর আমার খেয়াল, অচিরেই অবহিত লোক তার কাছে পয়গাম পৌঁছাবে-
وعروة انما اهدى جوابا * وقولا غير قولكما يسير
সেই সাথে উরওয়াকেও। আর আমি তোমাদের এমন একটি বাণী উপহার দেবো, যা হবে চিরন্তন এবং তোমাদের দু'জনের বক্তব্য থেকে ভিন্ন।
بان محمدا عبد رسول * لرب لا يضل ولا يجور
তা হচ্ছে, মুহাম্মদ (সা) প্রতিপালকের পয়গাম বহনকারী রাসূল। তিনি আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত হন না আর কারো প্রতি অবিচারও করেন না।
وجدناه نبيا مثل موسى * فكل فتی بخایره مخیر
আমরা তাঁকে মূসার মতো নবী রূপে পেয়েছি। যে তাঁর সাথে শ্রেষ্ঠত্বে মুকাবিলায় অবতীর্ণ হবে, সে পরাস্ত হবে।
وبئس الأمر أمر بني قسى * بوج إذ تقسمت الأمور
ওজ্ প্রান্তরে বনূ কাস্সী (ছাকীফ) গোত্রের অবস্থা যখন শতধা বিচ্ছিন্ন, তখন তাদের হালত অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে উঠলো।
أضاعوا أمرهم ولكل قوم * أمير والدوائر قد تدور
তাদের ব্যাপার তারা নষ্ট করে দিল। প্রতিটি সম্প্রদায়ের কোন না কোন আমীর থাকে, এবং তাদের উপর চারদিক থেকে বিপদ নেমে আসলো যা আবর্তনশীল।
فجئنا أسد غابات إليهم * جنود الله ضاحية تسير
আমরা তাদের পানে অগ্রসর হলাম বনভূমির সিংহকূলের মত। আল্লাহ্র বাহিনীসমূহ খোলাখুলিভাবে অগ্রসর হচ্ছিলো।
نوم الجمع جمع بنى قسى * على حنق نكاد له نظير
আমরা, আমাদের বাহিনীসমূহ- হাওয়াযিনের বিভিন্ন বাহিনীর উদ্দেশ্য অগ্রসর হচ্ছিলাম ক্রোধান্বিত অবস্থায়। যেন আমরা তাদের উদ্দেশ্যে পাখির মত উড়ে চলছিলাম।
وإقسم لوهم مكثوا لسرنا * إليهم بالجنود ولم يغوروا
আমি শপথ করে বলছি, যদি তারা রয়ে যেতো, তা হলে আমরা এমন বাহিনীসমূহে নিয়ে তাদের দিকে যাত্রা করতাম যারা তাদের পরাজিত না করে ফিরতো না।
فكنا اسد لية ثم حتى * أبحناها واسلمت النصوروا
তারপর আমরা লিয়্যাতে¹ পৌঁছে সেখানকার সিংহ বনে যাই এবং তা জয় করি, আর সেখানে রক্তপাতকে নিজেদের জন্যে হালাল করে নেই। তারপর নুসূর গোত্রকে² আমাদের হাতে অর্পণ করা হয়।
ويوم كان قبل لدى حنين * فاقلع والدماء به تمور
ইতোপূর্বে হুনায়ন যুদ্ধের এমন একটি দিন অতিক্রান্ত হয়েছে যাতে তাদের উচ্ছন্ন সাধন করা হয়েছে এবং তাদের রক্তপাত,করা হয়েছে।
من الايام لم تسمع كيوم * ولم يسمع به قوم ذكور
সেটা ছিল যুদ্ধের এমন একটি দিন, যে দিনের মত দিনের কথা তোমরা কোনদিন শুনতে পাওনি বা কোন বীর জাতিই ইতিপূর্বে এমন দিনের কথা শুনতে পায়নি।
قتلنا في الغبار بنى حطيط * على راياتها والخيل زور
আমরা বনু হুতায়তকে তাদের ঝাণ্ডার কাছে গিয়ে হত্যা করি, যখন খুবই ধুলো উড়ছিল, আর তাদের অশ্বগুলো পলায়নরত দেখা যাচ্ছিলো।
ولم يك ذو الخمار رئيس قوم * لهم عقل يعاقب او نكير
সে সময় যুলখিমার তার সম্প্রদায়ের সর্দার ছিল না। তাদের বুদ্ধি বিবেচনা ও চেষ্টা তদবিরের শাস্তি তাদেরকে দেয়া হচ্ছিল।
أقام بهم على سنن المنايا * وقد بانت لمبصرها الأمور
সে তাদের সম্প্রদায়কে মৃত্যুর পথসমূহে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অথচ সে পথসমূহ সম্পর্কে অবগতদের কাছে ব্যাপারটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
فأفلت من نجا منهم جريضا * وقتل منهم بشر كثير
তাদের মধ্যে যারা রক্ষা পেয়েছিল তাদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল এবং তাদের বহু সংখ্যক লোককে হত্যা করা হয়।
ولا يغنى الأمور أخو التواني * ولا الغلق الصريرة الحصور
অলস নিষ্কর্মা লোকেরা কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজেই সিদ্ধহস্ত হয় না বা কারিৎকর্মা প্রতিপন্ন হয় না। না দুর্বলচেতারা, যারা না করে বিয়ে-শাদী, না ঘেঁষে রমণীদের পাশে।
أحانهم وحان وملكوه * أمورهم وأفلتت الصقور
সে তাদের সকলকে নিধন করলো এবং নিজেও নিহত হলো। আর তাকে লোকজন এমন দুর্যোগ মুহূর্তে তাদের আমীররূপে বরণ কর নেয়, যখন বীর যোদ্ধারা প্রাণ ভয়ে পালাচ্ছিল।
بنو عون تميح بهم جياد * اهين له الفصافص والشعير
বনূ আওফ, তাদের সাথে গর্বিত চালে চলে তাদের অভিজাত শ্রেণীর ঘোড়াগুলো, যেগুলোর জন্যে প্রচুর সরবরাহ রয়েছে তাজা ঘাস আর যবের।
فلو لا قارب وبنو ابيه * تقسمت المزارع والقصور
যদি কারিব ও তাঁর অন্যান্য ভাইয়ারা না থাকতেন, তা হলে তাদের জমিজমা ও দালানকোঠাগুলো ভাগ বণ্টন হয়ে যেতো।
ولكن الرئاسة عمموها * على يمن أشار به المشير
বরং সারা রাজত্ব তাদের হাতেই বরকতের জন্যে অর্পণ করা হয়, যাদের হাতে অর্পণের জন্যে ইশারাকারী। অর্থাৎ নবী করীম (সা) ইশারা করেছেন।
اطاعوا قاربا ولهم جدود * واحلام الى عز تصير
তারা কারিবের আনুগত্য করেন, অথচ তাদের যে পিতৃপুরুষ ও জ্ঞান বুদ্ধি, তা তাদের সম্মানজনক অবস্থানে পৌছিঁয়ে দেয়।
فان يهدوا الى الاسلام يلفوا * انوف الناس ما سمر السمير
যদি তাদের ইসলামের দিকে হিদায়েত নসীব হয়ে যায়, তা হলে যতদিন পর্যন্ত নৈশকালীন গল্পকারীর গল্প বলার রীতি থাকবে ততদিন তারা লোকসমাজের নাক স্বরূপ অর্থাৎ মর্যাদার প্রতীক হয়ে থাকবে।
وان لم يسلموا فهم اذان * بحرب الله ليس لهم نصير
আর যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে, তা হলে এ হবে তাদের আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা এবং এমতাবস্থায় তাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।
كما حكت بنى سعد وحرب * برهط بني غزية عنقفير
যেমনটি বনূ সা'দকে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে দলিত-মথিত করেছে এবং গাযিয়্যা গোত্রের জন্যে যুদ্ধ মহাবিপর্যয় প্রতিপন্ন হয়েছে।
كأن بنى معاوية بن بكر * الى الاسلام ضائنة تخور
বনু মুআরিয়া ইবুন বকর যেন ইসলামের সামনে গাভীর বাছুর, যেগুলো হাম্বা হাম্বা রবে ডাকছে।
فقلنا أسلموا أنا أخوكم * وقد برأت من اللاحن الصدور
এ জন্যে আমরা তাদের উদ্দেশ্য করে বললাম: ওহে, তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, তা হলে আমরা তোমাদের ভাই, আর আমাদের অন্তর হিংসা-বিদ্বেষ মুক্ত।
كأن القوم اذ جاؤا إلينا * من البغضاء بعد السلم عور
যখন তারা আমাদের নিকট আসলো, তখন সন্ধি হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তাদের অন্তরসমূহ বিদ্বেষে অন্ধ ও কানা ছিল।
ইবন হিশাম বলেন: গায়লান হচ্ছে গায়লান ইবন সালামা সাকাফী এবং উরওয়া বলতে- উরওয়া ইবন মাসউদ সাকাফীকে বুঝানো হয়েছে।

টিকাঃ
১. লিয়‍্যা হচ্ছে তায়েফের নিকটবর্তী একটি স্থানের নাম।
২. হাওয়াযিন গোত্রের একটি শাখাগোত্র।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 দুরায়দ ইবন সাম্মার হত্যাকাণ্ড

📄 দুরায়দ ইবন সাম্মার হত্যাকাণ্ড


ইবন ইসহাক বলেন: মুশরিকরা যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে তায়েফে আশ্রয় নেয়। মালিক ইব্‌ আওফও তাদের সাথে যায়। তাদের কোন কোন বাহিনী আওতাসে চলে যায়। কোন কোন বাহিনী যায় নাখলা অভিমুখে। নাখলায় সাকীফ গোত্রের গিয়ারা উপগোত্রীয়রা ছাড়া আর কেউ যায়নি। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অশ্বারোহী বাহিনী নাখলাগামীদের পশ্চাদ্ধাবন করে, কিন্তু যারা পার্বত্য পথে পালিয়ে গিয়েছিল তারা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন নি।
রবী'আ ইব্‌ন রুফাই ইব্‌ন আহবান ইব্‌ন দা'লারাই ইব্‌ন রবী'আ ইব্‌ন ইয়ারবূ' ইব্‌ন সামাল ইব্‌ন আওফ ইমরাউল কায়েস, যাকে তার মা দুগনার নামানুসারে ইবনু দুগনা বলা হতো, এ নামেই সে প্রসিদ্ধ ছিল। ইব্‌ন হিশামের ভাষ্য অনুসারে যাকে ইব্‌ন লাযু'আ বলা হতো- সে দুরায়দ ইব্‌ন সাম্মাকে ধরে ফেলতে সমর্থ হয়। রবী'আ দুরায়দের উটের লাগাম ধরে ফেলে। তার ধারণা ছিল উটটির আরোহী একজন মহিলা। কেননা, সে একটি ঘেরা হাওদার উপর বসে ছিল। তালাশী নিতেই দেখা গেল, সে তো নারী নয় বরং একজন পুরুষ এবং লোকটি জরাজীর্ণ বৃদ্ধ। আসলে সে ছিল দুরায়দ ইব্‌ন সাম্মা অথচ ঐ কিশোরটি তাকে চিনতো না। তখন দুরায়দ বলে উঠলো: তুমি আমাকে কি করতে চাও? জবাবে সে বললো: আমি তোমাকে হত্যা করবো। তখন সে জিজ্ঞাসা করলো: তুমি কে? জবাবে সে বললো: আমি হচ্ছি রবী'আ ইব্‌ন রুফাই সুলামী। তারপর সে তার তরবারি দ্বারা তাকে আঘাত করলো, কিন্তু সে তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলো। তখন বৃদ্ধ দুরায়দ বলে উঠলো: "তোমার মা তোমাকে কী মন্দ অস্ত্রই না সজ্জিত করে দিয়েছে! ঐ আমার হাওদার পিছন থেকে আমার তলোয়ারটা টেনে নেও।" আসলেও ঐ হাওদার মধ্যে তার তলোয়ারখানা মওজুদ ছিল। "তারপর অস্থি বাদ দিয়ে মগজের নীচে আঘাত কর, কেননা আমি এ ভাবেই লোকদের হত্যা করতাম। তারপর যখন তুমি তোমার মায়ের কাছে যাবে, তখন তাকে বলবে যে, তুমি দুরায়দ ইব্‌ন সাম্মাকে হত্যা করেছো। আল্লাহ্র কসম, কত যুদ্ধেই না আমি তোমাদের মহিলাদের রক্ষা করেছি।
বনূ সুলায়ম গোত্রীয়রা বলে: রবী'আ যখন দুরায়দকে আঘাত হানলো, তখন সে উলঙ্গ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তখন দেখা গেল যে, তার নিতম্ব এবং উরুদ্বয় উদোম অশ্বপৃষ্ঠে সব সময় আরোহণ করার কারণে একেবারে কাগজের মত সাদা হয়ে রয়েছে। দুরায়দকে হত্যার পর রবী'আ যখন তার মায়ের কাছে ফিরে গেল এবং তার হত্যার সংবাদ তাকে দিল, তখন তার মা বলে উঠলেন: আল্লাহ্র কসম! ও তো তোমার মায়েদের তিন তিনবার স্বাধীন করেছে।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 দুরায়দের হত্যা প্রসংগে তার কন্যার শোকগাথা

📄 দুরায়দের হত্যা প্রসংগে তার কন্যার শোকগাথা


রবী'আর হাতে দুরায়দের হত্যা প্রসঙ্গে দুরায়দ-দুহিতা উমরা তার শোকগাথায় বলে:
শপথ তোমার জীবনের, দুরায়দের ব্যাপারে আমার লেশমাত্র শঙ্কা ছিল না সুমায়রা প্রান্তরে, বিপজ্জনক বাহিনীর কোন আশঙ্কাও আমি অন্তরে পোষণ করতাম না।
আল্লাহ্ বনূ সুলায়মকে দেবেন তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল। তারা যে রূঢ় আচরণ করেছে, তিনিও তাদের সাথে করবেন তদ্রূপ রূঢ় আচরণ।
আর আমরা যখন আমাদের ঘোড়া নিয়ে রণক্ষেত্রে তাদের দিকে ধাবিত হবো,- হবো তাদের মুখোমুখী; তখন তিনি তাদের নির্বাচিত লোকদের রক্তে আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করবেন। (হে দুরায়দ!)
তাদের কত দুর্দিনেই না তুমি তাদের হয়ে গড়ে তুলেছো মস্ত প্রতিরোধ, অথচ তখন তাদের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা হয়েছিল। আর তাদের কত সম্ভ্রান্ত মহিলাদের না তুমি আযাদ করে দিয়েছো! আর তাদের কত মহিলাকেই না করেছো বন্ধনমুক্ত!
আর সুলায়মের কত লোকই না তোমাকে কতরূপ উপাধিতে সম্বোধন করতো। আর যখন তাদের প্রাণান্তকর অবস্থা ছিল তখন তুমি তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছ! কিন্তু এর প্রতিদানে তারা করেছে চরম দুর্ব্যবহার। আর দিয়েছে আমাকে এমনি মর্মবেদনা— যাতে আমার পায়ের গোছার অস্থিমজ্জা পর্যন্ত— গলে প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। হে দুরায়দ!
তোমার অশ্বখুরের দাগ মুছে গেছে যী-বকর থেকে নুহাক প্রান্তর অবধি। হায়, সে পদচিহ্নগুলো আর কোনদিনই দেখা যাবে না।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 উমরা বিন্ত দুরায়দ তার কবিতায় আরো বলে

📄 উমরা বিন্ত দুরায়দ তার কবিতায় আরো বলে


তারা বললো: আমরা হত্যা করেছি দুরায়দকে। আমি বললাম: তারা যথার্থই বলেছে।
তারপর আমার অশ্রু আমার কামিজের উপর গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
যদি সে সর্বগ্রাসী শক্তি না হতো, যা সকল জাতিকে তার প্রভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে,
তা হলে সুলায়ম ও কা'ব গোত্র- বুঝতে পারতো যে, কী করে হুকুম তামিল করতে হয়।
যদি তা না হতো, তা হলে- এমন একটি বাহিনী তাদের আঘাত হানতো, কখনো প্রতি দিন, আবার কখনো একদিন অন্তর। যাদের অস্ত্রের আঁচ পেলেই তারা শিউরে উঠতো।
ইব্‌ন হিশام বলেন: মতান্তরে দুরায়দের হত্যাকারীর নাম ছিল-আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কুনাঈ' ইন উহ্হ্বান ইবন সা'লাবা ইব্‌ন রবী'আ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00