📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 যুদ্ধে নিহত অমুসলিমদের দ্রব্যসম্ভার হত্যাকারী মুসলমানদের প্রাপ্য

📄 যুদ্ধে নিহত অমুসলিমদের দ্রব্যসম্ভার হত্যাকারী মুসলমানদের প্রাপ্য


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর আমার নিকট আবু কাতাদা আনসারী (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমার এমন কিছু সাথী আমার নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যাদের আমি অসত্য ভাষণের জন্যে অভিযুক্ত করতে পারি না। তারা বনূ গিফারের আযাদকৃত গোলাম নাফি এর সূত্রে আবু মুহাম্মদের এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তিনি আবু কাতাদা (রা) সূত্রে বলেন যে, তিনি [আবু কাতাদা (রা)] বলেছেন: হুনায়নের যুদ্ধের দিন আমি দু’ ব্যক্তিকে লড়াইরত অবস্থায় দেখতে পেলাম। তাদের একজন মুসলিম এবং অপরজন মুশরিক ছিল।
তিনি বলেন: এমন সময় আমি দেখতে পেলাম, অপর একজন মুশরিক এসে তার সাথী মুশরিক ভাইকে মুসলমানটির বিরুদ্ধে সাহায্য করতে চাইলো।
আবু কাতাদা (রা) বলেন: তখন আমি অগ্রসর হয়ে তার হাতটি কেটে দিলাম। সে তার অপর হাত দিয়ে আমার গলা চেপে ধরলো। আল্লাহ্র কসম! সে আমাকে কোনমতেই ছাড়ছিল না, এমন কি আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
ইবন হিশামের বর্ণনায় আছে: সে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলে ফেলে অবস্থা। রক্তক্ষয় যদি তাকে নিঃশেষিত না করে ফেলতো, তা হলে সে অবশ্যই আমাকে হত্যা করতো। এমন সময় সে ধড়াস করে পড়ে গেল। তারপর আমি তাকে আরেকটি আঘাত করে হত্যা করলাম। তারপর আমার অবস্থা এতই কাহিল ছিল যে, আমার পক্ষে আর লড়াই করা সম্ভবপর ছিল না। এ সময় জনৈক মক্কাবাসী আমাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করতে গিয়ে নিহত ব্যক্তিটির দ্রব্যসম্ভার তুলে নিল। যখন যুদ্ধ শেষ হলো, আর আমরা শত্রুদের দিক থেকে পূর্ণরূপে অবসর হলাম, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঘোষণা করলেন : من قتل قتيلا فله سلبه যে ব্যক্তি (যুদ্ধ ক্ষেত্রে অমুসলিমদের) কোন ব্যক্তিকে হত্যা করবে, সে-ই হবে তার নিকট থেকে লব্ধ দ্রব্যসামগ্রীর মালিক।"
তখন আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহ্র কসম! আমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছি, যার কাছে যথেষ্ট দ্রব্যসামগ্রী ছিল। তখন আমি খুব কাহিল হয়ে পড়েছিলাম। কে তা উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছে তা আমি বলতে পারবো না।
তখন মক্কাবাসী এক ব্যক্তি বললো সে যথার্থ বলেছে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ঐ নিহত ব্যক্তিটির দ্রব্যসামগ্রী আমার কাছে আছে। আপনি এ বস্তুগুলো আমার নিকট থাকার ব্যাপারে তাকে সম্মত করে দিন!
তখন আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলে উঠলেন আল্লাহ্র কসম! তা কখনো হতে পারে না। এ ব্যাপারে তিনি তাকে সম্মত করবেন না। আল্লাহ্র সিংহদের মধ্যকার একটি সিংহের, যে তাঁরই দীনের হিফাযতের জন্যে লড়াই করে, তুমি তারই প্রাপ্য ভাগ বসাতে চাচ্ছো? তার হাতে নিহত ব্যক্তির দ্রব্যসামগ্রী তাকে ফিরিয়ে দাও!
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলে উঠলেন : صدق فاردد علیه سلبه "আবূ বকর যথার্থই বলেছেন। তুমি তার প্রাপ্য নিহত ব্যক্তির সামগ্রী তাকে ফিরিয়ে দাও।"
আবু কাতাদা (রা) বলেন: সাথে সাথে আমি তা তার কাছ থেকে নিয়ে নিলাম। তারপর তা বিক্রি করে একটি খেজুর বাগান কিনলাম, আর এটাই ছিল আমার মালিকানাধীন প্রথম সম্পদ।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট এমন এক রাবী আবূ সালামা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যাকে আমি মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত করতে পারি না। তিনি ইসহাক ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ তালহা সূত্রে আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণনা করেন, একা আবু তালহাই হুনায়ন যুদ্ধের দিন কুড়িজনের দ্রব্যসামগ্রী খুলে নিয়েছিলেন。

টিকাঃ
১. মাওলানা আবদুল জলীল সিদ্দিকী অনূদিত এবং মাওলানা গোলাম রাসূল মেহের সম্পাদিত সীরাতুন্নবী কামিল শিরোনামে প্রকাশিত এ গ্রন্থের উর্দু ভাষ্যে নির্দিষ্ট করে শেষোক্ত পংক্তিদ্বয় কাদিসিয়ার যুদ্ধে কথিত হয় বলে বলা হয়েছে। দেখুন সীরাতুন্নবী কামিল, ২খ. পৃ. ৫৩৪।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 যুদ্ধে ফেরেশতাদের অংশ গ্রহণ

📄 যুদ্ধে ফেরেশতাদের অংশ গ্রহণ


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: আবূ ইসহাক ইব্‌ন ইয়াসার আমার নিকট বলেন যে জুবায়র ইন্ন মুতইম (রা)-এর সূত্রে তাঁর নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি বলেছেন: শত্রু সম্প্রদায়ের পরাজয়ের প্রাক্কালে লোকজন যখন যুদ্ধেরত তখন আমি লক্ষ্য করলাম, আসমান থেকে কাল চাদরের মত কী যেন নেমে আসছে। শেষ পর্যন্ত তা আমাদের এবং শত্রু সম্প্রদায়ের মধ্যবর্তী স্থানে পতিত হলো। আমি চেয়ে দেখি, অসংখ্য কালো কালো পিঁপড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সমস্ত প্রান্তর তাতে ভরে গিয়েছে। তখন আমার কোন সন্দেহ রইলো না যে, এঁরা আল্লাহ্ ফেরেশতা। তারপর কাফির সম্প্রদায়ের বিপর্যয় না ঘটা পর্যন্ত তাঁরা আর ফিরে যাননি, বরং সব সময় আমাদের সাথে ছিলেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 জনৈকা মুসলিম মহিলার কবিতা

📄 জনৈকা মুসলিম মহিলার কবিতা


ইবন ইসহাক বলেন: আল্লাহ্ তা'আলা যখন হুনায়নের মুশরিকদের পরাজিত করলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাদের উপর বিজয়ী করলেন। তখন জনৈকা মুসলিম রমণী কবিতায় বলেন:
قد غلبت خيل الله خيل اللات * والله احق بالثبات
লাত দেবতার অশ্বারোহী দলের উপর বিজয় লাভ করেছে আল্লাহ্ অশ্বারোহী দল। আর আল্লাহরই চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী সত্তা।
ইব্‌ন হিশام বলেন: কোন এক বর্ণনাকারী আমার নিকট উক্ত পংক্তিটি এভাবে আবৃত্তি করে শুনিয়েছেন:
غلبت خيل الله خيل اللات * خيله احق بالثبات
লাত দেবতার অশ্বারোহীদের উপর আল্লাহ্র অশ্বারোহীরা বিজয় লাভ করেছে। আর আল্লাহ্র বাহিনী দৃঢ়পদ থাকার অধিকতর যোগ্য।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হাওয়াযিনের পরাজয় ও নিধন

📄 হাওয়াযিনের পরাজয় ও নিধন


ইবন ইসহাক বলেন: যখন হাওয়াযিন গোত্রীয়দের পরাজয় হলো, তখন তাদের বনূ মালিকের অন্তর্ভুক্ত সাকীফ গোত্রের হত্যাযজ্ঞ চললো। তাদের সত্তর ব্যক্তি তাদের পতাকাতলে নিহত হয়। উসমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রবীআ ইবন হারিস ইন্ন হাবীব নিহতদের অন্যতম ছিল। তাদের পতাকা ছিল যুলখিমার তথা আওফ ইব্‌ন রবীআর হাতে। সে নিহত হলে পতাকাটি উসমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ধারণ করে। এ পতাকা হাতেই যুদ্ধাবস্থায় সে নিহত হয়।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট যখন তাঁর নিহত হওয়ার সংবাদ পৌঁছলো, তখন তিনি বললেন: ابعده الله فانه كان يبغض قريشاً তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ, কেননা সে কুরায়শদের প্রতি অত্যন্ত বিদ্বেষভাবাপন্ন ছিল।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট ইয়াকুব ইন্ন উৎবা ইন্ন মুগীরা ইন্ন আখনাস বর্ণনা করেন, উসমান ইব্‌ন আবদুল্লাহর সাথে তার একটি খ্রিস্টান গোলামও নিহত হয়। সে ছিল খৎনা বিহীন। জনৈক আনসার সাহাবী সাকীফ গোত্রের নিহতদের সামানপত্র তাদের দেহ থেকে খুলে নিচ্ছিলেন। ঐ গোলামটির দেহ থেকে জিনিসিপত্র খুলে নিতে গিয়ে তিনি দেখতে পান যে গোলামটির খৎনা করা নেই।
রাবী বলেন: তখন ঐ আনসার সাহাবী চীৎকার করে বললেন : হে আরবসমাজ, শুনে রাখো, একজন সাকীফ গোত্রীয় লোক, খৎনা ছাড়া দেখা যাচ্ছে।
মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা) বলেন: আমি তখন তার হাত ধরে বললাম: আমার আশঙ্কা হলো এ ব্যক্তি আরবদের মধ্যে আমাদের বে-ইজ্জতি করে ছাড়বে। তখন আমি বললাম : দোহাই তোমার, আমার পিতামাতা তোমার জন্য কুরবান হোন, অমনটি বলো না, ও হচ্ছে আমাদের একটি খ্রিস্টান বালক। তারপর আমি অন্যান্য নিহতদের কাপড় খুলে খুলে তাকে দেখাতে লাগলাম, ঐ দেখ, এদের প্রত্যেকেই খৎনা করা লোক।
ইবন ইসহাক বলেন: আহলাফ তথা মিত্রবাহিনীর পতাকা ছিল কারিব ইব্‌ন আসওয়াদের হাতে। তারা যখন পরাজিত হলো তখন সে তার হস্তাস্থিত পতাকাটি একটি গাছের সাথে ঠেস দিয়ে রেখে পালিয়ে যায় এবং তার সাথে সাথে তার চাচাতো ভাইয়েরা ও গোষ্ঠীর লোকজন পলায়ন করে। তাই আহ্লাফের তথা মিত্রদলসমূহের মধ্যকার দু'ব্যক্তি ছাড়া আর কেউই নিহত হয়নি। সে দু'জন হচ্ছে গায়রাহ গোত্রের ওহাব এবং বনী কুব্বাহ্ জাল্লাহ্। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জাল্লাহ্-এর হত্যা সংবাদ অবগত হয়ে বললেন: বনূ সাকীফের যুবককুল শিরোমণি আজ নিহত হলো। তবে ইব্‌ন হানীফার পুত্রটি রয়ে গেল। ইব্‌ন হানীফা বলতে এখানে তিনি হারিস ইন উয়ায়সকে বুঝিয়েছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00