📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রণাঙ্গনে উম্মু সুলায়ম (রা)

📄 রণাঙ্গনে উম্মু সুলায়ম (রা)


ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে দেখেন উম্মু সুলায়মান বিন্ত মিলহানও তাঁর স্বামী আবূ তালহার সাথে রণাঙ্গনে এসেছেন। তিনি তাঁর কোমরে একটি চাদর জড়িয়ে বেঁধে রেখে ছিলেন। তখন আবু তালহার সন্তান (আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ তালহা) তাঁর গর্ভে। আবু তালহার উট তিনি সামলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল, পাছে উট তাঁর বাগ না মানে। এজন্যে অর মাথা নিকটে টেনে ধরে তাঁর হাত নাকে বাঁধা রশির সাথে উটের নাকের ছিদ্রের মধ্যে চুকিয়ে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন: কী হে, উম্মু সুলায়ম নাকি?
তিনি জবাব দিলেন জ্বী হ্যাঁ, আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনাকে ছেড়ে যারা পলায়ন করে যাবে আমি তাদেরকে হত্যা করবো, যেমনটি আপনি হত্যা করবেন আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধরতদেরকে। কেননা, তারা এরই যোগ্য পাত্র। প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আল্লাহ-ই কি তাদের জন্য যথেষ্ট নন, হে উম্মু সুলায়ম?
রাবী বলেন: উম্মু সুলায়মের সাথে তখন একটি খঞ্জর ছিল। আবূ তালহা তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন: এ খঞ্জর কি জন্যে এনেছ হে উম্মু সুলায়ম? জবাবে উম্মু সুলায়ম বললেন: কোন পৌত্তলিক যদি আমার পাশে ঘেঁষে তা হলে তার নাড়িভুঁড়ি আমি এর দ্বারা বের করে দেবো।
রাবী বলেন: তখন আবূ তালহা (রা) বলে উঠলেন: আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন না, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! রাগান্বিত উম্মু সুলায়ম কী বলছে?

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মালিক ইব্‌ন আওফের কবিতা

📄 মালিক ইব্‌ন আওফের কবিতা


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন হুনায়ন অভিমুখে যাত্রা করেন, তখন বন্ সুলায়ম যাহ্হাক ইব্‌ন সুফিয়ান কিলাবীকে তাদের সাথে নিয়ে নেন। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে তাঁর কাছে কাছেই থাকে। লোকজন যখন পরাস্ত হয়ে পশ্চাৎ অপসরণ করছিল। তখন মালিক ইব্‌ন আওফ তার নিজের ঘোড়াকে লক্ষ্য করে তার উদ্দীপক কবিতায় বলেন:
أقدم محاج انه يوم نكر * مثلى على مثلك يحمى ويكر
হে আমার ঘোড়া মুহাজ, তুই এগিয়ে চল। আজ ভীতিপ্রদ যুদ্ধের দিন। আমার মত লোক তোর মত ঘোড়ার পিঠে চড়েই এমন দিনে আত্মরক্ষা করে এবং আক্রমণের পর আক্রমণ চালিয়ে যায়।
اذا اضيع الصف يوما والدبر * ثم احزالت زمر بعد زمر
যুদ্ধের দিনে যখন সারিসমূহ ভেঙ্গে যায়, তারপর দলের পর দল, বাহিনীর পর বাহিনী, হয়ে যায়।
كتائب يكل فيهن البصر * قد اطعن الطعنة تقذى بالسبر
সে বিশাল বাহিনীসমূহ-যা দেখে চোখ রীতিমত ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়ে। আমি তাদের বল্লম নিক্ষেপে এমনিভাবে গভীর ক্ষতে আহত করি যে, সে গভীর ক্ষত দেখবার জন্যে ও ক্ষত সারাবার জন্যে বাতিসমূহের প্রয়োজন দেখা দেয়।
حين يذم المستكين المنجحر * وأطعن النجلاء تعوى وتهر
যখন পালিয়ে ঘরের কোণে আশ্রয় গ্রহণকারী পরাভূতদের নিন্দাবাদ করা হয়ে থাকে, এমন সময় আমি এমন গভীর ক্ষত সৃষ্টিকারী আঘাত হানি, যা থেকে রীতিমত আওয়ায বের হতে থাকে।
لها من الجوف رشاش منهمر * تفهق تارات وحينا تنفجر
সেসব ক্ষত থেকে প্রবাহমান রক্তের ফোয়ারা বের হয়। কখনো বা সেসব ক্ষত ফেটে যায়, আবার কখনো তা প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ তা থেকে রক্তপুঁজ প্রভৃতি গড়িয়ে যায়।
وثعلب العامل فيها منكسر * يا زيد يا بن همهم اين تفر
বল্লমের ভাঙ্গা ফলা সেসব ক্ষতের মধ্যে রয়ে যায়। আর তখন আমরা ডেকে ডেকে এরূপ বলি: হে যায়দ, হে ইব্‌ন হামহাম তোমরা কোথায় পালিয়ে যাচ্ছো?
قد نفد الضرس وقد طال العمر * قد علم البيض الطويلات الخمر
পেষণ দাঁত ভেঙ্গে গেছে। বয়স অনেক বেড়ে গেছে। দীর্ঘ দো-পাট্টা পরিধানকারিণী মনোহারিণী নারীরা সম্যক অবগত
اني في امثالها غير غمر * اذ تخرج الحاصن من تحت الستر
যে, যখন সতী-সাধ্বী নারীদের পর্দা ত্যাগ করে ঘরের বের হতে বাধ্য হতে হয়, তখনো আমি এমনতর যখম দ্বারা ঘায়েল করার ব্যাপারে অনভিজ্ঞ বা আত্মভোলা প্রতিপন্ন হই না!
মালিক ইব্‌ন আওফ নিম্নের পংক্তিটি ও বলেন:
اقدم محاج انها الاساوره * لا تغرنك رجل نادره
হে আমার ঘোড়া মুহাজ! বড় বড় দক্ষ তীরন্দাজ আরোহীরা মওজুদ রয়েছে। তোর অনন্য সাধারণ পা যেন তোকে প্রতারিত না করে।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: উক্ত পংক্তিদ্বয় মালিক ইব্‌ন আওফের রচিত নয় এবং এ যুদ্ধের সময় তা কথিতও হয়নি, বরং এটা অন্য কোন কবির রচিত এবং অন্য যুদ্ধের সময় তা পঠিত।¹

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 যুদ্ধে নিহত অমুসলিমদের দ্রব্যসম্ভার হত্যাকারী মুসলমানদের প্রাপ্য

📄 যুদ্ধে নিহত অমুসলিমদের দ্রব্যসম্ভার হত্যাকারী মুসলমানদের প্রাপ্য


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর আমার নিকট আবু কাতাদা আনসারী (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমার এমন কিছু সাথী আমার নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যাদের আমি অসত্য ভাষণের জন্যে অভিযুক্ত করতে পারি না। তারা বনূ গিফারের আযাদকৃত গোলাম নাফি এর সূত্রে আবু মুহাম্মদের এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তিনি আবু কাতাদা (রা) সূত্রে বলেন যে, তিনি [আবু কাতাদা (রা)] বলেছেন: হুনায়নের যুদ্ধের দিন আমি দু’ ব্যক্তিকে লড়াইরত অবস্থায় দেখতে পেলাম। তাদের একজন মুসলিম এবং অপরজন মুশরিক ছিল।
তিনি বলেন: এমন সময় আমি দেখতে পেলাম, অপর একজন মুশরিক এসে তার সাথী মুশরিক ভাইকে মুসলমানটির বিরুদ্ধে সাহায্য করতে চাইলো।
আবু কাতাদা (রা) বলেন: তখন আমি অগ্রসর হয়ে তার হাতটি কেটে দিলাম। সে তার অপর হাত দিয়ে আমার গলা চেপে ধরলো। আল্লাহ্র কসম! সে আমাকে কোনমতেই ছাড়ছিল না, এমন কি আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
ইবন হিশামের বর্ণনায় আছে: সে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলে ফেলে অবস্থা। রক্তক্ষয় যদি তাকে নিঃশেষিত না করে ফেলতো, তা হলে সে অবশ্যই আমাকে হত্যা করতো। এমন সময় সে ধড়াস করে পড়ে গেল। তারপর আমি তাকে আরেকটি আঘাত করে হত্যা করলাম। তারপর আমার অবস্থা এতই কাহিল ছিল যে, আমার পক্ষে আর লড়াই করা সম্ভবপর ছিল না। এ সময় জনৈক মক্কাবাসী আমাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করতে গিয়ে নিহত ব্যক্তিটির দ্রব্যসম্ভার তুলে নিল। যখন যুদ্ধ শেষ হলো, আর আমরা শত্রুদের দিক থেকে পূর্ণরূপে অবসর হলাম, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঘোষণা করলেন : من قتل قتيلا فله سلبه যে ব্যক্তি (যুদ্ধ ক্ষেত্রে অমুসলিমদের) কোন ব্যক্তিকে হত্যা করবে, সে-ই হবে তার নিকট থেকে লব্ধ দ্রব্যসামগ্রীর মালিক।"
তখন আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহ্র কসম! আমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছি, যার কাছে যথেষ্ট দ্রব্যসামগ্রী ছিল। তখন আমি খুব কাহিল হয়ে পড়েছিলাম। কে তা উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছে তা আমি বলতে পারবো না।
তখন মক্কাবাসী এক ব্যক্তি বললো সে যথার্থ বলেছে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ঐ নিহত ব্যক্তিটির দ্রব্যসামগ্রী আমার কাছে আছে। আপনি এ বস্তুগুলো আমার নিকট থাকার ব্যাপারে তাকে সম্মত করে দিন!
তখন আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলে উঠলেন আল্লাহ্র কসম! তা কখনো হতে পারে না। এ ব্যাপারে তিনি তাকে সম্মত করবেন না। আল্লাহ্র সিংহদের মধ্যকার একটি সিংহের, যে তাঁরই দীনের হিফাযতের জন্যে লড়াই করে, তুমি তারই প্রাপ্য ভাগ বসাতে চাচ্ছো? তার হাতে নিহত ব্যক্তির দ্রব্যসামগ্রী তাকে ফিরিয়ে দাও!
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলে উঠলেন : صدق فاردد علیه سلبه "আবূ বকর যথার্থই বলেছেন। তুমি তার প্রাপ্য নিহত ব্যক্তির সামগ্রী তাকে ফিরিয়ে দাও।"
আবু কাতাদা (রা) বলেন: সাথে সাথে আমি তা তার কাছ থেকে নিয়ে নিলাম। তারপর তা বিক্রি করে একটি খেজুর বাগান কিনলাম, আর এটাই ছিল আমার মালিকানাধীন প্রথম সম্পদ।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট এমন এক রাবী আবূ সালামা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যাকে আমি মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত করতে পারি না। তিনি ইসহাক ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ তালহা সূত্রে আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণনা করেন, একা আবু তালহাই হুনায়ন যুদ্ধের দিন কুড়িজনের দ্রব্যসামগ্রী খুলে নিয়েছিলেন。

টিকাঃ
১. মাওলানা আবদুল জলীল সিদ্দিকী অনূদিত এবং মাওলানা গোলাম রাসূল মেহের সম্পাদিত সীরাতুন্নবী কামিল শিরোনামে প্রকাশিত এ গ্রন্থের উর্দু ভাষ্যে নির্দিষ্ট করে শেষোক্ত পংক্তিদ্বয় কাদিসিয়ার যুদ্ধে কথিত হয় বলে বলা হয়েছে। দেখুন সীরাতুন্নবী কামিল, ২খ. পৃ. ৫৩৪।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 যুদ্ধে ফেরেশতাদের অংশ গ্রহণ

📄 যুদ্ধে ফেরেশতাদের অংশ গ্রহণ


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: আবূ ইসহাক ইব্‌ন ইয়াসার আমার নিকট বলেন যে জুবায়র ইন্ন মুতইম (রা)-এর সূত্রে তাঁর নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি বলেছেন: শত্রু সম্প্রদায়ের পরাজয়ের প্রাক্কালে লোকজন যখন যুদ্ধেরত তখন আমি লক্ষ্য করলাম, আসমান থেকে কাল চাদরের মত কী যেন নেমে আসছে। শেষ পর্যন্ত তা আমাদের এবং শত্রু সম্প্রদায়ের মধ্যবর্তী স্থানে পতিত হলো। আমি চেয়ে দেখি, অসংখ্য কালো কালো পিঁপড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সমস্ত প্রান্তর তাতে ভরে গিয়েছে। তখন আমার কোন সন্দেহ রইলো না যে, এঁরা আল্লাহ্ ফেরেশতা। তারপর কাফির সম্প্রদায়ের বিপর্যয় না ঘটা পর্যন্ত তাঁরা আর ফিরে যাননি, বরং সব সময় আমাদের সাথে ছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00