📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আল্লাহ্ পক্ষ থেকে সাহায্য প্রসংগে

📄 আল্লাহ্ পক্ষ থেকে সাহায্য প্রসংগে


ইবন ইসহাক বলেন: মক্কাবাসী কেউ কেউ আমার নিকট বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা থেকে হুনায়নের পথে যাত্রার সময় যখন তার সঙ্গীসাথী আল্লাহ্র বাহিনীর সংখ্যাধিক্য লক্ষ্য করলেন, তখন তিনি বললেন:
لن نغلب اليوم من قلة
"সংখ্যা স্বল্পতার জন্যে আমাদের আর পরাজয় বরণ করতে হবে না।"
ইবন ইসহাক বলেন: কারো ধারণা, কথাটি বনূ বকরের জনৈক ব্যক্তি এরূপ বলেছিল।
ইবন ইসহাক বলেন: যুহরী আমার নিকট কাসীর ইবন আব্বাস সূত্রে, তিনি তাঁর পিতা আব্বাস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব সূত্রে বলেন: আমি সেদিন রাসূলুল্লাহর সংগে ছিলাম। আমি তখন তাঁর সাদা রঙের খচ্চরের লাগাম ধরে তার অবলম্বন স্বরূপ ছিলাম।
আব্বাস (রা) বলেন: আমি ছিলাম একজন মোটাসোটা গোছের উচ্চ ধ্বনিসম্পন্ন ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন লোকজনের পলায়নপর অবস্থা লক্ষ্য করলেন তখন তিনি বলতে লাগলেন:
اين ايها الناس ؟
"তোমরা যাচ্ছো কোথায়, হে লোকসকল?"
কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, তাঁর কথায় কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে লক্ষ্য করে বললেন: হে আব্বাস! তুমি—হে আনসার সমাজ! 'হে সামুরা ওয়ালা সম্প্রদায়'!' বলে লোকজনকে আহবান কর!
রাবী আব্বাস (রা) বলেন: তখন লোকজন 'লাব্বায়িক লাব্বায়িক' বলে সাড়া দিল। রাবী বলেন: তখন সকলেই নিজ নিজ উটের গতিরোধের প্রয়াস পেল।
কিন্তু কেউ তাতে সমর্থ হচ্ছিলো না। তখন তারা নিজেদের বর্ম নিজ নিজ ঘাড়ের উপর ফেলে, ঢাল তরবারি নিয়ে উট থেকে লাফিয়ে পড়ছিল এবং সেগুলোকে ছেড়ে দিচ্ছিলো। তারপর তারা আমার ধ্বনি অনুসরণ করে অগ্রসর হতে হতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট পর্যন্ত এসে পৌঁছলো। এভাবে যখন তাঁর নিকট শ' খানেক লোক জড়ো হলো, তখন তারা শত্রুপক্ষের মুখোমুখি হলো এবং উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ বেঁধে গেল। তাঁদের সংকেতধ্বনি প্রথম দিকে ছিল " باللانصار"-হে আনসার সম্প্রদায়!' আর পরে তা ছিল 'با للخرج"-'হে খাযরাজ সম্প্রদায়!'

টিকাঃ
১. সামুরা ওয়ালা সম্প্রদায় বলতে এখানে 'বায়আতে রিদওয়ানে' অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের বুঝানো হয়েছে।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আলী (রা) ও আনসার সাহাবীর বীরত্ব

📄 আলী (রা) ও আনসার সাহাবীর বীরত্ব


ইবন ইসহাক বলেন: 'আসিম ইবন উমর, জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। হাওয়াযিনের সেই পতাকাধারী ব্যক্তিটি যখন মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে তার ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছিলো, তখন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) এবং জনৈক আনসার সাহাবী যেমন করেই হোক তাকে খতম করতে সংকল্প করলেন।
রাবী বলেন: সে মতে আলী লোকটির পিছন দিকে গিয়ে তার উটের পিছনের পা দু'টি কেটে দিলেন। উটটি মূহূর্তেই তার নিতম্বর উপর পতিত হলো। তৎক্ষণাৎ আনসার ব্যক্তিটি লোকটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি তার পায়ের উপর সজোরে তলোয়ারের আঘাত করতেই তার পায়ের গোছা ঠিক মাঝামাঝি স্থানে দ্বি-খণ্ডিত হয়ে গেল। সে ব্যক্তি তখন ধড়ام করে তার বাহন থেকে নীচে পতিত হলো। এভাবে সে নিহত হয়।
রাবী জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন: এ যুদ্ধে লোকজন সাহস ও বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। আল্লাহ্র কসম! শত্রুপক্ষের যে লোক একবার পরাজিত হয়ে পালিয়েছে, সে আর ফিরে আসার নামও করেনি। এমন কি শেষ পর্যন্ত শত্রুপক্ষের এক বিরাটসংখ্যক লোক বন্দী অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে নীত হয়।
রাবী বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) একবার আবু সুফিয়ান ইবন হারিছ ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের দিকে তাকালেন। সেদিন যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে চরম ধৈর্য, স্থৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি যখন থেকে ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন থেকেই একজন পরম নিষ্ঠাবান মুসলমানরূপে পরিচিত ছিলেন। তিনি তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খচ্চরের জিনের পেছনের অংশ ধরে ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞাসা করলেন: কে হে? জবাবে তিনি বললেন: আমি, আপনার মায়েরই সন্তান, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)!’

টিকাঃ
১. এ সীরাত গ্রন্থের ব্যাখ্যাতা বিখ্যাত ‘রওযুল উনুফ’ গ্রন্থের রচয়িতা সহায়লী এবং ইয়াকুত প্রমুখ বলেন: ইতোপূর্বে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখে এরূপ উৎসাহব্যঞ্জক ও আবেগময় শব্দ কোন যুদ্ধের সময় শোনা যায়নি।
২. আসলে ইনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাচাতো ভাই-তাঁর দাদীর পৌত্র। আরবী বান্ধারায় এরূপ লোককে নিজের মায়ের সন্তান বলার প্রচলন ছিল। আমাদের দেশেও বড় চাচীকে বড়-আম্মা, চাচীকে আম্মা বলার রেওয়াজ প্রচলিত আছে। সে হিসাবে আপনার মায়ের সন্তান বলে তাঁর পরিচয় দেয়া অস্বাভাবিক নয়।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রণাঙ্গনে উম্মু সুলায়ম (রা)

📄 রণাঙ্গনে উম্মু সুলায়ম (রা)


ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে দেখেন উম্মু সুলায়মান বিন্ত মিলহানও তাঁর স্বামী আবূ তালহার সাথে রণাঙ্গনে এসেছেন। তিনি তাঁর কোমরে একটি চাদর জড়িয়ে বেঁধে রেখে ছিলেন। তখন আবু তালহার সন্তান (আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ তালহা) তাঁর গর্ভে। আবু তালহার উট তিনি সামলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল, পাছে উট তাঁর বাগ না মানে। এজন্যে অর মাথা নিকটে টেনে ধরে তাঁর হাত নাকে বাঁধা রশির সাথে উটের নাকের ছিদ্রের মধ্যে চুকিয়ে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন: কী হে, উম্মু সুলায়ম নাকি?
তিনি জবাব দিলেন জ্বী হ্যাঁ, আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনাকে ছেড়ে যারা পলায়ন করে যাবে আমি তাদেরকে হত্যা করবো, যেমনটি আপনি হত্যা করবেন আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধরতদেরকে। কেননা, তারা এরই যোগ্য পাত্র। প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আল্লাহ-ই কি তাদের জন্য যথেষ্ট নন, হে উম্মু সুলায়ম?
রাবী বলেন: উম্মু সুলায়মের সাথে তখন একটি খঞ্জর ছিল। আবূ তালহা তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন: এ খঞ্জর কি জন্যে এনেছ হে উম্মু সুলায়ম? জবাবে উম্মু সুলায়ম বললেন: কোন পৌত্তলিক যদি আমার পাশে ঘেঁষে তা হলে তার নাড়িভুঁড়ি আমি এর দ্বারা বের করে দেবো।
রাবী বলেন: তখন আবূ তালহা (রা) বলে উঠলেন: আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন না, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! রাগান্বিত উম্মু সুলায়ম কী বলছে?

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মালিক ইব্‌ন আওফের কবিতা

📄 মালিক ইব্‌ন আওফের কবিতা


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন হুনায়ন অভিমুখে যাত্রা করেন, তখন বন্ সুলায়ম যাহ্হাক ইব্‌ন সুফিয়ান কিলাবীকে তাদের সাথে নিয়ে নেন। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে তাঁর কাছে কাছেই থাকে। লোকজন যখন পরাস্ত হয়ে পশ্চাৎ অপসরণ করছিল। তখন মালিক ইব্‌ন আওফ তার নিজের ঘোড়াকে লক্ষ্য করে তার উদ্দীপক কবিতায় বলেন:
أقدم محاج انه يوم نكر * مثلى على مثلك يحمى ويكر
হে আমার ঘোড়া মুহাজ, তুই এগিয়ে চল। আজ ভীতিপ্রদ যুদ্ধের দিন। আমার মত লোক তোর মত ঘোড়ার পিঠে চড়েই এমন দিনে আত্মরক্ষা করে এবং আক্রমণের পর আক্রমণ চালিয়ে যায়।
اذا اضيع الصف يوما والدبر * ثم احزالت زمر بعد زمر
যুদ্ধের দিনে যখন সারিসমূহ ভেঙ্গে যায়, তারপর দলের পর দল, বাহিনীর পর বাহিনী, হয়ে যায়।
كتائب يكل فيهن البصر * قد اطعن الطعنة تقذى بالسبر
সে বিশাল বাহিনীসমূহ-যা দেখে চোখ রীতিমত ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়ে। আমি তাদের বল্লম নিক্ষেপে এমনিভাবে গভীর ক্ষতে আহত করি যে, সে গভীর ক্ষত দেখবার জন্যে ও ক্ষত সারাবার জন্যে বাতিসমূহের প্রয়োজন দেখা দেয়।
حين يذم المستكين المنجحر * وأطعن النجلاء تعوى وتهر
যখন পালিয়ে ঘরের কোণে আশ্রয় গ্রহণকারী পরাভূতদের নিন্দাবাদ করা হয়ে থাকে, এমন সময় আমি এমন গভীর ক্ষত সৃষ্টিকারী আঘাত হানি, যা থেকে রীতিমত আওয়ায বের হতে থাকে।
لها من الجوف رشاش منهمر * تفهق تارات وحينا تنفجر
সেসব ক্ষত থেকে প্রবাহমান রক্তের ফোয়ারা বের হয়। কখনো বা সেসব ক্ষত ফেটে যায়, আবার কখনো তা প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ তা থেকে রক্তপুঁজ প্রভৃতি গড়িয়ে যায়।
وثعلب العامل فيها منكسر * يا زيد يا بن همهم اين تفر
বল্লমের ভাঙ্গা ফলা সেসব ক্ষতের মধ্যে রয়ে যায়। আর তখন আমরা ডেকে ডেকে এরূপ বলি: হে যায়দ, হে ইব্‌ন হামহাম তোমরা কোথায় পালিয়ে যাচ্ছো?
قد نفد الضرس وقد طال العمر * قد علم البيض الطويلات الخمر
পেষণ দাঁত ভেঙ্গে গেছে। বয়স অনেক বেড়ে গেছে। দীর্ঘ দো-পাট্টা পরিধানকারিণী মনোহারিণী নারীরা সম্যক অবগত
اني في امثالها غير غمر * اذ تخرج الحاصن من تحت الستر
যে, যখন সতী-সাধ্বী নারীদের পর্দা ত্যাগ করে ঘরের বের হতে বাধ্য হতে হয়, তখনো আমি এমনতর যখম দ্বারা ঘায়েল করার ব্যাপারে অনভিজ্ঞ বা আত্মভোলা প্রতিপন্ন হই না!
মালিক ইব্‌ন আওফ নিম্নের পংক্তিটি ও বলেন:
اقدم محاج انها الاساوره * لا تغرنك رجل نادره
হে আমার ঘোড়া মুহাজ! বড় বড় দক্ষ তীরন্দাজ আরোহীরা মওজুদ রয়েছে। তোর অনন্য সাধারণ পা যেন তোকে প্রতারিত না করে।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: উক্ত পংক্তিদ্বয় মালিক ইব্‌ন আওফের রচিত নয় এবং এ যুদ্ধের সময় তা কথিতও হয়নি, বরং এটা অন্য কোন কবির রচিত এবং অন্য যুদ্ধের সময় তা পঠিত।¹

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00