📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও কোন কোন সাহাবীর দৃঢ়তা
ইবন ইসহাক বলেন: আসিম ইবন উমর ইবন কাতাদা জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: আমরা যখন হুনায়ন প্রান্তরের সামনে এলাম, তখন আমরা তিহামাগামী প্রান্তরসমূহের একটি প্রান্তরের ঢালু প্রশস্ত এলাকার নীচের দিকে অবতরণ করতে শুরু করলাম। ভোরের আঁধার তখনও কাটেনি। শত্রুপক্ষ আমাদের আগেই সে প্রান্তরে অবস্থান নিয়েছিল। তারা প্রতিটি গিরিপথ, গোপনীয় ও সংকীর্ণ স্থানে আমাদের জন্যে ওঁৎপেতে বসে ছিল। তারা আগে থেকেই রীতিমত পরিকল্পনা নিয়ে এরূপ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আমাদের সে প্রান্তর অবতরণকালে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ বা আক্রান্ত হওয়ার কল্পনামাত্র ছিল না। এমন সময় শত্রুবাহিনী তাদের গোপন অবস্থান স্থলসমূহ থেকে অতর্কিতে একযোগে আমাদের উপর প্রচণ্ড হামলা করলো। ফলে, আমরা দিশাহারা হয়ে এমনিভাবে পশ্চাতের দিকে পালালাম যে, কেউ যে কারো দিকে ফিরে তাকাবো সে উপায়ও ছিল না।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) ডান দিকে একটু সরে গিয়ে ফিরে দাঁড়ালেন এবং আওয়ায দিতে লাগলেন: اين ايها الناس ؟ هلموا الى انا رسول الله انا محمد بن عبد الله
"হে লোকসকল! তোমরা যাচ্ছো কোথায়? আমার দিকে এসো! আমি আল্লাহ্র রাসূল, আমি মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্।"
রাবী জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন: পলায়নকালে উটগুলো একটার উপর অপরটা পড়ছিল। এভাবে সমস্ত লোক দেখতে দেখতে উধাও হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে তখন মাত্র কয়েকজন মুহাযির, আনসার ও আহলে বায়তের লোক ছিলেন।
মুহাজিরদের মধ্যে যাঁরা সেদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে ছিলেন তাঁরা হচ্ছেন: আবু বকর ও উমর (রা)। আহলে বায়তের মধ্যে ছিলেন: আলী ইব্ন আবূ তালিব, আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব, আবু সুফিয়ান ইবন হারিস এবং তাঁর পুত্র, ফযল ইব্ন আব্বাস, রবী'আ ইবন হারিস, উসামা ইবন যায়দ এবং আয়মন ইবন উবায়দুল্লাহ্ (রা) যিনি ঐদিনই শাহাদত বরণ করেন।¹
ইব্ন হিশাম বলেন: আবু সুফিয়ান ইব্ন্ন হারিসের পুত্রের নাম ছিল জা'ফর। আর আবূ সুফিয়ানের আসল নাম ছিল মুগীরা। (আবু সুফিয়ান তাঁর উপনাম ছিল)। কেউ কেউ এ তালিকায় কসম ইব্ন আব্বাসের নাম নেন, তাঁরা আবু সুফিয়ানের পুত্রকে এ তালিকায় গণ্য করেন না।
টিকাঃ
১. কারো মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, যুদ্ধ হতে পলায়ন একটি কবীরা গুনাহ্ হওয়া সত্ত্বেও মাত্র আটজন ছাড়া নবী করীম (সা)-এর সঙ্গী-সাথী সকলেই সেদিন কি করে পলায়ন করলেন, অথচ কুরআন শরীফে এ ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। এর জবাব হচ্ছে : একমাত্র বদরের যুদ্ধের দিনের পলায়ন ছাড়া অন্যান্য যুদ্ধ থেকে পলায়ন কবীরা গুনাহ হওয়ায় ব্যাপারে আলিমদের ইজমা বা মতৈক্য নেই। হাসান ও নাফি'- যিনি আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম ছিলেন, এরূপই বলেছেন। কুরআন শরীফের আয়াতে : ومن بؤلهم يومنذ ديره )যারা ঐ দিন পালাবে), এর সুস্পষ্ট দলীল। উহুদ যুদ্ধের দিন যারা যুদ্ধ থেকে পলায়ন করেন, তাঁদের সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে ولقد عفا الله عنهم (আল্লাহ্ তাঁদের মাফ করে দিয়েছেন)। হুনায়ন যুদ্ধের দিনের পলাতকদের ব্যাপারে উল্লেখিত আয়াতের সমাপ্তি টানা হয়েছে : غفور رحیم শব্দদ্বয় দিয়ে যা তাঁদের ক্ষমাপ্রাপ্তির ইঙ্গিতবাহী। এ প্রসঙ্গ পুরো আয়াতগুলো হচ্ছে:
لقد نصركم الله في مواطن كثيرة ويوم حنين اذ اعجبتكم كثرتكم فلم تغن عنكم شيئا وضاقت عليكم الارض بما رحبت ثم وليتم مديرين - ثم انزل الله سكينته على رسوله وعلى المؤمنين وانزل جنودا لم تروها وعذب الذين كفروا وذالك جزاء الكافرين - ثم يتوب الله من بعد ذالك على من يشاء والله غفور رحيم "আল্লাহ্ তোমাদের তো সাহায্য করেছেন বহু ক্ষেত্রে এবং হুনায়নের যুদ্ধের দিনে, ফলে তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোনই কাজে আসেনি, পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়েছিল এবং পরে তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়েছিলে। তারপর আল্লাহ্ তাঁর নিকট থেকে তাঁর রাসূল ও বিশ্বাসীদের উপর প্রশান্তি বর্ষণ করেন, এবং এমন এক সৈন্যবাহিনী অবতীর্ণ করেন, যা তোমরা দেখতে পাওনি এবং তিনি কাফিরদের শাস্তি প্রদান করেন; এটাই কাফিরদের কর্মফল। এরপরও আল্লাহ্ যার প্রতি ইচ্ছা ক্ষমাপরায়ণ হতে পারেন; আল্লাহ্ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৯: ২৫-২৭)।
ইবন সালাম বলেন: বদরযুদ্ধের দিনের পলায়ন-ই কবীরা গুনাহ ছিল। কিন্তু তা থেকে পলায়নকারীরা পরবর্তীতে ফিরে আসেন এবং রাসূলূল্লাহ্ (সা)-এর পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্ তাঁদের বিজয় দান করেন।
📄 মুসলমানদের পরাজয়ে আবূ সুফিয়ানের উল্লাস
ইবন ইসহাক বলেন: যুদ্ধে যখন মুসলমানদের বিপর্যয় হলো এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে গমনকারী মক্কাবাসী গোঁয়ার প্রকৃতির লোকেরা তা প্রত্যক্ষ করলো, তখন তাদের কেউ কেউ কথাবার্তায় তাদের অন্তরে লুক্কায়িত বিদ্বেষের অভিব্যক্তি ঘটালো। আবু সুফিয়ান ইব্ হারব বলে উঠলো: "তাদের পরাজয়ের অন্ত থাকবে না- যদি সমুদ্রও সামনে পড়ে যায়। আর তীর নিশ্চয়ই তাঁর সাথে তাঁর তৃণে রয়েছে।"
জাবালা ইবন হাম্বল চীৎকার করে বললো, (কিন্তু ইবন হিশামের বর্ণনা হচ্ছে 'কালাদাহ্ ইবন হাম্বল') সে তার ভাই সাওয়ান ইবন উমাইয়ার সাথে ছিল- যিনি তখনো পৌত্তলিক ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলাম গ্রহণের কথা চিন্তা করার জন্যে তাকে তখন সময় দিয়ে রেখে ছিলেন : الا بطل السحر اليوم "আজ যাদুর তেলেসমাতি টুটে গেছে!"
তখন সাওয়ান ইবন উমাইয়া বললেন ..... اسكت فض الله فاك থাম! আল্লাহ্ তোর মুখ ভেঙ্গে দিন! আল্লাহর কসম একজন কুরায়শের আমার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, আমার উপর একজন হাওয়াযিনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চাইতে অধিকতর পসন্দনীয়।
📄 কালদার নিন্দায় হাসানের কবিতা
ইন হিশাম বলেন: কালদার নিন্দায় হাসান ইবন সাবিত (রা) তাঁর কবিতায় বলেন:
رأيت سوادا من بعيد فراعنى * ابو حنبل ينزو على ام حنبل
كان الذي ينزو به فوق بطنها * ذراع قلوص من نتاج ابن عزهل
"দূর থেকে আমি (হাওয়াযিনের) কাল পতাকাটি দেখতে পেলাম। আমাকে ভয় প্রদর্শন করলো আবূ হাম্বল। সে তখন উম্মু হাম্বল, অর্থাৎ তার স্ত্রীর উপর উপগত। যে তার সাথে সঙ্গম করছিল, সে তার উদরের উপর-ই ছিল। ইব্ন আযহালের জন্মাবার হাত ছিল তখন অপসৃয়মান।"
আবূ যায়দ এ দু'টি পংক্তি আমাকে সুর করে আবৃত্তি করে শুনান। তিনি আমার কাছে বলেন যে, এ দু'টি পংক্তি দিয়ে তিনি সাওয়ান ইবন উমাইয়ার নিন্দাবাদ করেছিলেন, আর তিনি ছিলেন উক্ত কালদারই মুশরিক ভাই।
📄 শায়বা ইন্ন তালহা কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যার প্রচেষ্টা
ইবন ইসহাক বলেন: শায়বা ইবন উসমান ইব্ন আবূ তালহা আমার নিকট বর্ণনা করেন; আর তিনি ছিলেন আবদুদ্দার গোত্রের একজন, আমি মনে মনে বললাম, "আজই আমার মুহাম্মদের নিকট থেকে রক্তের প্রতিশোধে নেয়ার সুবর্ণ সুযোগ। উল্লেখ্য তার পিতা উহুদের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। সে বললো: আজ আমি মুহাম্মদকে হত্যা করবো।
সে বলে: আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)- কে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর চার পাশে ঘুরতে লাগলাম, তারপর কী যেন এসে আমার সামনে অন্তরায় হয়ে গেল। এমন কি তা আমার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেললো। শেষ পর্যন্ত আমার পক্ষে আর তা করা সম্ভবপর হলো না। আমি উপলব্ধি করলাম, আমাকে এ কাজ থেকে নিবৃত্ত করা হয়েছে, অর্থাৎ কোন অদৃশ্য শক্তিই তাঁকে হত্যা করা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করেছে।