📄 মক্কায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গভর্নর
মক্কায় যারা রয়ে যান, তাদের আমীর রূপে আত্তাব ইব্ন উসায়দা ইব্ন আবূ ঈস ইব্ন উমাইয়া ইব্ন আব্দ শাম্সকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় তাঁর প্রতিনিধি নিযুক্ত করে যান। তারপর তিনি হাওয়াযিন গোত্রের মুকাবিলার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন।
📄 ইন্ন মিরদাসের কাসীদা
আব্বাস ইব্ন মিরদাস সুলামী এ সম্পর্কে তাঁর কবিতায় বলেন :
اصابت العام رعلا غول قومهم * وسط البيوت ولون الغول ألوان
এ বছর রি'ল গোত্রকে (যারা সুলায়ম গোত্রের একটি শাখা গোত্র) তাদের গোত্রের লোকজনের আনীত মহাবিপর্যয়, খোদ তাদের ঘরে এসে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এ মহাবিপদ একভাবে নয়, বহুভাবে বহুরূপে এসে তাদেরকে গ্রাস করেছে।
بالهف ام كلاب اذ تبيتهم * خيل ابن هوذة لا تنهى وانسان
কিলাব গোত্রের মায়ের তখনকার দুর্গাতির জন্যে আফসোস, যখন ইবন হাওযার অশ্বারোহীরা এবং ইনসান গোত্রের অপ্রতিরোধ্য বাহিনী উপর্যুপরি তাদের উপর নৈশ আক্রমণ চালাচ্ছিলো।
لا تلفظوها وشدوا عقد ذمتكم * إن ابن عمكم سعد و دهمان
মুখের গ্রাসের মত এদেরকে থু-থু করে ফেলে দিও না, বরং অঙ্গীকারের বন্ধনকে শক্ত কর। কেননা সা'দ ও দাহমান তোমাদেরই চাচাতো ভাই।
لن ترجعوها وان كانت مجللة * ما دام في النعم المخوذ ألبان
যদিও তারা সংকটাচ্ছন্ন এতদসত্ত্বেও তাদেরকে ফেরত পাঠিও না-যাবৎ গৃহপালিত জন্তুসমূহের স্তনে দুধ অবশিষ্ট থাকে।
شنعاء جلل من سوآتها حضن * وسال ذو شوغر منها وسلوان
হাদন পাহাড়¹ অনিষ্টকারিতা ও অপমানে জর্জরিত। যু-শাওগর ও সালওয়ান উপত্যকাদ্বয় চতুর্দিক থেকে প্রবাহিত পাপাচারের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে।
ليست بأطيب مما يشتوى حذف * اذ قال كل شواء العير جوفان
সে অনিষ্ট ঐ ভূনা গোশতের চাইতে মোটেও উত্তম নয়-যা হযফ নামক পাচক রান্না করে, আর বলে : বন্য গাধার ভূনা গোশত মাত্রই পুরুষাঙ্গ তুল্য।
وفي هوازن قوم غير أن بهم * داء اليماني فان لم يغدروا خانوا
হাওয়াযিন একটা মস্ত বড় সম্প্রদায়, তবে তাদের মধ্যে রয়েছে ইয়ামানী ব্যাধিটি—তারা যদি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ নাও করে, খিয়ানত তো অবশ্যই করবে।
فيهم اخ لو وفوا او بر عهدهم * ولو نهكناهم بالطعن قد لانوا
তাদের মধ্যে এমন ভাইও আছে যারা কদাচিত প্রতিশ্রুতি পালন করে বা বিশ্বাস রক্ষা করে। আর যদি আমরা তাদেরকে বর্শা দিয়ে ধমক লাগাই, তা হলে তারা অনেক বিনম্র হয়ে পড়ে।
ابلغ هوازن اعلاها واسفلها * منى رسالة نصح فيه تبيان
হে দূত, হাওয়াযিন গোত্রের উঁচু-নীচু সকলকে আমার পক্ষ থেকে এ উপদেশবার্তাটুকু পৌঁছে দাও, যাতে বিশদ বর্ণনা রয়েছে।
إني أظن رسول الله صابحكم * جيشا له في فضاء الأرض أركان
আমার নিশ্চিত ধারণা, রাসূলুল্লাহ (সা) প্রত্যুষেই তোমাদের বিরুদ্ধে তাঁর এমন এক বাহিনীকে পরিচালিত করবেন, যে বাহিনী তোমাদের ভূমিকে চারদিক থেকে ঘিরে নেবে।
فيهم أخوكم سليم غير تارككم * والمسلمون عباد الله غسان
এদের মধ্যে তোমাদের ভাই সুলায়ম গোত্রীয়রাও আছে, যারা তোমাদের ছাড়বার পাত্র নয়। আর মুসলমানরা হয় আল্লাহর বান্দা। তারা তোমাদের চিবিয়েই তবে ছাড়বে।
وفي عضادته اليمنى بنو اسد * والاجربان بنو عبس وذبيان
আর তাদের দক্ষিণ বাহিনীতে আছে আসাদ গোত্র। আরো আছে বনূ আবস ও যুবিয়ান-এমন দুটো গোত্র, যাদের দেখলে লোকেরা ভয়ে পালায়।
تكاد ترجف منه الارض رهبته * وفى مقدمه اوس وعثمان
এ বাহিনীর ভয়ে ভূমি পর্যন্ত কাঁপে। আর এ বাহিনীর অগ্রভাগে রয়েছে আওস ও উসমান গোত্র।
ইবন ইসহাক বলেন: আওস ও উছমান হচ্ছে মুযায়নিয়া গোত্রের দু'টি শাখা গোত্র।
ইবন হিশাম বলেন: ابلغ هوازن اعلاها واسفلها এ পংক্তি থেকে শেষ পর্যন্ত এ যুদ্ধ সম্পর্কে বলা হয়েছে, আর তার পূর্বের পংক্তিগুলো অন্য কোন যুদ্ধসংক্রান্ত। কিন্তু ইবন ইসহাক তা বর্ণনায় তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।
টিকাঃ
১. নাজদের একটি পাহাড়।
📄 ঝুলানো গাছের কাহিনী
ইবন ইসহাক বলেন: ইব্ন শিহাব যুহরী আমার নিকট আবূ ওয়াহিদ লায়সীর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, মালিক ইব্ন হারিস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে আমরা হুনায়নের যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বের হলাম। আমরা তখন সবেমাত্র জাহিলিয়াত ছেড়ে ইসলাম কবুল করেছি।
তিনি বলেন: আমরা তাঁর সংগে হুনায়ন যাত্রা করলাম। সে যুগে কুরায়শ ও আরবের অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায় একটি বিশাল সবুজ-শ্যামল গাছের খুব ভক্ত অনুরক্ত ছিল। সে গাছটিকে যাতুল আওয়াত বা ঝুলানো গাছ নামে অভিহিত করা হতো। প্রতিবছর একবার তারা ঐ গাছটির কাছে যেতো এবং তাদের অস্ত্রপাতি তার সাথে লটকাতো, পশুবলি দিত এবং এর নিকট এক দিন অবস্থান করতো।
তিনি বলেন: আমরা যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে পথ চলছি এমন সময় একটি বিশাল কুল গাছ আমাদের নযরে পড়লো। আমরা তখন রাস্তার কিনার থেকে চিৎকার করে বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ওদের যেমন ঝুলানো গাছ আছে, আমাদের জন্যেও তেমনি ঝুলানো গাছের ব্যবস্থা করুন!
তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন:
الله اكبر قلتم والذي نفس محمد بيده كما قال قوم موسى الموسى : اجعل لنا الها كما لهم الهة قال انكم قوم تجهلون انها السنن لتركبن سنن من كان قبلكم .
'আল্লাহু আকবার! মুহাম্মদের জীবন যাঁর হাতে সে পবিত্র সত্তার কসম, তোমরা এমন কথা বললে, যা মূসার সম্প্রদায় তাঁর কাছে বলেছিল। তারা বলেছিল ওদের অর্থাৎ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের যেমন অনেক ইলাহ্ বা পূজ্য দেবতা রয়েছে তেমনি আমাদের জন্যেও একজন মাবুদের ব্যবস্থা করুন! তিনি তখন জবাবে বলেছিলেন: "নিঃসন্দেহে তোমরা একটা অজ্ঞ সম্প্রদায়।" এটা তো গতানুগতিক প্রথা পদ্ধতি। এক সময় তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের অনুসারী হবে।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও কোন কোন সাহাবীর দৃঢ়তা
ইবন ইসহাক বলেন: আসিম ইবন উমর ইবন কাতাদা জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: আমরা যখন হুনায়ন প্রান্তরের সামনে এলাম, তখন আমরা তিহামাগামী প্রান্তরসমূহের একটি প্রান্তরের ঢালু প্রশস্ত এলাকার নীচের দিকে অবতরণ করতে শুরু করলাম। ভোরের আঁধার তখনও কাটেনি। শত্রুপক্ষ আমাদের আগেই সে প্রান্তরে অবস্থান নিয়েছিল। তারা প্রতিটি গিরিপথ, গোপনীয় ও সংকীর্ণ স্থানে আমাদের জন্যে ওঁৎপেতে বসে ছিল। তারা আগে থেকেই রীতিমত পরিকল্পনা নিয়ে এরূপ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আমাদের সে প্রান্তর অবতরণকালে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ বা আক্রান্ত হওয়ার কল্পনামাত্র ছিল না। এমন সময় শত্রুবাহিনী তাদের গোপন অবস্থান স্থলসমূহ থেকে অতর্কিতে একযোগে আমাদের উপর প্রচণ্ড হামলা করলো। ফলে, আমরা দিশাহারা হয়ে এমনিভাবে পশ্চাতের দিকে পালালাম যে, কেউ যে কারো দিকে ফিরে তাকাবো সে উপায়ও ছিল না।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) ডান দিকে একটু সরে গিয়ে ফিরে দাঁড়ালেন এবং আওয়ায দিতে লাগলেন: اين ايها الناس ؟ هلموا الى انا رسول الله انا محمد بن عبد الله
"হে লোকসকল! তোমরা যাচ্ছো কোথায়? আমার দিকে এসো! আমি আল্লাহ্র রাসূল, আমি মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্।"
রাবী জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন: পলায়নকালে উটগুলো একটার উপর অপরটা পড়ছিল। এভাবে সমস্ত লোক দেখতে দেখতে উধাও হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে তখন মাত্র কয়েকজন মুহাযির, আনসার ও আহলে বায়তের লোক ছিলেন।
মুহাজিরদের মধ্যে যাঁরা সেদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে ছিলেন তাঁরা হচ্ছেন: আবু বকর ও উমর (রা)। আহলে বায়তের মধ্যে ছিলেন: আলী ইব্ন আবূ তালিব, আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব, আবু সুফিয়ান ইবন হারিস এবং তাঁর পুত্র, ফযল ইব্ন আব্বাস, রবী'আ ইবন হারিস, উসামা ইবন যায়দ এবং আয়মন ইবন উবায়দুল্লাহ্ (রা) যিনি ঐদিনই শাহাদত বরণ করেন।¹
ইব্ন হিশাম বলেন: আবু সুফিয়ান ইব্ন্ন হারিসের পুত্রের নাম ছিল জা'ফর। আর আবূ সুফিয়ানের আসল নাম ছিল মুগীরা। (আবু সুফিয়ান তাঁর উপনাম ছিল)। কেউ কেউ এ তালিকায় কসম ইব্ন আব্বাসের নাম নেন, তাঁরা আবু সুফিয়ানের পুত্রকে এ তালিকায় গণ্য করেন না।
টিকাঃ
১. কারো মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, যুদ্ধ হতে পলায়ন একটি কবীরা গুনাহ্ হওয়া সত্ত্বেও মাত্র আটজন ছাড়া নবী করীম (সা)-এর সঙ্গী-সাথী সকলেই সেদিন কি করে পলায়ন করলেন, অথচ কুরআন শরীফে এ ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। এর জবাব হচ্ছে : একমাত্র বদরের যুদ্ধের দিনের পলায়ন ছাড়া অন্যান্য যুদ্ধ থেকে পলায়ন কবীরা গুনাহ হওয়ায় ব্যাপারে আলিমদের ইজমা বা মতৈক্য নেই। হাসান ও নাফি'- যিনি আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম ছিলেন, এরূপই বলেছেন। কুরআন শরীফের আয়াতে : ومن بؤلهم يومنذ ديره )যারা ঐ দিন পালাবে), এর সুস্পষ্ট দলীল। উহুদ যুদ্ধের দিন যারা যুদ্ধ থেকে পলায়ন করেন, তাঁদের সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে ولقد عفا الله عنهم (আল্লাহ্ তাঁদের মাফ করে দিয়েছেন)। হুনায়ন যুদ্ধের দিনের পলাতকদের ব্যাপারে উল্লেখিত আয়াতের সমাপ্তি টানা হয়েছে : غفور رحیم শব্দদ্বয় দিয়ে যা তাঁদের ক্ষমাপ্রাপ্তির ইঙ্গিতবাহী। এ প্রসঙ্গ পুরো আয়াতগুলো হচ্ছে:
لقد نصركم الله في مواطن كثيرة ويوم حنين اذ اعجبتكم كثرتكم فلم تغن عنكم شيئا وضاقت عليكم الارض بما رحبت ثم وليتم مديرين - ثم انزل الله سكينته على رسوله وعلى المؤمنين وانزل جنودا لم تروها وعذب الذين كفروا وذالك جزاء الكافرين - ثم يتوب الله من بعد ذالك على من يشاء والله غفور رحيم "আল্লাহ্ তোমাদের তো সাহায্য করেছেন বহু ক্ষেত্রে এবং হুনায়নের যুদ্ধের দিনে, ফলে তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোনই কাজে আসেনি, পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়েছিল এবং পরে তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়েছিলে। তারপর আল্লাহ্ তাঁর নিকট থেকে তাঁর রাসূল ও বিশ্বাসীদের উপর প্রশান্তি বর্ষণ করেন, এবং এমন এক সৈন্যবাহিনী অবতীর্ণ করেন, যা তোমরা দেখতে পাওনি এবং তিনি কাফিরদের শাস্তি প্রদান করেন; এটাই কাফিরদের কর্মফল। এরপরও আল্লাহ্ যার প্রতি ইচ্ছা ক্ষমাপরায়ণ হতে পারেন; আল্লাহ্ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৯: ২৫-২৭)।
ইবন সালাম বলেন: বদরযুদ্ধের দিনের পলায়ন-ই কবীরা গুনাহ ছিল। কিন্তু তা থেকে পলায়নকারীরা পরবর্তীতে ফিরে আসেন এবং রাসূলূল্লাহ্ (সা)-এর পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্ তাঁদের বিজয় দান করেন।