📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 দুরায়দ ইব্‌ন সুম্মা

📄 দুরায়দ ইব্‌ন সুম্মা


যখন তাকে হাওদা থেকে নামানো হলো, তখন সে জিজ্ঞাসা করলো: তোমরা এখন কোন প্রান্তরে? জবাবে তারা বললো: আওতাসে। সে বললো:
نعم مجال الخيل ! * لا حزن ضرس * ولا سهل دهس * مالي اسمع رغاء البعير ونهاق الحمير * وبكاء الصغير * ويعار الشاء ؟
ঘোড়ার চক্কর কাটার উত্তম জায়গাই বটে। উঁচু কঙ্করময় নয় যে ঘোড়া চলতে কষ্ট পাবে, নীচু কর্দমাক্ত নয় যে ঘোড়ার পা দেবে যাবে
সে আবার বললো: কী ব্যাপার, আমি যে শুনতে পাচ্ছি উটের হনহনানী? গাধার বিকট স্বর? শিশুদের কান্না? ছাগলের ভ্যাঁ, ভ্যাঁ, শব্দ?
জবাবে লোকজন বললো: মালিক ইব্‌ন আওফ তো লোকজনের সাথে তাদের ধন-সম্পদ ও তাদের স্ত্রীপুত্রকেও সাথে নিয়ে এসেছে। তখন দুরায়দ বললো: কোথায় মালিক ইব্‌ন আওফ? লোকজন তখন মালিক ইব্‌ন আওফকে ডেকে এনে বললো: এই যে মালিক ইব্‌ন আওফ!
তখন সে তাকে লক্ষ্য করে বললো: হে মালিক ইব্‌ন আওফ! তুমি এখন তোমার সম্প্রদায়ের নেতা হয়েছ। আজকের দিনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে অনাগত ভবিষ্যতের উপর। আমি যে, উটের হনহনানী, গাধার বিকট স্বর, শিশুদের কান্নাকাটি এবং ছাগলের ভ্যাঁন, ভ্যাঁন শব্দ শুনতে পাচ্ছি, ব্যাপার কী?
জবাবে মালিক ইব্‌ন আওফ বললো: আমি তো লোকজনের ধন-সম্পদ ও তাদের স্ত্রী পুত্রকে সাথে নিয়ে এসেছি। দুরায়দ বললো: এসব করতে গেলে কেন? জবাবে সে বললো: ভাবলাম, প্রতিটি লোকের পেছনে তার ধন-সম্পদ ও স্ত্রীপুত্রকে রেখে যুদ্ধ করবো— যাতে করে তারা তাদের এসব রক্ষার নিমিত্তে ওগুলোর মায়ায় লড়াই করে।
রাবী বলেন: এ জবাব শুনে দুরায়দ মালিককে ধমক দিয়ে উঠলো। সে বললো: আরে মেষপালক কোথাকার, শুনি, পরাজিত কাউকে কি কিছু ফেরত নিয়ে যেতে দেয়া হয়? যুদ্ধ যদি তোমার অনুকূলে যায়, তা হলে তো তলোয়ার ও বর্শাবল্লমধারী লোকই তোমার কাজে আসবে, আর যদি তা তোমার প্রতিকূলে যায়, তা হলে তোমার স্ত্রী পুত্র ও ধন-সম্পদ তোমার বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
তারপর দুরায়দ জিজ্ঞাসা করলো: আচ্ছা কা'ব ও কিলাব গোত্র কি ভূমিকা গ্রহণ করেছে? লোকজন জবাবে বললো: তাদের কেউই যুদ্ধক্ষেত্রে আসেনি। সে মন্তব্য করলো: তা হলে ক্ষিপ্রতা ও বীরত্বই অনুপস্থিত! এ যুদ্ধটা যদি প্রাধান্য ও মর্যাদা প্রাপ্তির হতো তা হলে কা'ব কিলাব গোত্র অনুপস্থিত থাকতো না। হায়, তোমরাও যদি কা'ব-কিলাব গোত্রদ্বয়ের মতো করতে তা হলে কতই না উত্তম হতো! তা'হলে তোমরা কারা যুদ্ধে এসেছো?
জবাবে লোকজন বললো: আমর ইব্‌ন আমির ও আওফ ইব্‌ন আমির গোত্রদ্বয়। সে বললো: ওহো, আমির গোত্রের দুটো আনাড়ী কিশোর শাখায় না দেখছি। এরা না পারবে কোন উপকার করতে আর না পারবে কোন অপকার করতে। শুন হে মালিক! তুমি হাওয়াযিনের জামাআতকে ঘোড়ার সামনে মোটেও পেশ করো না। বরং নিজ গোত্র ও দেশ রক্ষার নিমিত্ত এদেরকে পিছনে পাঠিয়ে দাও। তারপর শুধু অশ্বারোহীদেরকে নিয়ে সাবিঈদের (তথা মুসলমানদের) মুখোমুখি হও! যদি যুদ্ধের ফলাফল তোমাদের অনুকূলে আসে, তা হলে পিছনের লোকজনও এসে তোমাদের সাথে মিলিত হবে, আর যদি প্রতিকূলে যায়, তা হলে অন্তত তোমার পরিবার পরিজন ও ধন-সম্পদ তো নিরাপদ পাবে।
জবাবে মালিক ইব্‌ন আওফ বললো: আল্লাহ্র কসম! আমি তা করবো না। তুমি জরাজীর্ণ বুড়ো হয়ে গেছো, এজন্যে তোমার বুদ্ধি বিবেচনাও বুড়ি হয়ে গেছে! হে হাওয়াযিন গোত্রের লোকজন, আল্লাহর কসম! হয় তোমরা আমার আনুগত্য করবে, না হয় আমি আমার এ নিজ তলোয়ারের উপরই ভরসা করবো, যাবৎ না তা আমার কব্জা থেকে বেরিয়ে যায়। আর তার কাছে দুরায়দের সাথে আলোচনা বা তার মতামত কোনটাই মনঃপূত হলো না। হাওয়াযিন গোত্রীয়রা সমস্বরে বলে উঠলো : আমরা তোমার আনুগত্য করবো! তখন দুরায়দ ইব্‌ন সুম্মা বলে উঠলো :
هذا يوم لا اشهد ولا يفتني
এ এমন একটা যুদ্ধ-যাতে না পারলাম আমি শামিল হতে, না পারলাম এথেকে দূরে রইতে।
يا ليتني فيها جذع اخب فيها واضع * اقود وطفاء الزمع كانها شاة صدع
হায় যদি আজ হতাম যুবা, তবে লড়তাম খুব কোমর কষে কেশরসম লম্বা লোমের ছাগের মতো ঘোড়ায় বসে।
ইবন হিশাম বলেন: একাধিক কবিতা বিশেষজ্ঞ এ পংক্তিটি আমাকে গেয়ে শুনিয়েছেন : با ليتني فيها جزع

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 গুপ্তচরদের সাক্ষ্য

📄 গুপ্তচরদের সাক্ষ্য


ইবন ইসহাক বলেন : তারপর মালিক লোকজনের উদ্দেশ্যে বললো : তোমরা যখন মুসলিম বাহিনীকে আসতে দেখবে, তখন তোমরা তোমাদের তরবারির কোষসমূহ ভেঙ্গে ফেলবে এবং একযোগে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
রাবী হলেন : উমাইয়া ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আমর ইবন উসমান আমার নিকট বর্ণনা করেন; মালিক ইব্‌ন আওফ তার বাহিনী থেকে কিছু গুপ্তচরকে মুসলিম বাহিনীর সংবাদ সংগ্রহের জন্যে প্রেরণ করে। তারা তার কাছে এ অবস্থায় ফিরে আসলো যে, তাদের সব পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়ে গেছে। তখন সে তাদের বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে জিজ্ঞাসা করলো : তোমাদের সর্বনাশ হোক, তোমাদের এ দুবারস্থা কেন? জবাবে তারা বললো : চিত্র-বিচিত্র ঘোড়ার পিঠে সওয়ার কিছু শাদা-শুভ্র লোক দেখতে পেলাম। আল্লাহ্র কসম! তারপর আমাদের যে দশা দেখতে পাচ্ছেন, তা ঠেকাই, সে সাধ্য আমাদের ছিল না।
আল্লাহ্র শপথ! এমন একটি আলৌকিক ঘটনা দেখার পরও মালিক ইব্‌ন আওফকে তার পূর্ব পরিকল্পনা মত কাজ করে যাওয়া থেকেও বিরত রাখতে পারলো না। বরং সে তার পরিকল্পনা মত এগিয়ে গেল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ইব্‌ন আবূ হাদরাদের গুপ্তচর মিশন

📄 ইব্‌ন আবূ হাদরাদের গুপ্তচর মিশন


ইবন ইসহাক বলেন: হাওয়াযিনের এ যুদ্ধ প্রস্তুতির সংবাদ জানতে পেরে নবী করীম (সা) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ হাদরাদ আসলামীকে তাদের গোপন সংবাদাদি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়তে এবং তাদের সংবাদ নিয়ে ফিরে আসতে নির্দেশ দিলেন। সে মতে ইব্‌ন আবু হাদরাদ বেরিয়ে পড়লেন। তিনি যথাসময়ে তাদের মধ্যে গিয়ে ঢুকে পড়লেন এবং তাদের মধ্যে অবস্থান করে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পর্কে জেনে শুনে আসলেন। এ সময় তিনি মালিক ইব্‌ন আওফ ও বনূ হাওয়াযিনের সমস্ত পরিকল্পনা সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট ফিরে এসে তাঁকে সব খবর অবহিত করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন উমর ইবন খাত্তাব (রা)-কে ডেকে তাঁকেও সে সংবাদ অবহিত করলেন। সব শুনে উমর (রা) বললেন: ইব্‌ন আবূ হাদরাদ সত্য বলেনি। ইব্‌ন আবূ হাদরাদ তখন বলে উঠলেন: আজ যদি আপনি আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেন, (তা হলে এটা আশ্চর্যের কিছুই নয়!), হে উমর! একদা আপনি সত্যধর্মকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন, আমার চাইতে যিনি শতগুণে উত্তম সেই পবিত্রসত্তা (অর্থাৎ, মহানবী (সা)-কেও আপনি মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন! তখন উমর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে লক্ষ্য করে বললেন: ইব্‌ন আবূ হাদরাদ কী বলছে, তা কি আপনি শুনছেন না ইয়া রাসূলাল্লাহ্? তখন মৃদুহাস্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: قد كنت ضالا فهداك الله يا عمر তুমি যে বিভ্রান্ত পথহারা ছিলে তাতে তো সন্দেহ নেই হে উমর, তারপর আল্লাহ্ তোমাকে হিদায়াত দান করেছেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সাফওয়ানের বর্ম ধার নেয়া

📄 সাফওয়ানের বর্ম ধার নেয়া


রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন হাওয়াযিন গোত্রের মুকাবিলার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রংণ করলেন, তখন তাঁর কাছে বলা হলো যে সাফওয়ান ইবন উমাইয়ার কাছে তার নিজস্ব যথেষ্ট বর্ম ও অস্ত্র রয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে ডেকে পাঠালেন। লোকটি তখনো পৌত্তলিক¹। তিনি তাকে বললেন: হে আবূ উমাইয়া! আমাদেরকে তোমার অস্ত্রপাতি একটু ধার দাও না। আমরা আগামীকাল তোমার অস্ত্র নিয়ে শত্রুর মুকাবিলা করবো। সাফওয়ান বললেন: হে মুহাম্মদ! আপনি কি কেড়ে নেবেন? তিনি বললেন: না, ধার স্বরূপ, এ নিশ্চয়তাসহ নেবো যে, তা তোমার কাছে ফেরত দেবো। জবাবে সাফওয়ান বললেন: তা হলে আপত্তি নেই তারপর তিনি এক শ' বর্ম এবং সে অনুপাতে অস্ত্রপাতি দিলেন যা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ছিল। লোকজন বলে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফওয়ানের কাছে প্রয়োজন মাফিক অস্ত্রপাতি চেয়েছিলেন, আর তিনি তা-ই তাঁকে দিয়েছিলেন।

টিকাঃ
১. পূর্বেই বলা হয়েছে সাফওয়ান ইসলাম গ্রহণের কথাটি ভেবে দেখার জন্যে ইতোপূর্বে একমাস সময় নিয়েছিলেন। এটা ঐ এক মাস সময়ের মধ্যকার ঘটনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00