📄 জাহিলিয়াতের যুগে কুরায়শ ও বনূ জুযায়মার মধ্যের ঘটনা
ফাকীহ ইন্ন মুগীরা, আওফ ইব্ন আব্দ মান্নাফ ও আফফান ইব্ন আবুল আস ইব্ন উমাইয়া বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ইয়ামানে গিয়েছিলেন। আফফানের সাথে তাঁর পুত্র উসমান এবং আওফের সাথে তাঁর পুত্র আবদুর রহমানও ছিলেন। উক্ত তিন ব্যক্তি ইয়ামানে মৃত্যুবরণকারী জনৈক বনূ জাযায়মগোত্রীয় ব্যক্তির অর্থ-সম্পদ তার উত্তরাধিকারীদের নিকট পৌঁছেয়ে দেবার উদ্দেশ্যে ইয়ামান থেকে নিয়ে আসছিলেন। তাঁরা বনু জুযায়মা গোত্রের উক্ত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের নিকট পৌঁছবার পূর্বেই ঐ গোত্রের খালিদ ইব্ন হিশাম নামক এক ব্যক্তি তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করে উক্ত অর্থ-সম্পদ দাবী করলো। তাঁরা তার কাছে তা অর্পণে অস্বীকৃতি জানালে সে তার সঙ্গীসাথী নিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলো। তাঁরাও তার সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। এ যুদ্ধে আওফ ও ফাকীহ ইব্ন্ন মুগীরা নিহত হন। পক্ষান্তরে আফ্ফান ও তাঁর পুত্র উসমান বেঁচে যান। তারা ফাকীহ্ ইব্ন মুগীর ও আওফ ইব্ন আব্দ আওফের অর্থ-সম্পদ নিয়ে যায়। আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা) তাঁর পিতার ঘাতক উক্ত খালিদ ইবন হিশামকে হত্যা করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। তখন কুরায়শ গোত্র বনূ জুযায়মার সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে মনস্থ করে। বনূ জুযায়মারা বলে: আমাদের গোটা গোত্র তোমাদের লোকদের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত নয়, বরং ব্যক্তিগতভাবে কয়েকব্যক্তি মূর্খতাবশে তোমাদের লোকদের উপর হামলা করে তাদেরকে হত্যা করেছে। আমরা তার কিছুই অবগত নই। আমরা তোমাদের প্রাপ্য রক্তপণ এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্যে প্রস্তুত রয়েছি। কুরায়শরা তাদের এ ওযরখাহী ও প্রস্তাব মেনে নেয় এবং এভাবে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।
📄 সালমার কবিতা
বনূ জুযায়মার এক ব্যক্তি এ উপলক্ষে নিম্নোক্ত কবিতা বলেন। কেউ কেউ বলেন এর রচয়িতা সালমা নাম্নী এক মহিলা:
للاقت سليم يوم ذلك ناطحا * ولو لا مقال القوم للقوم اسلموا
ومرة حتى يتركوا البرك ضابحا * لما صعهم بسر واصحاب جحدم
যদি এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে না বলতো যে, আত্মসমর্পণ ও সন্ধির পথে এসো, তা হলে সেদিন সুলায়ম গোত্র শিং মেরে লড়াই করতো, বুসরা, জাহদাম এবং মুরার সঙ্গী-সাথীরা তাদের উপর এমন তলোয়ার চালাতো যে, তারা কেবল তাদের উটগুলোকে আর্তনাদরত অবস্থায় ছেড়ে দিত।
فكائن ترى يوم الغميصاء من فتى * اصيب ولم يجرح وقد كان جارحا
الظت بخطاب الايامي وطلقت * غداتئذ منهن من كان ناكحا
তা হলে তুমি সে যুবককে, যে নিহত হয়েছে, গামীসার প্রান্তরে প্রত্যক্ষ করতে এমনভাবে যে সে আহত অবস্থায় থাকতো না বরং অনেককে সে হতাহত করে ছাড়তো। গামীসা প্রান্তরের বিবাহিতা মহিলাদের সে তখন বিধবা করে দিত এবং এ বিধবাদের সংখ্যা এত বেশি হতো যে, তাদের বিয়ে করার প্রস্তাবদাতাদের প্রাচুর্যে গামীসা ভূমি বিরক্ত হয়ে উঠতো।
ইব্ন হিশام বলেন: উক্ত কবিতায় ব্যবহৃত بسر — এবং الظت بخطاب শব্দগুলো ইব্ন ইসহাক বর্ণিত নয়, অন্য কারো বর্ণিত।
📄 ইবন মিরদাসের জবাবী কবিতা
ইবন ইসহাক বলেন: উক্ত কবিতার জবাব আব্বাস ইবন মিরদাস নিম্নের কবিতার দ্বারা দেন। কেউ কেউ বলেন, বরং নিম্নের কবিতায় জবাব দেন জাহ্হাফ ইবন হাকীম সুলামী:
دعى عنك تقوال الضلال كفى بنا * لكبش الوغى في اليوم والامس ناطحا
(হে মহিলা কবি সাল্মা!) তোমার বিভ্রান্তিপূর্ণ বাক্যালাপ রেখে দাও, আমাদের জন্যে যুদ্ধের সে সর্দারই যথেষ্ট, যিনি আজ বল আর কালই বল বীর-বিক্রমে মুকাবিলাকারী।
فخالد أولى بالتعذر منكم * غداة علا نهجا من الأمر واضحا
খালিদই বরং একথার বেশী হকদার যে, তোমরা তাঁর কাছে ওযর পেশ করবে। কেননা, তাঁর সেদিনকার কর্মপন্থাই ছিল যথার্থ ও বাস্তব।
معانا بامر الله يزجى اليكم * سوانح لا تكبو له و بوارحا
আল্লাহ্র আদেশে তিনি ছিলেন সাহায্যপ্রাপ্ত। তিনি তোমাদের দিকে এমন বিপদরাশিকে ঠেলে দিচ্ছিলেন যে, তা কোন মতেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ছিল না।
نعوا مالكا بالسهل لما هبطنه * عوابس في كابي الغبار كوالحا
যখন রকমারি বিপদ আপদ বিভৎস মূর্তিতে দাঁত উচিয়ে রণাঙ্গনের ধূলি-ধূসরিত অন্ধকারে তার উপর আপতিত হলো, তখনই লোকজন মালিকের মৃত্যু সংবাদ শুনিয়ে দিল।
فان نك اثكلناك سلمى فمالك * تركتم عليه نائحات ونائحا
সুতরাং আমি যদি তোমাকে পুত্রবিরহে কাতর করে থাকি, হে সালমা! তা হলে তা কি একটা খুব বড় কথা, মালিকের জন্যে তোমরা অনেককে বিলাপকারিণী ও বিলাপকারী বানিয়েছ।
📄 বনূ জুযায়মার এক প্রেমিক যুগলের কাহিনী
ইবন ইসহাক বলেন: ইয়াবুব ইব্ন উতবা ইব্ন মুগীরা ইব্ন আখনাস আমার নিকট যুহরীর সূত্রে ইবন আবূ হাদরাদ আসলামী থেকে বর্ণনা করেন যে, উক্ত আবূ হাদরাদ বলেছেন: একদা আমি খালিদ ইব্ন ওয়ালীদের অশ্বারোহী দলের মধ্যে ছিলাম। তখন আমার বয়সী বনূ জুযায়মার একটি যুবক-যার দু'হাত তার ঘাড়ের সাথে রশি দিয়ে বাঁধা ছিল এবং তার অদূরেই কতিপয় মহিলা সমবেত ছিল, সে আমাকে বললো: হে যুবক! আমি বললাম: তোমার কী চাই? সে অনুনয়ের সাথে বললো: তুমি আমাকে একটু রশি ধরে ঐ মহিলাদের কাছে নিয়ে যেতে পার? ওদের কাছে আমার কিছু বলার আছে। তারপর তুমি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে এবং তোমরা যা ভাল মনে কর, তাই করবে।
জবাবে আমি বললাম আল্লাহ্র কসম তুমি তো খুব মামুলী একটি অনুরোধ করেছো। এ আর কী কঠিন ব্যাপার! তখন আমি তাকে রশি ধরে মহিলাদের কাছে নিয়ে গেলাম। সে সেখানে দাঁড়িয়ে বললো:
اسلمى حبيش * على نفذ من العيش
শান্তিতে রও হে হুবায়শ! আমার যে জীবনের শেষ!
أريتك اذ طالبتكم فوجدتكم * بحيلة أو ألفيتكم بالحوانق
ألم يك أهلا أن ينول عاشق * تكلف ادلاج السرى والودائق
হুবায়শা! তোমাকে আমি বলেছি যে, যখন আমি তোমাদেরকে খুঁজেছি তখন তোমাদের পেয়েছি কখনো হীলাতে আবার কখনো হাওয়ানীকে। যে প্রেমিক কখনো রাতের অন্ধকারে আবার কখনো খরাদগ্ধ দুপুরে পথ চলার কষ্ট বরণ করেছে, সে কি তার কষ্টের বিনিময় পাওয়ার হকদার ছিল না?
فلا ذنب لي قد قلت إذ أهلنا معا * أثيبي بود قبل إحدى الصفائق
আমার কোন অপরাধ নেই, আমি আগেই বলেছি যখন আমাদের লোকজন একত্রে ছিল—কোন বিপদাপদ এসে পড়ার আগেই প্রেমের বদলে আমাকে প্রেম দাও!
إثيبي بود قبل أن تشحط النوى * وينأى الامير بالحبيب المفارق
প্রেমের 'বদলে তুমি আমাকে প্রেম দাও বিরহ অন্তরায় হওয়ার আগেই, আর বিপদ এসে গৃহকর্তা বিরহী বন্ধুকে দূরে আরো দূরে নিয়ে যাওয়ার আগেই।
فانی لا ضیعت سر أمان * ولاراق عيني عنك بعدك رائق
আমি গোপন রহস্যের আমানত নষ্ট করিনি, তা কারো কাছে ফাঁস করে দিয়ে, আর না কোন চিত্তহারী প্রেমাস্পদ আমার চোখে তোমার পরে স্থান করে নিয়েছে।
سوى أن ما نال العشيرة شاغل * عن الود إلا أن يكون التوامق
তবে হ্যাঁ, সম্প্রদায়ের প্রয়োজনে যে প্রেমের ব্যাপারে কিছুটা শিথিলতা বা গাফলতি আসেনি তা নয়, তবে এটাও কথা যে, প্রেম ভালবাসাটা উভয় দিকের ব্যাপার, এ ব্যাপারে কারো একচেটিয়া দায়-দায়িত্ব থাকে না।
ইব্ন হিশাম বলেন: অধিকাংশ কাব্য বিশারদ শেষ দু'টি পংক্তি এ কবির বলে স্বীকার করেন না।
আবূ ইসহাক বলেন, ইয়াকূব ইব্ন উতবা ইব্ন মুগীরা ইব্ন আখনাস আমার নিকট যুহরীর সূত্রে ইব্ন আবূ হাদরাদ আসলামীর থেকে বর্ণনা করেন। তখন ঐ মহিলাটি তাকে বললো:
انت فحييت سبعا وعشرا وترا * وثمانيه شتری
তোমাকে তো বিরতিপূর্ণ সতের বছর এবং অবিরতভাবে আট বছর অবধি حياك الله (আল্লাহ্ তোমাকে দীর্ঘজীবী করুন বা নন্দিত করুন) বলে প্রত্যুত্তর দিয়ে তোমার প্রেমের প্রতিদান দেয়া হয়েছে।
ইব্ন আবূ হাদরাদ আসলামী বলেন: তারপর আমি তাকে সেখান থেকে নিয়ে এসে তার গর্দান উড়িয়ে দেই।
ইবন ইসহাক বলেন: আবূ ফারাস ইব্ন আবূ সুনবুলা আসলামী তাঁর কতিপয় প্রত্যক্ষদর্শী শায়খের বরাতে আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, তাঁরা তাঁদের চোখে দেখা ঘটনা বর্ণনা করেছেন: যখন উক্ত যুবকটির গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তার ঐ দিয়তাটি তার কাছেই দাঁড়িয়ে তা প্রত্যক্ষ করছিল। তারপর সে তার প্রেমিকের উপর উপুড় হয়ে পড়ে এবং তাকে চুম্বন করতে করতে সেও সেখানে প্রাণ বিসর্জন দেয়।