📄 রক্তপণ ও ক্ষতিপূরণ দানের জন্য আলী (রা)-কে প্রেরণ
ইবন ইসহাক বলেন: হাকীম ইবন হাকীম আমার নিকট আবূ জা'ফর মুহাম্মদ ইবন আলী সূত্রে বর্ণনা করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইবন আবূ তালিব (রা)-কে ডেকে বললেন: হে আলী! তুমি ঐসব সম্প্রদায়ের কাছে যাও এবং তাদের ব্যাপারটি দেখ এবং জাহিলিয়াতের রীতিনীতিকে তোমার পদতলে দলিত কর!
সে মতে আলী বের হয়ে তাদের কাছে উপনীত হলেন। তিনি তাঁর সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রদত্ত প্রচুর অর্থ-সম্পদও নিয়ে গেলেন। তিনি তাদের রক্তপণ এবং তাদের অর্থ সম্পদের ক্ষতিপূরণ শোধ করলেন। এমন কি তাদের কুকুরের জন্য কাষ্ঠনির্মিত পানপাত্রটাও তিনি তাদের পরিশোধ করে দেন। যখন তিনি রক্তপণ এবং অর্থ সম্পদের সব ক্ষতিপূরণ দিলেন, কারো কোন পাওনাই আর অবশিষ্ট রইলো না, তখনও তাঁর কাছে যথেষ্ট অর্থ সম্পদ অবশিষ্ট রয়ে গেল। তিনি তাদের সব পাওনা শোধ করে তাদের জিজ্ঞাসা করলেন: তোমাদের আর কারো কোন রক্তপণ বা অর্থের ক্ষতিপূরণ কি অপরিশোধকৃত রয়েছে? জবাবে তারা বললো: জ্বী, না।
তখন তিনি বললেন: এ অবশিষ্ট অর্থসম্পদও আমি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আদেশ যথাযথভাবে পালনের ক্ষেত্রে সতর্কতাবশত দিয়ে দিচ্ছি-ঐ পাওনার পরিবর্তে তিনি সম্যক জানেন, কিন্তু তোমরা জানো না। তারপর তিনি সেরূপই করলেন। এরপর তিনি ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে এ সংবাদ জানালেন। সব শুনে তিনি বললেন: أصبت وأحسنت
"তুমি ঠিকই করেছো এবং চমৎকার কাজ করেছো।"
রাবী বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) দাঁড়িয়ে কিবলামুখী হলেন এবং তাঁর পবিত্র হস্তদ্বয় এমনভাবে ঊর্ধ্ব দিকে তুলে ধরলেন যে, তাঁর উভয় স্কন্দের নিম্নাংশ দেখা যাচ্ছিলো। তিনি তখন বলছিলেন :
اللهم انى ابرأ اليك مما صنع خالد بن الوليد ثلاث مرات
"হে আল্লাহ্! খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ যে কর্মকাণ্ড করেছে, তার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। এরূপ তিনি তিনবার বললেন।
📄 খালিদ ইব্ন ওয়ালীদের ওযর পেশ
ইবন ইসহাক বলেন: যারা খালিদকে এ ব্যাপারে নির্দোষ মনে করেন তারা বলেন, তিনি বলেছেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন হুযাফা সাহসী আমাকে না বলা পর্যন্ত আমি যুদ্ধে লিপ্ত হইনি। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমাকে তারা ইসলাম গ্রহণ না করলে তাদের বিরুদ্ধে লড়তে আদেশ দিয়েছেন।
ইন হিশাম বলেন: আবূ আমর মাদানী বলেছেন, খালিদ (রা) যখন ঐ সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে উপনীত হন, তখন তারা বলেছিলেন: "আমরা ধর্মান্তরিত হয়েছি! আমরা ধর্মান্তরিত হয়েছি!!"
ইবন ইসহাক বলেন: তারা যখন অস্ত্রসংবরণ করলো, আর জাহদাম বনু জুযায়মার প্রতি খালিদের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করলো, তখন সে বলে উঠলো: হে বনূ জুযায়মার লোকজন, যুদ্ধের মওকা হারালে, এখন তোমরা যে আপদে লিপ্ত হলে, সে ব্যাপারে আমি পূর্বেই তোমাদের সতর্ক করেছিলাম। (কিন্তু হায়, তোমরা তাতে কান দিলে না!)
টিকাঃ
১. প্রথমদিকে মুসলমানদেরকে 'সাবী' বলা হতো। কেননা, প্রাচীন আরবের সাবীরাও মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকতেন। সে হিসাবে তারা বলেছিল: আমরা সাবী হয়ে গিয়েছি, মানে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়ে গিয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে খালিদ তার মর্ম অনুধাবনে বা তা বিশ্বাস করতে ব্যর্থ হন।
📄 খালিদ ও আবদুর রহমান ইব্ন আওফের বাক-বিতণ্ডা
আমি যতদূর জেনেছি, এ নিয়ে খালিদ (রা) ও আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা)-এর মধ্যে বচসা হয়। আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা) তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন: ইসলামের যুগে তুমি একটা আস্ত জাহিলিয়াতের কাজ করলে!
জবাবে খালিদ (রা) বললেন: আমি তো তোমার পিতার হত্যাকারীকে হত্যা করেছি। তখন প্রতিউত্তরে আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা) বললেন: তুমি মিথ্যে বলছো এবং আমিই আমার পিতার হন্তাকে হত্যা করেছি। তুমি তো তোমার চাচা ফাকীহ ইব্ন মুগীরার হন্তাকেই হত্যা করেছো। এমন কি এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে অপ্রীতিকর অবস্থায় সৃষ্টি হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট যখন এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেন :
مهلا يا خالد دع عنك اصحابي فو الله لو كان لك احد ذهبا ثم انفقت في سبيل الله ما ادركت غدوة رجل من اصحابی ولا روحته
"ধীরে হে খালিদ! ধীরে! আমার সাহাবীদের ব্যাপারে হুঁশিয়ার! আল্লাহ্র কসম, যদি তোমার কাছে উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও থাকে, আর তা তুমি আল্লাহ্র পথে বিলিয়ে দাও, তবু তুমি আমার সাহাবীদের এক সকাল অথবা এক বিকালের সাওয়াব লাভেও সমর্থ হবে না।"
📄 জাহিলিয়াতের যুগে কুরায়শ ও বনূ জুযায়মার মধ্যের ঘটনা
ফাকীহ ইন্ন মুগীরা, আওফ ইব্ন আব্দ মান্নাফ ও আফফান ইব্ন আবুল আস ইব্ন উমাইয়া বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ইয়ামানে গিয়েছিলেন। আফফানের সাথে তাঁর পুত্র উসমান এবং আওফের সাথে তাঁর পুত্র আবদুর রহমানও ছিলেন। উক্ত তিন ব্যক্তি ইয়ামানে মৃত্যুবরণকারী জনৈক বনূ জাযায়মগোত্রীয় ব্যক্তির অর্থ-সম্পদ তার উত্তরাধিকারীদের নিকট পৌঁছেয়ে দেবার উদ্দেশ্যে ইয়ামান থেকে নিয়ে আসছিলেন। তাঁরা বনু জুযায়মা গোত্রের উক্ত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের নিকট পৌঁছবার পূর্বেই ঐ গোত্রের খালিদ ইব্ন হিশাম নামক এক ব্যক্তি তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করে উক্ত অর্থ-সম্পদ দাবী করলো। তাঁরা তার কাছে তা অর্পণে অস্বীকৃতি জানালে সে তার সঙ্গীসাথী নিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলো। তাঁরাও তার সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। এ যুদ্ধে আওফ ও ফাকীহ ইব্ন্ন মুগীরা নিহত হন। পক্ষান্তরে আফ্ফান ও তাঁর পুত্র উসমান বেঁচে যান। তারা ফাকীহ্ ইব্ন মুগীর ও আওফ ইব্ন আব্দ আওফের অর্থ-সম্পদ নিয়ে যায়। আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা) তাঁর পিতার ঘাতক উক্ত খালিদ ইবন হিশামকে হত্যা করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। তখন কুরায়শ গোত্র বনূ জুযায়মার সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে মনস্থ করে। বনূ জুযায়মারা বলে: আমাদের গোটা গোত্র তোমাদের লোকদের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত নয়, বরং ব্যক্তিগতভাবে কয়েকব্যক্তি মূর্খতাবশে তোমাদের লোকদের উপর হামলা করে তাদেরকে হত্যা করেছে। আমরা তার কিছুই অবগত নই। আমরা তোমাদের প্রাপ্য রক্তপণ এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্যে প্রস্তুত রয়েছি। কুরায়শরা তাদের এ ওযরখাহী ও প্রস্তাব মেনে নেয় এবং এভাবে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।