📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ফুযালার ইসলাম গ্রহণ

📄 ফুযালার ইসলাম গ্রহণ


ইবন হিশাম বলেন: রাবী আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন লায়স গোত্রের ফুযালা ইবন উমায়র ইবন মালূহ বায়তুল্লাহ্ তওয়াফকালে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করতে মনস্থ করে। সে যখন এ উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকটবর্তী হল, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: কী হে, ফুযালা নাকি?
জবাবে ফুযালা বলে উঠলো: হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি ফুযালা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞাসা করলো: মনে মনে তুমি কী বলছিলে হে? সে জবাব দিলেন: কিছু না, মনে মনে আল্লাহর যিকির করছিলাম।
রাবী বলেন: তার এ জবাব শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হেসে দিলেন। তিনি বললো: আল্লাহ্র কাছে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করো! বলতে বলতে তিনি তাঁর পবিত্র হাত তার বক্ষদেশে স্থাপন করেন। অমনি তার অন্তরে শান্তির শীতল পরশ অনুভূত হয়। তারপর ফুযালা প্রায়ই বলতেন:
والله ما رفع يده عن صدرى حتى ما من خلق الله احب الى منه
"আল্লাহ্র কসম! তাঁর পবিত্র হাত আমার বুকের উপর থেকে সরাতেই অবস্থা এমন হলো যে, আল্লাহ্ দুনিয়ায় তাঁর চাইতে প্রিয়তর আমার নিকট আর কেউই রইলো না।
ফুযালা বলেন: তারপর আমি আমার পরিবারের কাছে ফিরে যাই এবং স্ত্রীর সাথে আলাপ আলোচনায় রত হই। তখন সে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো: নতুন কিছু শুনাও! ফুযালা উত্তরে "নতুন কোন খবর নেই" বলে কবিতায় বললেন:
قالت هلم الى الحديث قلت لا * يأبى عليك الله والاسلام
لو ما رأيت محمدا وقبيله * بالفتح يوم تكسر الاصنام
لرأيت دين الله اضحى بينا * والشرك يغشى وجهه الاظلام
অর্থাৎ-স্ত্রী বললো: ও হে! আমাকে নতুন কিছু শুনাও! আমি বললাম: না।
তোমাকে ওসব বলতে বারণ আছে আল্লাহ্ ও ইসলামের।
ওহে! যদি তুমি দেখতে মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের বিজয়ের দিন—যেদিন মূর্তিগুলো ভেঙ্গে পড়ছিল— টুকরো টুকরো হয়ে।
তাহলে তুমি উপলব্ধি করতে নিশ্চয়ই, আল্লাহ্ দীন দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর শিরকের মুখমণ্ডলকে অন্ধকাররাশি গ্রাস করে নিয়েছে।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সাফওয়ান ইবন উমাইয়াকে অভয়দান

📄 সাফওয়ান ইবন উমাইয়াকে অভয়দান


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্‌ন জা'ফর আমার নিকট উরওয়া ইব্‌ন যুবায়র (র) সূত্রে বর্ণনা করেন: সাফওয়ান ইব্‌ন উমাইয়া জিদ্দা হয়ে জাহাজযোগে ইয়ামানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়। তখন উমায়র ইব্‌ন ওহাব বললেন: হে আল্লাহ্‌র নবী, সাফওয়ান ইব্‌ন উমাইয়া হচ্ছে তার সম্প্রদায়ের নেতা। সে আপনার ভয়ে পালিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হয়েছে। তা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তাকে নিরাপত্তা দেয়া হলো।
উমায়র বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা) আপনি আমাকে এমন কোন নিদর্শন দিন, যাতে বুঝা যায় যে, আপনি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর ঐ পাগড়িটি তাঁর হাতে তুলে দেন, যা পরিধান করে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। উমায়র তৎক্ষণাৎ তা নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবং সাফওয়ানের নাগালও পেয়ে যান। সে তখন সমুদ্রযাত্রার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তখন উমায়র তাকে ডেকে বলেন: হে সাফওয়ান। আমার পিতামাতা তোমার জন্যে কুরবান হোক! দোহাই আল্লাহ্! আত্মগোপন করো না! এই যে তোমার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অভয়নামা নিয়ে এসেছি।
সাফওয়ান বললো: তোমার সর্বনাশ হোক! তুমি আমার নিকট থেকে দূর হও! আমার সাথে তুমি কোন কথা বলবে না।
তখন উমায়র বললেন: সাফওয়ান, তোমার জন্যে আমার পিতামাতা কুরবান হোন! রাসূলুল্লাহ্ (সা)! মানব জাতির সর্বোত্তম পুরুষ, মানব জাতির মধ্যে সর্বাধিক সদাচারী, মানব জাতির সর্বাধিক সহিষ্ণু পুরুষ, মানবকূল শিরোমণি, তোমার পিতৃব্যপুত্র, যাঁর মর্যাদা তোমারই মর্যাদা, যাঁর গৌরব তোমারই গৌরব, যাঁর রাজত্ব তোমারই রাজত্ব— তিনিই তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। তখন সাফওয়ান বললো: নিজের প্রাণের ব্যাপারে তাঁকে আমি ভয় করি।
উমায়র বললেন: 'তিনি এর চাইতে অনেক বেশি সহিষ্ণু, অনেক বেশি মহানুভব!' এবার সাফওয়ান ভরসা পেলো এবং তাঁর সাথে ফিরে চললো। শেষ পর্যন্ত সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তখন সাফওয়ান বলল: সে (উমায়র) বলছে: আপনি নাকি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।
জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: সে যথার্থই বলেছে।
সাফওয়ান: তা'হলে আমাকে দু'মাসের অবকাশ দিতে হবে। এ দু'মাস ভেবে দেখি, কী করা যায়।
রাসূলুল্লাহ্: যাও, তোমাকে চার মাসের অবকাশ দেয়া হলো। যাতে ভালভাবে চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পার।
ইবন হিশাম বলেন: আমার নিকট কুরায়শ বংশের জনৈক বিজ্ঞজন বর্ণনা করেন: সাফওয়ান উমায়রকে বলেছিল:
তোমার সর্বনাশ হোক! তুমি আমার নিকট থেকে দূর হয়ে যাও! তুমি আমার সাথে কথা বলবে না। কেননা, তুমি একটা আস্ত মিথ্যাবাদী মুহাম্মদ নিশ্চয়ই এমনটি করেন নি। (অর্থাৎ আমাকে নিরাপত্তা দেন নি) বদর যুদ্ধসংক্রান্ত বর্ণনার শেষভাগে আমরা এ প্রসঙ্গে বর্ণনা করে এসেছি।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মক্কার সর্দারদের ইসলাম গ্রহণ

📄 মক্কার সর্দারদের ইসলাম গ্রহণ


ইবন ইসহাক বলেন: যুহরী আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, উম্মু হাকীম বিন্ত হারিস ইবন হিশাম ও ফাখতা বিন্ত ওয়ালীদ এঁরা যথাক্রমে ইকরিমা ইব্‌ন আবু জাহল ও সাওয়ান ইবন উমাইয়ার স্ত্রী ছিলেন। এঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন। উম্মু হাকীম তাঁর স্বামী ইকরিমার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট নিরাপত্তার আবেদন জানান। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে নিরাপত্তা দান করেন। পরে তিনি ইয়ামানে গিয়ে তার সাথে মিলিত হন। উম্মু হাকীম তাঁকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে উপনীত হন। তারপর যখন ইকরিমা ও সাওয়ান ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁদের উভয়ের পূর্বের বিবাহকে বহাল রাখলেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মক্কা বিজয়সংক্রান্ত কবিতা

📄 মক্কা বিজয়সংক্রান্ত কবিতা


ইবন ইসহাক বলেন: হাসান ইন্ন সাবিত (রা)-এর পৌত্র সাঈদ ইবন আবদুর রহমান আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, হাসান নাজরানে অবস্থানরত ইব্‌ন যাবারীর উদ্দেশ্যে একটি মাত্র পংক্তি ছুঁড়ে মারেন, বাড়তি আর কিছুই বলেন নি, আর তা হলো:
لا تعن رجلا احلك بغضه * نجران في عيش احذ لئيم
"সে লোকটিকে তুমি হারিয়ো না, যার বিরুদ্ধে অন্তরে পোষণ করা বিদ্বেষ তোমাকে • নাজরানে নিয়ে নিক্ষেপ করেছে, যেখানে তোমাকে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।"
ইন্ন যাবা'রীর কানে তা পৌঁছতেই তিনি দৌড়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এসে উপস্থিত হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণকালে তিনি কবিতায় বলেন:
يا رسول المليك ان لساني * راتق ما فتقت اذ انا بور
হে রাজাধিরাজের প্রেরিত রাসূল! আমার রসনা তখনো সংযত ছিল, যখন আমি ধ্বংসের পথে ছিলাম, তখনো সে ঔদ্ধত্যপূর্ণ কোন কথা বলেনি।
از آبارى الشيطان في سنن الغي * ومن مال ميله مثبور
যখন আমি ধ্বংসের ও বিভ্রান্তির পথে শয়তানের চাইতেও বেশী অগ্রগামী ছিলাম। আর যে ব্যক্তি বিভ্রান্তির পথে অগ্রসর হয়, সে ধ্বংসই হয়ে থাকে।
آمن اللحم والعظام لربى * ثم قلبي الشهيد انت النذير
এখনতো আমার অস্থিমাংস পর্যন্ত আমার প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছে। তারপর অন্তরও সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আপনি সতর্ককারী রাসূল।
اننى عنك زاجر ثم حيا * من لؤى و كلهم مغرور
আমি আপনার জন্যে লুয়াই গোত্রকে ধমক লাগিয়েছি। ওরা তো সকলেই প্রতারণার শিকার, (তাই ঈমান আনছে না।)
ইবন ইসহাক বলেন: ইসলাম গ্রহণকালে যাবা'রী আরো বলেন:
منع الرقاد بلابل وهموم * والليل معتلج الرواق بهيم
নানরূপ দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ এসে আমার নিদ্রাকে ব্যাহত করলো, অথচ রাত ছিল ভাঁজে ভাঁজে অন্ধকারে আচ্ছন্ন।
مما اتاني ان احمد لامنى * فيه فبث كانني محموم
এর হেতু ছিল এই, আমার কাছে সংবাদ পৌঁছলো যে, আহমদ নবী আমাকে ভর্ৎসনা করেছেন। ফলে আমার সারাটি রাত অতিবাহিত হলো এমনভাবে, যেন আমি প্রবল জ্বরাক্রান্ত রোগী।
يا خير من حملت على اوصالها * عيرانة سرح اليدين غشوم
হে সর্বোত্তম উস্ত্রী আরোহী! যেগুলো ছিল উষ্ট্রের মত সবল, সুঠামদেহী ও দুর্বারগতি।
اني لمعتذر اليك من الذى * اسديت اذ انا في الضلال اهيم
বিভ্রান্তির ঘূর্ণাবর্তে হাবুডুবু খাওয়া দিনগুলোতে আমার কৃত অপরাধগুলোর জন্যে আমি আপনার কাছে লজ্জিত ও অনুতপ্ত।
ايام تأمرني باغوى خطة * سهم وتأمرني بها مخزوم
যে দিনগুলোতে একদিকে সাহম গোত্রের লোকজন আমাকে একটি ভ্রান্তিপূর্ণ পদক্ষেপের জন্যে উৎসাহিত করতো, আর মাখযূম গোত্রীয়রা আরেকটি ভ্রান্তিপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যে।
وامد اسباب الردى ويقودني * امر الغواة وامرهم مشئوم
যখন আমি আমার নিজের ধ্বংসের উপাদান নিজেই প্রস্তুত করে চলেছিলাম, আর বিভ্রান্ত প্রথভ্রষ্ট লোকদের ভ্রান্তিই আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল ধ্বংসের পথে, অথচ তাদের ব্যাপার ছিল একান্তই অলক্ষুণে।
فاليوم آمن بالنبي محمد * قلبي ومخطئ لهذه محروم
আজ নবী মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি আমার অন্তরে ঈমান এনেছে, আর এ ব্যাপারে ত্রুটি- বিচ্যুতিকারী হচ্ছে হতভাগ্য।
مضت العداوة وانقضت اسبابها * ودعت أواصر بيننا وحلوم
বৈরিতার যুগের অবসান ঘটেছে এবং তার হেতুসমূহও আজ শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের মধ্যকার সৌহার্দ সম্প্রীতি এবং প্রজ্ঞা আমাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
فاغفر فدى لك والداى كلاهما * زللي فانك راحم مرحوم
আমার পিতামাতা উভয়ে আপনার জন্যে কুরবান হোন! আপনি আমার ত্রুটিবিচ্যুতি ক্ষমা করবেন। কেননা, আপনি দয়ালু এবং রহমত আপনার প্রতি বর্ষিত হয়েছে।
وعليك من علم المليك علامة * نور اغر وخاتم مختوم
আপনার মধ্যে রাজাধিরাজ আল্লাহ্ প্রদত্ত ইলমের নিদর্শন রয়েছে। আপনি প্রোজ্জ্বল-দীপ্ত। আপনার মাধ্যমে নুবৃওয়াত ও রিসালতের সীল লেগে গেছে। আর এ সীল স্বয়ং আল্লাহই লাগিয়েছেন।
اعطاك بعد محبة برهانه * شرفا وبرهان الاله عظيم
আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে সম্ভ্রম ও মর্যাদার প্রীতিপূর্ণ নিদর্শন দান করেছেন, আর আল্লাহর নিদর্শন মহান ও মাহাত্ম্যপূর্ণ।
ولقد شهدت ان دينك صادق * حق وانك في العباد جسيم
আর আমি এ মর্মে সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনার আনীত ধর্ম সত্য ও হক এবং গোটা মানব জাতির মধ্যে আপনার ব্যক্তিত্ব অনন্য।
والله يشهد ان احمد مصطفى * مستقبل في الصالحين كريم
আল্লাহ্ স্বয়ং সাক্ষ্য দেন যে, আহমদ মুস্তাফা (সা) পুণ্যবানদের মধ্যে অত্যন্ত মান্যবর ও মর্যাদাশীল।
قوم علا بنيانه من هاشم * فرع تمكن في الذر و اروم
তিনি এমন এক সাহসী সর্দার, যার ভিত্তি হাশিম বংশ থেকে উদ্দাত। তিনিই মূল। তিনিই শাখা। এর উভয়ের অবস্থান অনেক ঊর্ধ্বে।
ইন হিশাম বলেন: অনেক কাব্যবিশেষজ্ঞের মতে এ কবিতাগুলো যাবা'রীর হতেই পারে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00