📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আনসারদের আশংকা

📄 আনসারদের আশংকা


ইব্‌ন হিশাম বলেন: ইয়াহইয়া ইব্‌ন সাঈদ সূত্রে আমি জানতে পেরেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা বিজয় করে যখন তাতে প্রবেশ করেন, তখন তিনি সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে আল্লাহ্র নিকট দু'আ করতে থাকেন। আনসারগণ তা প্রত্যক্ষ করে তাঁরা পরস্পরে বলাবলি করতে লাগলেন: তোমাদের কী ধারণা, আল্লাহ্ যখন তার ভূমি ও নগরীতে তাঁকে বিজয় দান করেছেন, তখন তিনি কি এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন?
তারপর যখন তিনি দু'আ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন: তোমরা এতক্ষণ কী বলাবলি করছিলে? তারা জবাব দিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কিছুই না। তিনি যখন পীড়াপীড়ি করলেন, তখন তাঁরা সে ব্যাপারটি তাঁকে জানালেন। তখন নবী করীম (সা) বললেন:
معاذ الله المحيا محياكم والممات مماتكم
আল্লাহ্র পানাহ্! জীবনে মরণে আমি তোমাদেরই সাথে থাকবো।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মূর্তি ধ্বংস

📄 মূর্তি ধ্বংস


ইব্‌ন হিশাম বলেন: ইব্‌ন শিহাব যুহরী উবায়দুল্লাহ্ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) সূত্রে আমার জনৈক আস্থাভাজন রাবী মারফত আমি জানতে পেরেছি যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর বাহনে চড়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। তিনি বাহনের উপর সওয়ার অবস্থায়ই বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেন। বায়তুল্লাহর চারদিকে তখন শীসা বাঁধানো অনেক মূর্তি ছিল। নবী করীম (সা) তাঁর হস্তস্থিত ছড়ির দ্বারা মূর্তিগুলোর দিকে ইঙ্গিত করতে করতে বলছিলেন:
جاء الحق وزهق الباطل ان الباطل كان زهوقا
"সত্য সমাগত, অসত্য অপসৃত। অসত্য অপসৃয়মানই বটে।"
যে সমস্ত মূর্তির মুখমণ্ডলের দিকে তিনি ইশারা করেন, সেগুলো চিৎ হয়ে আর যেগুলোর পশ্চাৎভাগের দিকে ইশারা করেন, সেগুলো উপুড় হয়ে পড়ে যায়। এভাবে সব ক'টি মূর্তিই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
তামীম ইব্‌ন আসাদ খুযাঈ এ সম্পর্কে তাঁর কবিতায় বলেন:
. وفي الاصنام معتبر وعلم * لمن يرجو الثواب او العقابا
"মূর্তিগুলোর এ পরিণতিতে রয়েছে শিক্ষা তাদের জন্য যারা এগুলোর কাছে শাস্তি বা পুরস্কার আশা করে।"

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ফুযালার ইসলাম গ্রহণ

📄 ফুযালার ইসলাম গ্রহণ


ইবন হিশাম বলেন: রাবী আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন লায়স গোত্রের ফুযালা ইবন উমায়র ইবন মালূহ বায়তুল্লাহ্ তওয়াফকালে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা করতে মনস্থ করে। সে যখন এ উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকটবর্তী হল, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: কী হে, ফুযালা নাকি?
জবাবে ফুযালা বলে উঠলো: হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি ফুযালা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞাসা করলো: মনে মনে তুমি কী বলছিলে হে? সে জবাব দিলেন: কিছু না, মনে মনে আল্লাহর যিকির করছিলাম।
রাবী বলেন: তার এ জবাব শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হেসে দিলেন। তিনি বললো: আল্লাহ্র কাছে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করো! বলতে বলতে তিনি তাঁর পবিত্র হাত তার বক্ষদেশে স্থাপন করেন। অমনি তার অন্তরে শান্তির শীতল পরশ অনুভূত হয়। তারপর ফুযালা প্রায়ই বলতেন:
والله ما رفع يده عن صدرى حتى ما من خلق الله احب الى منه
"আল্লাহ্র কসম! তাঁর পবিত্র হাত আমার বুকের উপর থেকে সরাতেই অবস্থা এমন হলো যে, আল্লাহ্ দুনিয়ায় তাঁর চাইতে প্রিয়তর আমার নিকট আর কেউই রইলো না।
ফুযালা বলেন: তারপর আমি আমার পরিবারের কাছে ফিরে যাই এবং স্ত্রীর সাথে আলাপ আলোচনায় রত হই। তখন সে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো: নতুন কিছু শুনাও! ফুযালা উত্তরে "নতুন কোন খবর নেই" বলে কবিতায় বললেন:
قالت هلم الى الحديث قلت لا * يأبى عليك الله والاسلام
لو ما رأيت محمدا وقبيله * بالفتح يوم تكسر الاصنام
لرأيت دين الله اضحى بينا * والشرك يغشى وجهه الاظلام
অর্থাৎ-স্ত্রী বললো: ও হে! আমাকে নতুন কিছু শুনাও! আমি বললাম: না।
তোমাকে ওসব বলতে বারণ আছে আল্লাহ্ ও ইসলামের।
ওহে! যদি তুমি দেখতে মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের বিজয়ের দিন—যেদিন মূর্তিগুলো ভেঙ্গে পড়ছিল— টুকরো টুকরো হয়ে।
তাহলে তুমি উপলব্ধি করতে নিশ্চয়ই, আল্লাহ্ দীন দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর শিরকের মুখমণ্ডলকে অন্ধকাররাশি গ্রাস করে নিয়েছে।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সাফওয়ান ইবন উমাইয়াকে অভয়দান

📄 সাফওয়ান ইবন উমাইয়াকে অভয়দান


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্‌ন জা'ফর আমার নিকট উরওয়া ইব্‌ন যুবায়র (র) সূত্রে বর্ণনা করেন: সাফওয়ান ইব্‌ন উমাইয়া জিদ্দা হয়ে জাহাজযোগে ইয়ামানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়। তখন উমায়র ইব্‌ন ওহাব বললেন: হে আল্লাহ্‌র নবী, সাফওয়ান ইব্‌ন উমাইয়া হচ্ছে তার সম্প্রদায়ের নেতা। সে আপনার ভয়ে পালিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হয়েছে। তা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তাকে নিরাপত্তা দেয়া হলো।
উমায়র বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা) আপনি আমাকে এমন কোন নিদর্শন দিন, যাতে বুঝা যায় যে, আপনি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর ঐ পাগড়িটি তাঁর হাতে তুলে দেন, যা পরিধান করে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। উমায়র তৎক্ষণাৎ তা নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবং সাফওয়ানের নাগালও পেয়ে যান। সে তখন সমুদ্রযাত্রার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তখন উমায়র তাকে ডেকে বলেন: হে সাফওয়ান। আমার পিতামাতা তোমার জন্যে কুরবান হোক! দোহাই আল্লাহ্! আত্মগোপন করো না! এই যে তোমার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অভয়নামা নিয়ে এসেছি।
সাফওয়ান বললো: তোমার সর্বনাশ হোক! তুমি আমার নিকট থেকে দূর হও! আমার সাথে তুমি কোন কথা বলবে না।
তখন উমায়র বললেন: সাফওয়ান, তোমার জন্যে আমার পিতামাতা কুরবান হোন! রাসূলুল্লাহ্ (সা)! মানব জাতির সর্বোত্তম পুরুষ, মানব জাতির মধ্যে সর্বাধিক সদাচারী, মানব জাতির সর্বাধিক সহিষ্ণু পুরুষ, মানবকূল শিরোমণি, তোমার পিতৃব্যপুত্র, যাঁর মর্যাদা তোমারই মর্যাদা, যাঁর গৌরব তোমারই গৌরব, যাঁর রাজত্ব তোমারই রাজত্ব— তিনিই তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। তখন সাফওয়ান বললো: নিজের প্রাণের ব্যাপারে তাঁকে আমি ভয় করি।
উমায়র বললেন: 'তিনি এর চাইতে অনেক বেশি সহিষ্ণু, অনেক বেশি মহানুভব!' এবার সাফওয়ান ভরসা পেলো এবং তাঁর সাথে ফিরে চললো। শেষ পর্যন্ত সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তখন সাফওয়ান বলল: সে (উমায়র) বলছে: আপনি নাকি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।
জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: সে যথার্থই বলেছে।
সাফওয়ান: তা'হলে আমাকে দু'মাসের অবকাশ দিতে হবে। এ দু'মাস ভেবে দেখি, কী করা যায়।
রাসূলুল্লাহ্: যাও, তোমাকে চার মাসের অবকাশ দেয়া হলো। যাতে ভালভাবে চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পার।
ইবন হিশাম বলেন: আমার নিকট কুরায়শ বংশের জনৈক বিজ্ঞজন বর্ণনা করেন: সাফওয়ান উমায়রকে বলেছিল:
তোমার সর্বনাশ হোক! তুমি আমার নিকট থেকে দূর হয়ে যাও! তুমি আমার সাথে কথা বলবে না। কেননা, তুমি একটা আস্ত মিথ্যাবাদী মুহাম্মদ নিশ্চয়ই এমনটি করেন নি। (অর্থাৎ আমাকে নিরাপত্তা দেন নি) বদর যুদ্ধসংক্রান্ত বর্ণনার শেষভাগে আমরা এ প্রসঙ্গে বর্ণনা করে এসেছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00