📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কা'বার অভ্যন্তরে সালাত আদায়

📄 কা'বার অভ্যন্তরে সালাত আদায়


ইবন হিশাম বলেন: আমার নিকট আরও বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিলালকে সঙ্গে নিয়ে কা'বার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বের হয়ে আসেন এবং বিলাল পিছনে রয়ে যান। এরপর আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) বিলালের নিকট গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোথায় সালাত আদায় করলেন? কিন্তু তিনি কয় রাকাআত পড়লেন, তা তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন না। ইবন উমর (রা) যখনই কা'বায় প্রবেশ করতেন, তখনই তিনি কা'বার দরজা পিছনে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেন এবং তাঁর এবং কা'বার সামনের দেয়ালের মাঝখানে তিন হাত পরিমাণ দূরত্ব থাকতো। এ অবস্থায় তিনি সালাত আদায় করতেন। বিলাল (রা) তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সালাত আদায়ের যে স্থানটি নির্দেশ করেছিলেন সেখানেই তিনি সালাত আদায় করতেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হারিস ও আত্তাবের ইসলাম গ্রহণ

📄 হারিস ও আত্তাবের ইসলাম গ্রহণ


ইবন হিশام বলেন: আমার নিকট আরো বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা বিজয়ের বছর কা'বায় প্রবেশ করেন। তখন বিলাল (রা) তার সঙ্গে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে আযান দেয়ার নির্দেশ দেন। আবু সুফিয়ান ইব্‌ন হারব, আত্তাব ইবন উসায়দ ও হারিস ইবন হিশাম তখন কা'বার আঙিনায় উপবিষ্ট ছিলেন। আযান শুনে আত্তাব ইবন উসায়দ বললো: আল্লাহ্ (আমার পিতা) উসায়দকে এ সম্মানটুকু দান করেছেন যে, তাকে এটুকু শুনতে হয়নি, কেননা, তিনি এসব শুনলে অবশ্যই ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হতেন।
হারিস ইন হিশাম বললো: আল্লাহর কসম! আমি যদি জানতে পারতাম যে, সে (অর্থাৎ আল্লাহ্র রাসূল) সত্যবাদী তা হলে আমি অবশ্যই তাঁর পথ ধরতাম।
উক্ত দু'জনের কথা শুনে আবু সুফিয়ান বললেন: আমি কোন মন্তব্য করছি না। আমি যদি কিছু বলতে যাই, তবে এ কঙ্করগুলোই আমার পক্ষ থেকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবে যে, আমি এরূপ এরূপ মন্তব্য করেছি।
তারা এরূপ বলাবলি করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের নিকট এসে বললেন: তোমরা এতক্ষণ যা বলাবলি করলে, তার সবই আমি জ্ঞাত আছি। তিনি তাদের সব কথার পুনরাবৃত্তি করে তাদেরকে শুনিয়ে দিলেন। হারিস ও আত্তাব কালবিলম্ব না করে বলে উঠলো: نشهد انك رسول الله والله ما اطلع على هذا احد كان معنا ، فنقول اخبرك "আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র কসম! আমাদের কাছে কেউই ছিল না যে, বলবো, সেই তা জেনে আপনাকে জানিয়ে দিয়েছে"।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 একটি হত্যাকাণ্ড ও রাসূলুল্লাহ্ কর্তৃক রক্তপণ শোধ

📄 একটি হত্যাকাণ্ড ও রাসূলুল্লাহ্ কর্তৃক রক্তপণ শোধ


ইবন ইসহাক বলেন: সাঈদ ইব্‌ন আবূ সানদার আসলামী তাঁর সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির সম্পর্কে আমার নিকট বর্ণনা করেন:
আহ্মার বা'সা নামের আমাদের একজন সাহসী সঙ্গী ছিল। সে যখন নিদ্রা যেতো, তখন এত জোরে নাক ডাকতো যে, তার শয়নস্থল কারো নিকট গোপন থাকতো না। তাই সে যখন তার মহল্লায় নিদ্রা যেতো, তখন মহল্লার এক প্রান্তে গিয়ে নিদ্রা যেতো। রাতে মহল্লায় কোন হামলা হলে লোকজন "হে আহমার! হে আহমার!" বলে চীৎকার জুড়ে দিতো। সে তখন উঠে সিংহের মত গর্জন করতে করতে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। তার সামনে তখন আর কেউই টিকতে পারতো না।
এক রাতের ঘটনা। হুযায়ল গোত্রের কিছু যুদ্ধবাজ লোক আহমার গোত্রের উপর হামলা করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে। তারা মহল্লার কাছাকাছি এসে পৌঁছালে ইব্‌ন আসওয়া হুযালী তার গোত্রের লোকজনকে বললো: ওহে! তাড়াহুড়ো করো না। আমি আগে একটু দেখে নেই, যদি আহমার মহল্লায় থাকে, তাহলে তাদের উপর হামলা করা সম্ভব হবে না। তবে তার নাক ডাকার আওয়ায গোপন থাকবে না।
রাবী বলেন: তারপর সে ব্যক্তি মনোযোগ সহকারে তার নাক ডাকার আওয়ায শোনার চেষ্টা করল এবং যখন সত্যি সত্যি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলো, তখন সে ওদিকে অগ্রসর হয়ে একেবারে তরবারি তার বুকে ঠেকালো। কিন্তু তখনও তার নাক অবিরতভাবে ডেকেই চলেছে। শেষ পর্যন্ত সে তার উপর হামলা করে তাকে হত্যা করে ফেলে। তারপর তারা আহমারের গোত্রের উপর হামলা চালালো। লোকজন চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী আহমার, আহমার বলে চিল্লাচিল্লি করতে লাগলো, কিন্তু আহমারের কাজ তো ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে! সে আসবে কোথেকে? তারপর যখন মক্কা বিজিত হলো, বিজয়ের পরের দিনের কথা। ইব্‌ন আসওয়া হুযালীও মক্কায় এলো। সে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল এবং লোকজনকে নানা কথা জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। সে ভয়ে ভয়ে ছিল যে, পাছে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে চিনে ফেলে। বনু খুযাআর লোকজন তাকে দেখেই চিনে ফেলে। তারা তাকে সঙ্গে সঙ্গে চুতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে। সে তখন মক্কার একটি প্রাচীর গাত্রের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। তারা তাকে জিজ্ঞাসা করে, ওহে! তুমিই কি আহমারের ঘাতক? সে বলল: হ্যাঁ আমিই আহমারের ঘাতক, তাতে কী হয়েছে?
রাবী বলেন: এমন সময় খিরাশ ইবন উমাইয়া তলোয়ার হাতে এগিয়ে এলো। সে বললো : এ লোকটার নিকট থেকে তোমরা সকলে সরে যাও! আল্লাহর কসম! আমাদের ধারণা, সেও চাচ্ছে যে, লোকজন তার নিকট থেকে দূরে সরে যাক। তারপর যখন আমরা লোকটির নিকট থেকে দূরে সরে দাঁড়ালাম, তখন খিরাশ তার উপর হামলা করলো এবং তার তলোয়ার খানা ইব্‌ন আসওয়ার পেটে ঢুকিয়ে দিল। আল্লাহর কসম! আমি যেন সে দৃশ্যটা এখনও দেখতে পাচ্ছি যে, তার পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে! আর তার চোখ দুটো মাথার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। আর সে বলছে : তোমরা এ কাজটি করলে, হে খুযাআ গোত্রের লোকজন? অবশেষে ধপাস করে তার দেহটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: يا معشر خزاعة ارفعوا أيديكم عن القتل فقد كثر القتل ان نفع - لقد قتلتم قتيلا لادينه "হে খুযাআ গোত্রের লোকজন! এবার হত্যা হানাহানি থেকে হাত গুটিয়ে নাও! খুনোখুনি ঢের হয়েছে। খুনোখুনিতে কোন মঙ্গল নেই। তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছো, আমি তার রক্তপণ আদায় করে দেবো।"
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুর রহমান ইবন হারমালা আসলামী আমার নিকট সাঈদ ইব্‌ন মুসায়্যিব সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা) যখন খিরাশ ইবন উমাইয়ার ব্যাপারটি সম্পর্কে অবহিত হলেন, তখন তিনি বললেন: ان خراشا لقتال "নিঃসন্দেহে খিরাশ একজন বড় খুনী।" তিনি তার এ দোষটির কথা প্রায়ই বলতেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কা'বার হুরমত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খুতবা

📄 কা'বার হুরমত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খুতবা


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: সাঈদ আবু সাঈদ মাকবুরী আমার নিকট আবূ শুরায়হ খুযাঈর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আমর ইবন যুবায়র¹ যখন তাঁর ভাই আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন যুবায়রের সাথে লড়বার উদ্দেশ্যে মক্কায় আসলেন, তখন আমি তার নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম: এসব কী হচ্ছে? রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মক্কা বিজয়ের সময় আমরা তাঁর সঙ্গে ছিলাম। মক্কা বিজয়ের পরের দিন বনু খুযাআর লোকজন হুযায়ল গোত্রের এক ব্যক্তির উপর হামলা করে তাকে হত্য করে, অথচ লোকটি মুশরিক ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সে সম্পর্কে আমাদের সামনে এরূপ খুতবা দেন :
يا ايها الناس ان الله حرم مكة يوم خلق السموات والارض فهى حرام من حرام الى يوم القيامة فلا يحل لامرئ يومن بالله واليوم الآخر ان يسفك فيها دما ولا يعضد فيها شجرا لم تحلل لاحد كان قبلى ولا تحلل لاحد يكون بعدى ولم تحلل لى الا هذه الساعة غضبا على اهلها الا ثم قد رجعت كحرمتها بالامس فليبلغ الشاهد منكم الغائب فمن قال لكم ان رسول الله قاتل فيها فقولوا : ان الله قد احلها لرسوله ولم يحللها لكم يا معشر خذاعة ارفعوا ايديكم عن القتل فقد كثر القتل ان نفع لقد قتلتم قتيلا لا دينه فمن قتل بعد مقامى هذا فاهله بخير النظرين ان شاءوا قدم قاتله وان شاء وا فعقله
হে মানবমণ্ডলী! আল্লাহ্ তা'আলা যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন সেদিনই তিনি মক্কাকে হারাম বা সম্মানিত করেছেন। কিয়ামতের দিন অবধি তা এভাবেই সম্মানিত থাকবে। সুতরাং আল্লাহ্ ও পরকালে বিশ্বাস পোষণ করে এমন কোন ব্যক্তির পক্ষে এতে রক্তপাত করা বা তার গাছপালা কাটা বৈধ নয়। এসব আমার পূর্ববর্তী কারো জন্য বৈধ করা হয়নি, আর আমার পরবর্তী কারো জন্য কোনদিন বৈধ করা হবে না। এর অধিবাসীদের প্রতি (আল্লাহর) ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ শুধু এ মুহূর্তে আমার জন্যে তা বৈধ করা হয়েছে। ওহে, শুনে রাখ, এর বিগত দিনের মতো আবার এর মর্যাদা (হুরমত) ফিরে এসেছে। সুতরাং তোমাদের যারা উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিতদেরকে এ পয়গাম পৌঁছিয়ে দেয়। সুতরাং যখন তোমাদের কেউ একথা বলবে যে, আল্লাহর রাসূল তো এখানে লড়াই করেছেন, তখন তোমরা জবাবে বলবে: আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের জন্য তা বৈধ করেছিলেন। তোমাদের জন্য তিনি তা বৈধ করেন নি। হে খুযাআ গোত্রের লোকজন! তোমরা হত্যা ও খুন-খারাবী থেকে তোমাদের হাত গুটিয়ে নাও। খুন-খারাবী ঢের হয়েছে। এতে কোন মঙ্গল নেই। তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছো, আমি তার রক্তপণ শোধ করে দেবো। আমার এ ঘোষণার পর যে ব্যক্তিই নিহত হবে, তার উত্তরাধিকারীদের দু'টি বিকল্প অধিকার থাকবে। তারা যদি চায় তাহলে তার ঘাতকের নিকট থেকে কিসাস গ্রহণ করতে পারবে, (খুনের বদলে খুন)। আর চাইলে তার রক্তপণও আদায় করে নিতে পারবে।
এ খুতবা প্রদানের পর পরেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনু খুযাআর ঐ নিহত ব্যক্তিটির রক্তপণ আদায় করে দেন।
(আবূ শুরায়হ এর এ বক্তব্য শোনার পর) আমর বলে উঠলেন: যাও বুড়ো, তোমার কাজে যাও! আমরা এর হুরমত বা মর্যাদা সম্পর্কে তোমার চাইতে বেশীই অবগত আছি। কা'বার মর্যাদা কোন রক্তপাতকারী, আনুগত্য বর্জনকারী এবং জিযিয়া দিতে অস্বীকারকারীর শাস্তি বিধানের অন্তরায় নয়।
তখন আবূ শুরায়হ তার জবাবে বললেন: انى كنت شاهاً وكنت غائبا ولقد أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم ان يبلغ شاهدنا غائبنا وقد ابلغتك وانت وشانك
"আমি সেদিন উপস্থিত ছিলাম, আর আপনি অনুপস্থিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের উপস্থিতদেরকে আমাদের অনুপস্থিতদের কাছে পয়গাম পৌঁছিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি আপনার কাছে তার সে পয়গামটি পৌঁছিয়ে দিলাম। এবার আপনার করণীয় কি তা আপনিই বুঝুন।"

টিকাঃ
১. আসলে ইনি আমর ইবন যুবায়র ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমর ইবন সাঈদ ইব্‌ন আস। ইব্‌ন যুবায়রের ভাই যেহেতু উমাইয়াদের পক্ষে এবং তাঁর ভাইয়ের বিপক্ষে ছিলেন, এজন্যই ইবন হিশাম বা রাবী বাক্কায়ী এরূপ ধারণা হয়েছে বলে রওযুল উনুফে সুহায়লী অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00