📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কা'বা শরীফে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খুতবা

📄 কা'বা শরীফে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খুতবা


ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট জনৈক আলিম বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) কা'বার দরজায় দাঁড়িয়ে নিম্নরূপ খুতবা দেন:
لا اله الا الله وحده لا شريك له * صدق وعده ونصر عبده وهزم الاحزاب وحده * الا كل مأثرة او دم او مال يدعى * فهو تحت قدمی ها بتن الا سدانة البيت * وسقايه الحاج ألا وقتيل الخطا شبه العمد * بالسو ط والعصا ففيه الدية مغلظة منة من الابل * اربعون منها في بطونها اولادها يا معشر قريش . ان الله * قد اذ هب عنكم نخوة الجاهلية وتعظمها بالاباء * الناس من ادم وادم من تراب
এক আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর ওয়াদা পূরণ করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন। একাই সব বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছেন।
জেনে রাখ! জাহিলিয়াত যুগের সকল আভিজাত্যের অহমিকা রক্তের বা সম্পদের সকল প্রতিশোধের দাবী আমার এ দু'পায়ের নীচে (দলিত হলো)।
তবে, বায়তুল্লাহ্র সেবা বা ব্যবস্থাপনা ও হাজীদের পানি পান করানের ব্যাপার দুটো এর ব্যতিক্রম।
জেনে রাখ! ভুলক্রমে হত্যার ব্যাপারটা ছড়ি অথবা লাঠি দ্বারা প্রায় ইচ্ছাকৃত হত্যার তুল্য। এর জন্যে দিয়তে মুগাল্লাযা অর্থাৎ একশ' উট দিতে হবে-যার চল্লিশটি হবে গর্ভবতী।
হে কুরায়শ সম্প্রদায়! আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের থেকে জাহিলিয়াতের যুগের অহমিকা ও বংশ গৌরবের অবসান ঘটিয়েছেন।
মানুষ মাত্রই আদম থেকে সৃষ্ট, আর আদম সৃষ্ট মাটি থেকে।
তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন:
يأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّنْ ذَكَرِهُ أُنْثَى وَجَعَلْنَاكُم شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُم عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ.
অর্থাৎ- "হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহ্র নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সবকিছু জানেন। সমস্ত খবর রাখেন" (৪৯: ১৩)।
তারপর তিনি বললেন: يا معشر قريش * ماترون اني فاعل فيكم ؟
হে কুরায়শ সম্প্রদায়! তোমাদের ব্যাপারে আমি কী আচরণ করবো বলে তোমরা ধারণা পোষণ কর।
জবাবে তারা বললো: خيرا ، اخ كريم * و ابن اخ كريم
উত্তম ধারণা রাখি। আপনি আমাদের মহানুভব এক ভাই, মহানুভব এক ভাইপো।
তখন তিনি বললেন: از هبوا فانتم الطلقاء -'যাও, তোমরা সম্পূর্ণ স্বাধীন, সম্পূর্ণ দায়মুক্ত!
তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মসজিদে আসন গ্রহণ করলেন। আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) বায়তুল্লাহ্র চাবি হাতে তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহ্ আপনার প্রতি শান্তি বর্ষণ করুন! বায়তুল্লাহর সেবায়েতের পদ এবং হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব-এ দুটোই আমাকে দান করুন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন বললেন: উসমান ইব্‌ন তালহা কোথায়?
তাকে ডেকে আনা হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: هاك مفت حك يا عثمان ، اليوم يوم برو وفاء
"এই লও তোমার চাবি, হে উসমান! আজকের দিন হচ্ছে সদাচার ও বিশ্বস্ততার পালনের দিন।"
ইব্‌ন হিশام বলেন: সুফিয়ান ইব্‌ন উয়ায়না বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী (রা)-কে লক্ষ্য করে বলেন:
انما اعطيكم ما ترزون لا ما ترزون
"আমি তোমাকে তোমার কাক্ষিত পদ অর্থাৎ হাজীদের পানি পান করানের দায়িত্ব প্রদান করছি, যাতে পরিশ্রম ও কায়িক্লেশ আছে। রায়তুল্লাহর সেবায়েতের পদ নয়, যাতে তেমন ঝামেলা নেই।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কা'বার অভ্যন্তরে সালাত আদায়

📄 কা'বার অভ্যন্তরে সালাত আদায়


ইবন হিশাম বলেন: আমার নিকট আরও বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিলালকে সঙ্গে নিয়ে কা'বার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বের হয়ে আসেন এবং বিলাল পিছনে রয়ে যান। এরপর আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) বিলালের নিকট গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোথায় সালাত আদায় করলেন? কিন্তু তিনি কয় রাকাআত পড়লেন, তা তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন না। ইবন উমর (রা) যখনই কা'বায় প্রবেশ করতেন, তখনই তিনি কা'বার দরজা পিছনে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেন এবং তাঁর এবং কা'বার সামনের দেয়ালের মাঝখানে তিন হাত পরিমাণ দূরত্ব থাকতো। এ অবস্থায় তিনি সালাত আদায় করতেন। বিলাল (রা) তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সালাত আদায়ের যে স্থানটি নির্দেশ করেছিলেন সেখানেই তিনি সালাত আদায় করতেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হারিস ও আত্তাবের ইসলাম গ্রহণ

📄 হারিস ও আত্তাবের ইসলাম গ্রহণ


ইবন হিশام বলেন: আমার নিকট আরো বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা বিজয়ের বছর কা'বায় প্রবেশ করেন। তখন বিলাল (রা) তার সঙ্গে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে আযান দেয়ার নির্দেশ দেন। আবু সুফিয়ান ইব্‌ন হারব, আত্তাব ইবন উসায়দ ও হারিস ইবন হিশাম তখন কা'বার আঙিনায় উপবিষ্ট ছিলেন। আযান শুনে আত্তাব ইবন উসায়দ বললো: আল্লাহ্ (আমার পিতা) উসায়দকে এ সম্মানটুকু দান করেছেন যে, তাকে এটুকু শুনতে হয়নি, কেননা, তিনি এসব শুনলে অবশ্যই ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হতেন।
হারিস ইন হিশাম বললো: আল্লাহর কসম! আমি যদি জানতে পারতাম যে, সে (অর্থাৎ আল্লাহ্র রাসূল) সত্যবাদী তা হলে আমি অবশ্যই তাঁর পথ ধরতাম।
উক্ত দু'জনের কথা শুনে আবু সুফিয়ান বললেন: আমি কোন মন্তব্য করছি না। আমি যদি কিছু বলতে যাই, তবে এ কঙ্করগুলোই আমার পক্ষ থেকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবে যে, আমি এরূপ এরূপ মন্তব্য করেছি।
তারা এরূপ বলাবলি করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের নিকট এসে বললেন: তোমরা এতক্ষণ যা বলাবলি করলে, তার সবই আমি জ্ঞাত আছি। তিনি তাদের সব কথার পুনরাবৃত্তি করে তাদেরকে শুনিয়ে দিলেন। হারিস ও আত্তাব কালবিলম্ব না করে বলে উঠলো: نشهد انك رسول الله والله ما اطلع على هذا احد كان معنا ، فنقول اخبرك "আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র কসম! আমাদের কাছে কেউই ছিল না যে, বলবো, সেই তা জেনে আপনাকে জানিয়ে দিয়েছে"।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 একটি হত্যাকাণ্ড ও রাসূলুল্লাহ্ কর্তৃক রক্তপণ শোধ

📄 একটি হত্যাকাণ্ড ও রাসূলুল্লাহ্ কর্তৃক রক্তপণ শোধ


ইবন ইসহাক বলেন: সাঈদ ইব্‌ন আবূ সানদার আসলামী তাঁর সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির সম্পর্কে আমার নিকট বর্ণনা করেন:
আহ্মার বা'সা নামের আমাদের একজন সাহসী সঙ্গী ছিল। সে যখন নিদ্রা যেতো, তখন এত জোরে নাক ডাকতো যে, তার শয়নস্থল কারো নিকট গোপন থাকতো না। তাই সে যখন তার মহল্লায় নিদ্রা যেতো, তখন মহল্লার এক প্রান্তে গিয়ে নিদ্রা যেতো। রাতে মহল্লায় কোন হামলা হলে লোকজন "হে আহমার! হে আহমার!" বলে চীৎকার জুড়ে দিতো। সে তখন উঠে সিংহের মত গর্জন করতে করতে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। তার সামনে তখন আর কেউই টিকতে পারতো না।
এক রাতের ঘটনা। হুযায়ল গোত্রের কিছু যুদ্ধবাজ লোক আহমার গোত্রের উপর হামলা করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে। তারা মহল্লার কাছাকাছি এসে পৌঁছালে ইব্‌ন আসওয়া হুযালী তার গোত্রের লোকজনকে বললো: ওহে! তাড়াহুড়ো করো না। আমি আগে একটু দেখে নেই, যদি আহমার মহল্লায় থাকে, তাহলে তাদের উপর হামলা করা সম্ভব হবে না। তবে তার নাক ডাকার আওয়ায গোপন থাকবে না।
রাবী বলেন: তারপর সে ব্যক্তি মনোযোগ সহকারে তার নাক ডাকার আওয়ায শোনার চেষ্টা করল এবং যখন সত্যি সত্যি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলো, তখন সে ওদিকে অগ্রসর হয়ে একেবারে তরবারি তার বুকে ঠেকালো। কিন্তু তখনও তার নাক অবিরতভাবে ডেকেই চলেছে। শেষ পর্যন্ত সে তার উপর হামলা করে তাকে হত্যা করে ফেলে। তারপর তারা আহমারের গোত্রের উপর হামলা চালালো। লোকজন চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী আহমার, আহমার বলে চিল্লাচিল্লি করতে লাগলো, কিন্তু আহমারের কাজ তো ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে! সে আসবে কোথেকে? তারপর যখন মক্কা বিজিত হলো, বিজয়ের পরের দিনের কথা। ইব্‌ন আসওয়া হুযালীও মক্কায় এলো। সে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল এবং লোকজনকে নানা কথা জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। সে ভয়ে ভয়ে ছিল যে, পাছে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে চিনে ফেলে। বনু খুযাআর লোকজন তাকে দেখেই চিনে ফেলে। তারা তাকে সঙ্গে সঙ্গে চুতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে। সে তখন মক্কার একটি প্রাচীর গাত্রের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। তারা তাকে জিজ্ঞাসা করে, ওহে! তুমিই কি আহমারের ঘাতক? সে বলল: হ্যাঁ আমিই আহমারের ঘাতক, তাতে কী হয়েছে?
রাবী বলেন: এমন সময় খিরাশ ইবন উমাইয়া তলোয়ার হাতে এগিয়ে এলো। সে বললো : এ লোকটার নিকট থেকে তোমরা সকলে সরে যাও! আল্লাহর কসম! আমাদের ধারণা, সেও চাচ্ছে যে, লোকজন তার নিকট থেকে দূরে সরে যাক। তারপর যখন আমরা লোকটির নিকট থেকে দূরে সরে দাঁড়ালাম, তখন খিরাশ তার উপর হামলা করলো এবং তার তলোয়ার খানা ইব্‌ন আসওয়ার পেটে ঢুকিয়ে দিল। আল্লাহর কসম! আমি যেন সে দৃশ্যটা এখনও দেখতে পাচ্ছি যে, তার পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে! আর তার চোখ দুটো মাথার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। আর সে বলছে : তোমরা এ কাজটি করলে, হে খুযাআ গোত্রের লোকজন? অবশেষে ধপাস করে তার দেহটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: يا معشر خزاعة ارفعوا أيديكم عن القتل فقد كثر القتل ان نفع - لقد قتلتم قتيلا لادينه "হে খুযাআ গোত্রের লোকজন! এবার হত্যা হানাহানি থেকে হাত গুটিয়ে নাও! খুনোখুনি ঢের হয়েছে। খুনোখুনিতে কোন মঙ্গল নেই। তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছো, আমি তার রক্তপণ আদায় করে দেবো।"
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুর রহমান ইবন হারমালা আসলামী আমার নিকট সাঈদ ইব্‌ন মুসায়্যিব সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা) যখন খিরাশ ইবন উমাইয়ার ব্যাপারটি সম্পর্কে অবহিত হলেন, তখন তিনি বললেন: ان خراشا لقتال "নিঃসন্দেহে খিরাশ একজন বড় খুনী।" তিনি তার এ দোষটির কথা প্রায়ই বলতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00