📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হারামে প্রবেশ
ইবন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্ন জা'ফর ইব্ন যুবায়র আমার নিকট আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ ছওর সূত্রে, তিনি সাফিয়্যা বিন্ত শায়বা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় অবতরণের পর যখন লোকজনের মধ্যে স্বস্তির ভাব ফিরে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে, তখন তিনি বের হয়ে বায়তুল্লাহয় আসেন এবং বাহনের উপর বসা অবস্থায়ই সাতবার তা প্রদক্ষিণ করেন। তাওয়াফকালে তিনি তাঁর হাতের ছড়ি দ্বারা হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করে চুম্বনের কাজ সারেন। তাওয়াফ শেষে তিনি উসমান ইব্ন তালহাকে ডেকে তার নিকট থেকে কা'বার চাবি নেন। কা'বার দরজা খোলা হলে তিনি তাতে প্রবেশ করেই কাঠের তৈরি একটি কবুতর মূর্তি দেখতে পান। তিনি নিজহাতে তা ভেঙ্গে ছুঁড়ে ফেলে দেন। তারপর কা'বার দরজায় এসে দাঁড়ান। ইতোমধ্যে তাঁর আগমনে মসজিদে বেশ লোকজনের সমাবেশ ঘটে।
ইন হিশাম বলেন: কতিপয় আলিম আমার নিকট এ মর্মে বর্ণনা করেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বায়তুল্লাহয় প্রবেশ করে তার ভিতরে ফেরেশতা প্রভৃতির কিছু ছবি দেখতে পান। তিনি দেখতে পান যে, ইবরাহীম (আ)-এর এমনি একটি ছবি তাতে রয়েছে, যাতে দেখানো হয়েছে যে, তিনি তীর হাতে ভাগ্য নির্ণয় করছেন। তখন তিনি বললেন: আল্লাহ্ ওদেরকে ধ্বংস করুন! ওরা আমাদের মহান মুরুব্বীকে তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয়কারী বানিয়ে ছেড়েছে, অথচ ঐসব ভাগ্য নির্ণয়ের তীরের সাথে তাঁর কী সম্পর্ক! কোথায় তাঁর মর্যাদা, আর কোথায় এসব অলীক তীর, আর অলীক ভাগ্য নির্ণয়।
مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَٰكِن كَانَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
"ইবরাহীম তো ইয়াহুদী বা নাসারা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।"
তারপর তিনি ছবিগুলো মুছে ফেলতে নির্দেশ দেন এবং সেমতে সেগুলো মুছে ফেলা হয়।
📄 কা'বা শরীফে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খুতবা
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট জনৈক আলিম বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) কা'বার দরজায় দাঁড়িয়ে নিম্নরূপ খুতবা দেন:
لا اله الا الله وحده لا شريك له * صدق وعده ونصر عبده وهزم الاحزاب وحده * الا كل مأثرة او دم او مال يدعى * فهو تحت قدمی ها بتن الا سدانة البيت * وسقايه الحاج ألا وقتيل الخطا شبه العمد * بالسو ط والعصا ففيه الدية مغلظة منة من الابل * اربعون منها في بطونها اولادها يا معشر قريش . ان الله * قد اذ هب عنكم نخوة الجاهلية وتعظمها بالاباء * الناس من ادم وادم من تراب
এক আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর ওয়াদা পূরণ করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন। একাই সব বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছেন।
জেনে রাখ! জাহিলিয়াত যুগের সকল আভিজাত্যের অহমিকা রক্তের বা সম্পদের সকল প্রতিশোধের দাবী আমার এ দু'পায়ের নীচে (দলিত হলো)।
তবে, বায়তুল্লাহ্র সেবা বা ব্যবস্থাপনা ও হাজীদের পানি পান করানের ব্যাপার দুটো এর ব্যতিক্রম।
জেনে রাখ! ভুলক্রমে হত্যার ব্যাপারটা ছড়ি অথবা লাঠি দ্বারা প্রায় ইচ্ছাকৃত হত্যার তুল্য। এর জন্যে দিয়তে মুগাল্লাযা অর্থাৎ একশ' উট দিতে হবে-যার চল্লিশটি হবে গর্ভবতী।
হে কুরায়শ সম্প্রদায়! আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের থেকে জাহিলিয়াতের যুগের অহমিকা ও বংশ গৌরবের অবসান ঘটিয়েছেন।
মানুষ মাত্রই আদম থেকে সৃষ্ট, আর আদম সৃষ্ট মাটি থেকে।
তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন:
يأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّنْ ذَكَرِهُ أُنْثَى وَجَعَلْنَاكُم شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُم عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ.
অর্থাৎ- "হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহ্র নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সবকিছু জানেন। সমস্ত খবর রাখেন" (৪৯: ১৩)।
তারপর তিনি বললেন: يا معشر قريش * ماترون اني فاعل فيكم ؟
হে কুরায়শ সম্প্রদায়! তোমাদের ব্যাপারে আমি কী আচরণ করবো বলে তোমরা ধারণা পোষণ কর।
জবাবে তারা বললো: خيرا ، اخ كريم * و ابن اخ كريم
উত্তম ধারণা রাখি। আপনি আমাদের মহানুভব এক ভাই, মহানুভব এক ভাইপো।
তখন তিনি বললেন: از هبوا فانتم الطلقاء -'যাও, তোমরা সম্পূর্ণ স্বাধীন, সম্পূর্ণ দায়মুক্ত!
তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মসজিদে আসন গ্রহণ করলেন। আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) বায়তুল্লাহ্র চাবি হাতে তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহ্ আপনার প্রতি শান্তি বর্ষণ করুন! বায়তুল্লাহর সেবায়েতের পদ এবং হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব-এ দুটোই আমাকে দান করুন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন বললেন: উসমান ইব্ন তালহা কোথায়?
তাকে ডেকে আনা হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: هاك مفت حك يا عثمان ، اليوم يوم برو وفاء
"এই লও তোমার চাবি, হে উসমান! আজকের দিন হচ্ছে সদাচার ও বিশ্বস্ততার পালনের দিন।"
ইব্ন হিশام বলেন: সুফিয়ান ইব্ন উয়ায়না বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী (রা)-কে লক্ষ্য করে বলেন:
انما اعطيكم ما ترزون لا ما ترزون
"আমি তোমাকে তোমার কাক্ষিত পদ অর্থাৎ হাজীদের পানি পান করানের দায়িত্ব প্রদান করছি, যাতে পরিশ্রম ও কায়িক্লেশ আছে। রায়তুল্লাহর সেবায়েতের পদ নয়, যাতে তেমন ঝামেলা নেই।
📄 কা'বার অভ্যন্তরে সালাত আদায়
ইবন হিশাম বলেন: আমার নিকট আরও বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিলালকে সঙ্গে নিয়ে কা'বার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বের হয়ে আসেন এবং বিলাল পিছনে রয়ে যান। এরপর আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) বিলালের নিকট গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোথায় সালাত আদায় করলেন? কিন্তু তিনি কয় রাকাআত পড়লেন, তা তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন না। ইবন উমর (রা) যখনই কা'বায় প্রবেশ করতেন, তখনই তিনি কা'বার দরজা পিছনে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেন এবং তাঁর এবং কা'বার সামনের দেয়ালের মাঝখানে তিন হাত পরিমাণ দূরত্ব থাকতো। এ অবস্থায় তিনি সালাত আদায় করতেন। বিলাল (রা) তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সালাত আদায়ের যে স্থানটি নির্দেশ করেছিলেন সেখানেই তিনি সালাত আদায় করতেন।
📄 হারিস ও আত্তাবের ইসলাম গ্রহণ
ইবন হিশام বলেন: আমার নিকট আরো বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা বিজয়ের বছর কা'বায় প্রবেশ করেন। তখন বিলাল (রা) তার সঙ্গে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে আযান দেয়ার নির্দেশ দেন। আবু সুফিয়ান ইব্ন হারব, আত্তাব ইবন উসায়দ ও হারিস ইবন হিশাম তখন কা'বার আঙিনায় উপবিষ্ট ছিলেন। আযান শুনে আত্তাব ইবন উসায়দ বললো: আল্লাহ্ (আমার পিতা) উসায়দকে এ সম্মানটুকু দান করেছেন যে, তাকে এটুকু শুনতে হয়নি, কেননা, তিনি এসব শুনলে অবশ্যই ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হতেন।
হারিস ইন হিশাম বললো: আল্লাহর কসম! আমি যদি জানতে পারতাম যে, সে (অর্থাৎ আল্লাহ্র রাসূল) সত্যবাদী তা হলে আমি অবশ্যই তাঁর পথ ধরতাম।
উক্ত দু'জনের কথা শুনে আবু সুফিয়ান বললেন: আমি কোন মন্তব্য করছি না। আমি যদি কিছু বলতে যাই, তবে এ কঙ্করগুলোই আমার পক্ষ থেকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবে যে, আমি এরূপ এরূপ মন্তব্য করেছি।
তারা এরূপ বলাবলি করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের নিকট এসে বললেন: তোমরা এতক্ষণ যা বলাবলি করলে, তার সবই আমি জ্ঞাত আছি। তিনি তাদের সব কথার পুনরাবৃত্তি করে তাদেরকে শুনিয়ে দিলেন। হারিস ও আত্তাব কালবিলম্ব না করে বলে উঠলো: نشهد انك رسول الله والله ما اطلع على هذا احد كان معنا ، فنقول اخبرك "আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র কসম! আমাদের কাছে কেউই ছিল না যে, বলবো, সেই তা জেনে আপনাকে জানিয়ে দিয়েছে"।