📄 মক্কা বিজয়ের দিন মুসলমানদের সাঙ্কেতিক চিহ্নসমূহ
মক্কা বিজয়, হুনায়ন ও তায়েফের যুদ্ধে মুসলমানদের সঙ্কেতবাণী ছিল নিম্নরূপ:
মুহাজিরদের সঙ্কেত : يا بنى عبد الرحمن —হে আবদুর রহমানের গোত্র!
খাযরাজীদের সঙ্কেত : يا بنی عبد الله - হে আবদুল্লাহর গোত্র!
আওস গোত্রীয়দের সঙ্কেত : يا بنی عبید الله - হে উবায়দুল্লাহর গোত্র!
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) যাদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন
ইবন ইসহাক বলেন: মক্কা প্রবেশের আদেশদানকালে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর মুসলিম সেনাপতিদের নিকট থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, তাঁরা তাঁদের বিরুদ্ধে লড়তে আসা লোকদের ব্যতীত অন্য কারো সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হবে না। তবে তিনি নাম উল্লেখ করে বিশেষ কিছু লোককে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন, এমন কি যদি তাদেরকে কা'বার গিলাফের নীচেও পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে আমর ইব্ন লুআই গোত্রের আবদুল্লাহ্ ইবন সা'দ ছিল অন্যতম।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে হত্যার আদেশ এ জন্য দিয়েছিলেন যে, বাহ্যতঃ সে ইসলাম গ্রহণ করে এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আদেশক্রমে সে ওয়াহী লিপিবদ্ধ করতো। কিন্তু পরে মুরতাদ হয়ে পৌত্তলিকতা অবলম্বন করে কুরায়শদের কাছে ফিরে যায়। মক্কা বিজয়ের দিন সে উসমান ইন্ন আফফানের নিকট গিয়ে আশ্রয় নেয়। সে ছিল উসমান (রা)-এর দুধভাই। উসমান (রা) তাকে লুকিয়ে রাখেন। পরে মক্কা বিজয় শেষে পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক হয়ে গেলে মুসলমানগণ এবং মক্কাবাসীরা যখন পুরোপুরি উত্তেজনা মুক্ত, তখন তিনি তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হন এবং তার জন্যে নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে তারপর বললেন: 'আচ্ছা, ঠিক আছে।' তারপর উসমান (রা) চলে গেলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) উপস্থিত সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: আমি তো এজন্যে নীরব ছিলাম যাতে তোমাদের কেউ একজন উঠে গিয়ে ওর গর্দানটা উড়িয়ে দেয়!
একথা শুনে জনৈক আনসার সাহাবী বলে উঠলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি যদি আমাকে একটু ইশারা করতেন! জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: ইশারায় কাউকে হত্যা করা নবীর জন্যে শোভা পায় না।
ইবন হিশাম বলেন: পরে লোকটি পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে। উমর ইবন খাত্তাব (রা) তাঁকে গভর্নরও নিযুক্ত করেছিলেন। তারপর উসমান ইবন আফফান (রা) ও তাঁর খিলাফতকালে তাঁকে গভর্নর করেছিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: বনূ তামীম ইন্ন গালিব এর আবদুল্লাহ্ ইব্ন খাতলকেও রাসূলুল্লাহ্ (সা) হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন। সে মুসলমান ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে একজন আনসার সাহাবীকে সাথে দিয়ে যাকাত উশুল করার জন্যে পাঠিয়েছিলেন। একজন মুসলিম গোলামও সেবক হিসাবে তার সাথে ছিল। পথে একটি মঞ্জিলে সে অবতরণ করে এবং একটি ভেড়া যবাই করে তার জন্যে খাদ্য প্রস্তুত করার জন্যে গোলামকে নির্দেশ দেয়। তারপর সে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে জেগে যখন সে দেখতে পেল যে, গোলামটি খাদ্য প্রস্তুত করেনি, তখন সে তার উপর হামলা করে তাকে হত্যা করে এবং নিজে মুরতাদ হয়ে পৌত্তলিক জীবনে ফিরে যায়।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন খাতলের দু'টি দাসী গায়িকা ছিল। একজন ছিল ফারতনা এবং অপরজন ছিল তারই আরেক সঙ্গিনী। এরা দু'জনে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কুৎসামূলক গান গেয়ে বেড়াতো। তিনি তার সঙ্গে তার এ দু'টি দাসীকেও হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হুয়ায়রিস ইব্ন নাকীয ইব্ন ওহাব ইব্ন আব্দ ইব্ন কুসাঈও এ তালিকার অন্যতম ব্যক্তি। এ লোকটিও মক্কায় নানাভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জ্বালাতন করতো।
ইবন হিশাম বলেন: আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব রাসূল দুহিতা ফাতিমা ও উন্মু কুলসুমকে মক্কা থেকে মদীনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে ইন্ন নাকীয তাঁদেরকে বিব্রত করেছিল এবং তীর নিক্ষেপ করে তাঁদেরকে ভূপাতিত করেছিল।
ইবন ইসহাক বলেন: এ তালিকায় মিকয়াস ইন্ন হুবাবাও ছিল। ইতোপূর্বে সে একজন আনসারীকে হত্যা করে পৌত্তলিক হয়ে কুরায়শদের কাছে ফিরে গিয়েছিল। ঐ আনসারীটি ভুলক্রমে মিকয়াসের ভাইকে হত্যা করে ফেলেছিলেন। ঐ আনসারীকে হত্যার বদলেই তাকে হত্যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আরেকজন ছিল মুত্তালিব বংশের কোন এক ব্যক্তির সারা নাম্নী এক দাসী। ইকরিমা ইন্ন আবূ জাহলও এ তালিকার অন্যতম একজন ছিল। মক্কায় যারা নবী করীম (সা)-কে ক্লেশ দিত 'সারা' ছিল তাদের একজন। ইকরিমা ইয়ামানে পালিয়ে যায়। তার স্ত্রী উম্মু হাকিম বিল্ড হারিস ইন হিশাম ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট নিরাপত্তার আবেদন জানান, তাঁর আবেদন মঞ্জুর হলে স্বামীর খোঁজে তিনি ইয়ামানে যান, অবশেষে তাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকটে নিয়ে আসলে ইকরিমাও ইসলাম গ্রহণ করেন।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন খাত্তালকে সাঈদ ইবন হুরায়স মাখযূমী ও আবূ বুরযা আসলামী দু'জনে মিলে হত্যা করেন। মিকয়াস ইব্ন হুবাবাকে হত্যা করে তারই স্বগোত্রীয় নুমায়লা ইবন আবদুল্লাহ্। মিকয়াস ইবন হুবাবার হত্যা প্রসঙ্গে তার বোন কবিতায় বলে:
لعمري لقد أخرى نميلة رهطه * وفجع أضياف الشتاء بمقيس
فلله عينا من رأى مثل مقيس * اذ النفساء اصبحت لم تخرس
অর্থাৎ-আমার জীবনের শপথ, নুমায়লা তার স্বগোত্রকে কলঙ্কিত করলো। মিকয়াসকে হত্যা করে শীতকালের অতিথিদেরকে সে- বিরাট কায় ক্লেশে ফেলে দিল। আল্লাহ্ ওয়াস্তে বল দেখি, সে চোখ আজ কোথায়, যে মিকয়াসের মত দানশীল মহানুভব ব্যক্তিকে দেখবে, যখন পোয়াতীদেরকেও পথ্যাদি সরবরাহ করা হয় না?
আবদুল্লাহ্ ইব্ন খাতলের দাসীদ্বয়ের একজন নিহত হয় এবং অপর জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরবর্তীকালে তার জন্যে নিরাপত্তার আবেদন জানানো হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তা মঞ্জুর করেন। সারার জন্যে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা হলেও তাকেও তিনি নিরাপত্তা দিয়ে দেন। ফলে, সে রক্ষা পেয়ে যায়। অবশেষে উমর (রা)-এর শাসনামলে জনৈক অশ্বারোহীর ঘোড়ার খুরের নীচে পিষ্ট হয়ে সে মারা পড়ে। হুয়ায়রিস ইব্ন নাকীযকে আলী (রা) হত্যা করেন।
📄 উম্মু হানীর দুই আশ্রিত দেবর
ইবন ইসহাক বলেন: সাঈদ ইব্ন আবূ হিন্দ আমার নিকট আকীল ইব্ন আবূ তালিবের গোলাম আবূ মুৱা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবু তালিবের কন্যা উম্মু হানী (রা) বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মক্কার উচ্চ এলাকায় অবতরণ করেন, তখন আমার দেবর সম্পর্কীয় বনূ মাখযূমের দুই ব্যক্তি পালিয়ে আমার নিকট চলে আসে। উম্মু হানী ছিলেন মাখযূমী গোত্রের হুবায়রা ইব্ন আবূ ওহাবের স্ত্রী। তিনি বলেন: এমন সময় আমার ভাই আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) আমার ঘরে আগমন করলেন। তাদের দু'জনকে দেখেই তিনি বলে উঠলোঃ আল্লাহ্ কসম, আমি এদেরকে হত্যা করবোই। তখন আমি তাদেরকে আমার ঘরে আবদ্ধ করে দরজা বন্ধ করে দিলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট মক্কার উচ্চভূমিতে ছুটে গেলাম। তিনি তখন এমন একটি পাত্র থেকে পানি নিয়ে গোসল করছেন, যাতে আটার চিহ্ন লেগে ছিল এবং তাঁর কন্যা ফাতিমা তখন তাঁকে কাপড় দিয়ে আড়াল করে রেখেছিল।
গোসল শেষ করে তিনি যথারীতি কাপড় পরলেন। তারপর আট রাকাআত চাশতের সালাত আদায় করলেন। তারপর আমার কাছে এসে বললেন: স্বাগতম হে উম্মু হানী! কী মনে করে আসলে? আমি তখন তাঁকে ঐ দু'ব্যক্তি ও আলীর সংবাদ জানালাম। শুনে তিনি বললেন: তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমিও তাকে আশ্রয় দিলাম, তুমি যাকে নিরাপত্তা দিয়েছ, আমিও তাকে নিরাপত্তা দিলাম। আলী ওদেরকে হত্যা করবে না।
ইবন হিশام বলেন: তারা দু'জন ছিলেন হারিস ইবন হিশাম ও যুহায়র ইবন আবূ উমাইয়া ইব্ন মুগীরা।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হারামে প্রবেশ
ইবন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্ন জা'ফর ইব্ন যুবায়র আমার নিকট আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ ছওর সূত্রে, তিনি সাফিয়্যা বিন্ত শায়বা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় অবতরণের পর যখন লোকজনের মধ্যে স্বস্তির ভাব ফিরে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে, তখন তিনি বের হয়ে বায়তুল্লাহয় আসেন এবং বাহনের উপর বসা অবস্থায়ই সাতবার তা প্রদক্ষিণ করেন। তাওয়াফকালে তিনি তাঁর হাতের ছড়ি দ্বারা হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করে চুম্বনের কাজ সারেন। তাওয়াফ শেষে তিনি উসমান ইব্ন তালহাকে ডেকে তার নিকট থেকে কা'বার চাবি নেন। কা'বার দরজা খোলা হলে তিনি তাতে প্রবেশ করেই কাঠের তৈরি একটি কবুতর মূর্তি দেখতে পান। তিনি নিজহাতে তা ভেঙ্গে ছুঁড়ে ফেলে দেন। তারপর কা'বার দরজায় এসে দাঁড়ান। ইতোমধ্যে তাঁর আগমনে মসজিদে বেশ লোকজনের সমাবেশ ঘটে।
ইন হিশাম বলেন: কতিপয় আলিম আমার নিকট এ মর্মে বর্ণনা করেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বায়তুল্লাহয় প্রবেশ করে তার ভিতরে ফেরেশতা প্রভৃতির কিছু ছবি দেখতে পান। তিনি দেখতে পান যে, ইবরাহীম (আ)-এর এমনি একটি ছবি তাতে রয়েছে, যাতে দেখানো হয়েছে যে, তিনি তীর হাতে ভাগ্য নির্ণয় করছেন। তখন তিনি বললেন: আল্লাহ্ ওদেরকে ধ্বংস করুন! ওরা আমাদের মহান মুরুব্বীকে তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয়কারী বানিয়ে ছেড়েছে, অথচ ঐসব ভাগ্য নির্ণয়ের তীরের সাথে তাঁর কী সম্পর্ক! কোথায় তাঁর মর্যাদা, আর কোথায় এসব অলীক তীর, আর অলীক ভাগ্য নির্ণয়।
مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَٰكِن كَانَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
"ইবরাহীম তো ইয়াহুদী বা নাসারা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।"
তারপর তিনি ছবিগুলো মুছে ফেলতে নির্দেশ দেন এবং সেমতে সেগুলো মুছে ফেলা হয়।