📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) যী-তোয়ায়

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) যী-তোয়ায়


ইন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবু বকর আমার নিকট বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) যী-তোয়ায় পৌঁছে বাহনের উপর বসা অবস্থায়ই থেমে যান। তখন তাঁর পাগড়ীটি শ্যামলা ছিল না, ববং তা' ছিল লোহিত বর্ণের ইয়ামনী চাদরের। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে জয়যুক্ত করায় আল্লাহর প্রতি বিনয়াবনত হয়ে তিনি মাথা এতই ঝুঁকিয়ে বসেন যে, তাঁর দাড়ি মুবারক একেবারে হাওদার সঙ্গে ঠেকে যায়।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবূ কুহাফার ইসলাম গ্রহণ

📄 আবূ কুহাফার ইসলাম গ্রহণ


ইন ইসহাক বলেন: ইয়াহইয়া ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন যুবায়র তাঁর পিতার সূত্রে, তিনি তাঁর আম্মাজান আসমা বিন্ত আবূ বকর (রা) থেকে আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন যী-তোয়ায় অবস্থান করেন, তখন আবু কুহাফা তাঁর এক কন্যাকে বললেন: বেটি, আমাকে আবূ কুবায়স পাহাড়ে¹ নিয়ে চল! আসমা বলেন: তাঁর দৃষ্টিশক্তি তখন লোপ পেয়ে গিয়েছিল। যা হোক, তার সে কন্যাটি তাঁকে নিয়ে পাহাড়ে আরোহণ করে। তখন আবূ কুহাফা বলেন: বেটি, তুমি কী দেখতে পাচ্ছো?
জবাবে মেয়েটি বললো: আমি এক বিশাল জনতা দেখতে পাচ্ছি। আবু কুহাফা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন তারা কি অশ্বারোহী? জবাবে মেয়েটি বললো আমি এক ব্যক্তিকে সে বাহিনীর সামনে পিছনে ছুটাছুটি করতে দেখতে পাচ্ছি। আবূ কুহাফা বললেন: আসলে ঐ ব্যক্তিটি বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তাদের সামনে থাকছে।
তারপর মেয়েটি বললো: আল্লাহ্র কসম! এবার জনতা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে দেখতে পাচ্ছি। রাবী আসমা (রা) বলেন; আবু কুহাফা বললেন: তা হলে আরোহীদেরকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তুমি তাড়াতাড়ি আমাকে বাড়ি নিয়ে চল! সে মতে মেয়েটি তাঁকে নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসে। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছবার আগেই তিনি অশ্বারোহীদের সামনে পড়ে যান।
আসমা বলেন: মেয়েটির গলায় একটি সোনার হার ছিল। একজন তার গলা থেকে তা কেড়ে নিয়ে নেয়। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় ঢুকেন এবং মসজিদে প্রবেশ করেন, তখন আবূ বকর (রা) তাঁর পিতাকে নিয়ে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে দেখে বলে উঠলেন: মুরব্বীকে ঘরেই রেখে আসতে, আমি নিজে গিয়ে তাঁকে দেখে আসতাম!
জবাবে আবূ বকর (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা) আপনি তাঁর নিকট যাওয়ার চাইতে তাঁর আপনার কাছে আসাটাই অধিকতর সঠিক হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে তাঁর নিজের সামনে বসালেন। তারপর তাঁর পবিত্র হাত বৃদ্ধের বুকে মুছে দিয়ে বললেন: 'আপনি মুসলমান হয়ে যান!' তখন আবূ কুহাফা আর কালবিলম্ব না করে সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন।
আসমা বিন্ত আবূ বকর (রা) বলেন: তারপর আবূ বকর (রা) তাঁকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেন। তাঁর মস্তক তখন শ্বেত-শুভ্র দেখাচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তাঁর চুল রাঙিয়ে দাও! তারপর আবূ বকর দাঁড়িয়ে তাঁর বোনের হাত ধরে বললেন: দোহাই আল্লাহর! দোহাই ইসলামের!! আমি আমার বোনের হারটি ফেরত চাই। কিন্তু কারো থেকে কোন উত্তর পাওয়া গেল না। তখন আবূ বকর (রা) বলে উঠলেন: হে আমার বোন! সাওয়াবের আশায় তোমার হারটি (আল্লাহ্র কাছে) জমা আছে বলে মনে করো। কারণ লোকদের মধ্যে আজকাল আর সে আমানতদারী নেই!'

টিকাঃ
১. কা'বা শরীফ সংলগ্ন পাহাড়-আজকাল এখানে সৌদী বাদশাহর একটি মহল রয়েছে।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুসলিম বাহিনীর মক্কা প্রবেশ

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুসলিম বাহিনীর মক্কা প্রবেশ


ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ নাজীহ্ আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর লোক-লশকরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে যী-তোয়া থেকে মক্কায় প্রবেশের আদেশ দেন। যুবায়র ইব্‌ন আওয়াম (রা)-কে তিনি কুদার দিক থেকে প্রবেশের আদেশ দেন। যুবায়র (রা) বাহিনীর বাম অংশের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। সা'দ ইবন উবাদাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কিছু লোক নিয়ে কাদার দিক থেকে প্রবেশের নির্দেশ দেন।
ইবন ইসহাক বলেন: কোন কোন আলিম বলেন যে, সা'দ ইবন উবাদা (রা) মক্কা প্রবেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে বললো:
الْيَوْمَ يَوْمَ المَلْحَمَةِ الْيَوْمَ تُسْتَحَلُّ الْحُرْمَةُ
"আজকের দিন সংঘাতের দিন! আজ বায়তুল্লাহর হুরমতকে হালাল বিবেচনার দিন!!"
জনৈক মুহাজির তাঁর এ কথাটি শুনে ফেলেন। ইন্ন হিশামের মতে, তিনি ছিলেন উমর ইব্‌ন খাত্তাব (রা)। তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! সা'দ ইবন উবাদা কী বলছে শুনুন! কুরুয়শদের উপর সে যে হামলা করবে না, এ ব্যাপারে আমরা তার উপর ভরসা করতে পারছি না। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্‌ন আবূ তালিবকে লক্ষ্য করে বললেন: ওর কাছে যাও এবং তার নিকট থেকে পতাকা নিজ হাতে নিয়ে তা নিয়ে তুমিই বরং নগরে প্রবেশ কর!
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ নাজীহ্ তাঁর বর্ণনায় আরো বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আদেশে খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) কিছু লোক নিয়ে মক্কার নিম্নাঞ্চলবর্তী লায়ত দিয়ে প্রবেশ করেন। তিনি ছিলেন ডান দিকের বাহিনীর অধিনায়ক। তাঁর সে বাহিনীতে আসলাম, সুলায়ম, গিফার, মুযায়না, জুহায়না এবং আরবের আরো বেশ ক'টি গোত্রের লোকজন ছিলেন।
অপরদিকে আবু উবায়দা ইবন জার্রা (রা) মুসলমানদের এক সারি লোক নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে দিয়ে মক্কায় উপস্থিত হন। আর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সা) আযাখিরের দিক থেকে মক্কার উচ্চ এলাকায় প্রবেশ করে সেখানেই তাঁবু স্থাপন করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ নাজীহ্ ও আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, সাওয়ান ইবন উমাইয়া, ইক্রিমা ইন্ন আবু জাহল ও সুহায়ল ইন আমর যুদ্ধের উদ্দেশ্যে খানদামা নামক স্থানে কিছু সৈন্য সমাবেশ করেন। অপর দিকে বনূ বকর গোত্রে হিসাম ইব্‌ন কায়স ইন্ন খালিদ, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মক্কা প্রবেশের আগে তার অস্ত্রে শান দিতে শুরু করে। তা দেখে তার স্ত্রী তাকে লক্ষ্য করে বলে এসব প্রস্তুত করা হচ্ছে কেন? জবাবে সে বলে: মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীদের জন্যে। তার স্ত্রী তাকে বলে আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীদের মুকাবিলায় তোমরা কিছুই করতে পারবে বলে তো আমার মনে হয় না। জবাবে হিমাস ইবন কায়স বলে আমি তো আশা করছি, তাদের কেউ একজনকে তোমার খিদমতে নিয়োজিত করতে পারবো। তারপর সে কবিতায় বললো:
ان يقبلوا اليوم فمالي علة * هذا سلاح كامل والة
وذو غرارين سريع السلة
অর্থাৎ-আজ যদি তারা যুঝিতে আসে কেউ আমার সনে পূর্ণ অস্ত্রে সজ্জিত আছি ফুল্ল মনে আছে বর্শা আছে তার সাথে দীর্ঘফলা আছে তার সাথে তেগ যে দুধারী (কাটিব গলা)।
তারপর সে খানদামায় গিয়ে সাওয়ান, সুহায়ল ও ইকরিমার সঙ্গে মিলিত হয়। খালিদ ইবন ওয়ালীদের কয়েকজন সাথীর সঙ্গে তাদের দেখা হয় এবং দু'পক্ষে সামান্য সংঘর্ষও হয়। এতে বনূ মুহারিব ইন্ন ফির গোত্রের কুর্য ইন্ন জাবির ও বনু মুনকিযের মিত্র খুনায়স ইবন খালিদ রবী'আ ইব্‌ন আসরাম শহীদ হন। এঁরা দু'জনই ছিলেন খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদের বাহিনীভুক্ত। খালিদের অবলম্বিত পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরে চলায় তাঁদের এ বিপর্যয় ঘটে। তাঁরা উভয়ে একত্রে নিহত হন। কুরযের নিহত হওয়ার একটু আগে খুনায়স নিহত হয়েছিলেন। কুরয ইবন জাবির তাঁর পদদ্বয়ের দ্বারা খুনায়সকে আগলে রেখে তাঁকে রক্ষার জন্যে লড়াই করতে করতে নিজেও শাহাদত বরণ করেন। তখন তিনি যে গাথাটি বলছিলেন তা ছিল এরূপ:
قد علمت صفراء من بنى فهر * نقية الوجه نقيه الصدر
لاضرين اليوم عن ابي صخر
অর্থাৎ—বনূ ফিহরের হলুদ বর্ণের, শুভ্র চেহারার ও নির্মল অন্তরের লোকগুলোর জানা হয়ে গেছে, আবূ সাত্রের প্রতিরক্ষার জন্যে কী দারুণ লড়াই না লড়েছি আমি!
ইবন হিশাম বলেন: খুনায়স-ই আবূ সাখর কুনিয়াতে মশহুর ছিলেন। তিনি ছিলেন খুযাআ গোত্রের লোক।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ নাজীহ্ ও আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর আমার নিকট আরো বর্ণনা করেন যে, খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদের বাহিনীর লোক জুহায়না গোত্রের সালামা ইব্‌ন মায়লাও শহীদ হন। পক্ষান্তরে মুশরিকদের পক্ষে বার তেরজন নিহত হওয়ার পর তারা পরাজিত হয়। হিমাশও পরাজয় বরণ করে ঘরে গিয়ে প্রবেশ করে স্ত্রীকে বলে: দরজাটা বন্ধ করে দাও! তখন স্ত্রী বলে উঠলো : তুমি যা বলেছিলে তার কী হলো গো? তখন সে কবিতায় বলে :
انك لو شهدت يوم الخندمة * اذ فرصفوان وفر عكرمة
وابو يزيد قائم كالمؤتمه * واسقعبلتهم بالسيوف المسلمة
ওহে! যদি তুমি থাকতে যুদ্ধকালে খানন্দামায়, তবে দেখতে কেমনে পালায় সাওয়ান এবং ইকরিমায়
বাপের বেটা আবূ ইয়াযীদ¹ দাঁড়িয়ে রয় স্তম্ভ সম
তরবারি নিয়ে লড়ছিল সে সামনে তার টেকা দায়!
ويقطعن كل ساعد وجمجمه * ضربا فلا يسمع الاغمغمه
তলোয়ারেতে কজি কাটে, যায় যে উড়ে মাথার খুলি, চতুর্দিকে 'হাম্হাম, সুর উড়ছে কেবল মাঠের ধূলি।
لهم نهيت خلفنا و همهمه * لم تنطقى في اللوم ادنى كلمه
হুঙ্কারেতে কাঁপছে ধরা, আর যে কিছুই যায় না শোনা
ওসব যদি দেখতে তুমি, খোঁটা দিতে যেতে ভুলি।
ইবন হিশাম বলেন: পংক্তিগুলো মূলত রাযীশ হুযালীর বলে বর্ণিত।

টিকাঃ
১. সুহারুল ইবন আমর।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মক্কা বিজয়ের দিন মুসলমানদের সাঙ্কেতিক চিহ্নসমূহ

📄 মক্কা বিজয়ের দিন মুসলমানদের সাঙ্কেতিক চিহ্নসমূহ


মক্কা বিজয়, হুনায়ন ও তায়েফের যুদ্ধে মুসলমানদের সঙ্কেতবাণী ছিল নিম্নরূপ:
মুহাজিরদের সঙ্কেত : يا بنى عبد الرحمن —হে আবদুর রহমানের গোত্র!
খাযরাজীদের সঙ্কেত : يا بنی عبد الله - হে আবদুল্লাহর গোত্র!
আওস গোত্রীয়দের সঙ্কেত : يا بنی عبید الله - হে উবায়দুল্লাহর গোত্র!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00