📄 আবূ সুফিয়ানের সামনে সৈন্যদের মহড়া
তারপর যখন আবু সুফিয়ান চলে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আব্বাস, গিরিপর্বতের নিকট উপত্যকার সঙ্কীর্ণ স্থানে একে একটু থামাবেন যাতে করে আল্লাহ্র সৈনিকরা সে পথে অতিক্রমকালে সে তাদেরকে এক নযর দেখতে পায়। আব্বাস (রা) বলেন: তারপর আমি বেরিয়ে পড়ি এবং রাসূলুল্লাহ্র আদেশ অনুসারে উপত্যকার সঙ্কীর্ণ স্থানে তাকে একটু থামাই।
আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব বলেন: তারপর এক একটি করে গোত্র আপন আপন পতাকা হস্তে পথ অতিক্রম করতে থাকে। যখনই কোন একটি গোত্র অতিক্রম করছিল, তখনই আবূ সুফিয়ান জিজ্ঞাসা করছিল: এরা কারা আব্বাস? আর জবাবে আমি বলছিলাম: এঁরা হচ্ছে সুলায়ম গোত্র! তখন সে বলছিল সুলায়মের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক! তারপর আরেকটি গোত্র অতিক্রম করলে সে আবার জিজ্ঞাসা করলো আব্বাস! এরা কারা? আমি বললাম: এরা হচ্ছে মুযায়না গোত্র। সে বলে উঠে মুযায়না দিয়ে আমার কী কাজ? এভাবে একে একে সবক'টি গোত্র অতিক্রম করছিল, তখনই সে আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল যে, এদের কী পরিচয়? আর আমার থেকে তাদের পরিচয় পেয়ে সে বলছিল এদের সাথে আমার কী সম্পর্ক? অবশেষে সবুজ বাহিনী পরিবেষ্টিত হয়ে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) অতিক্রম করলেন। ইবন হিশাম বলেন: তাঁদের দেহস্থিত বিপুল লৌহবর্ম এবং রমরমা ভাবের জন্যে তাঁদেরকে 'সবুজ বাহিনী' বলে অভিহিত করা হয়।
ইবন ইসহাক বলেন: এ বাহিনীতে মুহাজির এবং আনসার সাহাবিগণ ছিলেন। তাঁদের সকলেই লৌহবর্ম পরিহিত ছিলেন। তা লক্ষ্য করে আবু সুফিয়ান বলে উঠলেন: সুবহানাল্লাহ্! এরা কারা হে আব্বাস? তিনি বলেন: আমি তখন বললাম: মুহাজির ও আনসার পরিবেষ্টিত আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান বললেন: আল্লাহর কসম! আজ এমন কোন শক্তি নেই যারা এদের মুকাবিলা করতে পারে! তোমার ভাতিজার রাজত্ব তো দেখছি বিশাল আকার ধারণ করেছে, হে আব্বাস! আমি বললাম এ হচ্ছে নবৃওয়াতের শান, হে আবু সুফিয়ান। এটা রাজত্বের বহিঃপ্রকাশ নয়। সে বললো হ্যাঁ, তুমি যথার্থই বলেছো।
📄 আবূ সুফিয়ানের প্রত্যাবর্তন
আব্বাস (রা) বলেন: তখন আমি বললাম, এবার তুমি জলদি তোমার সম্প্রদায়ের কাছে চলে যাও। আবু সুফিয়ান সে মতে তার সম্প্রদায়ের লোকজনের নিকট উপস্থিত হয়ে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করলো:
"হে কুরায়শকুল! এই যে মুহাম্মদ তোমাদের মাথার উপর এসে পড়েছেন। তাঁর মুকাবিলা করার শক্তি তোমাদের নেই। সুতরাং যে আবূ সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ!" তার একথা শুনে উতবা তনয়া হিন্দা উঠে দাঁড়াল এবং তার কাছে এসে তার গোঁফ ধরে বললো : اقتلوا الحميت الدسم الاحمس
তোমরা মেরে ফেল! বড় মন্দ নেতা সে। আবু সুফিয়ান বললো: সর্বনাশ হোক্ তোমাদের! এর কথায় তোমরা বিভ্রান্তি হয়ো না! তোমাদের মধ্যে এমন এক মহাশক্তির আগমন ঘটেছে, যার মুকাবিলা করার সাধ্য তোমাদের নেই। যে কেউ আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ!
লোকেরা বলে উঠলো: "আল্লাহ্ তোমাকে ধ্বংস করুন! তোমার ঘর আমাদের কী কাজে আসবে? আর ক'জন লোকেরই বা তোমার ঘরে সংকুলান হবে?" তখন, আবু সুফিয়ান বললো: "যে ব্যক্তি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকবে, সেও নিরাপদ! আর যে ব্যক্তি মসজিদে (হারাম) প্রবেশ করবে, সেও নিরাপদ !!"
এ ঘোষণা শুনে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে আপন আপন ঘর ও মসজিদের দিকে ছুটে যায়।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) যী-তোয়ায়
ইন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবু বকর আমার নিকট বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) যী-তোয়ায় পৌঁছে বাহনের উপর বসা অবস্থায়ই থেমে যান। তখন তাঁর পাগড়ীটি শ্যামলা ছিল না, ববং তা' ছিল লোহিত বর্ণের ইয়ামনী চাদরের। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে জয়যুক্ত করায় আল্লাহর প্রতি বিনয়াবনত হয়ে তিনি মাথা এতই ঝুঁকিয়ে বসেন যে, তাঁর দাড়ি মুবারক একেবারে হাওদার সঙ্গে ঠেকে যায়।
📄 আবূ কুহাফার ইসলাম গ্রহণ
ইন ইসহাক বলেন: ইয়াহইয়া ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র তাঁর পিতার সূত্রে, তিনি তাঁর আম্মাজান আসমা বিন্ত আবূ বকর (রা) থেকে আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন যী-তোয়ায় অবস্থান করেন, তখন আবু কুহাফা তাঁর এক কন্যাকে বললেন: বেটি, আমাকে আবূ কুবায়স পাহাড়ে¹ নিয়ে চল! আসমা বলেন: তাঁর দৃষ্টিশক্তি তখন লোপ পেয়ে গিয়েছিল। যা হোক, তার সে কন্যাটি তাঁকে নিয়ে পাহাড়ে আরোহণ করে। তখন আবূ কুহাফা বলেন: বেটি, তুমি কী দেখতে পাচ্ছো?
জবাবে মেয়েটি বললো: আমি এক বিশাল জনতা দেখতে পাচ্ছি। আবু কুহাফা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন তারা কি অশ্বারোহী? জবাবে মেয়েটি বললো আমি এক ব্যক্তিকে সে বাহিনীর সামনে পিছনে ছুটাছুটি করতে দেখতে পাচ্ছি। আবূ কুহাফা বললেন: আসলে ঐ ব্যক্তিটি বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তাদের সামনে থাকছে।
তারপর মেয়েটি বললো: আল্লাহ্র কসম! এবার জনতা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে দেখতে পাচ্ছি। রাবী আসমা (রা) বলেন; আবু কুহাফা বললেন: তা হলে আরোহীদেরকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তুমি তাড়াতাড়ি আমাকে বাড়ি নিয়ে চল! সে মতে মেয়েটি তাঁকে নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসে। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছবার আগেই তিনি অশ্বারোহীদের সামনে পড়ে যান।
আসমা বলেন: মেয়েটির গলায় একটি সোনার হার ছিল। একজন তার গলা থেকে তা কেড়ে নিয়ে নেয়। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় ঢুকেন এবং মসজিদে প্রবেশ করেন, তখন আবূ বকর (রা) তাঁর পিতাকে নিয়ে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে দেখে বলে উঠলেন: মুরব্বীকে ঘরেই রেখে আসতে, আমি নিজে গিয়ে তাঁকে দেখে আসতাম!
জবাবে আবূ বকর (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা) আপনি তাঁর নিকট যাওয়ার চাইতে তাঁর আপনার কাছে আসাটাই অধিকতর সঠিক হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে তাঁর নিজের সামনে বসালেন। তারপর তাঁর পবিত্র হাত বৃদ্ধের বুকে মুছে দিয়ে বললেন: 'আপনি মুসলমান হয়ে যান!' তখন আবূ কুহাফা আর কালবিলম্ব না করে সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন।
আসমা বিন্ত আবূ বকর (রা) বলেন: তারপর আবূ বকর (রা) তাঁকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেন। তাঁর মস্তক তখন শ্বেত-শুভ্র দেখাচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তাঁর চুল রাঙিয়ে দাও! তারপর আবূ বকর দাঁড়িয়ে তাঁর বোনের হাত ধরে বললেন: দোহাই আল্লাহর! দোহাই ইসলামের!! আমি আমার বোনের হারটি ফেরত চাই। কিন্তু কারো থেকে কোন উত্তর পাওয়া গেল না। তখন আবূ বকর (রা) বলে উঠলেন: হে আমার বোন! সাওয়াবের আশায় তোমার হারটি (আল্লাহ্র কাছে) জমা আছে বলে মনে করো। কারণ লোকদের মধ্যে আজকাল আর সে আমানতদারী নেই!'
টিকাঃ
১. কা'বা শরীফ সংলগ্ন পাহাড়-আজকাল এখানে সৌদী বাদশাহর একটি মহল রয়েছে।