📄 হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আর পত্র
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্ন জা'ফর ইবন যুবায়র (র) উরওয়া ইব্ন যুবায়র প্রমুখ আলিমগণের সূত্রে বর্ণনা করেন। তারা বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর, হাতিব ইবন আবূ বালতা'আ (রা) এ অভিযানের সংবাদ দিয়ে কুরায়শদের নিকট একটি পত্র লিখেন। তারপর তা পুরস্কারের বিনিময়ে কুরায়শদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যে এক মহিলার হাত অর্পণ করেন। মুহাম্মদ ইবন জা'ফরের ধারণা, এ মহিলাটি ছিল মুযায়না গোত্রের। অন্যদের ধারণায় সে ছিল আবদুল মুত্তালিবের বংশের জনৈক ব্যক্তির 'সারা' নাম্নী দাসী। মহিলাটি পত্রটি তার মাথার চুলের খোপায় গুঁজে রওনা হয়ে পড়ে। এদিকে আসমান থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে হাতিবের এ কার্যক্রমের সংবাদ এসে যায়। ফলে, সঙ্গে সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্ন আবূ তালিব ও যুবায়র ইব্ন আওয়امকে এ আদেশ দিয়ে প্রেরণ করলেন যে, ঐ মহিলাকে ধরো যার মাধ্যমে হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আ আমাদের এ অভিযানের প্রস্তুতির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে, কুরায়শদের নিকট পত্র পাঠিয়েছেন।
সেমতে, তাঁরা দু'জন খালীকা বনু আবূ আহমদ' নামক স্থানে গিয়ে তাকে ধরে ফেলেন। তাঁরা তাকে উটের উপর থেকে নামিয়ে তার হাওদায় তল্লাসী চালান। কিন্তু তাঁরা তাতে কিছুই খুঁজে পেলেন না। তখন আলী (রা) তাকে লক্ষ্য করে বললেন: আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সা) মিথ্যা বলেননি। আমরাও মিথ্যা বলছি না। হয় তুমি চিঠিখানা বের করে দেবে, নতুবা আমরা তোমাকে উলঙ্গ করে ছাড়ব। আলী (রা)-এর এরূপ কঠোরতা লক্ষ্য করে মহিলাটি বলল: আপনি একটু অন্যদিকে মুখ ফিরান। আলী (রা) অন্যদিকে ফিরিয়ে দাঁড়ালে সে তার চুলের খোঁপা থেকে চিঠিটি বের করে তাঁর হাতে তুলে দিল। তিনি চিঠিটা নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে হাযির হলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাতিব (রা)-কে ডেকে এনে বললেন: কিসে তোমাকে এ কাজে প্ররোচিত করলো, হে হাতিব?
জবাবে হাতিব (রা) বললেন: “ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহ্ শপথ, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অবশ্যই আমার ঈমান রয়েছে। আমি মোটেও বদলে যাইনি বা আমার মধ্যে কোন পরিবর্তন সূচিত হয়নি। কিন্তু আমি এমন এক ব্যক্তি, যার গোত্রগোষ্ঠী বা আপনজন বলতে কেউ নেই। কিন্তু আমার স্ত্রী-পুত্ররা কুরায়শদের মধ্যে রয়ে গেছে। সেহেতু তাদের প্রতি আমি এ আনুকূল্যটুকু দেখিয়ে তাদের একটু সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করেছি।
এ কথা শুনে উমর ইবন খাত্তাব (রা) বলে উঠলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমাকে অনুমতি দিন, আমি ওর গর্দানটা উড়িয়ে দেই। কারণ, এ লোকটি মুনাফিকী করেছে।
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: উমর! তুমি কি জানো যে আল্লাহ্ তা'আলা বদর যুদ্ধের অংশগ্রহণকারী সাহাবীদেরকে বলে দিয়েছেন যে, তোমরা তোমাদের মনে যা চায়, তা-ই কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম। তারপর আল্লাহ তা'আলা হাতিব সম্পর্কে নাযিল করেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّة ...... فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الحَمِيدُ.
অর্থাৎ- "হে মু'মিনগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তোমরা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছো, অথচ তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা রাসূলকে এবং তোমাদের বের করে দিয়েছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহকে বিশ্বাস কর। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হয়ে থাকো, তবে কেন তোমারা তাদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব করেছো? তোমরা যা গোপন করো এবং তোমরা যা প্রকাশ কর, তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের মধ্যে যে কেউ এটা করে সে তো সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়।
তোমাদের কাবু করতে পারলে তারা হবে তোমাদের শত্রু এবং হাত ও জিহবা দ্বারা তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে এবং তারা চাইবে যে তোমরাও কুফরী করো।
তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন কোন কাজে আসবে না। আল্লাহ্ তোমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবেন। তোমরা যা কর তিনি তা দেখেন।
তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল: তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হলো শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য যদি না তোমরা এক আল্লাহর উপর ঈমান আন। তবে ব্যতিক্রম হলো আপন পিতার প্রতি ইবরাহীমের উক্তি, "আমি অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবো এবং তোমার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট আমি কোন অধিকার রাখি না।"
ইবরাহীম ও তার অনুসারিগণ বলেছিল: 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তো তোমারই উপর নির্ভর করেছি, তোমারই অভিমুখী হয়েছি এবং প্রত্যাবর্তন তো তোমারই নিকট।' 'হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের কাফিরদের পীড়নের পাত্র করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের ক্ষমা কর; তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।'
তোমরা যারা আল্লাহ্ ও আখিরাতের প্রত্যাশা কর, নিশ্চয়ই তাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ ইবরাহীম ও তার অনুসারীদের মধ্যে। কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে সে জেনে রাখুক, আল্লাহ্ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ” (৬০: ১-৬)।
টিকাঃ
১. ইয়াকৃতের বিবরণ অনুযায়ী স্থানটি মদীনা থেকে বার মাইল দূরে অবস্থিত। কেউ কেউ খালায়ক বলেও স্থানটির নাম উল্লেখ করেছেন।
📄 মক্কার পথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যাত্রা
ইবন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্ন মুসলিম ইব্ন শিহাব যুহরী আমার কাছে, উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উতবা ইবন মাসউদ সূত্রে আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি কুলসুম ইবন হুসায়ন ইব্ন উতবা ইব্ন খাল্ফ গিফারীকে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান। রমযানের দশ তারিখে তিনি রওনা হন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সঙ্গীরা রোযা রাখেন। যখন তাঁরা উসফান ও আমাজের মধ্যবর্তী কুদায়দ নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন তিনি সঙ্গীদেরসহ ইফতার করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: তারপর সেখান থেকে রওনা হয়ে তিনি দশ হাজার মুসলমানসহ মারায যাহরান নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন। তন্মধ্যে সুলায়ম গোত্রের সাত শ', মতান্তরে এক হাজার, আর মুযায়না গোত্রের এক হাজার লোক এবং আনসার ও মুহাজিরদের সকলেই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে ছিলেন; তাঁদের একজনও অনুপস্থিত ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মারায যাহ্বানে অবস্থান করছিলেন, কুরায়শরা তখনো তাঁর আগমন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। ঐ রাতেই আবু সুফিয়ান ইব্ন হাব, হাকীম ইন্ন হিযام ও বুদায়ল ইন ওরাকা সঙ্গোপনে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বের হয়।
এদিকে আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব মক্কা থেকে বের হয়ে পথে কোন এক স্থানে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে মিলিত হন।
ইন হিশাম বলেন: আব্বাস (রা) সপরিবারে হিজরত করে জুহফা নামক স্থানে এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে মিলিত হন। তিনি হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব নিয়ে এর পূর্ব পর্যন্ত মক্কায় বসবাস করছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর প্রতি প্রসন্নই ছিলেন। ইব্ন শিহাব যুহরী এরূপই বর্ণনা করেছেন।
📄 ইবন হারিস ও ইবন উমাইয়ার ইসলাম গ্রহণ
ইবন ইসহাক বলেন: আবু সুফিয়ান ইব্ন হারিস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব এবং আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমাইয়া ইব্ন মুগীরাও মক্কা ও মদীনার মধ্যে অবস্থিত 'বানীকুল-ইকাব' নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর সংগে সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা করেন। উম্মু সালামা (রা) তাঁদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে কথা বলেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনার চাচাতো ভাই এবং ফুফাতো ভাই ও জামাতা এসেছেন। জবাবে তিনি বললেন : ওদের দিয়ে আমার কোনই কাজ নেই। চাচাতো ভাইটি তো আমার অমর্যাদা করেছে। আর ফুফাতো ভাই ও জামাই মক্কায় আমাকে অনেক কটু কথা বলেছে।
আবু সুফিয়ান ইবন হারিসের সঙ্গে তাঁর একটি শিশুপুত্রও ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জবাব শুনে তিনি বলে উঠলেন : আল্লাহ্র শপথ, হয় তিনি আমাকে সাক্ষাতের অনুমতি দেবেন, না হয় এ ছেলেটির হাত ধরে আমি যে দিকে চোখ যায় চলে যাবো এবং ক্ষুৎপিপাসায় কারাতে কারাতে প্রাণ বিসর্জন দেবো।
তাঁর এ মনোভাবের কথা অবগত হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মনে ভাবান্তর উপস্থিত হলো। তাঁর হৃদয়ে তাদের প্রতি করুণার উদ্রেক হলো। তিনি তাদেরকে সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন। তখন তারা তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করলো।
📄 ইন্ন হারিসের কৈফিয়তমূলক কবিতা
ইসলাম গ্রহণকালে কবিতার মাধ্যমে নিজের পূর্বের কটু বাক্যের জন্যের কৈফিয়ত পেশ করে তিনি নিম্নরূপ বক্তব্য প্রকাশ করেন:
আপনার জীবনের শপথ, যখন আমি কুফরের ঝাণ্ডা হাতে চেষ্টিত ছিলাম লাত মানাতের ঘোড়-সওয়ারদেরকে মুহাম্মদের ঘোড়সওয়ারদের মুকাবিলায় জয়যুক্ত করার উদ্দেশ্যে, তখন নিঃসন্দেহে আমি ছিলাম ঐ ব্যক্তির তুল্য, যে ঘুঁটঘুটে অন্ধকার রাতে— চারদিকে হাত পা মারছিল।
এখন সে সময়টি এসেছে,
যখন আমাকে হাতে ধরে সঠিক পথে চালিত করা হচ্ছে। আর আমি এখন সঠিক পথের পথিক।
একজন দিশারী আমাকে পথ প্রদর্শন করেছেন, আমার প্রবৃত্তি নয়।
তিনি আমাকে উঠিয়ে দিয়েছেন হিদায়েতের রাজপথে, যার বিরুদ্ধে এতকাল আমি লড়ে এসেছি, তিনি আমাকে যুক্ত করে দিয়েছেন আল্লাহ্র সাথে, যার বিরুদ্ধে আমি প্রাণপণে লড়ে— দিন দিন তাঁকে দূরে— আরো দূরে সরিয়ে দিয়েছি।
আমি সর্বশক্তি নিয়োগ করে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতাম এবং তাঁর থেকে দূরে থাকতাম। অথচ মুহাম্মদের সংগে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে আমি এ সম্পর্ক প্রকাশ করতাম না।
তাঁর কথা আর কি বলব! তিনি তো এমন ব্যক্তি, যিনি নিজের ইচ্ছামত কিছুই বলেন না, যদি এরূপ করতেন, তাহলে শুধু তাঁর নিন্দাই করা হতো না, বরং তাঁকে মিথ্যাবাদী বলা হতো।
আমি এখন তাঁকে খুশি করতে চাই এবং প্রতিটি ব্যাপার আমার সম্প্রদায়ের সাথে আর সম্পৃক্ত থাকতে চাই না; যতক্ষণ না আমাকে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া হয়।
সাকীফ গোত্রকে বলে দাও যে, এখন আমি তাদের সাথী হয়ে যুদ্ধ করতে চাই না। তাদের আরো বলে দাও, তারা যেন এখন আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ধমক দেয়।
আমি সেই সেনাদলে ছিলাম না, যারা আমাদেরকে পাঁকড়াও করেছিল এবং ঐ সেনাদলকে আমি মুখ বা হাতের ইশারায় ডাকিনি।
এরা সেই গোত্র-যারা বহুদূর থেকে এসেছিল, এদের টেনে আনা হয়েছিল, এরা 'সুহাম ও সুরুদ'¹ নামক স্থান থেকে এসেছিল।
তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মাত্রায যাহ্রানে অবতরণ করলেন, আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব বলেন: তখন আমি মনে মনে বললাম, হায়, ধ্বংস কুরায়শদের! তারা এসে নিরাপত্তার আবেদন জানানোর আগেই যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলপূর্বক মক্কায় ঢুকেই পড়েন, তা হলে কুরায়শরা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন: তারপর আমি রাসূলের সাদা রঙের খচ্চরে চড়ে বসি। তারপরে আমি বেরিয়ে পড়ি এবং আরাক নামক স্থানে এসে পৌঁছি। তখন আমি মনে মনে বলছিলাম: হায়, আমি যদি কোন কাঠুরিয়া, গোয়ালা কিংবা অন্য কাউকে পেতাম, যে মক্কায় গিয়ে কুরায়শদের রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অবস্থান সম্পর্কে সংবাদ দেবে; যাতে করে অতর্কিতভাবে আক্রান্ত হবার আগেই তারা তাঁর কাছে নিরাপত্তার আবেদন জানাবে, তা হলে কতই না উত্তম হতো!
আব্বাস (রা) বলেন: আল্লাহর কসম! রাসূলের খচ্চরের পিঠে চড়ে আমি চলছি, আর যে উদ্দেশ্যে আমি বের হয়েছিলাম তার অনুসন্ধান করছি, এমন সময় আমি আবু সুফিয়ান এবং বুদায়ল ইবন ওরকার কথোপকথন শুনতে পেলাম। তখন তারা দু'জনে বাদানুবাদ করছিল। আবু সুফিয়ান বলছিল: আমি এ রাতের মত এত আগুন এত অধিক সংখ্যক লোক-লশকর তো আর কখনো দেখিনি!
আব্বাস বলেন, এর জবাবে বুদায়ল বলছিল: আল্লাহর কসম! এরা খুযাআ গোত্রের লোক, নিশ্চয়ই এরা যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করেছে।
আব্বাস (রা) বলেন: জবাবে আবু সুফিয়ান বলছিল, এ আগুন ও লোক-লশকর বন্ খুযাআর হতেই পারে না। তাদের সংখ্যা ও শক্তি এর চাইতে অনেক কম।
আব্বাস ইব্ন আবদুল (রা) মুত্তালিব বলেন: আবু সুফিয়ানের কণ্ঠস্বর চিনতে পেরে আমি বলে উঠলাম: 'হে আবু হান্যালা' সেও তখন আমার কণ্ঠস্বর চিনতে পারলো। সে বললো আবুল ফযল নাকি? আব্বাস বলেন: তখন আমি বললাম: 'হ্যাঁ।'
সে বললো: 'আমার বাবা-মা তোমার জন্যে কুরবান! তুমি যে এখানে, ব্যাপার কী? আমি বললাম: ধ্বংস হও, হে আবু সুফিয়ান! ঐ চেয়ে দেখ, আল্লাহ্র রাসূলকে লোকজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। আল্লাহ্র শপথ! কুরায়শদের ধ্বংস অনিবার্য।
আবু সুফিয়ান বলল: তা হলে এখন উপায়? আমার বাপ-মা তোমার জন্যে কুরবান হোন! আব্বাস বলেন: আমি তখন বললাম, আল্লাহ্র কসম! রাসূলুল্লাহ্ যদি তোমাকে নাগালে পান, তা হলে তরবারি দ্বারা তোমার গর্দান উড়িয়েই তবে ছাড়বেন। তুমি বরং এ খচ্চরের পিঠে চড়ে বসো। আমি তোমাকে আল্লাহ্র রাসূলের নিকট নিয়ে গিয়ে তাঁর কাছে তোমার জন্যে নিরাপত্তার আবেদন জানাই।
আব্বাস (রা) বলেন: সে মতে সে আমার পিছনে খচ্চরের উপর চড়ে বসে। তার সঙ্গীদ্বয় ফিরে চলে যায়। আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে চলে এলাম। যখনই আমি মুসলমানদের কোন আগুনের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখনই মুসলমানরা পরস্পর বলাবলি করছিল: ইনি কে? যখন তাঁরা আমাকে খচ্চরের পিঠে উপবিষ্ঠ দেখতে পেতো, তখন বলে উঠতো, ওহ্, উনি তো রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চাচা, তাঁরা খচ্চরে মওয়ার হয়ে যাচ্ছেন। এভাবে আমি উমর ইব্ন খাত্তাব (রা)-এর আগুনের পাশে দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। তিনি বলে উঠলেন: এ লোকটি কে? বলে তিনি দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকাতে লাগলেন। তারপর যখন তিনি বাহনের পিছনে আবু সুফিয়ানকে দেখতে পেলেন, তখন তিনি লাফিয়ে উঠলেন এবং বললেন: এতো আল্লাহ্হ্ দুশমন আবু সুফিয়ান দেখছি! "সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ্, যিনি কোন প্রকার সন্ধিচুক্তি ছাড়াই তাকে আমাদের নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছেন।" তারপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ছুটলেন। আর আমি চাবুক কষে খচ্চরকে উত্তেজিত করে তাঁর আগেই পৌঁছে গেলাম, ঠিক যেমনটি ধীরগতি সম্পন্ন কোন মানুষের আগেই দ্রুতগতির সওয়ারী গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যায়।
আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) আরো বলেন: তারপর আমি খচ্চর থেকে নেমে রাসূলুল্লাহ্র কাছে উপস্থিত হলাম। সাথে সাথে উমর (রা)ও সেখানে প্রবেশ করলেন। ঘরে ঢুকেই তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এই যে আবু সুফিয়ান, কোন প্রকার সন্ধিচুক্তি ছাড়াই আল্লাহ্ তা'আলা একে আমাদের নাগালের মধ্যে দিয়েছেন। অনুমতি হলে আমি এর গর্দানটা উড়িয়ে দেই।
আব্বাস (রা) বলেন: আমি তখন বলে উঠলাম: "ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কিন্তু একে আশ্রয় দিয়েছি।" তারপর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একান্ত পাশ ঘেঁষে বসে তাঁর মাথায় হাত দিয়ে বললাম: আল্লাহ্র কসম, আজকের রাত আমি ছাড়া আর কেউই তার সাথে একান্তে মিলিত হয়নি বা কানাঘুষা করেনি। তারপর আবু সুফিয়ানের ব্যাপারে উমর যখন অনেক কিছু বলে ফেললেন, তখন আমি বললাম: থামো হে উমর, আল্লাহর শপথ, এ ব্যক্তি যদি আদী ইব্ন কা'আব গোত্রের লোক হতো, তাহলে তুমি এতসব বলতে না! কিন্তু তুমি জানো যে, এ আব্দে মানাফ গোত্রের লোক, তাই তোমার এত বাড়াবাড়ি! উত্তরে উমর বললেন: থামো, হে আব্বাস! আল্লাহর কসম, যেদিন তুমি ইসলাম গ্রহণ করেছিলে, সেদিন তোমার ইসলাম গ্রহণ আমার নিকট (আমার পিতা) খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় ছিল। যদি তিনি ইসলাম গ্রহণ করতেন—করেন আমি জানি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট তোমার ইসলাম গ্রহণ, খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ অপেক্ষা সেদিন প্রিয়তর হতো।
টিকাঃ
১. সুহাম ও সুরুদ ইয়ামানে অবস্থিত দু'টি স্থানের নাম।