📄 আবু সুফিয়ানের সন্ধি প্রচেষ্টাঃ পিতার সাথে উম্মু হাবীবার আচরণ
তারপর আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে আগমন করে। এসে সে সর্বপ্রথম নবী সহধর্মিণী (স্বীয় কন্যা) উম্মু হাবীবার ঘরে যায়। ঘরে প্রবেশ করেই আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিছানার উপর বসতে উদ্যত হলে, উম্মু হাবীবা বিছানাটি গুটিয়ে সরিয়ে ফেলেন। তখন আবু সুফিয়ান বলে উঠলো : বেটি! আমার সম্মানে এ বিছানা থেকে আমাকে দূরে রাখছো, নাকি বিছানাটির সম্মানে তাথেকে আমাকে সরিয়ে দিচ্ছো, বুঝে উঠতে পারলাম না! জবাবে উম্মু হাবীবা (রা) বললেন: বরং এটা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শয্যা। আর আপনি হচ্ছেন নাপাক পৌত্তলিক। আপনি আল্লাহর রাসূলের শয্যার উপর বসবেন এটা আমি মেনে নিতে পারছি না। এ কথা শুনে আবু সুফিয়ান বলে উঠলো : আল্লাহর কসম! বেটি, আমাকে ছেড়ে এসে তুই খুবই খারাপ হয়ে গেছিস।
অরপর আবু সুফিয়ান বের হয়ে এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সংগে কথা বলে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ নিরুত্তর থাকায় সে আবূ বকরের নিকট গিয়ে তার পক্ষে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে কথা বলার অনুরোধ জানায়। জবাবে হযরত আবূ বকর (রা) বললেন: আমার পক্ষে তা সম্ভবপর হবে না।
তারপর আবু সুফিয়ান উমর (রা)-এর নিকট এসে এ ব্যাপারে আলাপ করলে, তিনিও বললেন : রাসূলুল্লাহর দরবারে আমি করবো সুপারিশ তোমাদের পক্ষে? আল্লাহ্র কসম! আমি যদি এতটুকু শক্তিও পাই, তা হলে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবো!
অগত্যা সে আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-এর নিকট গেল। রাসূল-তনয়া ফাতিমা (রা) যখন আলী (রা)-এর নিকটে বসা ছিলেন এবং তার কাছে ছিলেন তাঁদের শিশুপুত্র হাসান। আবু সুফিয়ান এভাবে কথা পাড়লো: “আলী, তোমাকেই আমি আমার প্রতি সর্বাধিক দরদী মনে করি। আমি বিশেষ একটি প্রয়োজনে এসেছিলাম। বিফল হয়ে ফিরে যেতে মন চায়না। অতএব তুমি আমার পক্ষে রাসূলুল্লাহ্র কাছে একটু সুপারিশ কর!”
জবাবে আলী (রা) বললেন : তোমার সর্বনাশ হোক, আবু সুফিয়ান, আল্লাহর রাসূল যে প্রতিজ্ঞ, সে ব্যাপারে কিছু বলার সাধ্যি আমার নেই। জবাব শুনে আবু সুফিয়ান ফাতিমা খাতুনকে লক্ষ্য করে বললো: হে মুহাম্মদ তনয়া! তুমি তোমার এ শিশু-পুত্রটিকে লোকদের মধ্যে মীমাংসা করে দিতে বলবে কি? ফলে, আজীবন সে আরবের নেতা রূপে গণ্য হবে? জবাবে ফাতিমা (রা) বললেন: ওর এখনো সে বয়স হয়নি যে সে লোকদের বিচার মীমাংসা করতে পারে! তা ছাড়া আল্লাহ্র রাসূলের উপর বিচার মীমাংসা করার সাধ্যিও কারো নেই।
আবু সুফিয়ান বললো: আবুল হাসান, আমার জন্যে বিষয়গুলো জটিল হয়ে গেল দেখছি! তুমি আমাকে কিছু পরামর্শ দাও দেখি!
জবাবে আলী (রা) বললেন: আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। তুমি হচ্ছো বনূ কিনানার সর্দার। তুমি নিজেই লোকদের মাঝে মীমাংসার ব্যবস্থা করে দেশে চলে যাও!
আবু সুফিয়ান বললো: তুমি কি মনে কর, এতে কোন কাজ হবে? জবাবে আলী (রা) বললো: না, আল্লাহর শপথ আমি ঠিক তা মনে করি না, কিন্তু এছাড়া তোমাকে বলার মত তো আমি কিছুই পাচ্ছি না!
তারপর আবু সুফিয়ান মসজিদে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো: লোকসকল! আমি সকলের সামনে হুদায়বিয়ার সন্ধি নবায়ন করলাম। একথা বলেই সে উটের পিঠে চড়ে তৎক্ষণাৎ রওনা হয়ে চলে যায়।
তারপর সে কুরায়শদের নিকট ফিরে এলে তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলো: কী সংবাদ নিয়ে আসলে? জবাবে আবু সুফিয়ান বললো: মুহাম্মদের কাছে গিয়ে আমি তার সঙ্গে আলাপ করেছি। কিন্তু আল্লাহর শপথ! সে আমাকে কোন উত্তরই দিল না! তারপর গেলাম আবূ কুহাফার ছেলের কাছে। কিন্তু তার কাছেও কোন কল্যাণ পেলাম না। তারপর খাত্তাবের পুত্রের নিকট গিয়ে তাকে পেলাম নিকৃষ্টতম শত্রুরূপে। ইবন হিশাম 'নিকৃষ্টতম শত্রু' স্থলে 'সেরা শত্রু' বলেছেন।
ইবন ইসহাক বলেন: (আবূ সুফিয়ানের বিবরণ) তারপর আমি গেলাম আলীর নিকট। তাকে অবশ্য অন্যদের তুলনায় অনেকটা নমনীয় পেয়েছি। সে আমাকে যে পরামর্শ দিল, আমি তা-ই বাস্তবায়িত করে এসেছি। কিন্তু তাতে কোন ফলোদয় হয়েছে কি না, তা আমি বলতে পারবো না।
তারা বললো: তোমাকে সে কী পরামর্শ দিয়েছিলো? জবাবে আবু সুফিয়ান বললো: আমাকে সে লোকসমক্ষে সন্ধি চুক্তি নবায়নের ঘোষণা দিতে বলে দিয়েছিল। আমি তাই করে এসেছি।
তারা আবার জিজ্ঞেস করলো: মুহাম্মদ কি তা অনুমোদন করেছে? জবাবে আবু সুফিয়ান বললো: 'না', তারা বললো ধ্বংস হোক তোমার! আল্লাহর শপথ! লোকটি তোমার সঙ্গে তামাশা বৈ কিছু করেনি। তুমি যা বলে এসেছো তাতে কোন কাজই হবে না।
আবূ সুফিয়ান বললো: তা অবশ্যি ঠিক। আল্লাহর কসম! এ ছাড়া আমার কোন গত্যন্তরও ছিল না।
📄 মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি
তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকজনকে প্রস্তুতি গ্রহণের আদেশ দেন। তাঁকে প্রস্তুত করে দেয়ার জন্যে পরিবারের লোকজনকেও তিনি আদেশ করেন। এ সময় আবু বকর (রা) তাঁর কন্যা আয়েশা (রা)-এর ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুদ্ধযাত্রার আসবাবপত্র গুছিয়ে দিচ্ছিলেন। তা লক্ষ্য করে আবূ বকর (রা) বললেন: বেটি! রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার যুদ্ধের আসবাবপত্র গুছিয়ে দেয়ার জন্যে তোমাদেরকে আদেশ করেছেন নাকি? জবাবে তিনি বললেন: জ্বী হ্যাঁ আব্বা, আপনিও প্রস্তুত হয়ে যান! তিনি আবার বললেন: তিনি কোথায় যেতে পারেন বলে তোমার ধারণা হয়?
আয়েশা (রা) বললেন: আল্লাহর শপথ, তা আমার জানা নেই। তারপর অবশ্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজেই ঘোষণা দিলেন যে, তিনি মক্কায় যাবেন এবং তাঁদেরকেও তিনি সফরের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। তারপর তিনি বললো: اللَّهُمَّ خُذِ الْعُيُونَ وَالْأَخْبَارَ عَنْ قُرَيْشٍ حَتَّى نَبْغَتَهَا فِي بِلَادِهَا অর্থাৎ-হে আল্লাহ্! চোখসমূহকে গাফিল এবং সংবাদসমূহকে তুমি কুরায়শদের নিকট গোপন রেখো! যাতে করে আমরা তাদের নগরীতে তাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করতে পারি।
সে মতে লোকজন প্রস্তুতি গ্রহণ করে। হাসান ইবন সাবিত (রা) লোকদেরকে যুদ্ধ প্রস্তুতির উৎসাহ দিয়ে এবং খুযাআ গোত্রের বিপন্ন লোকজনের কথা উল্লেখ করে নিম্নোক্ত পংক্তিগুলো আবৃত্তি করেন:
عناني ولم اشهد ببطحاء مكة * رجال بني كعب تحز رقابها
-ব্যাপারটি আমাকে খুবই মর্মাহত করেছে, অথচ আমি তখন মক্কাভূমিতে উপস্থিত ছিলাম না, যখন বনূ কা'বের লোকদের গর্দান কাটা হচ্ছিল-
بايدي رجال لم يسلو اسيوفهم * وقتلى كثير لم تجن ثيابها
সেসব লোকদের হাতে, যারা প্রকাশ্যে তাদের তরবারিসমূহকে নিষ্কোষিত করেনি। (বরং রাতের আঁধারে কাপুরুষের মত গোপনে গোপনে হত্যা রাহাজানি ও লুটপাট শুরু করেছিল) আর অনেক নিহতকেই বস্ত্রাচ্ছাদিত করে কাফন-দাফন দেয়া সম্ভবপর হয়ে উঠেনি।
الا ليت شعري هل تنالن نُصرتي * سهيل بن عمرو وَخَزَهَا وَعِقَابُهَا
হায়, যদি কেউ আমাকে অবগত করতো, সুহায়ল ইব্ন আমরের কাছে আমার ছোট বড় হ্যষ্যগুলো পৌঁছলো কি না!
وصفوان عود حَنَّ من شفر و استه * فَهَذَا أَوَانُ الحَرب شَدَّ عَصَابَهَا
আর সাফওয়ান ইবন উমাইয়া একটি বৃদ্ধ উটের মত। মৃদু পশ্চাৎ-বায়ুর আওয়ায শুনেও এসে ভরে কঁকিয়ে উঠে। এটাই যুদ্ধের সময়।
📄 হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আর পত্র
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্ন জা'ফর ইবন যুবায়র (র) উরওয়া ইব্ন যুবায়র প্রমুখ আলিমগণের সূত্রে বর্ণনা করেন। তারা বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর, হাতিব ইবন আবূ বালতা'আ (রা) এ অভিযানের সংবাদ দিয়ে কুরায়শদের নিকট একটি পত্র লিখেন। তারপর তা পুরস্কারের বিনিময়ে কুরায়শদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যে এক মহিলার হাত অর্পণ করেন। মুহাম্মদ ইবন জা'ফরের ধারণা, এ মহিলাটি ছিল মুযায়না গোত্রের। অন্যদের ধারণায় সে ছিল আবদুল মুত্তালিবের বংশের জনৈক ব্যক্তির 'সারা' নাম্নী দাসী। মহিলাটি পত্রটি তার মাথার চুলের খোপায় গুঁজে রওনা হয়ে পড়ে। এদিকে আসমান থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে হাতিবের এ কার্যক্রমের সংবাদ এসে যায়। ফলে, সঙ্গে সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্ন আবূ তালিব ও যুবায়র ইব্ন আওয়امকে এ আদেশ দিয়ে প্রেরণ করলেন যে, ঐ মহিলাকে ধরো যার মাধ্যমে হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আ আমাদের এ অভিযানের প্রস্তুতির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে, কুরায়শদের নিকট পত্র পাঠিয়েছেন।
সেমতে, তাঁরা দু'জন খালীকা বনু আবূ আহমদ' নামক স্থানে গিয়ে তাকে ধরে ফেলেন। তাঁরা তাকে উটের উপর থেকে নামিয়ে তার হাওদায় তল্লাসী চালান। কিন্তু তাঁরা তাতে কিছুই খুঁজে পেলেন না। তখন আলী (রা) তাকে লক্ষ্য করে বললেন: আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সা) মিথ্যা বলেননি। আমরাও মিথ্যা বলছি না। হয় তুমি চিঠিখানা বের করে দেবে, নতুবা আমরা তোমাকে উলঙ্গ করে ছাড়ব। আলী (রা)-এর এরূপ কঠোরতা লক্ষ্য করে মহিলাটি বলল: আপনি একটু অন্যদিকে মুখ ফিরান। আলী (রা) অন্যদিকে ফিরিয়ে দাঁড়ালে সে তার চুলের খোঁপা থেকে চিঠিটি বের করে তাঁর হাতে তুলে দিল। তিনি চিঠিটা নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে হাযির হলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাতিব (রা)-কে ডেকে এনে বললেন: কিসে তোমাকে এ কাজে প্ররোচিত করলো, হে হাতিব?
জবাবে হাতিব (রা) বললেন: “ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহ্ শপথ, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অবশ্যই আমার ঈমান রয়েছে। আমি মোটেও বদলে যাইনি বা আমার মধ্যে কোন পরিবর্তন সূচিত হয়নি। কিন্তু আমি এমন এক ব্যক্তি, যার গোত্রগোষ্ঠী বা আপনজন বলতে কেউ নেই। কিন্তু আমার স্ত্রী-পুত্ররা কুরায়শদের মধ্যে রয়ে গেছে। সেহেতু তাদের প্রতি আমি এ আনুকূল্যটুকু দেখিয়ে তাদের একটু সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করেছি।
এ কথা শুনে উমর ইবন খাত্তাব (রা) বলে উঠলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমাকে অনুমতি দিন, আমি ওর গর্দানটা উড়িয়ে দেই। কারণ, এ লোকটি মুনাফিকী করেছে।
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: উমর! তুমি কি জানো যে আল্লাহ্ তা'আলা বদর যুদ্ধের অংশগ্রহণকারী সাহাবীদেরকে বলে দিয়েছেন যে, তোমরা তোমাদের মনে যা চায়, তা-ই কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম। তারপর আল্লাহ তা'আলা হাতিব সম্পর্কে নাযিল করেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّة ...... فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الحَمِيدُ.
অর্থাৎ- "হে মু'মিনগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তোমরা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছো, অথচ তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা রাসূলকে এবং তোমাদের বের করে দিয়েছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহকে বিশ্বাস কর। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হয়ে থাকো, তবে কেন তোমারা তাদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব করেছো? তোমরা যা গোপন করো এবং তোমরা যা প্রকাশ কর, তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের মধ্যে যে কেউ এটা করে সে তো সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়।
তোমাদের কাবু করতে পারলে তারা হবে তোমাদের শত্রু এবং হাত ও জিহবা দ্বারা তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে এবং তারা চাইবে যে তোমরাও কুফরী করো।
তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন কোন কাজে আসবে না। আল্লাহ্ তোমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবেন। তোমরা যা কর তিনি তা দেখেন।
তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল: তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হলো শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য যদি না তোমরা এক আল্লাহর উপর ঈমান আন। তবে ব্যতিক্রম হলো আপন পিতার প্রতি ইবরাহীমের উক্তি, "আমি অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবো এবং তোমার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট আমি কোন অধিকার রাখি না।"
ইবরাহীম ও তার অনুসারিগণ বলেছিল: 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তো তোমারই উপর নির্ভর করেছি, তোমারই অভিমুখী হয়েছি এবং প্রত্যাবর্তন তো তোমারই নিকট।' 'হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের কাফিরদের পীড়নের পাত্র করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের ক্ষমা কর; তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।'
তোমরা যারা আল্লাহ্ ও আখিরাতের প্রত্যাশা কর, নিশ্চয়ই তাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ ইবরাহীম ও তার অনুসারীদের মধ্যে। কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে সে জেনে রাখুক, আল্লাহ্ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ” (৬০: ১-৬)।
টিকাঃ
১. ইয়াকৃতের বিবরণ অনুযায়ী স্থানটি মদীনা থেকে বার মাইল দূরে অবস্থিত। কেউ কেউ খালায়ক বলেও স্থানটির নাম উল্লেখ করেছেন।
📄 মক্কার পথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যাত্রা
ইবন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্ন মুসলিম ইব্ন শিহাব যুহরী আমার কাছে, উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উতবা ইবন মাসউদ সূত্রে আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি কুলসুম ইবন হুসায়ন ইব্ন উতবা ইব্ন খাল্ফ গিফারীকে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান। রমযানের দশ তারিখে তিনি রওনা হন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সঙ্গীরা রোযা রাখেন। যখন তাঁরা উসফান ও আমাজের মধ্যবর্তী কুদায়দ নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন তিনি সঙ্গীদেরসহ ইফতার করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: তারপর সেখান থেকে রওনা হয়ে তিনি দশ হাজার মুসলমানসহ মারায যাহরান নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন। তন্মধ্যে সুলায়ম গোত্রের সাত শ', মতান্তরে এক হাজার, আর মুযায়না গোত্রের এক হাজার লোক এবং আনসার ও মুহাজিরদের সকলেই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে ছিলেন; তাঁদের একজনও অনুপস্থিত ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মারায যাহ্বানে অবস্থান করছিলেন, কুরায়শরা তখনো তাঁর আগমন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। ঐ রাতেই আবু সুফিয়ান ইব্ন হাব, হাকীম ইন্ন হিযام ও বুদায়ল ইন ওরাকা সঙ্গোপনে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বের হয়।
এদিকে আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব মক্কা থেকে বের হয়ে পথে কোন এক স্থানে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে মিলিত হন।
ইন হিশাম বলেন: আব্বাস (রা) সপরিবারে হিজরত করে জুহফা নামক স্থানে এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে মিলিত হন। তিনি হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব নিয়ে এর পূর্ব পর্যন্ত মক্কায় বসবাস করছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর প্রতি প্রসন্নই ছিলেন। ইব্ন শিহাব যুহরী এরূপই বর্ণনা করেছেন।